ঢাকা ০৯:৪৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
চুয়াডাঙ্গা জেলার সাহিত্য নিয়ে দৈনিক যুগান্তরের বিশেষ আয়োজন

চুয়াডাঙ্গার সাহিত্যে যাদের অবদান

  • বাংলাবাঁক
  • আপডেট : ১১:৩৮:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৪
  • 315


মুন্সি আবু সাইফ 



চুয়াডাঙ্গা একটি ঐতিহাসিক জনপদ। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে চুয়াডাঙ্গা জেলার ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গাবাসীর অবিসংবাদিত লড়াকু ভূমিকা বিশ্বজনবিদিত। জাতীয় সংকটে এ জনপদবাসীর অবদান দেশময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়ে থাকে। পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতিচর্চার পৃষ্ঠপোষকতায় এ জনপদের অবদান অনস্বীকার্য। অবিভক্ত চুয়াডাঙ্গায় বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সান্নিধ্যে একটি সমৃদ্ধ শিল্প-সংস্কৃতির বলয় নির্মিত হয়েছিল। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের(ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে) যশোর ঝিনাইদহে অবস্থান, যশোর জেলার কালজয়ী প্রতিভা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্যকর্মে খোল-নলচে পরিবর্তনে অঙ্গীকার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহে অবস্থান (১৮৮৯-১৯০২ খ্রি.), বাউল সম্রাট লালন শাহের মরমি সাধনা, কাঙ্গাল হরিনাথের সংগীতভাবনা, মীর মশাররফ হোসেনের অবিস্মরণীয় কথাসাহিত্য, নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের পোস্টমাস্টার হিসাবে যশোরে অবস্থান, বাংলাসাহিত্যে প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক স্বর্ণকুমারী দেবী কর্তৃক জয়রামপুরে নিজস্ব প্রেস স্থাপন ও সাহিত্যচর্চা, ব্রিটিশ গোয়েন্দা দপ্তরের দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা সুসাহিত্যিক প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের চুয়াডাঙ্গায় অবস্থান এবং সর্বোপরি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গায় সাময়িক অবস্থান ও সাহিত্যচর্চা এ অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতিচর্চার মজবুত ভিত্তি নির্মাণ করে দিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় জেলার বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় চুয়াডাঙ্গার সাহিত্যাঙ্গন সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্য-ভাস্বর হয়ে উঠেছিল এবং সেই গৌরবময় ধারা আজও অব্যাহত।

চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য আন্দোলনের প্রাণপুরুষ কবি সুন্দর রেজাউল হক । রেজাউল হকের সমসাময়িক আরেকজন দিকপাল কবি প্রতিভা কবি শফিউদ্দীন। এম. ইব্রাহিম অনেক কবিতা রচনা করে চুয়াডাঙ্গা সাহিত্যকে সমৃদ্ধি দান করেছিলেন। আহাদ আলী মোল্লা সমকালীন বাংলা ছড়াসাহিত্যের একজন প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব। তুখোড় ছন্দশিল্পী। ছড়াকার হিসাবে স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশভঙ্গি, শব্দ বিন্যাসের নিপুণতা ও গতিময় ছন্দের চমৎকার গাঁথুনিতে তার জুড়ি নেই। তিনি ইতোমধ্যে ২০ হাজারেরও বেশি ছড়া লিখেছেন। লিখে চলেছেন নিরন্তর। প্রতিভাবান এ ছড়াকারের জন্ম ১৯৬৭ খিষ্টাব্দের ২২ নভেম্বর নানাবাড়ি চুয়াডাঙ্গার হাজরাহাটি গ্রামে। পৈতৃক বাড়ি আলমডাঙ্গা উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে। শক্তিমান এ ছড়াকার আশির দশক থেকে জাতীয় পত্রপত্রিকাসহ দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে আসছেন। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে চুয়াডাঙ্গার জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক মাথাভাঙ্গার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘টিপ্পনী’ শিরোনামে সমাজ সচেতনমূলক ছড়া লিখে বিশেষ খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।

