ঢাকা ০৬:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জন্মদিন স্মরণ : আমিনুল ইসলাম

আমিনুল ইসলামের কবিতা : শিল্পিত শব্দবুনন

  • বাংলাবাঁক
  • আপডেট : ০৮:২৪:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪
  • 827

আমিনুল ইসলামের কবিতা : শিল্পিত শব্দবুনন

প্রত্যয় হামিদ


কবিতা মূলত একেবারে মনের অবচেতন স্তর থেকে উঠে আসা কথামালা। এটা spontaneous overflow of powerful feelings. ওয়র্ডস্ওয়র্থ এটাও বলেছেন, ‘Poetry is the breath and finer spirit of all knowledge.’ অর্থাৎ, জ্ঞানের প্রাণকোষ বলি বা পরিশুদ্ধ আত্মাই বলি, কবিতা হচ্ছে তা-ই। ভাষার শুদ্ধতম গঠন হচ্ছে কবিতা:  ‘the best words in the best order.’ (এস টি কোলরিজ) । কবিতা কিন্তু অনেকটাই স্বপ্নের মত। স্বপ্ন দেখার জন্য যেমন একটা বিশেষ সময়ের প্রয়োজন হয়, তেমনি কবিতাকে উঠে আসতেও বিশেষ একটা মুহূর্ত লাগে। সেটা কখন কিভাবে আসবে তা কেউই বলতে পারে না। এটা অনেকটা পানির ভিতর থেকে বুদ্বুদ বেরিয়ে আসার মতো। কবির মনে কখনও সখনও একটা ভাবের উদয় হয়- ঠিক পানিতে বুদ্বুদ ওঠার মত। আর যে মুহূর্তে সেটা ওঠে, ঠিক সে মুহূর্তেই তাকে ধরে ফেলা চাই। ধরতে পারলেই কেবল হবে না, কলম বা কিবোর্ডের সাহায্য নিয়ে সেটার একটা দৃশ্যমান প্রকাশও চাই। কিন্তু ধরতে না পারলে? ফেটে যাওয়া বুদ্বুদের মতই মিশে যাবে সে হাওয়ায়। আর একবার মিশে গেলে সেটাকে ফিরে পাওয়া দুষ্কর- আর দুষ্কর কেন, একেবারেই অসম্ভব। এখানে তবে কবির ভূমিকা কী? কবিকে জানতে হয়, অনুধাবন করতে হয় কখন তার মধ্যে সেই বুদ্বুদটা উঠছে। বুদ্বুদটা হয়তো সবার বা অনেকের মধ্যেই ওঠে। কিন্তু সেটাকে অনুধাবন করতে পারা, আর অনুধাবিত বুদ্বুদ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই তাকে ধরে এনে অক্ষরে অক্ষরে বন্দী করতে পারাটাই কবিত্ব। যে সেটা করে, সে-ই কবি। এখানে তাই ভাব ও ভাষার একটা জুতসই সমন্বয় দরকার। বুদ্বুদের উপস্থিতি যারা টেরই পান না, বা যাদের এসব হয়ই না, তারা কি তবে কবিতা লিখতে পারেন না? না, পারেন না। তারা কেউ কেউ হয়তো কবিতা লেখার খায়েশ থেকে এটা সেটা লিখে থাকেন। তাদের লেখাগুলো আর যা-ই হোক, শেষ বিচারে আর কবিতা হয়ে ওঠে না। তাহলে, কবিতাকে আসতে হয়। অর্থাৎ কবি কবিতার কাছে যান না, কবিতা-ই কবির কাছে আসে: Poetry/ arrived in search of me. এটা পাবলো নিরুদার কথা। কিন্তু কোথা থেকে আসে কবিতা? প্রশ্ন তিনি নিজেই করেছেন, উত্তরও দিয়েছেন নিজেই: I don’t know, I don’t know where/ it came from, from winter or a river. প্রবন্ধের শুরুতে একটা উৎসের কথা বলা হলেও কথা এটাই সত্য: কবিতা কোথা হতে আসে তা জানা যায় না। কিন্তু তাকে কবিতা হয়ে উঠতে হবে– A poem should… be। কবি আমিনুল ইসলামের কবিতাগুলো কি তাহলে  ‘হয়ে’ উঠেছে? হয়ে উঠতে পেরেছে নিশ্চয়; কারণ তার কবিতা পড়ার সময় কখনও মনে হয়নি তিনি শব্দগুলোর উপর জোর খাটিয়েছেন। লাইনে লাইনে স্বতঃস্ফূর্ততার প্রামাণিক আবেশ পাঠককে অন্যরকম ভালোলাগায় অভিভূত করে। কবিতাগুলো তাই একই সাথে শুধু অর্থ বা বাক্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তা মুগ্ধতার মাপকাঠিতে উতরে গিয়ে পাঠককে ধরে রাখতে পারে শেষ অবধি।

কেবল টিএস এলিয়ট বা জীবনানন্দ দাশ নন, প্রখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের অভিমত হচ্ছে, কবিতায় কল্পনা ও বাস্তবতার মিশ্রিত কাব্যশক্তি থাকতে হয়। আবার কাব্যশক্তির প্রকাশ হয় শব্দের মাধ্যমে, কারণ, …you can’t make a poem with ideas— you make it with words! কবি আমিনুল ইসলাম শব্দকে নতুনত্ব দান করেছেন কল্পনা ও বাস্তবতার যুগপৎ ব্যবহারে। চেনাপরিচিত শব্দগুলো কবির কবিতায় পেয়েছে নতুন রং, পেয়েছে নতুন অর্থ। ওয়র্ডসওয়র্থ, কোলরিজদের মত রোমান্টিক সময়ের কবিরা এইসব চেনা, নিত্য ব্যবহার্য শব্দ ও ভাষাকেই কবিতার ভাষা হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন। ওয়র্ডওয়র্থ তার Lyrical Ballads-এ তো বলেছেন, কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে ‘incidents and situations’–ই কেবল ‘common life’ থেকে নেয়া হবে না, কবিতার ভাষাও হতে হবে ‘a selection of language really spoken by men’। আমিনুল ইসলাম প্রতিদিনকার সাধারণ মানুষের ভাষা ব্যবহার করেছেন তার কবিতায়, কিন্তু সেগুলোকে চমৎকারিত্বের নতুনত্ব দিয়েছেন সমৃদ্ধ হাতে। হস্তমৈথুনের কবিতা-য় তিনি যখন বলেন ‘শহরের সিলেবাস রাখেনি জোনাকি/ বন্ধ বাথরুমে শুধু শুধু জমে ওঠে নিঃসঙ্গতা’, তখন অতি পরিচিত ‘সিলেবাস’ নতুন পরিচয়ে পাঠকের কাছে হাজির হয়। একই কথা প্রযোজ্য উপমার উপস্থিতির ক্ষেত্রেও। আমিনুলের কবিতায় উপমার ব্যবহারে প্রথাবহির্ভূত, নিজস্ব প্রয়োগ চোখে পড়ার মতো। ‘দরবেশ নীরবতা’, ‘জোছনারাতের ব্লাডপ্রেসার’ (‘মুক্তিযুদ্ধের কান্না’) ইত্যাদি অজস্র উদাহরণ টানা যাবে আমিনুল কবিতা থেকে। এসব প্রায়োগিক নতুনত্ব যেমন কবির পরিপক্কতা নির্দেশ করে, তেমনই তা ভাষার উপর কবির দখলকে স্বীকৃতি দেয়। এমন প্রয়োগ ভাষার সৌন্দর্য বাড়ায়, বাড়ায় কবিতার সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা। দেখুন ভাষা ব্যবহারের চমৎকারিত্ব, উপমার আনকোরা রূপ:

চাঁদ-সুরুজের সুইচ অফ করো-

নিভিয়ে দাও বাতি

অতঃপর কপাট লাগিয়ে দাও

তারপর-

অন্ধের নাকের মতো খোলা থাক্ নিভৃত জানালা।

(‘নিভৃত জানালা’, জোছনার রাত বেদনার বেহালা)

 

কবিতায় ইতিহাস, ঐতিহ্যও কিন্তু উঠে আসে শব্দের হাত ধরে। শুধু ইতিহাস, ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি নয়, ইয়েটস্-এর মতো কবিদের কবিতায় মিথও এসেছে কবিতার অনুষঙ্গ হিসেবে। ইয়েটস্ গ্রিক মিথ থেকে শুরু করে আইরিশ মিথকে কবিতার বিষয়বস্তু করে তুলেছেন, লিখেছেন ‘The Madness of King Goll’, ‘Leda and the Swan’, ‘Sailing to Byzantium’–এর মতো সব বিখ্যাত কবিতা। ‘No Second Troy’–এ তিনি তার প্রেমিকা Lady Maud Gonne-কে সতর্ক করতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গ্রিক মিথলজি ট্রয়-এর। এছাড়া আইরিশ ইতিহাসকে তিনি কবিতায় এনেছেন বার বার। ইয়েটস্-এর মতো আমিনুল ইসলামও ইতিহাস-ঐতিহ্যকে কবিতার উপজীব্য করেছেন। পাশাপাশি আপন সংস্কৃতি আর মিথকেও তিনি আশ্রয় দিয়েছেন কবিতার শব্দে। কারণ, ঐতিহ্যের পরম্পরা বা ধারাবাহিকতার জ্ঞান কবির জন্য খুবই জরুরী। যদিও কবি ইতিহাস লেখেন না, কিন্তু তিনি অতীতের পুনর্নির্মাণ ঘটিয়ে তাকে বর্তমানের সাথে সম্পর্কিত করেন। আমিনুলকে পাঠ করলে এটা খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তিনি তার কবিতায় অতীতের পুনর্নির্মাণ ঘটিয়েছেন শব্দজালের গিঁটে গিঁটে:

আর ততোক্ষণে এবং সেটা অনেক বছর পর, আমরা দুজন বিজয় সেনের রাজধানী-

বিজয়নগরের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে; আমাদের পায়ের নিচে গণইতিহাসের

গণকবর, বিচ্ছিন্ন করোটি ও চাপাকান্না; আমাদের মাথার ওপর সন্ধ্যার শামিয়ানা,

আমাদের চারপাশে অন্ধকারের বিশ্বস্ত পাহারা; আমাদের দিকে তাকিয়ে নীরব পদ্মার

জলে ভেজা পুরাতন প্রেম; আমি তোমার বুকের ওঠানামা টের পাচ্ছি, লোনা উত্তেজনা

ছুঁয়ে যাচ্ছে শান্তসাঁঝের পৌরুষ!

