ঢাকা ০৪:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পরিমার্জিত পুনঃপ্রকাশ : জুলাই-আগস্টের কবিতা আলোচনা

আবু আফজাল সালেহ’র কবিতায় রক্তাক্ত জুলাই -আগস্ট

  • বাংলাবাঁক
  • আপডেট : ১১:০৭:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৪
  • 284

ছবি : সংগৃহীত 


হুমায়ুন কবীর



এ জনপদের ইতিহাসে চোখ মেললে মোটাদাগে কিছু রক্তাক্ত অধ্যায় দেখি।খুব বেশি পিছনে না গেলেও ‘৫২ , ‘৬৯ , ‘৭১ আর সাম্প্রতিক ‘২৪ এখনো আমাদের চোখে জ্বলজ্বল করছে। এছাড়াও আমাদের ট্রাজেডি সাহিত্যে শোকাবহ ১৫ আগস্ট ভুলবার নয়।কবিতা,উপন্যাস, নাটকসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় এই রক্তাক্ত দিনগুলো স্থান করে নিয়েছে।
গেল জুলাই – আগস্টে ছাত্র- জনতা প্রাণ উৎসর্গ করেছে।বীরদর্পে বলেছে:
বুকের ভেতর
অনেক ঝড়
বুক পেতেছি
গুলি কর 

বৈষম্যবিরোধী এই আন্দোলন কবিদের সংবেদনশীল মনকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে । তারা জুলাই – আগস্টের রক্তাক্ত ছবিটা বন্দী করেছেন রক্তের অক্ষরে। সাহিত্য পাতায়, ফেসবুকে সেই রক্তবর্ণ কবিতা পড়ে শোকার্ত হয়েছি।
দম বন্ধ হয়ে আছে এখনো
বারুদের গন্ধে
রক্তের গন্ধে
দূষিত বাতাস
ঢাকায় চট্টগ্রামে রংপুরে…
সারা বাংলাদেশ আজকে কাঁদছে
সন্তানহারা মায়ের শোকে
মানবতার খুনে

সমগ্র বাংলাদেশই তো আজ সন্তানহারা মা।’—–কবিতায় রক্তাক্ত জুলাই – আগস্টকে এভাবেই ধরেছেন কবি আবু আফজাল সালেহ। কবি আবু আফজাল সালেহ একজন সংবেদনশীল কবি ; পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা, প্রবন্ধ, ফিচার লেখেন। তাঁর এই ক্ষুদ্রাবয়ব কবিতায় ‘দম বন্ধ হয়ে আছে এখনো ‘ শব্দগুচ্ছ ভয়াল চিত্রকে মনে করিয়ে দেয়। সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানে এই কবি করেছেন কবিতায় প্রতিবাদ, কবিতায় প্রতিরোধ। তাঁর কবিতায় হাহাকারের প্রতিধ্বনি —-‘ সমগ্র বাংলাদেশ আজকে সন্তানহারা মা’ —পাঠককে ব্যাকুল করে তোলে। অনেকটা বিনম্র এবং কাতর উচ্চারণে আবু আফজাল সালেহ নিষ্ঠুর- রক্তাক্ত অবস্থাটা পাঠকের সামনে মেলে ধরেন। পাঠকের কাজটা কবি পাঠককেই করতে দেন। মানবিক বোধে তাড়িত কবির মনোবিশ্বে দেখি থরথর আবেগ। আবেগ তাড়িত কবি কবিতায় রুদ্রতা-নিষ্ঠুরতার কাব্যিক ছবি এঁকেছেন তাঁর নিপুন হাতে। পাঠককে জাগ্রত করেছেন , ঘা দিয়েছেন চেতনার গভীর প্রদেশে। কল্পনায় না ভেসে করছেন সত্যনিষ্ঠ উচ্চারণ :
রক্তাক্ত জুলাইয়ে শুরু রক্তখেলা
বুলেটের সামনে লাঠি
হায়েনা – বাহিনীর সামনে দাঁড়ায় পতাকা- লাল- সবুজ
অবিবেক আর ক্ষমতার কুয়াশায় ঢাকা
যেন ব্লাডস্টেশন, না- না যেন রক্তভাগাড়
রোডডিভাইডারে রক্তদাগ
অলিগলিতে খুলি,বিচ্ছিন্ন হাত,ছুটে যাওয়া
ছোপ – ছোপ রক্ত,চোখ,রক্তাক্ত – ঘর্মাক্ত পরিধেয়…