চুয়াডাঙ্গার প্রয়াত বরেণ্য বুদ্ধিজীবী এনএন সাহার গর্বিত সন্তান ছড়াকার চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু। বাংলাদেশের জাতীয় শিশুসাহিত্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি। চিতু ছাত্রজীবন থেকেই শিশুসাহিত্যের সঙ্গে জড়িত। তিনি শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য অসংখ্য পুরস্কার ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় অসংখ্য সংবাদপত্রে তার কয়েক হাজার লেখা প্রকাশিত হয়েছে এবং বর্তমানেও ছাপা হচ্ছে। চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু ছড়াকার হিসাবে বাংলাদেশ ও ভারতের সাহিত্যাঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছেন। বর্তমানে দৈনিক আকাশ খবর পত্রিকায় প্রতিদিন ‘চিমটি’ শিরোনামে তার ছড়া কলাম প্রকাশিত হয়। ইদ্রিস মণ্ডল বিশিষ্ট কবি ও ছড়াকার। চুয়াডাঙ্গা জেলার অগ্রগণ্য ছড়াকারদের মধ্যে অন্যতম। স্বরবৃত্ত ছন্দে ইদ্রিস মণ্ডলের রয়েছে অসাধারণ দক্ষতা। তার লেখা ব্যতিক্রমধর্মী ছড়াগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত পাঠ হয়ে থাকে। প্রেম, প্রকৃতি ও সমাজসচেতনতামূলক ছড়াগুলো চিত্ররূপময়তার মাধুর্যে বাণীবদ্ধ রূপ লাভ করেছে। মোঃ আনছার আলী (১৯৬২ খ্রি.) জেলার প্রথম শ্রেণির ছড়াকারদের অন্যতম। তিনি নানারকম মননশীল কবিতা ও ছড়া রচনায় অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। দেশ ও প্রকৃতি প্রেমমূলক ছড়া ও কবিতায় তিনি ঈর্ষণীয় সাফ্যলের পরিচয় দিয়েছেন। আব্দুল মালেক জাগরণী জেলার অন্যতম কবি ও ছড়াকার। তার ‘টিপাই মুখের ছড়া’ উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। তার ছড়ার মধ্যে স্বরবৃত্ত ছন্দের বৈচিত্র্যময় প্রয়োগ লক্ষ্যণীয়। তিনি সমাজজীবন থেকে উপাদান ও রসদ সংগ্রহ করে ছড়া ও কবিতায় বাণীবদ্ধ রূপদান করে থাকেন। নজমুল হেলাল দেশের একজন খ্যাতিমান কবি। কবিতাই নজমুল হেলালের ঘরবসতি। তার অস্তিত্বজুড়ে কবিতা। বাংলাদেশের সাহিত্যের মূল ধারায় থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ নজমুল হেলাল সেই ১৯৭৪ সাল থেকে বিরামহীন সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। কবিতার টানে তিনি বিশ্বনাগরিক। ছুটে চলেন দুই বাংলার পথে প্রান্তরে। সংগ্রহ করেন কবিতার রসদ। বিভিন্ন ধরনের সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনা করে থাকেন। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার লেখা কবিতা ও গান গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়ে থাকে।

বাতিঘর জাতিস্বর মুজিব

এখনো স্বপ্ন দেখায়

অমর কবিতা লেখায় মুজিব আমাদের

মৃত বলো না তাকে, মুজিব মরে নাই

মুজিব চেতনায়।

(মুজিব মরে নাই মৃত বলো না তাকে, নজমুল হেলাল)