(‘বিজয় সেনের রাজধানী এবং ভালোবাসার রাজকন্যা’, প্রণয়ী নদীর কাছে)

 

প্রাবন্ধিক ও গবেষক ড. সফিউদ্দিন আহমদও স্বীকার করেছেন- “আমিনুল ইসলাম আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের কবি- আমাদের কাব্য সাহিত্যে চিত্রময়তা ও প্রতীকিয়তার কবি এবং একজন সমাজসচেতন কবি।”(‘আমিনুল ইসলাম : শিকড় বৈভবের কবি’, ড. সফিউদ্দিন আহমদ)  একই ভাবে বলা যায়, অফিস আদালতে এবং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত শব্দ ও প্রত্যয়সমূহ তিনি কবিতা নির্মাণে ব্যবহার করেছেন যথাযথ গুরুত্ব ও উপযোগিতা বজায় রেখেই। আমাদের প্রতিনিয়ত অফিস আদালতে যেতে হয়, সেখানকার পরিভাষার মর্ম বুঝতে হয়। এটি একটি অনেকটা স্বতন্ত্র ভাষিক জগৎ। এখানে বহু পরিভাষা ব্যবহৃত হয় যা অর্থব্যঞ্জনায় খুবই সমৃদ্ধ। আবার বিশ্বায়ন ও আকাশ সংস্কৃতি এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে ভাষার মধ্যে প্রতিনিয়ত নতুন শব্দ, প্রযুক্তিগত পরিভাষা প্রবেশ করছে। সেসব পরিভাষার বাংলা অনুবাদ সম্ভব নয় বলে সেগুলো ভাংলা ভাষায় নিজস্ব শব্দের মতো গৃহীত ও বব্যহৃত হয়েছে। দেখুন, অফিস আদালতে ব্যবহৃত যান্ত্রিক শব্দগুলো কেমন কাব্যিক হয়ে উঠেছে:

ফ্যাক্সে হৃদয় ঢালতে গেলে ঘাঁটবে অপারেটর

যদিও নাঙ্গা যুগের ঊরু, মনটা কপটচারীর

ডাকপিওনের বেতন জোটে, আমার নিরুত্তর

তোমার হাতে কলমটা কি ফিন্যান্স সেক্রেটারির?

(‘হায় বসন্ত’, কুয়াশার বর্ণমালা)

 

পুরানো ও প্রচলিত এবং অতিচেনা শব্দ দিয়ে নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করা আমিনুল ইসলামের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এই কারণে শব্দের ভাবগত অর্থ যেমন পাল্টে যায়, তেমনি ভাষার ধারণ ও প্রকাশ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। বলাবাহুল্য, কবিতার ক্ষেত্রে শব্দই হচ্ছে প্রধান অস্ত্র। এই অস্ত্রবিদ্যার ব্যবহারে অভিনবত্ব বা নতুন কৌশল উদ্ভাবনের ওপর একজন কবির কাব্যভাষা বা প্রকরণের বিষয়টি নির্ভর করে। পুরাতন শব্দের নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে হয়। নতুন-পুরাতন শব্দ মিলিয়ে নতুন সমাসবদ্ধ শব্দ তৈরি করতে হয়। আহমদ রফিক সংগত কারণেই স্বীকার করেছেন, “কবির হাতে গড়ে ওঠে নিজস্ব শব্দভান্ডার অথবা বলা উচিৎ শব্দ ব্যবহারের নিজস্ব ভিন্নতা, কারো মতে অভিনবত্ব। তেমনি উঠে আসে অনুভূতির সজ্জিত প্রকাশে বা প্রকরণগত আকর্ষণে তৈরি চিত্রকল্প যা স্থানিক তাৎপর্যে অর্থবান। ” (‘আমিনুল ইসলামের কবিতার  বিষয় ও প্রকরণ বৈচিত্র্য’, আহমদ রফিক)  আমিনুল যে এই শব্দপ্রযুক্তিতে সফল, তা তার কবিতা-ই বলে দেয়:

গেরস্ত ঘুমিয়ে, তার স্বপ্ন ছুঁয়ে হেমন্তের দিন

শিউলির স্বপ্নমুখে ধাবমান শরতের সীমা

কাঁশবনে স্বপ্ন সাদা; এই শুধু আমি স্বপ্নহীন

আমাকে জাগিয়ে রাখে শ্রাবণের অন্ধপূর্ণিমা।

(‘আমাকে জাগিয়ে রাখে শ্রাবণের অন্ধপূর্ণিমা’, মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম)

 

বিদেশি ভাষার শব্দও তিনি ব্যবহার করেছেন সমান দক্ষতায়, কবিতার প্রয়োজনে, অর্থের সমৃদ্ধি ও পরিপূর্ণতার জন্য। ‘তিনি আরবি-ফার্সি-ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন কবিতার সমৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধিকরণের জন্য’ এবং ‘অনেক সময়ই এই শব্দগুলো ভিন্নতর ব্যাঞ্জনা সৃষ্টি করে’ (ইয়াসির আজিজ)। ‘যখন সে যৌবনের দুলদুল হয়ে উঠেছে, আমরা তাকে ধোপার গাধার লিভ সাবস্টিটিউট/ বানিয়েছি’ (‘আমাদের সম্পর্ক সুলতানা’, স্বপ্নের হালখাতা) অথবা, ‘তবে ভালোবাসার সিরাতুল মোস্তাকিম ছেড়ে কেন তুমি উকিলের আঘাটায় পথ খুঁজতে যাবে’ (‘জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার’, জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার)-এর মতো অসংখ্য লাইন আছে অনেক অনেক কবিতায় যা প্রমাণ করে শব্দচয়নে তিনি কোন নির্দিষ্ট গণ্ডিবদ্ধ নন। তাহলে শব্দের কাজ কি কেবলই ভাষার সৌন্দর্য সৃষ্টি? না। কবি কবিতায় যেসব শব্দ ব্যবহার করেন, তাদের অন্যতাম কাজ হচ্ছে ‘to make [the readers] hear, to make [them] feel- it is, before all, to make [the readers] see.’ অর্থাৎ, শব্দের বুননে যে ক্যানভাস তৈরি হয়, পাঠক সেখানে কবির দেখানো চিত্র দেখেন, শোনানো কথা শোনেন, অনুভূত বিষয় অনুভব করেন। দেখুন :

প্রণয়ের পার্লামেন্টে উত্থাপিত

তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন দুই-এর

উত্তরে বলছি-‘হে মাননীয় সাংসদ,

কেন এই সুচরিত অভিনয়-

সে-জরুরতের উলকি আঁকা

ভি-কাটা ব্লাউজের ভি-ভাঁজের নিচে,

তুমি ঝুঁকে এলে–আঁচলবিচ্যুত 

সেখানেও দুচোখ যায় আমার;

(‘স্বাগত হে অভিনেত্রী’,  প্রণয়ী নদীর কাছে)

 

আমিনুল ইসলামের কাব্যভাষার অন্যতম প্রধান আরেকটি দিক হচ্ছে প্রতীকায়তার মাধ্যমে আড়াল সৃষ্টি। তার কবিতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতীকাশ্রয়ী। প্রথম পাঠে মনে হয় সহজ সরল কিন্তু ভেবে দেখতে গেলে গভীর রহস্যের সন্ধান মেলে। তিনি আক্ষরিকভাবে যা বলেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যঞ্জনাগত অর্থ থাকে ভিন্ন কিছু। অর্থাৎ কবিতায় পেরিফ্র্যাসিস (Periphrasis) তৈরি করতে হয়। এর মাধ্যমে কবি কবিতায় একটা নিরাপদ বলয়, ভাবীয় আড়াল সৃষ্টি করতে পারেন। কারণ, এখন সরাসরি কথা বলার যুগ নয়- ঘুরিয়ে কথা বলতে হয়। কারণ, আমাদের  ‘civilization comprehends great variety and complexity, and this variety and complexity, playing upon a refined sensibility, must produce various and complex results.’  এটা টিএস এলিয়টের কথা ‘The Metaphysical Poets’–এ। তিনি এর পরেই তিনি কবিদের করণীয় কী, তা বলেছেন, ‘The poet must become more and more comprehensive, more allusive, more indirect’। কিন্তু কবিকে কেন ‘more allusive, more indirect’ হতে হবে? সে কথাও স্পষ্ট করেছেন তিনি- ‘in order to force, to dislocate… language into his meaning. কবি আমিনুল তবে কতটা  ‘more allusive, more indirect’ হতে পেরেছেন তার কবিতায়? কতটা? দেখুন:

প্রেমপত্র প্রেসক্রিপশন ও জন্মসনদ হাতে

যতবার দাঁড়াই জন্মের কাঠগড়ায়-

‘মাই লর্ড, ইয়োর অনার–’

ততবারই ডিএলআর কোট করে সেকথাই

ঘোষণা করেন মহামান্য আদালত

আমাকে থামিয়ে দিয়ে মাঝপথে।

অথচ আপীল বা রিভিউ করার সযোগ রাখেনি-

আকবরের চেয়েও উজ্জ্বল উপাধিধারী

মহা-একনায়কের অসংশোধনযোগ্য সংবিধান!

