ঢাকা ০৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জন্মদিন স্মরণ : আমিনুল ইসলাম

আমিনুল ইসলামের স্যাটায়ার-কবিতা : শিল্পরূপ ও শাণিত উচ্চারণ

  • বাংলাবাঁক
  • আপডেট : ১০:৫৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪
  • 599

আমিনুল ইসলামের স্যাটায়ার-কবিতা : শিল্পরূপ ও শাণিত উচ্চারণ
আবু আফজাল সালেহ


বিদ্রুপাত্মক এবং ব্যঙ্গাত্মক কবিতা বা কথাসাহিত্য হচ্ছে চতুর/শানিত বুদ্ধিযুক্ত/ জুতসই শব্দাবলি ব্যবহার করে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সম্পর্কে ধারণার যোগাযোগের শিল্প। একটি গোষ্ঠী বা ব্যক্তির অবস্থা, অনুভূতির ব্যঙ্গাত্বক প্রকাশ করার জন্য ভাষার একটি স্টাইল হচ্ছে স্যাটায়ার। এটাকে বাংলায় পরিহাস বললে সবচেয়ে সুন্দর হয়। এটি একটি পরিস্থিতি বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি সিন্ডিকেট প্রকাশ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। গদ্যসাহিত্য (বিশেষকরে নাটক) স্যাটায়ার ব্যবহার বহুল হলেও কবিতায় ব্যবহার করতে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিতে হয়। উপহাসের অর্থকে বোঝাতে কবিকে শব্দনির্মাণে অধিক চতুর হতে হয়। অভিজ্ঞতাও অবশ্য চতুর হতে সহয়তা করে। কবি আমিনুল ইসলাম (জন্ম : ২৯ ডিসেম্বর ১৯৬৩) প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে চাকরির সুবাদে বিভিন্ন বিষয়ে বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছেন। ফলে, অন্ধকার দিকের বিভিন্ন বিষয় তাঁর কান, কণ্ঠ, ত্বক, চোখ ইত্যাদিকে জাগিয়ে তুলেছে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা।

অন্য সাধারণ কবিতার মতোই আমিনুল ইসলাম এ-ধারায় নতুন কিছু জানালা খুলেছেন। তাঁর কাব্যিক থিম এবং বিষয়গুলো প্রধানত জনগণ ও বিভিন্ন গোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের বেদনা, হতাশা, অনিরপেক্ষতা, মোড়লগিরি এবং বিভিন্ন দেশীয়-আন্তর্জাতিক সমস্যার প্রকাশ ও নেপথ্যদের চরিত্র ও চিত্র তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন অস্বাভাবিকতার সমালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি করে সমাজ ও নাগরিকদের কৌশল ও চিন্তা করার আমন্ত্রণ করেছেন। শুধু শব্দাবলির প্রয়োগই নয়, বাক্য ও বিষয়বস্তু বাছাইয়ে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন মূল্যবোধ ইত্যাদি তুলে ধরেছেন। দাপ্তরিক, প্রযুক্তিগত ও আন্তর্জাতিক শব্দ/পরিভাষা, ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ইত্যাদি শব্দশ্রেণি ব্যবহারে জুতসই বাগ্মীতা ও শৈল্পিক মূল্যের পাশাপাশি পাঠকের হৃদয়ের কাছাকাছি যেতে পেরেছেন। ধর্ম-অধর্ম, সাম্প্রদায়িক নিয়ে লেখা আসল চরিত্র উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে প্রাচ্যের অসুখ (শেষ চার লাইন), রাখাইন ইত্যাদি কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে। দুর্নীতি, লুটেরা, ক্ষমতাবান ইত্যাদি চরিত্র কল্পচিত্র (সন্ত্রাসী ও হত্যাকারীরা ক্ষমতার চেয়ারে আসীন), কচুক্ষেতের হাসি (বামনদের জয়জয়কারে ছবি), শেয়ালের সিংহরোগ (অযোগ্যদের দখলবাজির ছবি), আঁধার বন্দনা (সাহিত্যে শিল্পে নেতিবাচকতা ও বিমানবকীকরণকে কটাক্ষ) ইত্যাদি কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতার অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে চোরের জন্য কনসালটেন্সি (দুর্নীতি ও লুটপাটের রামরাজত্ব স¤পর্কে আলোকপাত), অডিটবিহীন দিন (লুটপাটের সংস্কৃতির জয়জয়কারকে তুলে ধরা), আমার বোন এবং আমি (নারীস্বাধীনতা বিষয়ে পুরুষের ভন্ডামি), বেদখল হয়ে যায় পরানের পার্ক (আধুনিক মানুষের অর্থলিপ্সা ও প্রেমহীন যৌনতা), কিউপিডের মিউজিয়াম এবং (দেহবাদী প্রেম ও নগ্নতার সমর্থকদের তীব্র কষাঘাত), বোমাবাঁধা মানুষ (মরণশীল মানুষের লোভ ও লিপ্সার ছবি), স্বপ্নের কথা (রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে জোরাজুরিকে কটাক্ষ) ইত্যাদি কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে। বাইরে ফিটফাট ও উদার মনে হলেও আধুনিক এ যুগের শিক্ষিত ও উচুঁস্থানের ব্যক্তিত্বদের আসল চরিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে পর্বতবিরোধী গান (ঈর্ষাকাতর বামন মানুষ, রাজনীতিক-কবি-শিল্পীদের ছোটমনকে তুলে ধরা), কুড়ালের হাসি (জোর যার মুলুক তার দর্শনের সমালোচনা), ভালোবেসে কী হবে? (আধুনিক সভ্যমানুষ ও আধুনিক রাষ্ট্রের প্রেমবৈরী স্বরূপ উন্মোচন), কুয়ায়ন (আধুনিক মানুষের মানসিক ক্ষুদ্রতার ছবি), আমি হতে পারিনি আকাশ (মানুষের আসল রূপ উন্মোচন), বিকিনি রাত ও ফুটো কন্ডোম (দ্বিচারী আধনিকতাকে কটাক্ষ), এইসব শেয়ালেরা (সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গনের গোষ্ঠীবাদের কটাক্ষ), নিয়মের সৎপুত্র (প্রশাসনে দলবাজিতার কুফল), বিষবৃক্ষের বাগান (রাষ্টযন্ত্রে ও প্রশাসনে অবিশ্বাস, সন্দেহ, সংশয়) ইত্যাদি কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে।

উপমহাদেশীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির একটা বড়ো অনুষঙ্গ চাটুকারিতা নিয়ে গল্প কবিতা,কাহিনি , কিংবদন্তি। ইউসুফের গল্প, নাসিরউদ্দিন হোজার কিসসা, গোপাল ভাঁড়ের গল্প এক্ষেত্রে আজও ঘরে ঘওে জনপ্রিয় কিংবদন্তি হয়ে আছে। নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজদরবারে মন্ত্রী বা পরামর্শক ছিলেন গোপাল ভাঁড়। উজির নাজির নায়েব গোমস্তারা রাজাকে চাটুকারিতার দ্বারা খুশি রাখার ও প্রায়শ ক্ষেত্রে ভুল পথে পরিচালিত করতে চাইতেন। কিন্তু গোপাল ভাঁড় সময়োচিত পদক্ষেপ নিয়ে রাজাকে স্যাটায়ারধর্মী গল্পের ও ঘটনার অবতারণা করে রক্ষা করতেন ভুল সংঘটনের হাত থেকে। চাটুকারিতা নিয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর  ‘তৈল’ একটি বহুলপঠিত কালজয়ী প্রবন্ধ। কিন্তু সেই চাটুকারিতার সিলসিলা আজও বহমান কোথাও কোথাও তা আওর বেগবান হয়ে দেখা দেয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাজনীতির অলিতে গলিতে চাটুকারিতা আজ স্বাথ হাসিলে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। আমিনুল ইসলামের এই ঐতিহ্যিক অনুষঙ্গকে নতুন দিনের কবিতা করে তুলেছেন। উপস্থাপনার নাটকীয়তা, উপমা ও চিত্রকল্পের অভিনব ব্যবহার, সাম্প্রতিকতম সময়ের অনুষঙ্গ সংযোজন তার কবিতায় স্যাটায়ারকে শিল্পে উন্নীত করেছে। তেমনি একটি উৎকৃষ্ট কবিতার নাম ‘ রাইসরিষার গল্প’। কবিতাটি :

নদীর ব্যর্থতা অপরিহার্য হলে শস্যের সংসারে টানাটানি বাড়ে;
তথাপি ভুলে গেলেও চলে না যে আমাদের খুশিতরিকার জল
সনাতনী স্রোতে বয়ে যায় আজো। ফলে সঙ্গোপনে আমরাও
যথেষ্ট সিক্ত হয়েই আছি। আজও তো আমাদের ছোট জুতোয়
বড় পা-এমনতর প্রকল্পের প্রশংসা করতে হয়! আর সিক্ত না হলে
স্নিগ্ধ শব্দগুলো হয়তোবা ঠেকে যাবে অধরে, বিদ‚ষক উঠোনে
এও তো কাম্য নয়! আমাদের ইতিহাসবোধ নিয়ে পর্যাপ্ত সন্দেহ
উচ্চারিত; কিন্তু দ্যাখো-যাবতীয় শক্তিকেন্দ্রে নদীয়ার দরবারী
দৃশ্য আজো হাঁটু গেড়ে আছে! আহা নদীয়ার মহারাজ মহাশয়!