ময়নুল হাসান আদ্যোপান্ত রোমান্টিক কবি। তার রচিত ‘মাধবী ঠোঁটে ঠোঁট রেখে’ এবং ‘যদি ভালোবাসা দাও’ দুটি অনন্য অসাধারণ রোমান্টিক কাব্যগ্রন্থ। তার কবিতায় কাব্যচেতনার সঙ্গে মিলিত হয় কবিতার অসাধারণ শিল্পসৌকর্য। অনুপ্রাস, শ্লেষ বক্রোক্তি ব্যবহারে তিনি অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার অকালপ্রয়াণ চুয়াডাঙ্গায় সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে গভীর ক্ষত ও শূন্যতার জন্ম দিয়েছে। জাহিদুল ইসলাম মূলত একজন কবি ও ছড়াকার। আশির দশক থেকেই তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন। তার লেখা লিমিরিকধর্মী কবিতাগুলো দক্ষ সমাজ মানসের পরিচয় বহন করে। অভিনব ছন্দের গাঁথুনি, বক্তব্যের ঋজুতা, তীব্র সমাজ মনস্কতা তার কবিতা নবসৃষ্টির বার্তা বহন করে। আশির দশক থেকে বাংলা ছোটগল্প ও কবিতায় রিচার্ড রহমানের যাত্রা শুরু। গভীর রোমান্টিকতা, জাতিসত্ত্বার উদ্বোধন, প্রতিবাদ প্রতিরোধে তার কবিতা স্থায়ী মনোব্যঞ্জনাময় সত্য প্রকাশে ব্যাকুল। সরদার আল আমিন চুয়াডাঙ্গার অন্যতম কবি। আশির দশকে মনোবিশ্লেষণধর্মী কবিতা রচনায় তিনি একটি স্থায়ী আসন সৃষ্টি করেছিলেন। কবিতার ভাষায় এনেছিলেন চূড়ান্ত অভিনবত্ব। প্রতীক চিত্রকল্প ব্যবহারে তিনি চূড়ান্ত সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। শাহ আলম সনি মূলত কবি, গীতিকার ও সাংবাদিক। অনুকবিতার মধ্য দিয়ে তিনি সামাজিক সমস্যাকে চিহ্নিত করেন এবং উত্তরণের দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। কবিতার শব্দচয়নে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং ছন্দের সুনিপুণ গাঁথুনি শাহ আলম সনির কবিতার মূল উপজীব্য। কবি মোঃ শফিকুল ইসলাম এ প্রজন্মের একজন প্রতিশ্রুতিশীল কবি প্রতিভা। তার প্রকাশিত বেশকিছু কবিতাকর্ম রয়েছে। কবি মোঃ খলিলুর রহমান একজন সমাজসচেতন কবি ও ছড়াকার। নির্মোহ সমাজদৃষ্টি তার কবিতায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দে তিনি যথেষ্ট পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। আবু আফজাল সালেহ অত্যন্ত মননধর্মী কবি ও প্রাবন্ধিক। তার কবিতায় মননের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিচয় পাওয়া যায়। ঢাকা থেকে তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার। মোঃ নজরুল ইসলাম প্রভাত মিলন নামে প্রথম কাব্যগ্রন্থে তার কাব্যশৈলীর দুরন্ত প্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। কবি শরীফ সাথী চুয়াডাঙ্গার তরুণ কবি ও ছড়াকার হিসাবে ইতোমধ্যে সমগ্র বাংলাদেশে পরিচিতি লাভ করেছেন। তার লেখা উল্লেখযোগ্য কাব্য ও ছড়া গ্রন্থ হলো, বাংলাদেশের তাজ। টোজা বাবুর গরুর গাড়ি। শ্রী অশোক কুমার ঘোষ, শাশ্বত আলিম, রতন কুমার শর্মা তিনজনই মূলত স্বভাবধর্মের কবি। তাদের কবিতা ও ছড়ায় নানামুখী চেতনার পাশাপাশি শিল্প প্রকরণে অনুপ্রাসধর্মীতা লক্ষ করা যায়। শওকত আলী মূলত ছোটগল্পকার। তবে কবিতা রচনায় তার দক্ষতার প্রতিশ্রুতি বহন করে। ‘ইচ্ছের কাছাকাছি’ তার নিরীক্ষাধর্মী কাব্যগ্রন্থ। চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সাহিত্য সময়িকী পদধ্বনিতে নিয়মিত গল্প কবিতা প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া প্রগতি ও অন্যান্য স্থানীয় পত্রিকায় গল্প নিবন্ধ ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তপন কুমার পাল সাপ্তাহিক সাহিত্য পত্রিকা ও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তারেক এনামুল একজন প্রতিশ্রুতিশীল কবি ও ছড়াকার ছিলেন। তার অকাল মৃত্যুতে চুয়াডাঙ্গা একজন প্রতিভাবান ব্যক্তিকে হারায়। তার অসাধারণ ছড়াগ্রন্থ ‘উল্টে যদি পাল্টে যেত’। এ গ্রন্থে তার অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। খন্দকার হামিদুল ইসলাম একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, কবি ও নাট্যকার। আসিফ জাহান জেলার ঐতিহ্য সচেতন কবি হিসাবে সুপরিচিত। প্রেম, প্রকৃতি, মানুষ, ইতিহাস, ঐতিহ্য তার কবিতার মূল উপজীব্য। বাংলা ছন্দে তিনি যেমন অভিনবত্ব এনেছেন তেমন বিষয় ভাবনায় দেখিয়েছেন বৈচিত্র্য। হোসেন মোহাম্মাদ ফারুক মূলত কবি ও ছড়াকার। অভিজ্ঞতালব্ধ জীবনসত্য তার কবিতার মূল বাণী। ইতোমধ্যে তার তিনটি শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। এমএ মামুন একজন দক্ষ ছড়াকার ও কবি। ইতোমধ্যেই সমাজসচেতনমূলক ছড়া ও কবিতা রচনায় যথেষ্ট মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি অবিরত কবিতা ও ছড়া লিখছেন। অকাল প্রয়াত কবি অমিতাভ মীর দ্রোহের কবি হিসাবে সমধিক পরিচিত। তার কবিতায় অন্যায় অবিচার ও শৃঙ্খল ভাঙার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে। মূলত তার কবিতা জীবনবোধের অনুষঙ্গে অনন্য শিল্পবোধের চমৎকারিত্বে ভাস্বর হয়ে আছে। কবি সুমন ইকবাল বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে থাকেন। তার প্রকৃত নাম মোঃ ইকবাল হোসেন। সুমন মালিক দ্রোহের কবি। সামাজিক নানা অসংগতি অনাচার, অবক্ষয়, অবিচারের বিরুদ্ধে তার কবিতাগুলো শাণিত ভাষার সন্ধান দান করে। হামিদুল হক মুন্সী কবি ও প্রাবন্ধিক। ইতোমধ্যে তার ৩১টি মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনি শতাধিক লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করে দেশসেরা সম্পাদকের মর্যাদা পেয়েছেন। কাজল মাহমুদ নিরীক্ষাপ্রিয়, প্রথাবিরোধী কবি ও ছড়াকার হিসাবে সুপরিচিত। মোঃ ইব্রাহিম খলিল, তিনি আবু নাসিফ খলিল ছদ্মনামে কবিতা ও ছড়া লিখছেন। কবিতা ও ছড়ার ছন্দ বৈচিত্র্যে অভিনবত্ব আনার চেষ্টা করছেন। মোঃ গোলাম কবীর তিনি রোমান্টিক কবি হিসাবে জনপদে সমধিক পরিচিত। তার কবিতায় রোমান্টিকতার পাশাপাশি চিত্ররূপময়তা একটি বড় বৈশিষ্ট্য হিসাবে বিবেচ্য। গোলাম রহমান চৌধুরী একজন সমাজমনস্ক কবি। প্রেম প্রকৃতি ও ইতিহাস চেতনা তার কাব্যের মূল অনুষঙ্গ। রোমান্টিকতা এবং ইতিহাসনির্ভরতার মধ্যে তার কবিতাগুলো শেকড় সন্ধানী। মোঃ সিরাজুল হক নিয়মিত লেখালেখির মাধ্যমে ইতোমধ্যে জেলায় পরিচিতি লাভ করেছেন। আ.ফ.ম সিরাজ সামজী জেলার একজন অগ্রগণ্য কবি। ইতোমধ্যে কবিতা রচনায় তিনি যথেষ্ট খ্যাতি ও ব্যাপ্তির পরিচয় দিয়েছেন। কবি সিদ্দিক আহমেদ। মূলত নৈরাশ্যের মধ্যে আশার বসতি তার কবিতার কাক্সিক্ষত সুর। প্রয়াত সহিদা খাতুন জেলার অন্যতম মহিলা কবি। তার কবিতায় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিপ্রায় ও প্রত্যয় ঘোষিত হয়ে থাকে। সহিদা খাতুন ছিলেন স্বভাব কবি। তার কবিতায় দেশ মাতৃকার প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশিত হয়েছে। প্রয়াত সাহারে বানু মল্লিক একজন অসাধারণ কবি ও গীতিকার। আধুনিক বাংলা কবিতায় জটিল গ্রন্থি উন্মোচনে তার কবিতার পরম গতিশীলতা লাভ করেছে। জেলার উল্লেখযোগ্য মহিলা কবিগণের মধ্যে অন্যতম প্রবীণ কবি মালেকা হক মাখন। তার অসংখ্য লেখা চুয়াডাঙ্গাকে সমৃদ্ধ করেছে। এ ছাড়া আকলিমা খাতুন, আশরাফুন নাহার শোভা, জাকিয়া সুলতানা, মরিয়ম শেলি, মনোয়ারা খুশি, কেএম. জেসমিন আক্তার, জাহানারা জানি, আফসানা মেহজাবিন শাপলা, মোছাঃ সালমা খাতুন, তাসফিয়া আক্তার মালা লিখে চলেছেন।