(‘সক্রেটিসের পৃথিবী’, প্রণয়ী নদীর কাছে)

 

এভাবেই আমিনুলের কবিতা মাঝে মাঝে রহস্যময়তার ঘোর ও সম্মোহন সৃষ্টি করে। এটি তার কবিতার অনিঃশেষ ঐশ্বর্য হিসেবে কাজ করে। এটি রোদের মতো নয়, অন্ধকারের মতোও নয়। এ হচ্ছে জোছনার মতো যা আলো-আঁধারি দিয়ে তৈরি। বারবার পাঠেও তাই তার কবিতার আবেদন ফুরিয়ে যায় না। আমিনুলের কবিতার ভাষা সচ্ছন্দ, সাবলীল এবং গতিময়। কষ্টকল্পনা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দুটোই এড়িয়ে চলেছেন তিনি যত্নের সাথে। এটা তার সহজাত কাব্যক্ষমতার গুণই বটে। আমিনুলের কবিতার ভাষা তাই সাগরের মতো গভীর কিন্তু জলের মত স্বচ্ছ।

অতএব আমার এই ভালোবাসা রেখে দাও জোয়ানা

যেভাবে বাড়তি জল রেখে দেয় মরুভূমির উট

যেভাবে ওস্তাদ রেখে দেয় দক্ষ হাতে তার শেষ মার

যেভাবে টপ ট্রামকার্ড বাঁচিয়ে রাখে অভিজ্ঞ জুয়াড়ি;

আর এত এত সম্পদ নিয়ে একবারও জুয়া খেলবে না জীবনে

সে কী  করে হয়? তাহলে কেন এ জীবন? কী কাজ এত এত বাড়তি সম্পদের?

(‘আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট’, আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট)

 

একইভাবে চিত্রকল্প নিয়েও কথা বলা যায়। বলা বাহুল্য, চিত্রকল্প কিন্তু কবিতার প্রাণ। প্রাণ মানে কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এজরা পাউন্ড কী বললেন?   ‘It is better to represent an ‘Image’ in a life than to produce voluminous works.’  আবার কবিতায় চিত্রকল্প আরও বেশি প্রত্যাশিত, কারণ কবিতার পরিসর ছোটো, ঘন। এখানে বৃহৎ কিছুকে খুব সহজেই ধারণ করতে পারে এই ‘ইমেজ’। তাই আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব কিছু অবস্তুবাচক জিনিসকে বস্তুবাচক প্রতিকল্পে প্রতিস্থাপন করে পাঠকের চোখের সামনে তুলে ধরার যে কৌশল, তাতে দক্ষ না হলে কবিতার সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হয়, তেমনি তা ভাবের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে। আমিনুলের অনেক কবিতায় অসাধারণ কিছু দৃশ্যকল্প আছে যা পড়ামাত্র পাঠকমনপর্দায় পরিচ্ছন্ন, পরিষ্কার ছবি ভেসে ওঠে। দেখুন:

প্রভাতী পাহাড়ে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে ঝরনা

চারপাশে কুয়াশারঙের ছায়া

বাঘ সাপ শেয়ালের চোখ

হাতের তালুতে সূর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সময়

অর্ধ-আবৃত পইথানে

(‘অপ্রস্ফুটিত দুপুর’, জোছনার রাত বেদনার বেহালা)

 

উপমাও কিন্তু কবিতার শরীরে বয়ে চলা রক্ত, যা তাকে প্রাণ দেয়। আমিনুলের কবিতাগুলো জীবন্ত মনে হয় যেসব কারণে, উপমা কিন্তু তাদের মধ্যে অন্যতম। উপমার ব্যবহারে কবিতায় যেমন অধরা জিনিস দৃশ্যমান বস্তুর মতো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তেমনি তা পাঠককে কবিতা বুঝতে সহায়তা করে। শেক্সপিয়রের হ্যামলেটের কথা মনে পড়ে? কী বলেছিলেন? তার মায়ের প্রতিপক্ষে দাঁড়িয়ে তার ক্ষুরধার (Pun): ‘I will speak daggers to her, but use none.’ বুঝা গেল নিশ্চয়। অস্ত্র ব্যবহার না করেও কাউকে ঘায়েল করতে হলে কথার বিকল্প আর কী আছে? কিন্তু শিল্পীকে জানতে হবে মাত্রা ঠিক রেখে কোথায় কোন্ শব্দ ব্যবহার করলে, কোন্ উপমার আশ্রয় নিলে কাউকে সরাসরি আঘাত না করেও ক্ষত সৃষ্টি করা যায়। আমিনুলকে পড়ুন:

ঘুমিয়েছে গণতন্ত্র অ্যাফ্রো-এশিয়ায়

হরিণ শিশুর মতো কোমলশরীর

তাই দেখে লোভ জাগে জলে ও ডাঙায়

থাবা আর দাঁত নিয়ে সমান অধীর।

(‘আঁধারের জানালায়’, স্বপ্নের হালখাতা)

২.

কবিতায় গল্প বলার প্রবণতাটা জোয়ারের মতো এসেছিল রানি ভিক্টোরিয়ার সময়। তখন কবিরা কবিতায় গল্প বলেছেন- বলা ভালো- বলতে বাধ্য হয়েছেন উপন্যাসের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে। টিকে থাকার জন্য কবিতাকে সে সময় অভিযোজন করতে হয়েছে নিজেকে। গল্পপ্রিয় মানুষকে তাই কবিতার মোড়কে গল্প শুনিয়েছেন সে সময়ের কবিরা: রবার্ট ব্রাউনিং, ম্যাথু আর্নল্ড বা টেনিসন, এবং আরও পরে, জসীমউদদীনরা। ড্রামাটিক মনোলগ ছাড়াও কবিতায় বিভিন্ন আঙ্গিকে গল্প এসেছে। সে ধারার বিকাশক্রম পরিবর্তন হলেও বদলায়নি গল্প বলার ইচ্ছা। আমিনুল ইসলামও গল্পের মোড়কে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনিয়েছেন এই প্রজন্মকে। প্রতিটি বাঙালির মনন আর কর্ম জুড়ে থাকা এই মহান যুদ্ধকে ‘মুক্তিযুদ্ধের কান্না’ কবিতায় তিনি দিয়েছেন গল্পের আবেগ। এজন্য কবিতাটি কেবল একটা ‘কবিতা’-ই নয়, মুক্তিযুদ্ধের একটা অসামান্য দলিল হয়ে উঠেছে। কবিতাপাঠান্তে পাঠক আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, কষ্ট উথলে ওঠে বুক ভেদ করে। থমকে যেতে হয়, চোখ মুছতে হয় এ লাইনগুলো পড়ার পর:

অতঃপর স্বাধীনতা। খোঁজাখুঁজি; ছুটাছুটি;

নদীর ধারের ডোবা, জমির আড়ালের নালা,

নতুন কবরের মাটি আর ঝোপঝাড়ের আবরণ উলটিয়ে

খুঁজে দেখা হাড়গোড় খুলি;

একে জিজ্ঞাসা– ওকে অনুনয়;

সবখানেই উত্তর নাই; নাই; নাই!

(‘মুক্তিযুদ্ধের কান্না’, শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ)

 

আমিনুলকে পড়তে গেলে পাঠক তাই লক্ষ্য করবেন, তাঁর কবিতায় বিষয়বৈচিত্র্য আছে, আছে নানামুখী চিন্তাস্রোতে, যে স্রোতে চাইলেই গা ভাসিয়ে ভাটিতে যাওয়া যায়, অথবা বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের চিন্তাকেও ঝালিয়ে নেয়া যায়। আছে মেটাফিজিক্যাল কিছু কবিতাও। এই ঘরানার কবিতা সংখ্যায় বেশি না হলেও কবিতাগুলো আমিনুলের কবিতার কাব্যিক উচ্চতাকে ঋদ্ধ করেছে:

বহুদিন মনে সাধ– বলতে পারো জেদও

তোমার নৈঃশব্দ্যের বাগানে ঝুলে আছে

যেসকল কমলা-আঙুর-আপেল–

বাতাসের হাতে তাদের ছুঁয়ে দেখব একবার।

(‘অন্তর্বর্তী বাসনা’, জোছনার রাত বেদনার বেহালা)

 

৩.

আমিনুল ইসলামের কাব্যভাষার যে দিকটা তার কবিতার উপভোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে বহুগুণে, তার একটি হচ্ছে রসবোধের আবহে সৃষ্ট পরিহাস, স্যাটায়ার, শ্লেষ এবং তির্যকতা। এসব করতে গিয়ে কবিকে তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। রেইনার মারিয়া রিলকেকে স্মরণ করা যেতে পারে– ‘For poems are not, as people think, simply emotions (one has emotions early enough) —they are experiences.’ অর্থাৎ সমাজের নানান এবং অসামাঞ্জস্যপূর্ণ দিক ও বিষয়সমূহ যখন কবির চোখ প্রতিনিয়ত দেখে, তখন যে অভিজ্ঞতার সিঞ্চন হয় মস্তিষ্কে এবং  আরও পরে মননে, তা কবিতাবন্দি হয় উপহাস বা শ্লেষের রূপক মিশ্রণে। তির্যক বাক্যাশ্রয়ে তিনি দেখান সমাজের সেইসব ক্ষত যার দুর্গন্ধ সবার চেনা, কিন্তু মুখ খুলে বলে না কেউই। ‘চোরের জন্য কনসালট্যান্সি’ দেখুন:

সাবধান হে চোর মহোদয়, আর মুরগিচুরি নয়!

হাজতের চাবি আর হাতকড়া হাতে নিয়ে

দ্যাখো নাকি– দাঁড়িয়ে আছেন থানা মহাশয়!