আর আমরা তো নদীর দেশের লোক; পেছনের ঢেউ এসে বারবার
পা ধুয়ে দিলেও ঠিক সময়ে রিফর্মেশন ইন-সিটু হয়ে যেতে পারি।
স্বভাবতই হৃদরোগবিষয়ক বিজ্ঞাপন বেড়ে গেলেও তৈলবীজবৈরী
আমাদের কিছুই করার নেই। তাই অভ্যাস বিষয়ে সা¤প্রতিক ফতোয়া
প্রবলতর হলেও আমরা রাইসরিয়ার চাষ বাড়িয়ে দিতে চাই। দ্যাখো-
আস্কিং রানরেটের মতন চাহিদারেখা উঠে যায় শক্তিকেন্দ্রের চ‚ড়ায়।
[রাই সরিষারকাব্য/ শেষ হেমন্তের জোছনা]

“আজও তো আমাদের ছোট জুতোয়/ বড় পা-এমনতর প্রকল্পের প্রশংসা করতে হয়!’’ এই পঙক্তিতে ব্যবহৃত শ্লেষ, কষাঘাত এবং তারসঙ্গে রচনার রসময় বুনন ইত্যাদি স্যাটায়ারকে উপভোগ্য শিল্প উন্নীত করেছে। অনুরূপভাবে “ দ্যাখো- আস্কিং রানরেটের মতন চাহিদারেখা উঠে যায় শক্তিকেন্দ্রের চ‚ড়ায়।’’ পঙক্তিটি তৈলবাজির ক্রমবর্ধমান ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও ব্যবহারের দিকটিকে ক্রিকেট খেলার প্রতিযোগিতার চিত্রকল্পে মূর্ত  করে তোলা হয়েছে নান্দনিক সৌন্দর্যের দিকটি অক্ষুণ্ণ রেখে সবটুকু। আমিনুল ইসলাম সরকারি করেছেন বহু বছর। সরকারি চাকরিতে তার নানাবিধ অভিজ্ঞতা তাঁকে সমৃদ্ধ প্রজ্ঞার অধিকারী করেছে। তিনি রাষ্ট্রের আইনকানুন বিধিবিধান ইত্যাদি বিষয়ে পুরোমাত্রায় ওয়াকিফহাল।  সেসবের ফাঁকফোকর সম্পর্কেও তার ধারণা পরিস্কার । আমিনুল ইসলাম তাঁর বিভিন্ন কবিতায় আইনকানুন বিধিবিধানের মতো নীরস বিষয়কেও ব্যবহার করেছেন দক্ষতা সাথে। কবিতায় যাতে শৈল্পিক রসের অভাব না ঘটে সেজন্য তিনি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কবিতার ভাঁজে ভাঁজে গুঁজে দিয়েছেন স্যাটায়ার বা পরিহাসধর্মী উপাদান ও উপকারণ। সমাজে চুর ডাকাতি রাহাজানি ধর্ষণ, লুণ্ঠন, সাম্প্রদায়িক হানাহানি, যুদ্ধবিগ্রহ প্রভৃতি সকল ধরনের অপরাধের ও অন্যায়কর্মের হোতা হচ্ছেন পুরুষজাতি এবং তাদের মূল অস্ত্র পুরুষতন্ত্র। অথচ হাজার অপকর্ম করেও তারা লজ্জিত বোধ করে না। সাজাপ্রাপ্ত হয়েজেল খাটার পরও তারা সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে পারে , গলাবাজি করতে পারে। আবার উলটো তারা লজ্জাশীলতা, শরম , সম্ভ্রম ইত্যকার বিষয়গুলো কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করে নারীর ওপর চাপিয়ে রেখেছে। রাষ্ট্রের আইন পুরুষ ও পুরুষতন্ত্রের সৃষ্টি। সেই আইনে শ্লীলতাহানি বা শালীনতাহানি কিংবা সতীত্বহানির গ্লানি কেবলমাত্র নারীর জন্য রেখেছে। আইন মোতাবেক কোনোকিছুতেই পুরুষের শালীনতা বা শ্লীলতাহানি ঘটেনি, তার সতীত্ব নষ্ট হয় না। আমিনুল ইসলাম পরিহাস ও বিদ্রুপের কষাঘাতে পুরুষতন্ত্র ও তার ধারকবাহক পুরুষজাতিকে জর্জরিত করতে চেয়েছেন তাঁর কবিতায়। উপমা, চিত্রকল্প, শব্দ ইত্যাদির অভিনবব্যবহার এবং রসালো নাটকীয়তা তাঁর স্যাটায়ারকে উন্নতও উপভোগ্য শিল্পে উন্নীত করেছে।  তেমন অনেক কবিতার একটির নাম ‘লজ্জার পক্ষপাত’।

এই আমিন, তুমি এত এত খারাপ
কাম করো,
হরহামেশাই—
ক্ষমতার উগ্র অপব্যবহার,
লুঙ্গির নিচের গালি,
তারপরও দাঁত কেলিয়ে হাসো !