এ প্রজন্মের যেসব কবি চুয়াডাঙ্গার কাব্যজগতকে সমৃদ্ধ করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হাফিজুর রহমান, তৌফিক জোয়ার্দার, শংকর কুমার প্রামাণিক, আবুল কালাম আজাদ। তা ছাড়া চুয়াডাঙ্গা জেলার অন্যান্য কবি ও ছড়াকারদের মধ্যে রয়েছেন সরদার আলী হোসেন, হোসেন মোশারক, মোঃ সাইফুল ইসলাম, মোঃ শফিকুল ইসলাম, শেখ নজরুল ইসলাম, মোঃ রাজিব হাসান, মোঃ আমজাদ হোসেন, মোঃ রহমত বিশ্বাস, মোঃ আবুল কাসেম, মোঃ রাইমাত উল ইসলাম, হুমায়ন কবির, আবুল কাশেম, রাকিব হাসান, মোঃ হাবিবুর রহমান মজুমদার, আজিজুর রহমান, মোঃ আব্দুল হামিদ, হেলাল হোসেন জোয়ার্দ্দার, মোঃ মিজানুর রহমান (শুনু), মোঃ হারুন অর রশিদ, সিরাজুল ইসলাম, মোঃ জাকির হোসেন, মোঃ কামরুজ্জামান চাঁদ, জামান লিঙ্কন প্রমুখ।

চুয়াডাঙ্গা জেলার বর্তমান সাহিত্য ক্ষেত্র অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং সম্ভাবনার বার্তা বহন করে। জেলার কবি ও ছড়াকাররা যথার্থ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অবদান রাখতে সক্ষম হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করতে পারি।

 