জেনে রাখো—মুরগিচোরকে ঘৃণা করে–

জনতা ও জেলখানা, থানা ও দুদক,

উকিল ও আদালত–, অধিকন্তু সকলেই প্রায়।

তারচেয়ে—যদি পারো গিলে খাও দিঘি ও পুকুর

জেনে নাও হজমের হাল;

ভালো? অতএব

অতঃপর আস্ত একটি বঙ্গোপসাগর

জঙ্গলে বা জাতিসংঘে তখন আর কে তোমাকে আটকায় হে বীর!।

(‘চোরের জন্য কনসালট্যান্সি’, আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট)

 

রোমান্টিক পিরিয়ডের পর টিএস এলিয়টের হাত ধরে (যা পরবর্তীতে অ্যামি লউয়েল, ডিলান টমাস, ফিলিপ লার্কিনরাও অনুসরণ করেছেন) যে আধুনিক কবিতার জন্মযাত্রা, সেখানে ইমেজিস্টরা আক্রান্ত হয়েছে তাদের সমাজ-বাস্তবতাকে অস্বীকার করার প্রবণতার জন্য। আধুনিক কবিতায় সমাজ উঠে এসেছে তার প্রকৃত চেহারা নিয়ে- কখনও তা বেশ শালীন, সৌম্য, আবার কখনও তা হিংস্র, ক্লেদাক্ত, অসহিষ্ণু! মূলত ভিক্টোরিয়ান যুগেই ম্যাথিউ আর্নল্ডের হাত ধরে এই ধারাটির প্রাথমিক সূচনা। তিনি সেই সমাজকে দেখিয়েছেন যেখানে  ‘Hath really neither joy, nor love, nor light,/ Nor certitude, nor peace, nor help for pain;’ (‘Dover Beach’)। আর আমরা এমন একটি সময়ে বাস করি, যখন ‘ignorant armies clash by night’। কবিতায় আমিনুলও বলেছেন এই সময়ের কথা, যা বলতে প্রয়োজন সাহসী মনোভাব। মূলত কবিতাকে তিনি সমাজ সংস্কারের একটা শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন বলেই কখনও সাহস হারাননি, সত্য থেকে হননি বিচ্যুত। তার কবিতার সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু ও ধরন সে কথাকেই প্রতিস্থাপন করে। দেখুন:

তাই তো আমরা ইতিহাসের উঠোন থেকে

কুড়াল এনেছি—কুড়াল

আমরা অনার্যের ওয়ারিশ কি না!

বটগাছের দিন শেষ

আমগাছের গোড়ায় শেষ সামন্তের জল

অতএব কচুখেত;

হা হা! হো হো! হি হি! …

(‘কচুখেতের হাসি’, কুয়াশার বর্ণমালা)

 

৪.

সাহিত্যে, বিশেষত গদ্যে, আঞ্চলিক ভাষার উপস্থিতি নতুন না হলেও ইদানীং এটার প্রকোপ (!) অনেকটাই বেড়েছে বৈকি! বাংলাদেশের টিভি নাটকগুলো এই ক্ষেত্রে সবচে বেশি এগিয়ে। এটাতে দোষের কিছু নেই যদি তা সাহিত্যের মেজাজের সঙ্গে যায়, প্রেক্ষাপট সেটা দাবি করে। আঞ্চলিক ভাষা তাই সাহিত্যে এলে সেটা ভাষার অঙ্গহানির কারণ না হয়ে অলংকার হিসেবেই তার শ্রীবৃদ্ধি করে। গদ্যে কাজটা সহজ হলেও কবিতায় আঞ্চলিকতাকে প্রবিষ্ট করানো সহজ নয়। আমিনুল চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার মানুষ। কিন্তু তিনি যে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ করেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের কান্না’ কবিতায়, তা ঠিক সেই এলাকার মনে হয়নি। এটা তাই কবিতার বাস্তবতার প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছে। ‘এইটা মন্তাজ কাঁসারীর গলা রে ব্যাটা! নেফুলের বাপকে/ আইজ ওরা মাইরা ফেলবে!’– লাইনগুলো পড়ে মনে হয়েছে কবির মনগড়া কিছু আঞ্চলিক কথার মিশ্রণ ঘটেছে এখানে। তাঁর নিজের এলাকর আঞ্চলিকতা এখানে নিখাদভাবে উঠে আসার দাবি রাখে বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু সার্বিক বিচারে এই সত্যটুকু অকপটে স্বীকার করতেই হয়- আমিনুলকে পড়তে গেলে মাথা যন্ত্রণা করে না, মাথায় ব্যথাসৃষ্টিকারী অনেক উপদানকে কাগজে দেখে হালকা হওয়া যায়। নিজেকে প্রবোধ দেওয়া যায়- যা-ই হোক, একজন আমিনুল আমাদের কথাগুলোকে অক্ষরায়ন করেছেন!

 

৫.

কবিতা মূলত একেবারে মনের অবচেতন স্তর থেকে উঠে আসা কথামালা। এটা ’spontaneous overflow of powerful feelings.’ ওয়র্ডস্ওয়র্থ এটাও বলেছেন, ‘Poetry is the breath and finer spirit of all knowledge.’। অর্থাৎ, জ্ঞানের প্রাণকোষ বলি বা পরিশুদ্ধ আত্মাই বলি, কবিতা হচ্ছে তা-ই। শুদ্ধতম শব্দের সর্বোৎকৃষ্ট বিন্যাসই হচ্ছে কবিতা: ‘the best words in the best order.’ (এস টি কোলরিজ)। অর্থাৎ, কবিতার বাহন যে শব্দরাশি, তাকে উৎকৃষ্ট হতে হয়, হতে হয় সুসংগঠিত। শব্দের বুননে দুর্বলতা থাকলে তা শিল্পিত হয় না। শব্দসমূহ শেষাবধি শব্দগুচ্ছই থেকে যায়, কবিতা হয়ে ওঠে না। পাঠক যদি কবিতায় শব্দের চমৎকার বুনন না পান, তবে তিনি কেন সেটা পড়বেন? আর কেবল বুনন সবল হলেই হবে কেন? সেখানে তো রঙের কারুকাজও চাই। অর্থাৎ টেকসই বুননের সাথে চাই চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদির মতো চলমান রঙের সুষ্ঠু ও মনোগ্রাহী বিন্যাস। এসব কিছু ঠিকমতো হলেই কেবল শব্দেরা ‘কবিতা হয়ে ওঠে’। কারণ কবিতা হয়ে ওঠার বস্তু: ‘A poem should… be’। এই সব সার্বিক বিবেচনায় তবে প্রশ্ন আসে— কবি আমিনুল ইসলামের কবিতাগুলো কি তাহলে ‘হয়ে’ উঠেছে? হয়ে উঠতে পেরেছে নিশ্চয়; কারণ তার কবিতা পড়ার সময় কখনও মনে হয়নি তিনি শব্দগুলোর উপর জোর খাটিয়েছেন। লাইনে লাইনে স্বতঃস্ফূর্ততার প্রামাণিক আবেশ পাঠককে অন্যরকম ভালোলাগায় অভিভূত করে। কবিতাগুলো তাই একইসাথে শুধু অর্থ বা বাক্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তা মুগ্ধতার মাপকাঠিতে উতরে গিয়ে পাঠককে ধরে রাখতে পারে শেষ অবধি। দেখুন:

যদি আবারও বলি, তোমার ঠোঁট মানেই

কাকনহাটের চিররাঙা মাটি

এক চুমুতেই কাদা

সোমরসের বাটিটি;

আর এক বিরহেই পৌষের পর্ণমোচীর মাঠ;

কেউ কি তা মেনে নেবে?

ছুরি দেবে না এই ঘাস-ভাবনার গোড়ায়!

(‘প্রেমের কবিতার পাঠ’, মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম)

 

বলাবাহুল্য, কবি কবিতার কাছে যান না, কবিতা-ই কবির কাছে আসে:  ‘Poetry/ arrived in search of me.’ এটা পাবলো নিরুদার কথা। কিন্তু কোথা থেকে আসে কবিতা? প্রশ্ন তিনি নিজেই করেছেন, উত্তরও দিয়েছেন নিজেই : ‘I don’t know, I don’t know where/ it came from, from winter or a river.’

যেখান থেকেই আসুক না কেন, কবিতাকে আসলে আসতেই হয়। সেটা কখন কিভাবে আসবে তা কেউই বলতে পারে না। এটা অনেকটা পানির ভিতর থেকে বুদ্বুদ বেরিয়ে আসার মতো। কবির মনে কখনও সখনও একটা ভাবের উদয় হয়- ঠিক পানিতে বুদ্বুদ ওঠার মতো। আর যে মুহূর্তে সেটা ওঠে, ঠিক সে মুহূর্তেই তাকে ধরে ফেলা চাই। ধরতে পারলেই কেবল হবে না, কলম বা কিবোর্ডের সাহায্য নিয়ে সেটার একটা দৃশ্যমান প্রকাশও চাই। অর্থাৎ, কবিতার আগমনকে অনুধাবন করতে পারা, আর অনুধাবিত বিষয় বিস্মৃত হওয়ার আগেই তাকে ধরে এনে অক্ষরে অক্ষরে বন্দি করতে পারাটাই কবিত্ব। যে সেটা করে, সে-ই কবি। এখানে তাই ভাব ও ভাষার, অর্থাৎ শব্দের একটা জুতসই সমন্বয় দরকার। কবি আমিনুল সেই সময়টার অপেক্ষায় থাকেন। দৈনন্দিন ব্যস্ততা ও পেশাগত কারণে কখনও কখনও হয়তো অনুভূতিকে ছাড় দিতে হয়, কিন্তু যখন সময় দেন, তখন সবটুকু মনযোগ সহকারেই সময় দেন। তিনি সবকিছুর উর্ধ্বে কবিতাকে যেভাবে যতটুকু সময় দিয়েছেন, স্বীকার করতে হয়, সে সময়ের কোনো ভাঁজেই কোনো রকম কৃচ্ছতা, কোনো রকম শঠতা নেই। কবিতাকে ভালোবেসে আমিনুলের এই যে কাব্যযাত্রা, তা আরও সামনে, নিজেকে অমরত্বে প্রতিষ্ঠিত করা পর্যন্ত সচল থাকবে, বাংলাভাষা ও সাহিত্য তাঁর রচনায় ঋদ্ধ হবে- সন্দেহ নেই। বিশেষত তিনি যে স্বতন্ত্র কাব্যভাষা প্রয়োগ করেছেন, ইতিহাস সেটাও লালন করবে এবং পরবর্তী প্রজন্ম কবিতার এই ভিন্ন ও প্রতিশ্রুত শব্দশৈলিকে ধারণ করে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবে। জয় হোক কবিতার, কবিতায় শিল্পিত শব্দবুননের।