যা ঘটেছে তা কবিতায় তুলে ধরা — যেন ঘটনার অবিকল ফটোগ্রাফ। এমন উচ্চারণের একটা সুবিধে হচ্ছে পাঠক নিজেই তীব্র প্রতিক্রিয়াটা দেখাবে—- হয়তো তা হবে কবির শব্দের চেয়ে শক্তিশালী, কবির পঙতির চেয়ে সোচ্চার। শোষণ – দুঃশাসন- বৈষম্য বিরোধী সংগ্রামে যে রক্ত ঝরেছে তার জন্য কবি দায়ী করেছেন পুলিশ আর স্বৈরাচারকে।
কবি লিখেছেন : কার হাতে এ- রক্তভাগাড়?— পুলিশ আর স্বৈরাচারের !
কবি বিস্মিত হয়েছেন শিশু – কিশোর আর শান্তিকামীদের কিংবা নিরীহদের রক্ত ঝরতে দেখে।তিনি বলেছেন :
যারা কিছুই বোঝে না তাদের রক্তের অনেক রঙ আমরা দেখেছি
লাল- নীল- সাদা- কালো… 

কবি আবু আফজাল সালেহ জুলাই – আগস্টে ঘটে যাওয়া তারুণ্যের জয়কে উপলব্ধি করেছেন। অন্যদিকে তিনি দেখেছেন স্বৈরাচারের নিষ্ঠুরতায় তরুণদের মুখ কীভাবে সাদা বিবর্ণ হয়ে গেছে। তিনি দেখেছেন, তরুণদের মর্মবেদনা মায়ের মনকে কীভাবে ভেঙে দিয়েছে , বাবার হৃদয়কে কীভাবে অঙ্গার করে তুলেছে আর অভিজাতদের বাকশক্তিকে কীভাবে বোবা করে তুলেছে। কবির এই অনুভূতির প্রকাশ — ‘ অভিজাতও বোবা হয়ে গেছে ‘ কবিতায় উঠে এসেছে —-
একজন মা এসেছেন খালি বুকে
রক্ত- বুলেট চোখে নিয়ে
কাঁখের শিশুর বড় – গোল চোখে বিস্ময়
মায়ের হাতে – ধরে- থাকা কিশোরীর মুখে কয়েকটি
শব্দ
ভাই, পুলিশ, খুন…
কী চায় তিনজন, বলতে পারে না !
অভিজাতও কী বোবা হয়ে গেছে?

নির্মম বিভৎস হত্যাকাণ্ড পেরিয়ে যখন বিজয় এলো তখন আমজনতা আবেগে উত্তাল। কবি আবেগ সংযত রাখতে পছন্দ করেন। বিজয় অর্জিত হয়েছে বটে, তবু্ও তো চোখে বেদনার জল— বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত শরীর। কবি বেদনার মধ্যেও কবিতায় নিয়ে এলেন একটা পরিমিতিবোধ ; বিজয়োন্মত্ত হতে বারন করে কবিতায় উচ্চকণ্ঠ হলেন এই বলে—-
উল্লাস করার সময় আসেনি এখনো
ওত পেতে আছে
নিষ্ঠুরতা,হিংস্রতা আর অন্ধকার
আকাশটা এখনো হয়নি উদার
ধোঁয়ায় বিষাক্ত – বাতাসে ভারী।
বরং চলো পাহাড় গড়ে তুলি
বৈষম্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ি।

