আমিনুল ইসলাম : এক অনন্য নব শব্দচাষী
নিশীথ দাস
কবিতা। আক্ষরিক অর্থে, ছোটো একটি শব্দ কিন্তু এর ব্যাপ্তি অনেক। এতো এতো গভীর। বিশ্বজগতের চাইতেও। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনেক কবির কবিতাকে মহাকাব্যের সমতুল্য বিবেচনা করতে ইচ্ছুক আমি তবে সেটা যে এতো এতো… পৃষ্টা হবে এমন ধরাবাঁধা নিয়ম মানার পক্ষেও নই। একটি দীর্ঘ কবিতাতেও থাকতে পারে পুরো জীবনের গল্প, একটি মহাকাব্য হওয়ার জন্য সব গুণাবলিও। আর দুনিয়ার সব রকম সংজ্ঞা আমাদের দ্বারা নির্ধারিত ও প্রচারিত। এই কবিতাই মানুষের অন্তরের অনুভূতিকে ছুঁয়ে বাস্তবের সাথে মাত্রাযুক্ত করে প্রাসঙ্গিক ও যথেষ্ট আবেদনের দাবি তোলে। এই শব্দে রয়েছে জগতের সৃষ্টি-লয়। কি নেই এখানে! এখানে ওই যে রেলিং ধরে দাঁড়ানো মেয়েটি, শাপলা তোলাকালীন নদীর ওপর বৃষ্টি ঝরার দৃশ্য, রাস্তাটার পাঁজর মেরামত হওয়ার পরের গল্প, অনুরাধার কোল ভরে আলো জন্ম নেয়ার খুশি, শীতে কোঁকড়ানো বৃদ্ধের এপাশ-ওপাশ, গার্মেন্টস কর্মীর তীব্র হাহাকার। সবকিছু ধৃত হয়েছে অকপটে কবির কলমে। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, ভালোবাসা, চিরকালীন বেদনার্ত সুখসহ সব উঠে আসে। সময়ের সাথে পৃথিবীর চিত্রপট যেমন পালটে যাচ্ছে তেমনি পালটে যাচ্ছে মানুষের ভাবনার জগৎ, বিচরণের জগৎ, বেঁচে থাকার জগৎ ও তার দৈনন্দিন গতিবিধি। চিন্তা-ভাবনায় উঠে আসছে নতুনত্ব, নতুনকে গ্রহণ ও এডজাস্টমেন্টের চাহিদা। ক্রমে ক্রমে পৃথক হয়ে যাচ্ছি পূর্ববর্তী স্তরসীমা থেকে, এতে নেই কোনো বৈপ্লবিকতা তবে এর মধ্যে রয়েছে এক নিবিড় যোগসূত্র। একে কেন্দ্র করেই এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের বাংলা কবিতা, নিজস্ব রীতি, সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যে। এক্ষেত্রে অনেক কবিই নিরলসভাবে একাজটি করার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন কিংবা করেন না কিংবা খুব কম কবিই করতে পারেন। এই পরিবর্তনের জোয়ারে কোনো কোনো কবি কিছু না কিছু ভূমিকা পালন করেন। এক্ষেত্রে কেউ ব্যাপকভাবে সফল, কেউবা নয়। প্রকৃত কবি সফলতাকে কেন্দ্র করে সাহিত্য এগিয়ে যায় না, তার কাজ নিজের পর্যবেক্ষণ, অনুভূতিকে কবিতায় শেয়ার করা। কবিতা হলো ধ্যান। একে পেতে গেলে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়, এমনটা নয় সমুদ্রের পারে গেলাম আর হু হু করে বাতাস এলো। এজন্য সব সময় পেছনে লেগে থাকতে হয়। কাদায় কাদায় জীবনটাকে মাখাতে হয়, জলে ডুবতে হয়, ভাসতে হয়… আরো কত কী!