জনপ্রিয় পোস্ট

আবু আফজাল সালেহর ছড়া: সমাজ, প্রকৃতি ও উৎসবের মেলবন্ধন

জন্মদিন স্মরণ : আমিনুল ইসলাম

আমিনুল ইসলামের কবিতা : শিল্পিত শব্দবুনন

আপডেট : ০৮:২৪:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪

আমিনুল ইসলামের কবিতা : শিল্পিত শব্দবুনন

প্রত্যয় হামিদ


কবিতা মূলত একেবারে মনের অবচেতন স্তর থেকে উঠে আসা কথামালা। এটা spontaneous overflow of powerful feelings. ওয়র্ডস্ওয়র্থ এটাও বলেছেন, ‘Poetry is the breath and finer spirit of all knowledge.’ অর্থাৎ, জ্ঞানের প্রাণকোষ বলি বা পরিশুদ্ধ আত্মাই বলি, কবিতা হচ্ছে তা-ই। ভাষার শুদ্ধতম গঠন হচ্ছে কবিতা:  ‘the best words in the best order.’ (এস টি কোলরিজ) । কবিতা কিন্তু অনেকটাই স্বপ্নের মত। স্বপ্ন দেখার জন্য যেমন একটা বিশেষ সময়ের প্রয়োজন হয়, তেমনি কবিতাকে উঠে আসতেও বিশেষ একটা মুহূর্ত লাগে। সেটা কখন কিভাবে আসবে তা কেউই বলতে পারে না। এটা অনেকটা পানির ভিতর থেকে বুদ্বুদ বেরিয়ে আসার মতো। কবির মনে কখনও সখনও একটা ভাবের উদয় হয়- ঠিক পানিতে বুদ্বুদ ওঠার মত। আর যে মুহূর্তে সেটা ওঠে, ঠিক সে মুহূর্তেই তাকে ধরে ফেলা চাই। ধরতে পারলেই কেবল হবে না, কলম বা কিবোর্ডের সাহায্য নিয়ে সেটার একটা দৃশ্যমান প্রকাশও চাই। কিন্তু ধরতে না পারলে? ফেটে যাওয়া বুদ্বুদের মতই মিশে যাবে সে হাওয়ায়। আর একবার মিশে গেলে সেটাকে ফিরে পাওয়া দুষ্কর- আর দুষ্কর কেন, একেবারেই অসম্ভব। এখানে তবে কবির ভূমিকা কী? কবিকে জানতে হয়, অনুধাবন করতে হয় কখন তার মধ্যে সেই বুদ্বুদটা উঠছে। বুদ্বুদটা হয়তো সবার বা অনেকের মধ্যেই ওঠে। কিন্তু সেটাকে অনুধাবন করতে পারা, আর অনুধাবিত বুদ্বুদ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই তাকে ধরে এনে অক্ষরে অক্ষরে বন্দী করতে পারাটাই কবিত্ব। যে সেটা করে, সে-ই কবি। এখানে তাই ভাব ও ভাষার একটা জুতসই সমন্বয় দরকার। বুদ্বুদের উপস্থিতি যারা টেরই পান না, বা যাদের এসব হয়ই না, তারা কি তবে কবিতা লিখতে পারেন না? না, পারেন না। তারা কেউ কেউ হয়তো কবিতা লেখার খায়েশ থেকে এটা সেটা লিখে থাকেন। তাদের লেখাগুলো আর যা-ই হোক, শেষ বিচারে আর কবিতা হয়ে ওঠে না। তাহলে, কবিতাকে আসতে হয়। অর্থাৎ কবি কবিতার কাছে যান না, কবিতা-ই কবির কাছে আসে: Poetry/ arrived in search of me. এটা পাবলো নিরুদার কথা। কিন্তু কোথা থেকে আসে কবিতা? প্রশ্ন তিনি নিজেই করেছেন, উত্তরও দিয়েছেন নিজেই: I don’t know, I don’t know where/ it came from, from winter or a river. প্রবন্ধের শুরুতে একটা উৎসের কথা বলা হলেও কথা এটাই সত্য: কবিতা কোথা হতে আসে তা জানা যায় না। কিন্তু তাকে কবিতা হয়ে উঠতে হবে– A poem should… be। কবি আমিনুল ইসলামের কবিতাগুলো কি তাহলে  ‘হয়ে’ উঠেছে? হয়ে উঠতে পেরেছে নিশ্চয়; কারণ তার কবিতা পড়ার সময় কখনও মনে হয়নি তিনি শব্দগুলোর উপর জোর খাটিয়েছেন। লাইনে লাইনে স্বতঃস্ফূর্ততার প্রামাণিক আবেশ পাঠককে অন্যরকম ভালোলাগায় অভিভূত করে। কবিতাগুলো তাই একই সাথে শুধু অর্থ বা বাক্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তা মুগ্ধতার মাপকাঠিতে উতরে গিয়ে পাঠককে ধরে রাখতে পারে শেষ অবধি।

কেবল টিএস এলিয়ট বা জীবনানন্দ দাশ নন, প্রখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের অভিমত হচ্ছে, কবিতায় কল্পনা ও বাস্তবতার মিশ্রিত কাব্যশক্তি থাকতে হয়। আবার কাব্যশক্তির প্রকাশ হয় শব্দের মাধ্যমে, কারণ, …you can’t make a poem with ideas— you make it with words! কবি আমিনুল ইসলাম শব্দকে নতুনত্ব দান করেছেন কল্পনা ও বাস্তবতার যুগপৎ ব্যবহারে। চেনাপরিচিত শব্দগুলো কবির কবিতায় পেয়েছে নতুন রং, পেয়েছে নতুন অর্থ। ওয়র্ডসওয়র্থ, কোলরিজদের মত রোমান্টিক সময়ের কবিরা এইসব চেনা, নিত্য ব্যবহার্য শব্দ ও ভাষাকেই কবিতার ভাষা হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন। ওয়র্ডওয়র্থ তার Lyrical Ballads-এ তো বলেছেন, কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে ‘incidents and situations’–ই কেবল ‘common life’ থেকে নেয়া হবে না, কবিতার ভাষাও হতে হবে ‘a selection of language really spoken by men’। আমিনুল ইসলাম প্রতিদিনকার সাধারণ মানুষের ভাষা ব্যবহার করেছেন তার কবিতায়, কিন্তু সেগুলোকে চমৎকারিত্বের নতুনত্ব দিয়েছেন সমৃদ্ধ হাতে। হস্তমৈথুনের কবিতা-য় তিনি যখন বলেন ‘শহরের সিলেবাস রাখেনি জোনাকি/ বন্ধ বাথরুমে শুধু শুধু জমে ওঠে নিঃসঙ্গতা’, তখন অতি পরিচিত ‘সিলেবাস’ নতুন পরিচয়ে পাঠকের কাছে হাজির হয়। একই কথা প্রযোজ্য উপমার উপস্থিতির ক্ষেত্রেও। আমিনুলের কবিতায় উপমার ব্যবহারে প্রথাবহির্ভূত, নিজস্ব প্রয়োগ চোখে পড়ার মতো। ‘দরবেশ নীরবতা’, ‘জোছনারাতের ব্লাডপ্রেসার’ (‘মুক্তিযুদ্ধের কান্না’) ইত্যাদি অজস্র উদাহরণ টানা যাবে আমিনুল কবিতা থেকে। এসব প্রায়োগিক নতুনত্ব যেমন কবির পরিপক্কতা নির্দেশ করে, তেমনই তা ভাষার উপর কবির দখলকে স্বীকৃতি দেয়। এমন প্রয়োগ ভাষার সৌন্দর্য বাড়ায়, বাড়ায় কবিতার সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা। দেখুন ভাষা ব্যবহারের চমৎকারিত্ব, উপমার আনকোরা রূপ:

চাঁদ-সুরুজের সুইচ অফ করো-

নিভিয়ে দাও বাতি

অতঃপর কপাট লাগিয়ে দাও

তারপর-

অন্ধের নাকের মতো খোলা থাক্ নিভৃত জানালা।

(‘নিভৃত জানালা’, জোছনার রাত বেদনার বেহালা)

 

কবিতায় ইতিহাস, ঐতিহ্যও কিন্তু উঠে আসে শব্দের হাত ধরে। শুধু ইতিহাস, ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি নয়, ইয়েটস্-এর মতো কবিদের কবিতায় মিথও এসেছে কবিতার অনুষঙ্গ হিসেবে। ইয়েটস্ গ্রিক মিথ থেকে শুরু করে আইরিশ মিথকে কবিতার বিষয়বস্তু করে তুলেছেন, লিখেছেন ‘The Madness of King Goll’, ‘Leda and the Swan’, ‘Sailing to Byzantium’–এর মতো সব বিখ্যাত কবিতা। ‘No Second Troy’–এ তিনি তার প্রেমিকা Lady Maud Gonne-কে সতর্ক করতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গ্রিক মিথলজি ট্রয়-এর। এছাড়া আইরিশ ইতিহাসকে তিনি কবিতায় এনেছেন বার বার। ইয়েটস্-এর মতো আমিনুল ইসলামও ইতিহাস-ঐতিহ্যকে কবিতার উপজীব্য করেছেন। পাশাপাশি আপন সংস্কৃতি আর মিথকেও তিনি আশ্রয় দিয়েছেন কবিতার শব্দে। কারণ, ঐতিহ্যের পরম্পরা বা ধারাবাহিকতার জ্ঞান কবির জন্য খুবই জরুরী। যদিও কবি ইতিহাস লেখেন না, কিন্তু তিনি অতীতের পুনর্নির্মাণ ঘটিয়ে তাকে বর্তমানের সাথে সম্পর্কিত করেন। আমিনুলকে পাঠ করলে এটা খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তিনি তার কবিতায় অতীতের পুনর্নির্মাণ ঘটিয়েছেন শব্দজালের গিঁটে গিঁটে:

আর ততোক্ষণে এবং সেটা অনেক বছর পর, আমরা দুজন বিজয় সেনের রাজধানী-

বিজয়নগরের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে; আমাদের পায়ের নিচে গণইতিহাসের

গণকবর, বিচ্ছিন্ন করোটি ও চাপাকান্না; আমাদের মাথার ওপর সন্ধ্যার শামিয়ানা,

আমাদের চারপাশে অন্ধকারের বিশ্বস্ত পাহারা; আমাদের দিকে তাকিয়ে নীরব পদ্মার

জলে ভেজা পুরাতন প্রেম; আমি তোমার বুকের ওঠানামা টের পাচ্ছি, লোনা উত্তেজনা

ছুঁয়ে যাচ্ছে শান্তসাঁঝের পৌরুষ!