অশ্রু আর ক্রোধ এ দুটোই তাকে তাড়িত করে। কবিতায় সেই ক্রোধ হয়ে ওঠে প্রতিরোধ, অশ্রু হয়ে ওঠে ব্যারিকেড। কবির চোখ জুলাই – আগস্টের প্রতিবাদী মিছিল দেখেছে,তারুন্যের রুধির ঝরতে দেখেছে। কবি এই দেখা থেকে নির্মাণ করেছেন রক্তাক্ত জুলাই, রক্তাক্ত আগস্ট। রক্তাক্ত জুলাই – আগস্টের কবিতায় মিশিয়েছেন বাঙালির চেতনার রঙ। জুলাইয়ের এইসব কবিতায় পুস্পিত গোলাপ নেই, আগস্টের এইসব কবিতায় প্রস্ফুটিত বেলি নেই— আছে ছোপ-ছোপ রক্তের দাগ। সেই অর্থে তাঁর এই কবিতা –পাঠ প্রচলিত অর্থে সুখকর নয় ; বিপ্লব – অভিজ্ঞতাজাত কষ্টকর এক উচ্চারণ। বিপ্লব অভিজ্ঞতা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে এক স্বাধীন উপত্যকায়। তিনি বলেন:
তোমার স্বার্থপরতাই আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছে
বিরাট স্বাধীনতা। নীল আকাশে ঘাসের স্বাধীনতা
শঙ্ক্ষচোখে ভাসার স্বাধীনতা
জারুল বনে উড়ার স্বাধীনতা ——
আমার স্বাধীনতা একখানে বন্দি নেই আর।
নদীর সঙ্গে ছুটে যাওয়া, ইনানী পাথরে হোঁচট খাওয়া
চাকমা পাহাড় আর শালবনে হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই আর।
শিকলের ঝনঝনানি হারিয়ে গেছে তোমার স্বার্থপরতায়।

বোধহয়, কবিতা এভাবেই স্বৈরাচারীর পথ আগলে দাঁড়ায়। সময়ের প্রয়োজনে জেগে ওঠে কবি—কবিতা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা,প্রতিবাদের ভাষা। কবিতার বর্ণ হয়ে ওঠে ঘৃনা, ক্রোধ আর শক্তির প্রতীক। এই যেমন, শামসুর রাহমানের কলমে আসাদের শার্ট হয়ে ওঠে আমাদের প্রাণের পতাকা।কবিতায় শামসুর রাহমানের ব্যাকুল উচ্চারণ —-‘ এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?এমন যোগ্য সমাধি কই?’ আবু আফজাল সালেহ তরুন লিখিয়ে তাঁর কবিতার ভাষা অত শক্তিশালী না, কিন্তু তবু্ও তাঁর ‘ যুদ্ধ বাঁধে বুকের ভেতরখণ্ডিত হয় হৃদয়’—উচ্চারণ কম কীসে? কবিতায় তাঁর উচ্চারণ:
চারদিকে রক্তের চাহিদা , ‘ ওহ সেনাপতি, আরও গভীর হওআরও শক্ত হও, আরও বিচক্ষণ হও।’

কবি আবু আফজাল সালেহ অনেক প্রেমের কবিতা লিখেছেন। ‘ভালোবাসি’ উচ্চারণে তাঁর দ্বিধা —-‘ বলব ? নাকি বলব না? —- আজীবন হৃদয় গভীরে রেখেই দেব? ।’ এই দ্বিধান্বিত কবিকে জুলাই – আগস্টের রক্তাক্ত পঙতি নির্মাণে অকপট হতে দেখি। এ কবিতা নির্মাণে কবি সত্যনিষ্ঠ, সচেতন এবং সযত্ন। তাঁর সযতনে লেখা জুলাই – আগস্টের কবিতাগুলো পাঠককে বেদনার্ত করে,এক বীভৎসতার মুখোমুখি করে। কবির জুলাই – আগস্টের কবিতাগুলো পাঠককে প্রতিবাদী করে, নির্ভিক করে।কবিতাগুলো উৎকৃষ্ট শিল্পকর্ম কি না জানি না, তবে সেগুলো আমাদের শরীরের পেশিতে টানটান অস্থিরতা নিয়ে আসে। তারুণ্যের রক্তে রঞ্জিত তাঁর কবিতাগুচ্ছ আমাদের মনে সৌরভ ছড়ায় না, আমাদের মনকে উদ্ভ্রান্ত করে। রক্তাক্ত জুলাই – আগস্টের এ কবিতাগুলো আমাদের মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে আর স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্ন দেখানো আর ক্লান্ত করে তোলা দুটোই বোধহয় কবিতার কাজ।

 

হুমায়ুন কবীর:  শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক, চুয়াডাঙ্গা 
জনপ্রিয় পোস্ট