সৌজন্য : দৈনিক যুগান্তর, ঢাকা । ১৯ আগস্ট ২০২২ |  প্রিন্ট সংস্করণ।

লেখক : মুন্সি আবু সাইফ, গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ 

জনপ্রিয় পোস্ট

আবু আফজাল সালেহর ছড়া: সমাজ, প্রকৃতি ও উৎসবের মেলবন্ধন

চুয়াডাঙ্গা জেলার সাহিত্য নিয়ে দৈনিক যুগান্তরের বিশেষ আয়োজন

চুয়াডাঙ্গার সাহিত্যে যাদের অবদান

আপডেট : ১১:৩৮:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৪


মুন্সি আবু সাইফ 



চুয়াডাঙ্গা একটি ঐতিহাসিক জনপদ। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে চুয়াডাঙ্গা জেলার ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গাবাসীর অবিসংবাদিত লড়াকু ভূমিকা বিশ্বজনবিদিত। জাতীয় সংকটে এ জনপদবাসীর অবদান দেশময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়ে থাকে। পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতিচর্চার পৃষ্ঠপোষকতায় এ জনপদের অবদান অনস্বীকার্য। অবিভক্ত চুয়াডাঙ্গায় বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সান্নিধ্যে একটি সমৃদ্ধ শিল্প-সংস্কৃতির বলয় নির্মিত হয়েছিল। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের(ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে) যশোর ঝিনাইদহে অবস্থান, যশোর জেলার কালজয়ী প্রতিভা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্যকর্মে খোল-নলচে পরিবর্তনে অঙ্গীকার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহে অবস্থান (১৮৮৯-১৯০২ খ্রি.), বাউল সম্রাট লালন শাহের মরমি সাধনা, কাঙ্গাল হরিনাথের সংগীতভাবনা, মীর মশাররফ হোসেনের অবিস্মরণীয় কথাসাহিত্য, নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের পোস্টমাস্টার হিসাবে যশোরে অবস্থান, বাংলাসাহিত্যে প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক স্বর্ণকুমারী দেবী কর্তৃক জয়রামপুরে নিজস্ব প্রেস স্থাপন ও সাহিত্যচর্চা, ব্রিটিশ গোয়েন্দা দপ্তরের দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা সুসাহিত্যিক প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের চুয়াডাঙ্গায় অবস্থান এবং সর্বোপরি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গায় সাময়িক অবস্থান ও সাহিত্যচর্চা এ অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতিচর্চার মজবুত ভিত্তি নির্মাণ করে দিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় জেলার বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় চুয়াডাঙ্গার সাহিত্যাঙ্গন সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্য-ভাস্বর হয়ে উঠেছিল এবং সেই গৌরবময় ধারা আজও অব্যাহত।

চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য আন্দোলনের প্রাণপুরুষ কবি সুন্দর রেজাউল হক । রেজাউল হকের সমসাময়িক আরেকজন দিকপাল কবি প্রতিভা কবি শফিউদ্দীন। এম. ইব্রাহিম অনেক কবিতা রচনা করে চুয়াডাঙ্গা সাহিত্যকে সমৃদ্ধি দান করেছিলেন। আহাদ আলী মোল্লা সমকালীন বাংলা ছড়াসাহিত্যের একজন প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব। তুখোড় ছন্দশিল্পী। ছড়াকার হিসাবে স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশভঙ্গি, শব্দ বিন্যাসের নিপুণতা ও গতিময় ছন্দের চমৎকার গাঁথুনিতে তার জুড়ি নেই। তিনি ইতোমধ্যে ২০ হাজারেরও বেশি ছড়া লিখেছেন। লিখে চলেছেন নিরন্তর। প্রতিভাবান এ ছড়াকারের জন্ম ১৯৬৭ খিষ্টাব্দের ২২ নভেম্বর নানাবাড়ি চুয়াডাঙ্গার হাজরাহাটি গ্রামে। পৈতৃক বাড়ি আলমডাঙ্গা উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে। শক্তিমান এ ছড়াকার আশির দশক থেকে জাতীয় পত্রপত্রিকাসহ দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে আসছেন। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে চুয়াডাঙ্গার জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক মাথাভাঙ্গার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘টিপ্পনী’ শিরোনামে সমাজ সচেতনমূলক ছড়া লিখে বিশেষ খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।