(‘বিজয় সেনের রাজধানী এবং ভালোবাসার রাজকন্যা’, প্রণয়ী নদীর কাছে)

 

প্রাবন্ধিক ও গবেষক ড. সফিউদ্দিন আহমদও স্বীকার করেছেন- “আমিনুল ইসলাম আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের কবি- আমাদের কাব্য সাহিত্যে চিত্রময়তা ও প্রতীকিয়তার কবি এবং একজন সমাজসচেতন কবি।”(‘আমিনুল ইসলাম : শিকড় বৈভবের কবি’, ড. সফিউদ্দিন আহমদ)  একই ভাবে বলা যায়, অফিস আদালতে এবং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত শব্দ ও প্রত্যয়সমূহ তিনি কবিতা নির্মাণে ব্যবহার করেছেন যথাযথ গুরুত্ব ও উপযোগিতা বজায় রেখেই। আমাদের প্রতিনিয়ত অফিস আদালতে যেতে হয়, সেখানকার পরিভাষার মর্ম বুঝতে হয়। এটি একটি অনেকটা স্বতন্ত্র ভাষিক জগৎ। এখানে বহু পরিভাষা ব্যবহৃত হয় যা অর্থব্যঞ্জনায় খুবই সমৃদ্ধ। আবার বিশ্বায়ন ও আকাশ সংস্কৃতি এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে ভাষার মধ্যে প্রতিনিয়ত নতুন শব্দ, প্রযুক্তিগত পরিভাষা প্রবেশ করছে। সেসব পরিভাষার বাংলা অনুবাদ সম্ভব নয় বলে সেগুলো ভাংলা ভাষায় নিজস্ব শব্দের মতো গৃহীত ও বব্যহৃত হয়েছে। দেখুন, অফিস আদালতে ব্যবহৃত যান্ত্রিক শব্দগুলো কেমন কাব্যিক হয়ে উঠেছে:

ফ্যাক্সে হৃদয় ঢালতে গেলে ঘাঁটবে অপারেটর

যদিও নাঙ্গা যুগের ঊরু, মনটা কপটচারীর

ডাকপিওনের বেতন জোটে, আমার নিরুত্তর

তোমার হাতে কলমটা কি ফিন্যান্স সেক্রেটারির?

(‘হায় বসন্ত’, কুয়াশার বর্ণমালা)

 

পুরানো ও প্রচলিত এবং অতিচেনা শব্দ দিয়ে নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করা আমিনুল ইসলামের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এই কারণে শব্দের ভাবগত অর্থ যেমন পাল্টে যায়, তেমনি ভাষার ধারণ ও প্রকাশ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। বলাবাহুল্য, কবিতার ক্ষেত্রে শব্দই হচ্ছে প্রধান অস্ত্র। এই অস্ত্রবিদ্যার ব্যবহারে অভিনবত্ব বা নতুন কৌশল উদ্ভাবনের ওপর একজন কবির কাব্যভাষা বা প্রকরণের বিষয়টি নির্ভর করে। পুরাতন শব্দের নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে হয়। নতুন-পুরাতন শব্দ মিলিয়ে নতুন সমাসবদ্ধ শব্দ তৈরি করতে হয়। আহমদ রফিক সংগত কারণেই স্বীকার করেছেন, “কবির হাতে গড়ে ওঠে নিজস্ব শব্দভান্ডার অথবা বলা উচিৎ শব্দ ব্যবহারের নিজস্ব ভিন্নতা, কারো মতে অভিনবত্ব। তেমনি উঠে আসে অনুভূতির সজ্জিত প্রকাশে বা প্রকরণগত আকর্ষণে তৈরি চিত্রকল্প যা স্থানিক তাৎপর্যে অর্থবান। ” (‘আমিনুল ইসলামের কবিতার  বিষয় ও প্রকরণ বৈচিত্র্য’, আহমদ রফিক)  আমিনুল যে এই শব্দপ্রযুক্তিতে সফল, তা তার কবিতা-ই বলে দেয়:

গেরস্ত ঘুমিয়ে, তার স্বপ্ন ছুঁয়ে হেমন্তের দিন

শিউলির স্বপ্নমুখে ধাবমান শরতের সীমা

কাঁশবনে স্বপ্ন সাদা; এই শুধু আমি স্বপ্নহীন

আমাকে জাগিয়ে রাখে শ্রাবণের অন্ধপূর্ণিমা।

(‘আমাকে জাগিয়ে রাখে শ্রাবণের অন্ধপূর্ণিমা’, মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম)

 

বিদেশি ভাষার শব্দও তিনি ব্যবহার করেছেন সমান দক্ষতায়, কবিতার প্রয়োজনে, অর্থের সমৃদ্ধি ও পরিপূর্ণতার জন্য। ‘তিনি আরবি-ফার্সি-ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন কবিতার সমৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধিকরণের জন্য’ এবং ‘অনেক সময়ই এই শব্দগুলো ভিন্নতর ব্যাঞ্জনা সৃষ্টি করে’ (ইয়াসির আজিজ)। ‘যখন সে যৌবনের দুলদুল হয়ে উঠেছে, আমরা তাকে ধোপার গাধার লিভ সাবস্টিটিউট/ বানিয়েছি’ (‘আমাদের সম্পর্ক সুলতানা’, স্বপ্নের হালখাতা) অথবা, ‘তবে ভালোবাসার সিরাতুল মোস্তাকিম ছেড়ে কেন তুমি উকিলের আঘাটায় পথ খুঁজতে যাবে’ (‘জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার’, জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার)-এর মতো অসংখ্য লাইন আছে অনেক অনেক কবিতায় যা প্রমাণ করে শব্দচয়নে তিনি কোন নির্দিষ্ট গণ্ডিবদ্ধ নন। তাহলে শব্দের কাজ কি কেবলই ভাষার সৌন্দর্য সৃষ্টি? না। কবি কবিতায় যেসব শব্দ ব্যবহার করেন, তাদের অন্যতাম কাজ হচ্ছে ‘to make [the readers] hear, to make [them] feel- it is, before all, to make [the readers] see.’ অর্থাৎ, শব্দের বুননে যে ক্যানভাস তৈরি হয়, পাঠক সেখানে কবির দেখানো চিত্র দেখেন, শোনানো কথা শোনেন, অনুভূত বিষয় অনুভব করেন। দেখুন :

প্রণয়ের পার্লামেন্টে উত্থাপিত

তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন দুই-এর

উত্তরে বলছি-‘হে মাননীয় সাংসদ,

কেন এই সুচরিত অভিনয়-

সে-জরুরতের উলকি আঁকা

ভি-কাটা ব্লাউজের ভি-ভাঁজের নিচে,

তুমি ঝুঁকে এলে–আঁচলবিচ্যুত 

সেখানেও দুচোখ যায় আমার;

(‘স্বাগত হে অভিনেত্রী’,  প্রণয়ী নদীর কাছে)

 

আমিনুল ইসলামের কাব্যভাষার অন্যতম প্রধান আরেকটি দিক হচ্ছে প্রতীকায়তার মাধ্যমে আড়াল সৃষ্টি। তার কবিতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতীকাশ্রয়ী। প্রথম পাঠে মনে হয় সহজ সরল কিন্তু ভেবে দেখতে গেলে গভীর রহস্যের সন্ধান মেলে। তিনি আক্ষরিকভাবে যা বলেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যঞ্জনাগত অর্থ থাকে ভিন্ন কিছু। অর্থাৎ কবিতায় পেরিফ্র্যাসিস (Periphrasis) তৈরি করতে হয়। এর মাধ্যমে কবি কবিতায় একটা নিরাপদ বলয়, ভাবীয় আড়াল সৃষ্টি করতে পারেন। কারণ, এখন সরাসরি কথা বলার যুগ নয়- ঘুরিয়ে কথা বলতে হয়। কারণ, আমাদের  ‘civilization comprehends great variety and complexity, and this variety and complexity, playing upon a refined sensibility, must produce various and complex results.’  এটা টিএস এলিয়টের কথা ‘The Metaphysical Poets’–এ। তিনি এর পরেই তিনি কবিদের করণীয় কী, তা বলেছেন, ‘The poet must become more and more comprehensive, more allusive, more indirect’। কিন্তু কবিকে কেন ‘more allusive, more indirect’ হতে হবে? সে কথাও স্পষ্ট করেছেন তিনি- ‘in order to force, to dislocate… language into his meaning. কবি আমিনুল তবে কতটা  ‘more allusive, more indirect’ হতে পেরেছেন তার কবিতায়? কতটা? দেখুন:

প্রেমপত্র প্রেসক্রিপশন ও জন্মসনদ হাতে

যতবার দাঁড়াই জন্মের কাঠগড়ায়-

‘মাই লর্ড, ইয়োর অনার–’

ততবারই ডিএলআর কোট করে সেকথাই

ঘোষণা করেন মহামান্য আদালত

আমাকে থামিয়ে দিয়ে মাঝপথে।

অথচ আপীল বা রিভিউ করার সযোগ রাখেনি-

আকবরের চেয়েও উজ্জ্বল উপাধিধারী

মহা-একনায়কের অসংশোধনযোগ্য সংবিধান!