আবু আফজাল সালেহর ছড়া: সমাজ, প্রকৃতি ও উৎসবের মেলবন্ধন

পরিমার্জিত পুনঃপ্রকাশ : জুলাই-আগস্টের কবিতা আলোচনা

আবু আফজাল সালেহ’র কবিতায় রক্তাক্ত জুলাই -আগস্ট

আপডেট : ১১:০৭:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৪

ছবি : সংগৃহীত 


হুমায়ুন কবীর



এ জনপদের ইতিহাসে চোখ মেললে মোটাদাগে কিছু রক্তাক্ত অধ্যায় দেখি।খুব বেশি পিছনে না গেলেও ‘৫২ , ‘৬৯ , ‘৭১ আর সাম্প্রতিক ‘২৪ এখনো আমাদের চোখে জ্বলজ্বল করছে। এছাড়াও আমাদের ট্রাজেডি সাহিত্যে শোকাবহ ১৫ আগস্ট ভুলবার নয়।কবিতা,উপন্যাস, নাটকসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় এই রক্তাক্ত দিনগুলো স্থান করে নিয়েছে।
গেল জুলাই – আগস্টে ছাত্র- জনতা প্রাণ উৎসর্গ করেছে।বীরদর্পে বলেছে:
বুকের ভেতর
অনেক ঝড়
বুক পেতেছি
গুলি কর 

বৈষম্যবিরোধী এই আন্দোলন কবিদের সংবেদনশীল মনকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে । তারা জুলাই – আগস্টের রক্তাক্ত ছবিটা বন্দী করেছেন রক্তের অক্ষরে। সাহিত্য পাতায়, ফেসবুকে সেই রক্তবর্ণ কবিতা পড়ে শোকার্ত হয়েছি।
দম বন্ধ হয়ে আছে এখনো
বারুদের গন্ধে
রক্তের গন্ধে
দূষিত বাতাস
ঢাকায় চট্টগ্রামে রংপুরে…
সারা বাংলাদেশ আজকে কাঁদছে
সন্তানহারা মায়ের শোকে
মানবতার খুনে

সমগ্র বাংলাদেশই তো আজ সন্তানহারা মা।’—–কবিতায় রক্তাক্ত জুলাই – আগস্টকে এভাবেই ধরেছেন কবি আবু আফজাল সালেহ। কবি আবু আফজাল সালেহ একজন সংবেদনশীল কবি ; পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা, প্রবন্ধ, ফিচার লেখেন। তাঁর এই ক্ষুদ্রাবয়ব কবিতায় ‘দম বন্ধ হয়ে আছে এখনো ‘ শব্দগুচ্ছ ভয়াল চিত্রকে মনে করিয়ে দেয়। সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানে এই কবি করেছেন কবিতায় প্রতিবাদ, কবিতায় প্রতিরোধ। তাঁর কবিতায় হাহাকারের প্রতিধ্বনি —-‘ সমগ্র বাংলাদেশ আজকে সন্তানহারা মা’ —পাঠককে ব্যাকুল করে তোলে। অনেকটা বিনম্র এবং কাতর উচ্চারণে আবু আফজাল সালেহ নিষ্ঠুর- রক্তাক্ত অবস্থাটা পাঠকের সামনে মেলে ধরেন। পাঠকের কাজটা কবি পাঠককেই করতে দেন। মানবিক বোধে তাড়িত কবির মনোবিশ্বে দেখি থরথর আবেগ। আবেগ তাড়িত কবি কবিতায় রুদ্রতা-নিষ্ঠুরতার কাব্যিক ছবি এঁকেছেন তাঁর নিপুন হাতে। পাঠককে জাগ্রত করেছেন , ঘা দিয়েছেন চেতনার গভীর প্রদেশে। কল্পনায় না ভেসে করছেন সত্যনিষ্ঠ উচ্চারণ :
রক্তাক্ত জুলাইয়ে শুরু রক্তখেলা
বুলেটের সামনে লাঠি
হায়েনা – বাহিনীর সামনে দাঁড়ায় পতাকা- লাল- সবুজ
অবিবেক আর ক্ষমতার কুয়াশায় ঢাকা
যেন ব্লাডস্টেশন, না- না যেন রক্তভাগাড়
রোডডিভাইডারে রক্তদাগ
অলিগলিতে খুলি,বিচ্ছিন্ন হাত,ছুটে যাওয়া
ছোপ – ছোপ রক্ত,চোখ,রক্তাক্ত – ঘর্মাক্ত পরিধেয়…