রাতে এলে টিয়াপাখি নিয়ে-
মাতো ক্লাবে,
দিনের বেলা–
টিপে ধরো তারই গলা;

আর এসব নিয়ে কিছু বলতে গেলে
সাতখুন মাফের স্লোগান দিয়ে
গলাবাজি করো !

আচ্ছা, তোমার লজ্জা করে না?

না রে মনু, মুই বরিশালের
হই বা না হই,
মোরা হক্কলেই ব্যাডা ছেলে-
আইনের লোক।

আর দ্যাখো—
পুরোনো ৩৫৪ অথবা নতুন ১০,
আইন বলছে,
পুরুষের কোনো সম্ভ্রম নেই
লুঙ্গি-প্যান্ট খুলে নিলেও তার
শ্লীলতাহানি হয় না,
অতএব তার-
লজ্জা থাকার কোনো সুযোগ নেই..
হা হা হা ! হি হি হি !! হো হো হো !!!
[লজ্জার পক্ষপাত / হিজলের সার্কিট হাউস]

পুরুষজাতির একটা বড়ো অংশই যৌনতার বিবেচন ভণ্ড ও প্রতারক। তারা মুখে পরকিয়াকে ব্যাভিচার বলে নিন্দা করে, পুুরষ সৃষ্ট আইনেও সেজন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তারা চায় তাদের নিজেদেও স্ত্রীগণ পতিভক্ত ও সতীসাধ্বী থাকবে। কিন্তু নিজেদের স্ত্রীদের ফাঁকি দিয়ে অন্য নারীর সঙ্গে পরকিয়ায় লিপ্ত হওয়াকে গৌরবের মনে করে, একে কেউ কেউ প্রগতিশীল জীবনের উজ্জ্বল অংশ বলেও প্রচার করে। পুরুষজাতির এই ভণ্ডামি ও প্রতারণামূলক আচরণকে আমিনুল ইসলাম স্যাটায়ারধর্মী কবিতা করে তুলেছেন। বাস্তব অভিজ্ঞতা, কল্পনাশক্তির জোর, ইতিহাসের উপাদান , সমাজবিজ্ঞান ও ধর্মশাস্ত্রের প্রয়োগ, সর্বোপরি  উপস্থাপনার উপভোগ্যতা তাঁর এধরনের কবিতাকে উৎকৃষ্ট শিল্পে পরিণতি দান করেছে। তেমন একটি কবিতার নাম ‘হেরেমখানা’।  রাজা-বাদশাহ-সম্পদের হেরেমখানা ছিল। সেটাকে এখন নিন্দনীয় মনে করা হয়। আসলেও সেটা নিন্দনীয়  বলে গণ্য হওয়া সমীচীন। কিন্তু বাস্তবে কেবল রাজা বাদশাহ আর সম্রাটগণই নয়, পুরুষরা নানা কৌশলে নানা কিসিমে নানা অজুহাতে একই সঙ্গে বহু নারীকে যৌনতায় ভোগ করে এসেছে এবং সেই ধারা এখনও অব্যাহত আছে কোথাও আগের ধরনে কোথাও-বা রূপ পাল্টিয়ে।

অবশ্য এসব হেরেমখানা
ফাইভ স্টার অন্ধকারের চাদরে মোড়ানো।
অধিকন্তু বহুগামিতার সুপারস্টার–
ব্রাহ্মণ পুরোহিত আর মোল্লারা
আজও ধরে রেখেছে বহুগামিতার সিলসিলা।
ডেরা সাচ্চা সৌদা, জলক্লাব,
প্রযোজক-পরিচালকের দপ্তর
এবং আরও কত স্থানে হেরেমখানার ঘ্রাণ!

যার হেরেমখানা আছে, সে তো তা প্রতিদিন
স¤প্রসারণের চেষ্টা করে
আর যার নাই,–
সে চেয়ে থাকে–কবে হবে একটি হেরেমখানা তার!
(হেরেমখানা/ মতিহারী ভালোবাসা)