(‘সক্রেটিসের পৃথিবী’, প্রণয়ী নদীর কাছে)

 

এভাবেই আমিনুলের কবিতা মাঝে মাঝে রহস্যময়তার ঘোর ও সম্মোহন সৃষ্টি করে। এটি তার কবিতার অনিঃশেষ ঐশ্বর্য হিসেবে কাজ করে। এটি রোদের মতো নয়, অন্ধকারের মতোও নয়। এ হচ্ছে জোছনার মতো যা আলো-আঁধারি দিয়ে তৈরি। বারবার পাঠেও তাই তার কবিতার আবেদন ফুরিয়ে যায় না। আমিনুলের কবিতার ভাষা সচ্ছন্দ, সাবলীল এবং গতিময়। কষ্টকল্পনা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দুটোই এড়িয়ে চলেছেন তিনি যত্নের সাথে। এটা তার সহজাত কাব্যক্ষমতার গুণই বটে। আমিনুলের কবিতার ভাষা তাই সাগরের মতো গভীর কিন্তু জলের মত স্বচ্ছ।

অতএব আমার এই ভালোবাসা রেখে দাও জোয়ানা

যেভাবে বাড়তি জল রেখে দেয় মরুভূমির উট

যেভাবে ওস্তাদ রেখে দেয় দক্ষ হাতে তার শেষ মার

যেভাবে টপ ট্রামকার্ড বাঁচিয়ে রাখে অভিজ্ঞ জুয়াড়ি;

আর এত এত সম্পদ নিয়ে একবারও জুয়া খেলবে না জীবনে

সে কী  করে হয়? তাহলে কেন এ জীবন? কী কাজ এত এত বাড়তি সম্পদের?

(‘আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট’, আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট)

 

একইভাবে চিত্রকল্প নিয়েও কথা বলা যায়। বলা বাহুল্য, চিত্রকল্প কিন্তু কবিতার প্রাণ। প্রাণ মানে কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এজরা পাউন্ড কী বললেন?   ‘It is better to represent an ‘Image’ in a life than to produce voluminous works.’  আবার কবিতায় চিত্রকল্প আরও বেশি প্রত্যাশিত, কারণ কবিতার পরিসর ছোটো, ঘন। এখানে বৃহৎ কিছুকে খুব সহজেই ধারণ করতে পারে এই ‘ইমেজ’। তাই আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব কিছু অবস্তুবাচক জিনিসকে বস্তুবাচক প্রতিকল্পে প্রতিস্থাপন করে পাঠকের চোখের সামনে তুলে ধরার যে কৌশল, তাতে দক্ষ না হলে কবিতার সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হয়, তেমনি তা ভাবের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে। আমিনুলের অনেক কবিতায় অসাধারণ কিছু দৃশ্যকল্প আছে যা পড়ামাত্র পাঠকমনপর্দায় পরিচ্ছন্ন, পরিষ্কার ছবি ভেসে ওঠে। দেখুন:

প্রভাতী পাহাড়ে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে ঝরনা

চারপাশে কুয়াশারঙের ছায়া

বাঘ সাপ শেয়ালের চোখ

হাতের তালুতে সূর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সময়

অর্ধ-আবৃত পইথানে

(‘অপ্রস্ফুটিত দুপুর’, জোছনার রাত বেদনার বেহালা)

 

উপমাও কিন্তু কবিতার শরীরে বয়ে চলা রক্ত, যা তাকে প্রাণ দেয়। আমিনুলের কবিতাগুলো জীবন্ত মনে হয় যেসব কারণে, উপমা কিন্তু তাদের মধ্যে অন্যতম। উপমার ব্যবহারে কবিতায় যেমন অধরা জিনিস দৃশ্যমান বস্তুর মতো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তেমনি তা পাঠককে কবিতা বুঝতে সহায়তা করে। শেক্সপিয়রের হ্যামলেটের কথা মনে পড়ে? কী বলেছিলেন? তার মায়ের প্রতিপক্ষে দাঁড়িয়ে তার ক্ষুরধার (Pun): ‘I will speak daggers to her, but use none.’ বুঝা গেল নিশ্চয়। অস্ত্র ব্যবহার না করেও কাউকে ঘায়েল করতে হলে কথার বিকল্প আর কী আছে? কিন্তু শিল্পীকে জানতে হবে মাত্রা ঠিক রেখে কোথায় কোন্ শব্দ ব্যবহার করলে, কোন্ উপমার আশ্রয় নিলে কাউকে সরাসরি আঘাত না করেও ক্ষত সৃষ্টি করা যায়। আমিনুলকে পড়ুন:

ঘুমিয়েছে গণতন্ত্র অ্যাফ্রো-এশিয়ায়

হরিণ শিশুর মতো কোমলশরীর

তাই দেখে লোভ জাগে জলে ও ডাঙায়

থাবা আর দাঁত নিয়ে সমান অধীর।

(‘আঁধারের জানালায়’, স্বপ্নের হালখাতা)

২.

কবিতায় গল্প বলার প্রবণতাটা জোয়ারের মতো এসেছিল রানি ভিক্টোরিয়ার সময়। তখন কবিরা কবিতায় গল্প বলেছেন- বলা ভালো- বলতে বাধ্য হয়েছেন উপন্যাসের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে। টিকে থাকার জন্য কবিতাকে সে সময় অভিযোজন করতে হয়েছে নিজেকে। গল্পপ্রিয় মানুষকে তাই কবিতার মোড়কে গল্প শুনিয়েছেন সে সময়ের কবিরা: রবার্ট ব্রাউনিং, ম্যাথু আর্নল্ড বা টেনিসন, এবং আরও পরে, জসীমউদদীনরা। ড্রামাটিক মনোলগ ছাড়াও কবিতায় বিভিন্ন আঙ্গিকে গল্প এসেছে। সে ধারার বিকাশক্রম পরিবর্তন হলেও বদলায়নি গল্প বলার ইচ্ছা। আমিনুল ইসলামও গল্পের মোড়কে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনিয়েছেন এই প্রজন্মকে। প্রতিটি বাঙালির মনন আর কর্ম জুড়ে থাকা এই মহান যুদ্ধকে ‘মুক্তিযুদ্ধের কান্না’ কবিতায় তিনি দিয়েছেন গল্পের আবেগ। এজন্য কবিতাটি কেবল একটা ‘কবিতা’-ই নয়, মুক্তিযুদ্ধের একটা অসামান্য দলিল হয়ে উঠেছে। কবিতাপাঠান্তে পাঠক আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, কষ্ট উথলে ওঠে বুক ভেদ করে। থমকে যেতে হয়, চোখ মুছতে হয় এ লাইনগুলো পড়ার পর:

অতঃপর স্বাধীনতা। খোঁজাখুঁজি; ছুটাছুটি;

নদীর ধারের ডোবা, জমির আড়ালের নালা,

নতুন কবরের মাটি আর ঝোপঝাড়ের আবরণ উলটিয়ে

খুঁজে দেখা হাড়গোড় খুলি;

একে জিজ্ঞাসা– ওকে অনুনয়;

সবখানেই উত্তর নাই; নাই; নাই!

(‘মুক্তিযুদ্ধের কান্না’, শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ)

 

আমিনুলকে পড়তে গেলে পাঠক তাই লক্ষ্য করবেন, তাঁর কবিতায় বিষয়বৈচিত্র্য আছে, আছে নানামুখী চিন্তাস্রোতে, যে স্রোতে চাইলেই গা ভাসিয়ে ভাটিতে যাওয়া যায়, অথবা বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের চিন্তাকেও ঝালিয়ে নেয়া যায়। আছে মেটাফিজিক্যাল কিছু কবিতাও। এই ঘরানার কবিতা সংখ্যায় বেশি না হলেও কবিতাগুলো আমিনুলের কবিতার কাব্যিক উচ্চতাকে ঋদ্ধ করেছে:

বহুদিন মনে সাধ– বলতে পারো জেদও

তোমার নৈঃশব্দ্যের বাগানে ঝুলে আছে

যেসকল কমলা-আঙুর-আপেল–

বাতাসের হাতে তাদের ছুঁয়ে দেখব একবার।

(‘অন্তর্বর্তী বাসনা’, জোছনার রাত বেদনার বেহালা)

 

৩.

আমিনুল ইসলামের কাব্যভাষার যে দিকটা তার কবিতার উপভোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে বহুগুণে, তার একটি হচ্ছে রসবোধের আবহে সৃষ্ট পরিহাস, স্যাটায়ার, শ্লেষ এবং তির্যকতা। এসব করতে গিয়ে কবিকে তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। রেইনার মারিয়া রিলকেকে স্মরণ করা যেতে পারে– ‘For poems are not, as people think, simply emotions (one has emotions early enough) —they are experiences.’ অর্থাৎ সমাজের নানান এবং অসামাঞ্জস্যপূর্ণ দিক ও বিষয়সমূহ যখন কবির চোখ প্রতিনিয়ত দেখে, তখন যে অভিজ্ঞতার সিঞ্চন হয় মস্তিষ্কে এবং  আরও পরে মননে, তা কবিতাবন্দি হয় উপহাস বা শ্লেষের রূপক মিশ্রণে। তির্যক বাক্যাশ্রয়ে তিনি দেখান সমাজের সেইসব ক্ষত যার দুর্গন্ধ সবার চেনা, কিন্তু মুখ খুলে বলে না কেউই। ‘চোরের জন্য কনসালট্যান্সি’ দেখুন:

সাবধান হে চোর মহোদয়, আর মুরগিচুরি নয়!

হাজতের চাবি আর হাতকড়া হাতে নিয়ে

দ্যাখো নাকি– দাঁড়িয়ে আছেন থানা মহাশয়!