চুয়াডাঙ্গার প্রয়াত বরেণ্য বুদ্ধিজীবী এনএন সাহার গর্বিত সন্তান ছড়াকার চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু। বাংলাদেশের জাতীয় শিশুসাহিত্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি। চিতু ছাত্রজীবন থেকেই শিশুসাহিত্যের সঙ্গে জড়িত। তিনি শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য অসংখ্য পুরস্কার ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় অসংখ্য সংবাদপত্রে তার কয়েক হাজার লেখা প্রকাশিত হয়েছে এবং বর্তমানেও ছাপা হচ্ছে। চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু ছড়াকার হিসাবে বাংলাদেশ ও ভারতের সাহিত্যাঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছেন। বর্তমানে দৈনিক আকাশ খবর পত্রিকায় প্রতিদিন ‘চিমটি’ শিরোনামে তার ছড়া কলাম প্রকাশিত হয়। ইদ্রিস মণ্ডল বিশিষ্ট কবি ও ছড়াকার। চুয়াডাঙ্গা জেলার অগ্রগণ্য ছড়াকারদের মধ্যে অন্যতম। স্বরবৃত্ত ছন্দে ইদ্রিস মণ্ডলের রয়েছে অসাধারণ দক্ষতা। তার লেখা ব্যতিক্রমধর্মী ছড়াগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত পাঠ হয়ে থাকে। প্রেম, প্রকৃতি ও সমাজসচেতনতামূলক ছড়াগুলো চিত্ররূপময়তার মাধুর্যে বাণীবদ্ধ রূপ লাভ করেছে। মোঃ আনছার আলী (১৯৬২ খ্রি.) জেলার প্রথম শ্রেণির ছড়াকারদের অন্যতম। তিনি নানারকম মননশীল কবিতা ও ছড়া রচনায় অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। দেশ ও প্রকৃতি প্রেমমূলক ছড়া ও কবিতায় তিনি ঈর্ষণীয় সাফ্যলের পরিচয় দিয়েছেন। আব্দুল মালেক জাগরণী জেলার অন্যতম কবি ও ছড়াকার। তার ‘টিপাই মুখের ছড়া’ উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। তার ছড়ার মধ্যে স্বরবৃত্ত ছন্দের বৈচিত্র্যময় প্রয়োগ লক্ষ্যণীয়। তিনি সমাজজীবন থেকে উপাদান ও রসদ সংগ্রহ করে ছড়া ও কবিতায় বাণীবদ্ধ রূপদান করে থাকেন। নজমুল হেলাল দেশের একজন খ্যাতিমান কবি। কবিতাই নজমুল হেলালের ঘরবসতি। তার অস্তিত্বজুড়ে কবিতা। বাংলাদেশের সাহিত্যের মূল ধারায় থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ নজমুল হেলাল সেই ১৯৭৪ সাল থেকে বিরামহীন সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। কবিতার টানে তিনি বিশ্বনাগরিক। ছুটে চলেন দুই বাংলার পথে প্রান্তরে। সংগ্রহ করেন কবিতার রসদ। বিভিন্ন ধরনের সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনা করে থাকেন। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার লেখা কবিতা ও গান গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়ে থাকে।

বাতিঘর জাতিস্বর মুজিব

এখনো স্বপ্ন দেখায়

অমর কবিতা লেখায় মুজিব আমাদের

মৃত বলো না তাকে, মুজিব মরে নাই

মুজিব চেতনায়।

(মুজিব মরে নাই মৃত বলো না তাকে, নজমুল হেলাল)