কবিতা এমন একটা জীবন কবিকে দান করে যেখানে সুখ নেই, হতাশা, অতৃপ্তি কাজ করে। একে পুঁজি করে কবিকে বেঁচে থাকতে হয়। কেননা কবিরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অসুখী মানুষ। এই অসুখ তিল তিল করে তাড়িয়ে বেড়ায়, ভেতরে ভেতরে গোঙায়। এই অসুখই কবিতা। এই অসুখকেই লেখা হয় নানা উপমা, উৎপ্রেক্ষায়। অসুখই কবিকে প্রকৃত কবি হতে সহায়তা করে। অতৃপ্তিকে স্বভাবকবি জিইয়ে রাখে। বিশ্বহ্মাণ্ডের সকল উপাদান যেমন একদিকে একই উদ্দেশ্য সাধন করে তেমনি একজন কবিকেও ভালো লেখার তাগিদ দেয় এই অতৃপ্তি, এই বোধ। পরিবেশ-প্রতিবেশকে কবির জানতে হয় হৃদয়াবেগে। তার এই জানা থাকে সবার জানার থেকে আলাদা, সে জানে-দেখে হাজার বছরের পরের গল্প। সে নির্মাণ করে দেশ-জাতির ভবিষ্যৎ, রুচি। জাতিকে শিক্ষা, জ্ঞানে আলোকিত করার সংক্রামক শক্তি থাকে তার ব্যাপক। তার চেতনায় বর্তমান নির্মাণের সাথে থাকে পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাণও।
কবিতায় ইতিহাস, মিথ, ঐতিহ্য, লোকজ উপাদানসমৃদ্ধ কিংবা ভাষার নান্দনিক উপস্থাপনা কবিতাকে করে তোলে হৃদয়গ্রাহী। আর সেই সাথে কবি তার জাতিগত সংস্কৃতিকে রক্ষার পরোক্ষ একটি ভূমিকাও পালন করে। আর এসব বিষয়ে উপযুক্ত প্রতীক ব্যবহারে তা হয়ে ওঠে অনেক বিশ্বস্ত ও প্রাণবন্ত অনুভূতি, যার ওপর ভর করে ওই তৃপ্তিটুকুই পাওয়া যায়।
প্রিয় পাঠক, এতক্ষণ ধরে যাকে কেন্দ্র করে বক্তব্য উপস্থাপন করা হলো, অবশ্যই বুঝেছেন তিনি কে? হ্যাঁ, আমি কবি আমিনুল ইসলামের কথাই বলছি।
আমিনুল ইসলাম কবিতায় তারুণ্য ধারণ করেন সহজ বিশ্বাসে। তার কবিতায় খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করি যা তার অন্যান্য সমসাময়িক কবিদের বেলায় খুব একটা উপস্থিত নয়। তিনি খুব সতর্ক ও সহজভাবে নিজের রং, মনের রং বদলিয়ে খাপ খাইয়ে ফেলেন সব পরিবেশে যা প্রকৃত কবির পক্ষেই সম্ভব। দৈনন্দিন জীবনে কবি যদি নিজেকে পরিবর্তনযোগ্য না করে তোলে, তাহলে তার কবিতার পাশাপাশি নিজের মনস্তাত্ত্বিক জগতেরও ধ্বংস অনিবার্য হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। একটি জংধরা দা কিছুই কাটতে পারে না, একটি স্রোতবিহীন শ্যাওলাভরা নদী কিছুই দিতে পারে না, সেটা শুধু সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কবি আমিনুলের কবিতার পূর্বাপর পাঠে অনুভূত হয়- তিনি কবিতার শরীরকে নানাভাবে উপস্থাপনে যেমন সমর্থ তেমনি কবিতায় নতুন শব্দ, ইমেজ, প্রতীক গঠনেও। আমার খুব আনন্দ লাগে, তার সমসাময়িক খুব কম অগ্রজ কবি আছেন যারা যৌথ শব্দবন্ধন নিয়ে খেলে পাঠকের হৃদয়ে তৃষ্ণার জন্ম দিয়েছেন। আমরা জানি শতাব্দীর পর শতাব্দী একটি শব্দ তার নিজস্ব অর্থ হারিয়ে অন্য অর্থে চলে যায়, ব্যবহার কমে, নতুন সেন্টিমেন্ট নিয়ে আসে। কিছু কিছু শব্দ হারিয়ে যাওয়ার ক্রান্তিলগ্নে আবার নতুন নতুন শব্দের আবির্ভাব ঘটে– দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত নতুন নতুন শব্দে ভর করে কবিতায় তুলে আনেন নিজস্ব স্বর– যা তার মানসকে প্রতিবিম্বিতসহ বৈচিত্র্যময় করে তোলে। একটু স্পষ্ট করে বলি, বাজারে নতুন পণ্য এলে সবাই জানেন না, আবার কেউ জানলেও কেনেন না— তবে এক্ষেত্রে বলব আমিনুল ইসলাম দুটিতেই সিদ্ধহস্ত। তিনি নতুনকে সাদরে গ্রহণ করেন আবার এই নতুনকে নিজের চিন্তাকল্পনার বলে অর্থাৎ ইট, সিমেন্ট, বালির সমন্বয়ে একটি সঠিক অবকাঠামোয় পৌঁছেন, যেখানে ৭/৮ ডিগ্রির রিকটার স্কেলের ভূমিকম্পও সহ্য করা তার অসম্ভব নয়, অন্য রকম নতুনে রূপান্তরিত করেন।
প্রাকৃতিক অনেক উপাদান আছে যেগুলো একজন মানুষকে ভাবুক কিংবা কবি হওয়ার পথে উসকে দেয়। হতে পারে মাঠ, নদী, বৃষ্টি। কবি আমিনুলকেও পাগল করে দিয়েছিল এসব- তার ভাষায়, ‘‘যতদূর মনে পড়ে শিশুকাল হতেই আমি বৃষ্টি ও নদীর অক্লান্ত ভক্ত। বৃষ্টি হলে আমাকে ঘরে বেধে রাখবে এমন সাধ্য কারুরই ছিল না। বাস্তবিকই বৃষ্টির নূপুর বেজে ওঠার সাথে সাথে আমার হৃদয়মন ময়ূরের মতো নেচে উঠতো। আর বৃষ্টিমুখর নদীতে দলবলে সাঁতার কাটায় যে আনন্দলাভ ঘটতো, পরবর্তীতে মহার্ঘ্য আর কোনো কিছুতেই তা জোটেনি’’। আমিনুল ইসলামের কবিতার জার্নিতে মনে হয়, মেঠোপথে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের বাড়ির আঙিনা ধরে সামনের সাঁকো পেরিয়ে পিচ রাস্তায় উঠছি- সাইকেলের বেল, সিএনজি, অটোরিকশা, বাজারের শব্দের আনাগোনা প্রভৃতি। বলতে চাই বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে তার লাইন চলতে থাকে। যেখানে প্রতিটি ব্যবহৃত অনুষঙ্গে থাকে একেকটি গল্প, ছবি, ইতিহাস।
২০১৬ এর একুশের বইমেলায় কবি আমিনুল ইসলামের ‘কবিতা সমগ্র’ (পরিবর্ধিত সংস্করণ) বের হয়। এতে ১০টি কাবগ্রন্থ সন্নিবেশিত হয়েছে- তন্ত্র থেকে দূরে (২০০২), মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম (২০০৪), শেষ হেমন্তের জোছনা (২০০৮), কুয়াশার বর্ণমালা (২০০৯), পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি (২০১০), স্বপ্নের হালখাতা (২০১১), জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার (২০১২), শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ (২০১৩), জোছনার রাত বেদনার বেহালা (২০১৪) এবং আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট (২০১৫)। ছোটবেলা থেকে কবিতা লিখলেও নানাবিধ কারণে তিনি আমাদের সামনে উপস্থিত হন নব্বই দশকের শেষের দিকে। শুধু বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ বলেই বারেন্দ্রিক নন, তিনি কবি হিসেবেও বরেন্দ্র অঞ্চল নিয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তার বহু কবিতায় এর স্বাক্ষর মেলে। আমিনুল ইসলামের কবিতা সমগ্রের মুখবন্ধ পড়লে তার এ সম্পর্কিত কবিতা উপলব্ধির বিষয়টি অতি সহজেই দৃশ্যমান হয়। কর্মসূত্রে তিনি যেখানে গিয়েছেন সেখানকার জনজীবন সংস্কৃতি, লোককথা, উপকথা