যা ঘটেছে তা কবিতায় তুলে ধরা — যেন ঘটনার অবিকল ফটোগ্রাফ। এমন উচ্চারণের একটা সুবিধে হচ্ছে পাঠক নিজেই তীব্র প্রতিক্রিয়াটা দেখাবে—- হয়তো তা হবে কবির শব্দের চেয়ে শক্তিশালী, কবির পঙতির চেয়ে সোচ্চার। শোষণ – দুঃশাসন- বৈষম্য বিরোধী সংগ্রামে যে রক্ত ঝরেছে তার জন্য কবি দায়ী করেছেন পুলিশ আর স্বৈরাচারকে।
কবি লিখেছেন : কার হাতে এ- রক্তভাগাড়?— পুলিশ আর স্বৈরাচারের !
কবি বিস্মিত হয়েছেন শিশু – কিশোর আর শান্তিকামীদের কিংবা নিরীহদের রক্ত ঝরতে দেখে।তিনি বলেছেন :
যারা কিছুই বোঝে না তাদের রক্তের অনেক রঙ আমরা দেখেছি
লাল- নীল- সাদা- কালো… 

কবি আবু আফজাল সালেহ জুলাই – আগস্টে ঘটে যাওয়া তারুণ্যের জয়কে উপলব্ধি করেছেন। অন্যদিকে তিনি দেখেছেন স্বৈরাচারের নিষ্ঠুরতায় তরুণদের মুখ কীভাবে সাদা বিবর্ণ হয়ে গেছে। তিনি দেখেছেন, তরুণদের মর্মবেদনা মায়ের মনকে কীভাবে ভেঙে দিয়েছে , বাবার হৃদয়কে কীভাবে অঙ্গার করে তুলেছে আর অভিজাতদের বাকশক্তিকে কীভাবে বোবা করে তুলেছে। কবির এই অনুভূতির প্রকাশ — ‘ অভিজাতও বোবা হয়ে গেছে ‘ কবিতায় উঠে এসেছে —-
একজন মা এসেছেন খালি বুকে
রক্ত- বুলেট চোখে নিয়ে
কাঁখের শিশুর বড় – গোল চোখে বিস্ময়
মায়ের হাতে – ধরে- থাকা কিশোরীর মুখে কয়েকটি
শব্দ
ভাই, পুলিশ, খুন…
কী চায় তিনজন, বলতে পারে না !
অভিজাতও কী বোবা হয়ে গেছে?

নির্মম বিভৎস হত্যাকাণ্ড পেরিয়ে যখন বিজয় এলো তখন আমজনতা আবেগে উত্তাল। কবি আবেগ সংযত রাখতে পছন্দ করেন। বিজয় অর্জিত হয়েছে বটে, তবু্ও তো চোখে বেদনার জল— বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত শরীর। কবি বেদনার মধ্যেও কবিতায় নিয়ে এলেন একটা পরিমিতিবোধ ; বিজয়োন্মত্ত হতে বারন করে কবিতায় উচ্চকণ্ঠ হলেন এই বলে—-
উল্লাস করার সময় আসেনি এখনো
ওত পেতে আছে
নিষ্ঠুরতা,হিংস্রতা আর অন্ধকার
আকাশটা এখনো হয়নি উদার
ধোঁয়ায় বিষাক্ত – বাতাসে ভারী।
বরং চলো পাহাড় গড়ে তুলি
বৈষম্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ি।