ময়নুল হাসান আদ্যোপান্ত রোমান্টিক কবি। তার রচিত ‘মাধবী ঠোঁটে ঠোঁট রেখে’ এবং ‘যদি ভালোবাসা দাও’ দুটি অনন্য অসাধারণ রোমান্টিক কাব্যগ্রন্থ। তার কবিতায় কাব্যচেতনার সঙ্গে মিলিত হয় কবিতার অসাধারণ শিল্পসৌকর্য। অনুপ্রাস, শ্লেষ বক্রোক্তি ব্যবহারে তিনি অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার অকালপ্রয়াণ চুয়াডাঙ্গায় সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে গভীর ক্ষত ও শূন্যতার জন্ম দিয়েছে। জাহিদুল ইসলাম মূলত একজন কবি ও ছড়াকার। আশির দশক থেকেই তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন। তার লেখা লিমিরিকধর্মী কবিতাগুলো দক্ষ সমাজ মানসের পরিচয় বহন করে। অভিনব ছন্দের গাঁথুনি, বক্তব্যের ঋজুতা, তীব্র সমাজ মনস্কতা তার কবিতা নবসৃষ্টির বার্তা বহন করে। আশির দশক থেকে বাংলা ছোটগল্প ও কবিতায় রিচার্ড রহমানের যাত্রা শুরু। গভীর রোমান্টিকতা, জাতিসত্ত্বার উদ্বোধন, প্রতিবাদ প্রতিরোধে তার কবিতা স্থায়ী মনোব্যঞ্জনাময় সত্য প্রকাশে ব্যাকুল। সরদার আল আমিন চুয়াডাঙ্গার অন্যতম কবি। আশির দশকে মনোবিশ্লেষণধর্মী কবিতা রচনায় তিনি একটি স্থায়ী আসন সৃষ্টি করেছিলেন। কবিতার ভাষায় এনেছিলেন চূড়ান্ত অভিনবত্ব। প্রতীক চিত্রকল্প ব্যবহারে তিনি চূড়ান্ত সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। শাহ আলম সনি মূলত কবি, গীতিকার ও সাংবাদিক। অনুকবিতার মধ্য দিয়ে তিনি সামাজিক সমস্যাকে চিহ্নিত করেন এবং উত্তরণের দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। কবিতার শব্দচয়নে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং ছন্দের সুনিপুণ গাঁথুনি শাহ আলম সনির কবিতার মূল উপজীব্য। কবি মোঃ শফিকুল ইসলাম এ প্রজন্মের একজন প্রতিশ্রুতিশীল কবি প্রতিভা। তার প্রকাশিত বেশকিছু কবিতাকর্ম রয়েছে। কবি মোঃ খলিলুর রহমান একজন সমাজসচেতন কবি ও ছড়াকার। নির্মোহ সমাজদৃষ্টি তার কবিতায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দে তিনি যথেষ্ট পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। আবু আফজাল সালেহ অত্যন্ত মননধর্মী কবি ও প্রাবন্ধিক। তার কবিতায় মননের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিচয় পাওয়া যায়। ঢাকা থেকে তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার। মোঃ নজরুল ইসলাম প্রভাত মিলন নামে প্রথম কাব্যগ্রন্থে তার কাব্যশৈলীর দুরন্ত প্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। কবি শরীফ সাথী চুয়াডাঙ্গার তরুণ কবি ও ছড়াকার হিসাবে ইতোমধ্যে সমগ্র বাংলাদেশে পরিচিতি লাভ করেছেন। তার লেখা উল্লেখযোগ্য কাব্য ও ছড়া গ্রন্থ হলো, বাংলাদেশের তাজ। টোজা বাবুর গরুর গাড়ি। শ্রী অশোক কুমার ঘোষ, শাশ্বত আলিম, রতন কুমার শর্মা তিনজনই মূলত স্বভাবধর্মের কবি। তাদের কবিতা ও ছড়ায় নানামুখী চেতনার পাশাপাশি শিল্প প্রকরণে অনুপ্রাসধর্মীতা লক্ষ করা যায়। শওকত আলী মূলত ছোটগল্পকার। তবে কবিতা রচনায় তার দক্ষতার প্রতিশ্রুতি বহন করে। ‘ইচ্ছের কাছাকাছি’ তার নিরীক্ষাধর্মী কাব্যগ্রন্থ। চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সাহিত্য সময়িকী পদধ্বনিতে নিয়মিত গল্প কবিতা প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া প্রগতি ও অন্যান্য স্থানীয় পত্রিকায় গল্প নিবন্ধ ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তপন কুমার পাল সাপ্তাহিক সাহিত্য পত্রিকা ও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তারেক এনামুল একজন প্রতিশ্রুতিশীল কবি ও ছড়াকার ছিলেন। তার অকাল মৃত্যুতে চুয়াডাঙ্গা একজন প্রতিভাবান ব্যক্তিকে হারায়। তার অসাধারণ ছড়াগ্রন্থ ‘উল্টে যদি পাল্টে যেত’। এ গ্রন্থে তার অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। খন্দকার হামিদুল ইসলাম একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, কবি ও নাট্যকার। আসিফ জাহান জেলার ঐতিহ্য সচেতন কবি হিসাবে সুপরিচিত। প্রেম, প্রকৃতি, মানুষ, ইতিহাস, ঐতিহ্য তার কবিতার মূল উপজীব্য। বাংলা ছন্দে তিনি যেমন অভিনবত্ব এনেছেন তেমন বিষয় ভাবনায় দেখিয়েছেন বৈচিত্র্য। হোসেন মোহাম্মাদ ফারুক মূলত কবি ও ছড়াকার। অভিজ্ঞতালব্ধ জীবনসত্য তার কবিতার মূল বাণী। ইতোমধ্যে তার তিনটি শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। এমএ মামুন একজন দক্ষ ছড়াকার ও কবি। ইতোমধ্যেই সমাজসচেতনমূলক ছড়া ও কবিতা রচনায় যথেষ্ট মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি অবিরত কবিতা ও ছড়া লিখছেন। অকাল প্রয়াত কবি অমিতাভ মীর দ্রোহের কবি হিসাবে সমধিক পরিচিত। তার কবিতায় অন্যায় অবিচার ও শৃঙ্খল ভাঙার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে। মূলত তার কবিতা জীবনবোধের অনুষঙ্গে অনন্য শিল্পবোধের চমৎকারিত্বে ভাস্বর হয়ে আছে। কবি সুমন ইকবাল বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে থাকেন। তার প্রকৃত নাম মোঃ ইকবাল হোসেন। সুমন মালিক দ্রোহের কবি। সামাজিক নানা অসংগতি অনাচার, অবক্ষয়, অবিচারের বিরুদ্ধে তার কবিতাগুলো শাণিত ভাষার সন্ধান দান করে। হামিদুল হক মুন্সী কবি ও প্রাবন্ধিক। ইতোমধ্যে তার ৩১টি মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনি শতাধিক লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করে দেশসেরা সম্পাদকের মর্যাদা পেয়েছেন। কাজল মাহমুদ নিরীক্ষাপ্রিয়, প্রথাবিরোধী কবি ও ছড়াকার হিসাবে সুপরিচিত। মোঃ ইব্রাহিম খলিল, তিনি আবু নাসিফ খলিল ছদ্মনামে কবিতা ও ছড়া লিখছেন। কবিতা ও ছড়ার ছন্দ বৈচিত্র্যে অভিনবত্ব আনার চেষ্টা করছেন। মোঃ গোলাম কবীর তিনি রোমান্টিক কবি হিসাবে জনপদে সমধিক পরিচিত। তার কবিতায় রোমান্টিকতার পাশাপাশি চিত্ররূপময়তা একটি বড় বৈশিষ্ট্য হিসাবে বিবেচ্য। গোলাম রহমান চৌধুরী একজন সমাজমনস্ক কবি। প্রেম প্রকৃতি ও ইতিহাস চেতনা তার কাব্যের মূল অনুষঙ্গ। রোমান্টিকতা এবং ইতিহাসনির্ভরতার মধ্যে তার কবিতাগুলো শেকড় সন্ধানী। মোঃ সিরাজুল হক নিয়মিত লেখালেখির মাধ্যমে ইতোমধ্যে জেলায় পরিচিতি লাভ করেছেন। আ.ফ.ম সিরাজ সামজী জেলার একজন অগ্রগণ্য কবি। ইতোমধ্যে কবিতা রচনায় তিনি যথেষ্ট খ্যাতি ও ব্যাপ্তির পরিচয় দিয়েছেন। কবি সিদ্দিক আহমেদ। মূলত নৈরাশ্যের মধ্যে আশার বসতি তার কবিতার কাক্সিক্ষত সুর। প্রয়াত সহিদা খাতুন জেলার অন্যতম মহিলা কবি। তার কবিতায় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিপ্রায় ও প্রত্যয় ঘোষিত হয়ে থাকে। সহিদা খাতুন ছিলেন স্বভাব কবি। তার কবিতায় দেশ মাতৃকার প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশিত হয়েছে। প্রয়াত সাহারে বানু মল্লিক একজন অসাধারণ কবি ও গীতিকার। আধুনিক বাংলা কবিতায় জটিল গ্রন্থি উন্মোচনে তার কবিতার পরম গতিশীলতা লাভ করেছে। জেলার উল্লেখযোগ্য মহিলা কবিগণের মধ্যে অন্যতম প্রবীণ কবি মালেকা হক মাখন। তার অসংখ্য লেখা চুয়াডাঙ্গাকে সমৃদ্ধ করেছে। এ ছাড়া আকলিমা খাতুন, আশরাফুন নাহার শোভা, জাকিয়া সুলতানা, মরিয়ম শেলি, মনোয়ারা খুশি, কেএম. জেসমিন আক্তার, জাহানারা জানি, আফসানা মেহজাবিন শাপলা, মোছাঃ সালমা খাতুন, তাসফিয়া আক্তার মালা লিখে চলেছেন।