প্রভৃতি বিষয় কবিতায় উপস্থাপন করেছেন। আর এসব তুলে ধরার প্রকাশভঙ্গি তার একান্তই নিজস্ব রীতিসমৃদ্ধ। তিনি ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ে সচেতন বলে কুসুম্বা মসজিদ, পুণ্ড্রনগর, সোনারগাঁ, সোনা মসজিদ প্রভৃতি ঐতিহাসিক স্থাপনা বিষয় ও পুরাকীর্তিকে কবিতায় এনেছেন। অভিজ্ঞতা ও দর্শন পরিধি ব্যাপক বলেই হয়তো এ সংমিশ্রণের জটিল কাজটি সহজেই করতে পেরেছেন। তিনি কবিতায় প্রেম, রাজনীতি, সামাজিক অবক্ষয়, কাম, ক্রোধ, হতাশার পাশাপাশি আশা-প্রত্যাশা ও শান্তি নিয়ে কথা বলেছেন, পিতামাতা সন্তানকে যেভাবে সতর্কে-সযত্নে বলেন। শব্দযুগল তৈরিতে তিনি বেশ কৌশলী এবং সচেতন। আমরা বেহুলা ঘাটের কথা শুনেছি কিন্তু বেহুলা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা শুনিনি- শব্দের পাশে আরেকটি শব্দ ব্যবহারে যে দ্যোতনা, উপলব্ধি কিংবা নতুন ভাষার সৃষ্টি, সেই উপস্থিতিটি আমিনুল ইসলামের কবিতায় গভীর মমত্বের ছাপ পাই। শব্দচয়নে উদারতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে- তিনি চষে বেড়ান পৃথিবীর ছোটো বস্তু থেকে সবচেয়ে বড়ো বস্তু পর্যন্ত। তার এই ভাবনার ব্যাপ্তিতে ঋদ্ধ হয়ে ওঠে কবিতার শরীর। একজন কবিকে শুধু বেশি বেশি কল্পনাপ্রবণ হতে হবে এমন বক্তব্যকে এড়িয়ে বলতে পারি— কবিকে বেশি বেশি অভিজ্ঞতাপ্রিয় হতে হয় আর সেখান থেকেই উঠে আসে নতুন থেকে নতুনতর কল্পনা, অনন্য সুন্দর কল্পনা।
কিছু কিছু কবিতা পড়তে পড়তেই ভালো লাগে। যেন কোথাও গিয়ে আনন্দের সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছে- ভালো লাগছে। কিছু একটা আন্দাজ হয়তো করতে পারছি, তবে এ সম্পর্কে কিছুই বলা যাচ্ছে না— কেবল উপলব্ধিতে ভাষার শক্তি সম্পর্কে অবগত হতে পারি। আমার কাছে এ ধরনের কবিতাই একটি ভালো কবিতা হিসেবে বিবেচিত। একটা ভালো কবিতার এই তো আওয়াজ, এই তো মহত্ত্ব—
যারা অন্ধগলির নজির
বন্ধুর ডাক পেলে
তাদের কেউ কেউ
সড়ক হয়,
বন্ধুর সবুজ উঠোন ছুঁয়ে
ভিড়ে গিয়ে
সওদাগরী মোড়ে;
(অকৃতজ্ঞার পথ)
রাজনৈতিক ও দেশ সচেতন কবি আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশের হলমার্ক কেলেঙ্কারির কথাও বলেছেন। যেখানে জনগণের স্বপ্ন বিপন্ন, রাষ্ট্রীয় সংকটের কথাও উল্লেখ করেছেন।
তুমি সবটাই জমা রেখেছ সোনালী ব্যাংকে,
আমার সিংহভাগ আড়ালে,– বয়ামে;
দুই ধরনের লোকসান গুনছি দুজন।
(তৃতীয় ব্যাংক)
যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব যাই বলি না কেন এসব স্বার্থকেন্দ্রিক। সভ্যতার আদি থেকেই চলছে—অন্যের সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক, অন্যায় হিসেবে দেখিয়ে নিজের আক্রমণের ন্যায্যতা প্রতিস্থাপনের চেষ্টা। যুগে যুগে এসবের ব্যতিক্রম হয়নি, হবেও না। পক্ষ-বিপক্ষের মাঝখান থেকে সুযোগ নেবে তৃতীয় কোনো পক্ষ, যার উপস্থিতি কখনও ন্যায্য মনে হয়নি।
নদীপ্রাণ চাষিরা
দলদ্বন্দ্বে
ভেঙে ফেলেছে নাও