অশ্রু আর ক্রোধ এ দুটোই তাকে তাড়িত করে। কবিতায় সেই ক্রোধ হয়ে ওঠে প্রতিরোধ, অশ্রু হয়ে ওঠে ব্যারিকেড। কবির চোখ জুলাই – আগস্টের প্রতিবাদী মিছিল দেখেছে,তারুন্যের রুধির ঝরতে দেখেছে। কবি এই দেখা থেকে নির্মাণ করেছেন রক্তাক্ত জুলাই, রক্তাক্ত আগস্ট। রক্তাক্ত জুলাই – আগস্টের কবিতায় মিশিয়েছেন বাঙালির চেতনার রঙ। জুলাইয়ের এইসব কবিতায় পুস্পিত গোলাপ নেই, আগস্টের এইসব কবিতায় প্রস্ফুটিত বেলি নেই— আছে ছোপ-ছোপ রক্তের দাগ। সেই অর্থে তাঁর এই কবিতা –পাঠ প্রচলিত অর্থে সুখকর নয় ; বিপ্লব – অভিজ্ঞতাজাত কষ্টকর এক উচ্চারণ। বিপ্লব অভিজ্ঞতা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে এক স্বাধীন উপত্যকায়। তিনি বলেন:
তোমার স্বার্থপরতাই আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছে
বিরাট স্বাধীনতা। নীল আকাশে ঘাসের স্বাধীনতা
শঙ্ক্ষচোখে ভাসার স্বাধীনতা
জারুল বনে উড়ার স্বাধীনতা ——
আমার স্বাধীনতা একখানে বন্দি নেই আর।
নদীর সঙ্গে ছুটে যাওয়া, ইনানী পাথরে হোঁচট খাওয়া
চাকমা পাহাড় আর শালবনে হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই আর।
শিকলের ঝনঝনানি হারিয়ে গেছে তোমার স্বার্থপরতায়।

বোধহয়, কবিতা এভাবেই স্বৈরাচারীর পথ আগলে দাঁড়ায়। সময়ের প্রয়োজনে জেগে ওঠে কবি—কবিতা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা,প্রতিবাদের ভাষা। কবিতার বর্ণ হয়ে ওঠে ঘৃনা, ক্রোধ আর শক্তির প্রতীক। এই যেমন, শামসুর রাহমানের কলমে আসাদের শার্ট হয়ে ওঠে আমাদের প্রাণের পতাকা।কবিতায় শামসুর রাহমানের ব্যাকুল উচ্চারণ —-‘ এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?এমন যোগ্য সমাধি কই?’ আবু আফজাল সালেহ তরুন লিখিয়ে তাঁর কবিতার ভাষা অত শক্তিশালী না, কিন্তু তবু্ও তাঁর ‘ যুদ্ধ বাঁধে বুকের ভেতরখণ্ডিত হয় হৃদয়’—উচ্চারণ কম কীসে? কবিতায় তাঁর উচ্চারণ:
চারদিকে রক্তের চাহিদা , ‘ ওহ সেনাপতি, আরও গভীর হওআরও শক্ত হও, আরও বিচক্ষণ হও।’

কবি আবু আফজাল সালেহ অনেক প্রেমের কবিতা লিখেছেন। ‘ভালোবাসি’ উচ্চারণে তাঁর দ্বিধা —-‘ বলব ? নাকি বলব না? —- আজীবন হৃদয় গভীরে রেখেই দেব? ।’ এই দ্বিধান্বিত কবিকে জুলাই – আগস্টের রক্তাক্ত পঙতি নির্মাণে অকপট হতে দেখি। এ কবিতা নির্মাণে কবি সত্যনিষ্ঠ, সচেতন এবং সযত্ন। তাঁর সযতনে লেখা জুলাই – আগস্টের কবিতাগুলো পাঠককে বেদনার্ত করে,এক বীভৎসতার মুখোমুখি করে। কবির জুলাই – আগস্টের কবিতাগুলো পাঠককে প্রতিবাদী করে, নির্ভিক করে।কবিতাগুলো উৎকৃষ্ট শিল্পকর্ম কি না জানি না, তবে সেগুলো আমাদের শরীরের পেশিতে টানটান অস্থিরতা নিয়ে আসে। তারুণ্যের রক্তে রঞ্জিত তাঁর কবিতাগুচ্ছ আমাদের মনে সৌরভ ছড়ায় না, আমাদের মনকে উদ্ভ্রান্ত করে। রক্তাক্ত জুলাই – আগস্টের এ কবিতাগুলো আমাদের মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে আর স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্ন দেখানো আর ক্লান্ত করে তোলা দুটোই বোধহয় কবিতার কাজ।

 

হুমায়ুন কবীর:  শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক, চুয়াডাঙ্গা