আবু আফজাল সালেহের কবিতার নান্দনিক পাঠ
বাংলাবাঁক টিম
স্থিতিস্থাপকতা (Resilience) মানুষের টিকে থাকার চিরন্তন লড়াই, বিপর্যয় কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি এবং সংকটেও মানবিক মূল্যবোধ ধরে রাখার এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। সমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম নিভৃত ও মগ্ন সাধক কবি আবু আফজাল সালেহ। তাঁর কাব্যবিশ্ব যেমন সমকালীন জীবনের জটিলতায় দীর্ণ, তেমনই তা এক গভীর জীবনবাদী প্রত্যয়ে উজ্জ্বল।
আবু আফজাল সালেহর ‘বারবার ফিরে আসি‘ বা ‘বলেই ফেলি ভালোবাসি‘ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পাঠ করলে বোঝা যায়, তিনি কেবল সংকটের অন্ধকার তুলে ধরেন না, বরং সেই অন্ধকারের বুক চিরে আলোয় ফেরার এক অদম্য তাগিদ তৈরি করেন। সাহিত্যে ও জীবনদর্শনের পরিভাষায় এই ঘুরে দাঁড়ানোর নামই হলো ‘স্থিতিস্থাপকতা’ বা ‘রেজিলিয়েন্স‘।আবু আফজাল সালেহের কবিতায় স্থিতিস্থাপকতার বিভিন্ন মাত্রা নিচে আলোচনা করা হলো।
১. প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনের সহনশীলতা: কবির বেড়ে ওঠা চুয়াডাঙ্গার গ্রামীণ জনপদে। তাঁর কবিতায় বাংলার চেনা প্রকৃতি, নদী, মাটি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বারবার ফিরে এসেছে। গ্রামীণ জীবনের অভাব-অনটন, ঝড়-ঝাপটা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে টিকে থাকার যে সহজাত শক্তি, তাকে কবি অত্যন্ত দরদ দিয়ে এঁকেছেন। বারবার ভেঙে পড়ার পরও মানুষ যেভাবে মাটির টানে, ফসলের আশায় আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়—সেটিই তাঁর কবিতার মূল চালিকাশক্তি।
২. বারবার ফিরে আসার প্রত্যয়তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘বারবার ফিরে আসি’। এই শিরোনামটি নিজেই স্থিতিস্থাপকতার এক অনন্য ইশতেহার। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, হতাশা এবং ব্যর্থতা মানুষকে সাময়িকভাবে পিছু হঠাতে পারে, কিন্তু নিঃশেষ করতে পারে না। কবির উচ্চারণে বারবার ফিরে আসার এই যে আকুলতা, তা আসলে পরাজয়কে অস্বীকার করে নতুন করে জীবন শুরু করার এক দৃঢ় মানসিকতার প্রতীক।
৩. প্রেম ও সম্পর্কের পুনর্নির্মাণ: ‘বলেই ফেলি ভালোবাসি‘ কাব্যে কবি প্রেমের এক ভিন্ন রূপ দেখিয়েছেন। তাঁর কবিতায় প্রেম শুধু আবেগ বা মিলনের আনন্দ নয়, বরং তা ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়েও সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার এক আত্মিক শক্তি। আধুনিক জীবনের যান্ত্রিকতা ও ব্যস্ততা যখন সম্পর্কগুলোকে আলগা করে দেয়, তখন কবির পঙ্ক্তিগুলো ভালোবাসার চিরন্তন শক্তিতে বিশ্বাস রাখতে শেখায়। এই বিশ্বাসই মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেয় না।
৪. নাগরিক সংকট ও আত্মিক প্রতিরোধ : পেশাগত ও জাগতিক কারণে কবিকে নাগরিক জীবনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। শহরের যান্ত্রিকতা, স্বার্থপরতা ও একাকীত্ব মানুষকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করে। কিন্তু আবু আফজাল সালেহের কবিতা এই অপসংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে না। তাঁর কবিতায় এক ধরণের আত্মিক প্রতিরোধ বা ‘রেজিলিয়েন্স‘ দেখা যায়, যা নাগরিক কোলাহলের মাঝেও অন্তরের শুদ্ধতা ও মানবিকতাকে বাঁচিয়ে রাখে।
আবু আফজাল সালেহের কবিতা আমাদের শেখায় কীভাবে দুঃখকে শক্তিতে রূপান্তর করতে হয়। তাঁর কবিতা কোনো সস্তা আশাবাদের কথা বলে না, বরং জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে কীভাবে নতুন করে পথ চলতে হয়, সেই স্থিতিস্থাপকতার পাঠ দেয়। এখানেই কবি হিসেবে তাঁর সার্থকতা এবং সমকালীন বাংলা সাহিত্যে তাঁর কবিতার প্রাসঙ্গিকতা।
বাংলাবাঁক 