এ প্রজন্মের যেসব কবি চুয়াডাঙ্গার কাব্যজগতকে সমৃদ্ধ করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হাফিজুর রহমান, তৌফিক জোয়ার্দার, শংকর কুমার প্রামাণিক, আবুল কালাম আজাদ। তা ছাড়া চুয়াডাঙ্গা জেলার অন্যান্য কবি ও ছড়াকারদের মধ্যে রয়েছেন সরদার আলী হোসেন, হোসেন মোশারক, মোঃ সাইফুল ইসলাম, মোঃ শফিকুল ইসলাম, শেখ নজরুল ইসলাম, মোঃ রাজিব হাসান, মোঃ আমজাদ হোসেন, মোঃ রহমত বিশ্বাস, মোঃ আবুল কাসেম, মোঃ রাইমাত উল ইসলাম, হুমায়ন কবির, আবুল কাশেম, রাকিব হাসান, মোঃ হাবিবুর রহমান মজুমদার, আজিজুর রহমান, মোঃ আব্দুল হামিদ, হেলাল হোসেন জোয়ার্দ্দার, মোঃ মিজানুর রহমান (শুনু), মোঃ হারুন অর রশিদ, সিরাজুল ইসলাম, মোঃ জাকির হোসেন, মোঃ কামরুজ্জামান চাঁদ, জামান লিঙ্কন প্রমুখ।

চুয়াডাঙ্গা জেলার বর্তমান সাহিত্য ক্ষেত্র অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং সম্ভাবনার বার্তা বহন করে। জেলার কবি ও ছড়াকাররা যথার্থ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অবদান রাখতে সক্ষম হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করতে পারি।

 

সৌজন্য : দৈনিক যুগান্তর, ঢাকা । ১৯ আগস্ট ২০২২ |  প্রিন্ট সংস্করণ।

লেখক : মুন্সি আবু সাইফ, গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