আজকাল প্রগতিশীল এবং মৌলবাদী এই দুই ধরনে মানুষকে বিভক্ত করা হয় যদিও এই বিভাজন সবসময় বস্তুনিষ্ঠ হয় না । মূলত যাারা ধর্মের কড়া অনুসারী তাদেরকে মৌলবাদী বলা হয়। আর যারা নাস্তিক ও বিজ্ঞানচেতনার অধিকারী তাদের বলা হয় প্রগতিশীল। এই বিভাজনের স্রষ্টা পুরুষ এবং বিভাজিতও তারাই।  ধর্মীয় মৌলবাদীরা নারীজাতিকে ঘরে আটকে রাখতেচায় ধর্মের দোহাই দিয়ে আর প্রগতিশীলরা নারীকে স্বল্পবসনা, নগ্ন , ন্যুড ইত্যাদি হতে প্ররোচিত করে। উভয় গ্রæপের পুরুষই নারীকে ভোগের চোখে দেখে এবং সুযোগ পেলেই ভোগ করতেচায় এবং ভোগ করে।  তারার কেউই বা কোনো গ্রুপের পুরুষই নারীকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখে না, নারীতে তার ব্যক্তিত্বের, সৃজনশীলতার ও প্রতিষ্ঠা সৌন্দর্যে দেখে না। আবার তারাই নারীর সমাধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে গলা ফাটায়। আমিনুল ইসলাম তার ‘সখিনার সুন্দরী হওয়া’, ‘মাছিতন্ত্র’, ‘সোনাভান’, ‘সে আমার এমনই একজন’ প্রভৃতি কবিতায় বিষয়টি তুলে ধরেছেন হাস্যরস সহকারে।

যুবতিদের কালো হাঁড়িতে ঢুকিয়ে ঢাকনা আঁটা হচ্ছে;
তর্জন গর্জন সহযোগে তাড়ানো হচ্ছে মধুপ:
দেখ্ছ না কত রস! কত কীট! ঢেকে দাও;
নইলে আসমান ভেঙে পড়বে রাজার মাথায়!

অন্যদিকে প্রতিপক্ষ গলা: ভারি অন্যায়! ঢাকনা কেন?
বরং নীবিবন্ধ খুলে দিয়ে অবাধ হাওয়ায় ছেড়ে দাও
তারা তো প্রকৃতিরই বোন। আর আমাদের পুরুষচন্দ্র
রাজা তো আধুনিক মানুষ- খোলামেলাই পছন্দ করেন!

হাতাহাতিরত শব্দের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে যুবতিদের গলা।
[মাছিতন্ত্র / কুয়াশার বর্ণমালা]

সমাজের মানুষকে শাসন করে রাষ্ট্র। আর রাষ্ট্র চালায় রাজনীতিকগণ। উন্নত বিশ্বেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে নাগরিকদের অধিকার বেশি এবং রাজনীতিও সামাজিক দায়বদ্ধতার নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু অনুন্নত বা উন্নয়নশীল তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনীতি থাকে গডফাদার, মাফিয়া ডন, অসাধু ব্যবসায়ী ও লুটেরা শ্রেণির মানুষের হাতে। এদের একটা বড়ো অংশই ফৌজদারী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে ভয়ংকরভাবে। কিন্তু  আইনের শাসনের ন্যায়বিচারের অভাবজনিতকারণে তাদের কোনো শাস্তি হয় না। শাস্তি হয় শুধু দুর্বলের। শাস্তিহয় কেবল সাধারণ মানুষের। এমনকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর গণহত্যা চালানো রাজনৈতিক নেতা বা মাফিয়া ডন দেশের প্রধান নির্বাচিত হন– এমন নজিরও রাজনীতিতে আছে। আমিনুল ইসলাম বিষয়টিকে পরিহাসের কষাঘাতে রক্তাক্ত কবিতায় রূপ দান করেছেন। অনন্য প্রাতিস্বিক কাব্যভাষার গুণে আমিনুলের এধরনের কবিতা স্লোগানধর্মিতাকে পরিহার করে নান্দনিক সৌন্দর্যের শিল্পে উন্নীত হয়েছে। এখানেই আমিনুলের কাব্যশক্তির উজ্জ্বল অনন্যতা।

যদি একটা খুন করেছো,- ফৌজদারী অপরাধ
ফাঁসি অথবা যাবজ্জীবন;
আর যদি সাত কিংবা সহস্র খুন
তুমি হিরো,
হতে পারে–রাজ্য থেকে রাজধানী
তোমার গাড়িতে রাষ্ট্রীয় পতাকা
তোমার উপস্থিতিকে সশব্দ স্যালুট,
তোমাকে স্বাগত জানাতে পারে সিংহাসনও।

দ্যাখো, ইতিহাস রেপ্লিকেটেড আজ–
খণ্ড খণ্ড
এখানে ওখানে দেখা না-দেখা কতখানে…
[পরাবাস্তব চিত্রকল্প/ মতিহারী ভালোবাসা]

আমরা রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ নামক কবিতায় দেখেছি, সমাজের বড়ো বড়ো চোর কীভাবে সম্পদ চুর করে নিজে সাধু সাজে আর সম্পদ খোয়ানো নিরীহ নির্দোষ মানুষকে সমাজে কাছে চোর সাব্যস্ত করে। জমি হারানো উপেন জমি গ্রাসকারী জমিদারের উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বলে:

আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি এই ছিল মোর ঘটে
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ আমি আজ চোর বটে।
[দুই বিঘা জমি/ চিত্রা]