জেনে রাখো—মুরগিচোরকে ঘৃণা করে–

জনতা ও জেলখানা, থানা ও দুদক,

উকিল ও আদালত–, অধিকন্তু সকলেই প্রায়।

তারচেয়ে—যদি পারো গিলে খাও দিঘি ও পুকুর

জেনে নাও হজমের হাল;

ভালো? অতএব

অতঃপর আস্ত একটি বঙ্গোপসাগর

জঙ্গলে বা জাতিসংঘে তখন আর কে তোমাকে আটকায় হে বীর!।

(‘চোরের জন্য কনসালট্যান্সি’, আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট)

 

রোমান্টিক পিরিয়ডের পর টিএস এলিয়টের হাত ধরে (যা পরবর্তীতে অ্যামি লউয়েল, ডিলান টমাস, ফিলিপ লার্কিনরাও অনুসরণ করেছেন) যে আধুনিক কবিতার জন্মযাত্রা, সেখানে ইমেজিস্টরা আক্রান্ত হয়েছে তাদের সমাজ-বাস্তবতাকে অস্বীকার করার প্রবণতার জন্য। আধুনিক কবিতায় সমাজ উঠে এসেছে তার প্রকৃত চেহারা নিয়ে- কখনও তা বেশ শালীন, সৌম্য, আবার কখনও তা হিংস্র, ক্লেদাক্ত, অসহিষ্ণু! মূলত ভিক্টোরিয়ান যুগেই ম্যাথিউ আর্নল্ডের হাত ধরে এই ধারাটির প্রাথমিক সূচনা। তিনি সেই সমাজকে দেখিয়েছেন যেখানে  ‘Hath really neither joy, nor love, nor light,/ Nor certitude, nor peace, nor help for pain;’ (‘Dover Beach’)। আর আমরা এমন একটি সময়ে বাস করি, যখন ‘ignorant armies clash by night’। কবিতায় আমিনুলও বলেছেন এই সময়ের কথা, যা বলতে প্রয়োজন সাহসী মনোভাব। মূলত কবিতাকে তিনি সমাজ সংস্কারের একটা শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন বলেই কখনও সাহস হারাননি, সত্য থেকে হননি বিচ্যুত। তার কবিতার সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু ও ধরন সে কথাকেই প্রতিস্থাপন করে। দেখুন:

তাই তো আমরা ইতিহাসের উঠোন থেকে

কুড়াল এনেছি—কুড়াল

আমরা অনার্যের ওয়ারিশ কি না!

বটগাছের দিন শেষ

আমগাছের গোড়ায় শেষ সামন্তের জল

অতএব কচুখেত;

হা হা! হো হো! হি হি! …

(‘কচুখেতের হাসি’, কুয়াশার বর্ণমালা)

 

৪.

সাহিত্যে, বিশেষত গদ্যে, আঞ্চলিক ভাষার উপস্থিতি নতুন না হলেও ইদানীং এটার প্রকোপ (!) অনেকটাই বেড়েছে বৈকি! বাংলাদেশের টিভি নাটকগুলো এই ক্ষেত্রে সবচে বেশি এগিয়ে। এটাতে দোষের কিছু নেই যদি তা সাহিত্যের মেজাজের সঙ্গে যায়, প্রেক্ষাপট সেটা দাবি করে। আঞ্চলিক ভাষা তাই সাহিত্যে এলে সেটা ভাষার অঙ্গহানির কারণ না হয়ে অলংকার হিসেবেই তার শ্রীবৃদ্ধি করে। গদ্যে কাজটা সহজ হলেও কবিতায় আঞ্চলিকতাকে প্রবিষ্ট করানো সহজ নয়। আমিনুল চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার মানুষ। কিন্তু তিনি যে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ করেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের কান্না’ কবিতায়, তা ঠিক সেই এলাকার মনে হয়নি। এটা তাই কবিতার বাস্তবতার প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছে। ‘এইটা মন্তাজ কাঁসারীর গলা রে ব্যাটা! নেফুলের বাপকে/ আইজ ওরা মাইরা ফেলবে!’– লাইনগুলো পড়ে মনে হয়েছে কবির মনগড়া কিছু আঞ্চলিক কথার মিশ্রণ ঘটেছে এখানে। তাঁর নিজের এলাকর আঞ্চলিকতা এখানে নিখাদভাবে উঠে আসার দাবি রাখে বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু সার্বিক বিচারে এই সত্যটুকু অকপটে স্বীকার করতেই হয়- আমিনুলকে পড়তে গেলে মাথা যন্ত্রণা করে না, মাথায় ব্যথাসৃষ্টিকারী অনেক উপদানকে কাগজে দেখে হালকা হওয়া যায়। নিজেকে প্রবোধ দেওয়া যায়- যা-ই হোক, একজন আমিনুল আমাদের কথাগুলোকে অক্ষরায়ন করেছেন!

 

৫.

কবিতা মূলত একেবারে মনের অবচেতন স্তর থেকে উঠে আসা কথামালা। এটা ’spontaneous overflow of powerful feelings.’ ওয়র্ডস্ওয়র্থ এটাও বলেছেন, ‘Poetry is the breath and finer spirit of all knowledge.’। অর্থাৎ, জ্ঞানের প্রাণকোষ বলি বা পরিশুদ্ধ আত্মাই বলি, কবিতা হচ্ছে তা-ই। শুদ্ধতম শব্দের সর্বোৎকৃষ্ট বিন্যাসই হচ্ছে কবিতা: ‘the best words in the best order.’ (এস টি কোলরিজ)। অর্থাৎ, কবিতার বাহন যে শব্দরাশি, তাকে উৎকৃষ্ট হতে হয়, হতে হয় সুসংগঠিত। শব্দের বুননে দুর্বলতা থাকলে তা শিল্পিত হয় না। শব্দসমূহ শেষাবধি শব্দগুচ্ছই থেকে যায়, কবিতা হয়ে ওঠে না। পাঠক যদি কবিতায় শব্দের চমৎকার বুনন না পান, তবে তিনি কেন সেটা পড়বেন? আর কেবল বুনন সবল হলেই হবে কেন? সেখানে তো রঙের কারুকাজও চাই। অর্থাৎ টেকসই বুননের সাথে চাই চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদির মতো চলমান রঙের সুষ্ঠু ও মনোগ্রাহী বিন্যাস। এসব কিছু ঠিকমতো হলেই কেবল শব্দেরা ‘কবিতা হয়ে ওঠে’। কারণ কবিতা হয়ে ওঠার বস্তু: ‘A poem should… be’। এই সব সার্বিক বিবেচনায় তবে প্রশ্ন আসে— কবি আমিনুল ইসলামের কবিতাগুলো কি তাহলে ‘হয়ে’ উঠেছে? হয়ে উঠতে পেরেছে নিশ্চয়; কারণ তার কবিতা পড়ার সময় কখনও মনে হয়নি তিনি শব্দগুলোর উপর জোর খাটিয়েছেন। লাইনে লাইনে স্বতঃস্ফূর্ততার প্রামাণিক আবেশ পাঠককে অন্যরকম ভালোলাগায় অভিভূত করে। কবিতাগুলো তাই একইসাথে শুধু অর্থ বা বাক্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তা মুগ্ধতার মাপকাঠিতে উতরে গিয়ে পাঠককে ধরে রাখতে পারে শেষ অবধি। দেখুন:

যদি আবারও বলি, তোমার ঠোঁট মানেই

কাকনহাটের চিররাঙা মাটি

এক চুমুতেই কাদা

সোমরসের বাটিটি;

আর এক বিরহেই পৌষের পর্ণমোচীর মাঠ;

কেউ কি তা মেনে নেবে?

ছুরি দেবে না এই ঘাস-ভাবনার গোড়ায়!

(‘প্রেমের কবিতার পাঠ’, মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম)

 

বলাবাহুল্য, কবি কবিতার কাছে যান না, কবিতা-ই কবির কাছে আসে:  ‘Poetry/ arrived in search of me.’ এটা পাবলো নিরুদার কথা। কিন্তু কোথা থেকে আসে কবিতা? প্রশ্ন তিনি নিজেই করেছেন, উত্তরও দিয়েছেন নিজেই : ‘I don’t know, I don’t know where/ it came from, from winter or a river.’

যেখান থেকেই আসুক না কেন, কবিতাকে আসলে আসতেই হয়। সেটা কখন কিভাবে আসবে তা কেউই বলতে পারে না। এটা অনেকটা পানির ভিতর থেকে বুদ্বুদ বেরিয়ে আসার মতো। কবির মনে কখনও সখনও একটা ভাবের উদয় হয়- ঠিক পানিতে বুদ্বুদ ওঠার মতো। আর যে মুহূর্তে সেটা ওঠে, ঠিক সে মুহূর্তেই তাকে ধরে ফেলা চাই। ধরতে পারলেই কেবল হবে না, কলম বা কিবোর্ডের সাহায্য নিয়ে সেটার একটা দৃশ্যমান প্রকাশও চাই। অর্থাৎ, কবিতার আগমনকে অনুধাবন করতে পারা, আর অনুধাবিত বিষয় বিস্মৃত হওয়ার আগেই তাকে ধরে এনে অক্ষরে অক্ষরে বন্দি করতে পারাটাই কবিত্ব। যে সেটা করে, সে-ই কবি। এখানে তাই ভাব ও ভাষার, অর্থাৎ শব্দের একটা জুতসই সমন্বয় দরকার। কবি আমিনুল সেই সময়টার অপেক্ষায় থাকেন। দৈনন্দিন ব্যস্ততা ও পেশাগত কারণে কখনও কখনও হয়তো অনুভূতিকে ছাড় দিতে হয়, কিন্তু যখন সময় দেন, তখন সবটুকু মনযোগ সহকারেই সময় দেন। তিনি সবকিছুর উর্ধ্বে কবিতাকে যেভাবে যতটুকু সময় দিয়েছেন, স্বীকার করতে হয়, সে সময়ের কোনো ভাঁজেই কোনো রকম কৃচ্ছতা, কোনো রকম শঠতা নেই। কবিতাকে ভালোবেসে আমিনুলের এই যে কাব্যযাত্রা, তা আরও সামনে, নিজেকে অমরত্বে প্রতিষ্ঠিত করা পর্যন্ত সচল থাকবে, বাংলাভাষা ও সাহিত্য তাঁর রচনায় ঋদ্ধ হবে- সন্দেহ নেই। বিশেষত তিনি যে স্বতন্ত্র কাব্যভাষা প্রয়োগ করেছেন, ইতিহাস সেটাও লালন করবে এবং পরবর্তী প্রজন্ম কবিতার এই ভিন্ন ও প্রতিশ্রুত শব্দশৈলিকে ধারণ করে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবে। জয় হোক কবিতার, কবিতায় শিল্পিত শব্দবুননের।