ধানের আঁটি সাঁতার জানে না
পড়ে আছে চরে
কুমির এসে
রেকি করে যায়
ঘাট
সোনালি শস্যের ক্ষেতও।
(বিবাদ)
শীতের রূপসৌন্দর্য গ্রামেই নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব, যা শহরে কখনই হয় না। কেননা এত বড় বড় দালানকোঠা যা চোখের সামনে দেয়াল তুলে রাখে। শীতে গ্রামের মানুষ অবর্ণনীয় কষ্ট উপেক্ষা করে সামনে অগ্রসর হয়। অথচ এসব অবহেলিত-বঞ্চিতদের সংবাদ সবসময় থেকে যায় আড়ালে-
দুপুর গড়িয়ে যায়,
বিধ্বস্ত জনপদে রোদ আসে না-আসার সমান
তুমি অতটুকুও আসো না।
(শীত)
‘…এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম-’ যার বজ্রকন্ঠে এই বাণী উচ্চারিত হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চেতনাকে তুলে এনেছেন ‘আমার মুক্তিযোদ্ধা হতে পারা না পারার গল্প’ শিরোনামের কবিতায়। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দীক্ষিত কবি আমিনুল ইসলাম স্বপ্রণোাদিত হয়ে এই কাজটি নিঃসন্দেহে করেছেন বলা যায়। অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট, নম্বরহীন সেলফোন, আরব বসন্ত, র্যাব আঁখি, বিনিয়োগ, প্রযোজনা, নির্দলীয় ভালোবাসা, ভালোবাসার ইপিজেড, অন্ধরাতের এক্সরে রিপোর্ট, ভালোবাসার ডিলিট বাটন, অডিটবিহীন দিন, ভালোবাসার ইন্টারনাল অডিট রিপোর্ট, ভালোবাসার সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে, ডায়াগনোসিস, ফোন থেরাপি, ফোরকালার অধঃপতন, ব্রেকিং নিউজ, চোরের জন্য কনসালট্যান্সি, ফর্মুলার বাইরে, কুয়াশাপ্রিন্ট– এরকম শব্দ প্রয়োগে আমিনুল ইসলাম সময়ের স্রোতে নিজেকে মেলে নিজস্ব রীতি গড়ে তুলে কবিতায় অন্যরকম মাদকতা অনবরত রেখেছেন। এবার আরও কিছু তার কবিতার স্বাদ নেয়া যেতে পারে–
যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি– সড়ক বিভাগ তাকে
চৌরাস্তা বলে ডেকে থাকে;
আমার কাঁধে ঝুলানো যে ব্যাগ
তার অবশ্য প্রতিষ্ঠানিক নাম নেই।
(ভ্রমণ)
অথবা
আবহাওয়া অনুকূল দেখে সকাল হতেই
সবাই লোকাল বাস;
স্বভাবতই ছাতা নেয়ার জরুরত নেই কারও
(আইন অমান্যের আনন্দে)
অথবা
…মাটি খুঁড়ে তোলা কোনো নামহারা
সভ্যতার ধূসর কঙ্কাল; এই লোহা, এই ব্রোঞ্জ-এই যে পাথর-
এসবই সে যুগের জ্ঞানের ফসল: বিস্তারিত নদী ছিল-সমুদ্রও
সুদূরে ছিল না। অনেক বছর আগে এ শহর ছিল প্রেম-প্রাণের
ঠিকানা;
(পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি/ সাত)
ব্যাপকভাবে কবিতা পুঁজিবাজারের মতো, তবে সেটা দীর্ঘমেয়াদী, এই কখন যে দর বাড়ে আবার কখন কমে, কখন যে গতি শ্লথ হয়ে যায়- এ বিষয়ে মন্তব্য করা খুব মুশকিল। অর্থাৎ এইসব শব্দ, অনুভূতি কোনো কোনো শতকে উজ্জ্বল, আবার কখনো মূর্ছা যাবে, এটাই জাগতিক বিধান। কবি আমিনুলের কবিতায় শব্দ ও চিন্তার নতুনত্ব বরণ ও সূচনা প্রস্ফুটিত করার সাহস সবসময় নতুনদের উজ্জীবিত করবে এমনটা আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়।
বাংলাবাঁক 