এ বিষয়টি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিভিন্ন কবিতায় তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষায় তুলে ধরেছেন।

কে তোমায় বলে ডাকাত বন্ধু, কে তোমায় চোর বলে?
চারিদিকে বাজে ডাকাতি ডঙ্কা, চোরেরই রাজ্য চলে!
চোর-ডাকাতের করিছে বিচার কোন সে ধর্মরাজ?
জিজ্ঞাসা করো, বিশ্ব জুড়িয়া কে নহে দস্যু আজ?
বিচারক! তব ধর্মদণ্ড ধরো,
ছোটোদের সব চুরি করে আজ বড়োরা হয়েছ বড়ো!
যারা যত বড়ো ডাকাত-দস্যু জোচ্চোর দাগাবাজ
তারা তত বড়ো সম্মানী গুণী জাতি-সঙ্ঘেতে আজ।
[চোর-ডাকাত/ সাম্যবাদী]

আগে চুরি ছিল পেটের দায়ে এবং ধনী হওয়ার লোভে। ক্ষুধাতুর অন্নহীন এক প্লেট খাবার পেলে চুরি করতো অন্যদিকে জমিদার-শিল্পপতি চুরি করতো শ্রমিকের প্রাপ্যের একাংশ। সেসব চুরি সহজে শনাক্ত বোঝা যেতে তা এবং সনাক্তযোগ্য ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের, প্রযুক্তির বিকাশে এবং মানুষের উচ্চশিক্ষাজনিত মেধার জোরে এখন চুরিতে নানাবিধ মাত্রা ও ধরন যুক্ত হয়েছে। আগে বলা হতো গোরুর চুরি, মুরগিচুরি, ফসলচুরি, কম্বলচোর, সিঁধেলচুরি, পুকুরচুরি। এখন আরও বলা তেলচোর, খনিচোর, সমুদ্রচুরি, ব্যাংকডাকাত, ভোটচোর। অবস্থা এমন যে ছোটোখাটো চুরি চোরোর ধরা পড়লে আইনে তাদের শাস্তি হয় কিন্তু বড়ো বড়ো চোরেরা থেকে যা ধরাছোঁয়ার বাইরে। থানা-পুলিশ আইন-আদালত, জাতিসংঘ কেউই তাদের স্পর্শ করতে পারে না। কারণ সেসব তারাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আমিনুল ইসলাম কটাক্ষ করে বলেছেন,“বর্গীর রকের্ড মোছে বিশ্বব্যাংক ধূর্তহাতে জলে ও ডাঙায়।’’ (অক্ষম উচ্চারণ)  তবে আমিনুল ইসরাম যখন কবিতায় পরিহাস বা স্যাটায়ারের আশ্রয় নেন, তখন তা সৃষ্টি হিসেবে আরও বেশি শানিত, তির্যক ও লক্ষ্যভেদী অর্থব্যঞ্জনার ও শৈল্পিক সৌন্দর্যের অনুপম সৃষ্টি হয়ে ওঠে। তেমনি একটি কবিতা :

সাবধান হে চোর মহোদয়, আর মুরগিচুরি নয়!
হাজতের চাবি আর হাতকড়া হাতে নিয়ে
দ্যাখো নাকি–দাঁড়িয়ে আছেন থানা মহাশয়!
জেনে রাখো–মুরগি চোরকে ঘৃণা করে–
জনতা ও জেলখানা, থানা ও দুদক,
উকিল ও আদালত–, অধিকন্তু সকলেই প্রায়।

তারচেয়ে–যদি পারো গিলে খাও দিঘি ও পুকুর
জেনে নাও হজমের হাল;
ভালো? অতএব
অতঃপর আস্ত একটি বঙ্গোপসাগর
জঙ্গলে বা জাতিসংঘে তখন আর কে তোমাকে আটকায় হে বীর!
[চোরের জন্য কনসালটেন্সি/ আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট]

আমিনুল ইসলামের পরিহাস থেকে রক্ষা পায়নি দেশ থেকে বিদেশ, উঠোন থেকে জাতিসংঘ কোনোকিছুরই দ্বিচারিতা ও ভণ্ডামি। অন্তর্জাতিকপর্যায়ের নেতাগণ সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্ব, আলোকিত বিশ্ব  ইত্যাদি গাল ভরা বুলি আওড়ায় আর তারা  নিজেরাই সামরিক সন্ত্রাস চালিয়ে ধ্বংস করে দুর্বলদেশগুলোকে, লুট করে নেয় তাদের ভূ-গর্ভস্থ তরল সম্পদ, উন্নতসভ্যতার নামে তারা রচনা করে মাৎস্যন্যায় ও জঙ্গলনামা। তারা বেশে বেশিষ কওে উৎপাদন করে মারণাস্ত্র আর সেসব কিনতে বাধ্য করে অন্য রাষ্ট্রসমূহকে। তারা প্রগতিশীলতার কথা বলে মুখে কিন্তু নিজেরাই নতুন ধরনের ক্রুসেডের জন্ম দেয়। সেইপথেই আজ বিশেষত মধ্য্রপাচ্য ও আফ্রিকার মুসলমান জন-অধ্যুষিত দেশগুলোকে ধ্বংস করে এসেছ একের পর এক এবং সেই সর্বনাশা ধারার এখনও অব্যাহত আছে। একইভাবে দেশে-বিদেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, অবাধ ভোটধিকার, সবার জন্য কর্মসংস্থান ইত্যাদি গালভরা বুলিগুলো রাজনীতিবিদদের মুখে আওড়াতে দেখেছেন আমিনুল ইসলাম। আজকাল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনীতিবদগণের একটা বড়ো অংশই তাদের জনগণ বা ভোটার ক্ষমতায় গেলে তাদের জন্য আকাশপাতাল করার স্বপ্ন দেখায় মোটেও বাস্তবায়িত হয় না।  রাজনীতিবিদরা জেনেশুনে ভোটারদের এসব স্বপ্ন দেখিয়ে বোকা বানিয়ে ভোট নিয়ে ক্ষমতায় যায়।  এ-বিষয়টি আমিনুল ইসলাম তার একাধিক কবিতায় পরিহাস ও কৌতুকের ভাষায় পরিবেশন করেছেন।  ‘স্বপ্নের কথা’, ‘মাঘের চিঠি’, ‘ভ্রম্যমাণ ক্যামেরায়’, প্রভৃতি কবিতায় বিষয়টি ভয়ংকর সুন্দর আকার ধারণ করেছে।

হঠাৎ বামদিক হতে এক ফেরিওয়ালা
কপালে মোহন চুমু দিয়ে আমাকে জাগায়,
শব্দের ফুলঝুরি ছড়িয়ে বলে:
‘স্বপ্নছাড়া বাঁচবে কী করে ভাই?
আমার কাছে স্বপ্ন আছে!
লাল স্বপ্ন,
নীল স্বপ্ন,
লম্বা স্বপ্ন,
খাটো স্বপ্ন,
এবং পাঁচমিশালী স্বপ্ন।
স্বপ্ন দিয়েই ঢাকা আমাদের অতীত,
স্বপ্ন দিয়ে ভরা আমাদের বর্তমান,
স্বপ্ন নিয়েই যাবো আমরা ভবিষ্যতে।
তুমি হয়তো জানো না, তোমার সে পূর্বপুরুষেরা
ভূুরি ভুরি স্বপ্ন দেখতেন,
আর প্রত্যেক সকালে খোয়াবনামা ঘেঁটে
গফুর মারফতীর কাছে ব্যাখ্যা শুনতেন হা করে;
আর তাজ্জব তুমি-
সেই বংশের ছেলে হয়ে কাটাতে চাও স্বপ্নহীন রাত?’

আমি বলি: ‘শূন্য গোলা, শূন্য গোয়ালও–
আকাশের নিচে অগণিত মাথা;
স্বপ্ন দিয়ে তো ক্ষুধাতুরের পেট ভরে না একবেলাও!’

ফেরিওয়ালার বিরক্ত স্বর: ‘আহা! বোঝো না কেন-
স্বপ্নটাই মানুষের জীবন!
রুটি-মাংস-ডালভাত এইসব আদতে ইতর-চাহিদা;
জেনে রাখো–একমুঠো স্বপ্ন বহুগুণে মূল্যবান
একগুদাম মোটা চালের চেয়ে;
আমাদের গরুমার্কা স্বপ্নগুলো কালোত্তীর্ণ
আর এ কৃষিপ্রধান দেশে কার্যকরী ষোলআনা;
অতএব নিজে নাও,
বাড়তি দামে অন্যদেরও দাও,
বেশি বেশি;  ঠকবে নাকো মোটেই।’
[স্বপ্নের কথা/ তন্ত্র থেকেদূরে]

ভীষণভাবে সমাজ সচেতন আমিনুল ইসলাম  দেশের বিদেশের অনেক রাজনীতিবিদ দেশের সম্পদ লুণ্ঠন ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে রাতারাতি অঢেল সম্পদেও মালিক বনে যাওয়া এবং যোগ্যতা  না -থাকা সত্ত্বেও সাহিত্য-সংগীতের আসরে প্রধান অতিথি হওয়ার বিষয়টিকে ব্যঙ্গ  করে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। পাশাপাশি আমলাতন্ত্রে রয়েছে নানাবিধ দ্বিচারিতা এবং সবকিছুর মাঝে প্রটোকল-প্রিয়তা ও প্রটোকল-উৎকণ্ঠা। আমলাতন্ত্রের পারিবারিক জীবনের একটি দিক নিয়ে আবদুল গণি হাজারী রচিত ‘কতিপয় আমলার স্ত্রী’’ কবিতাটি ব্যাপকভাবে পরিচিত ও বিখ্যাত। আমিনুল ইসলাম রচিত এ-ধরনের কবিতাসমূহের মধ্যে ‘প্রদীপের নিচে: একটি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট’, ‘ভিআইপি ভবন এবং রমনার কোকিল’, ‘ব্যুরোক্রেসি: এ থ্যাংকলেস জব’,  ‘স্বপ্নের উঠোনে সনদহীন উমেদার’  ‘হাওলাদার ভাই’ ইত্যাদি প্রধান। যথোপযুক্ত শব্দের ব্যবহার, অভিনব উপমার প্রয়োগ, অসাধারণ সুন্দর চিত্রকল্প এবং হাস্যরসের শৈল্পিক সচ্ছলতা কবিতাগুলোকে লক্ষার্জন সহায়ক এবং উপভোগ্য করে তুলেছে। এসব কবিতায় আমিনুল ইসলামের অসম সৎসাহস ও অতুলনীয় সৃজনশীল শক্তির ছাপ পরিস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। দু-ধরনের দুটি উদাহরণ:

ক.
রবীন্দ্রসংগীতের ঘ্যানঘ্যানানি আর নজরুলসংগীতের ঘোরপ্যাঁচে
সময়ের অপচয় করার মতো সময় নেই! ভাওয়াইয়ার হুল্লোড়ে
তালা লাগে তার কানে। অথচ সংগীত প্রতিযোগিতার উৎসবে মূল
মেহমানের আসনে বসে সে কী মাথাদোলানী! সম্রাট আকবরের
তৃণমূল সংস্করণ বলে ফিসফাস করেছিলেন গুটিকয় হরফুন মৌলা।

আঙুল-কলাগাছের উপমা তো নয়, তার কাছে জগতশেঠও নস্যি;
অথচ আয়কর বিভাগ খুঁজে পায় নাকো তাকে কোনো উৎসেই!
[হাওয়লাদার ভাই/ জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার ]

খ.
পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন ও আইন জমে হয়েছে পাহাড়!
তবে ‘কর্তার ইচ্ছাই কর্ম’-এটাই হিমাদ্রীর চূড়া,
আর একথা সেখানে স্বপ্নেও ভোলে না কেউ;
অবশ্য কর্তা কে-এই প্রশ্নের উত্তর–
কখনো রোদ, কখনো-বা জোছনা।
উঠুন!
জী স্যার।
বসুন!
জী স্যার।
হাঁটুন!
জী স্যার।
দৌড়ান!
জী স্যার।
ফলে কোনোদিনও শেখা হয় না দাঁড়াতে নিজপায়ে;
ফলে নিজ মেরুদন্ডে সোজা হয়ে দাঁড়ায়নি সিস্টেম।
[প্রদীপের নিচে: একটি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট / জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার ]

আইনকানুন ও বিধিবিধান মোতাবেক আমলাতন্ত্র বা রাষ্ট্রের যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা বিভাগ পরিচালিত হওয়ার কথা। সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম, জনস্বার্থ ইত্যাদি হওয়ার কথা সবচেয়ে বড়ো পরিচালিকা শক্তি। তবেসবার ওপরে থাকাকর কথা নিরপক্ষেতা। সরকার বদল হয় কিন্তু রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র ও নানবিধ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীও কর্মকর্তারা রয়ে যান। তারা কোনো দলীয় কর্মীও নন। দল-মত-ধর্ম-গোষ্ঠী-অঞ্চল নিরপেক্ষতাই তাদের অক্ষুণ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে  বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-মায়ানমারসহ অনেক দেশেই এই নিরপক্ষেতা ক্ষুণ্ণ হয়। তাতে করে অন্যায় এবং অবিচারের সম্মুখীন হয় সংশ্লিষ্ট দেশ ও সমাজের নাগরিকদের একটা অংশ যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাছাড়াও নানাবিধ হস্তক্ষেপ ও তদবিরের নামে চাপ আসে। যে সকল কর্মচারী-কর্মকর্তা সেই হস্তক্ষেপ ও চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন না, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কপালে ‘শাস্তিমূলক বদলি’,‘ পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়া’ ‘ওএসডি হওয়া’ ইত্যাদি জুটে।  আমিনুল ইসলাম একটি ছোটো আয়তনের পরিহাসমূলক কবিতাটির মাধ্যমে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন শিল্পের ধর্ম ও সৌন্দর্য বজায় রেখে।

ছেলের কথায় বদলি করিনি
ছেলের কথায় বদলি হয়েছি
ছেলেটি আমার ছিল নাকো
বদলিটাও ছিল নাকো আমার
ছেলেটি আমার হয়নিকো
বদলিটা আমার হয়েছে।
[প্রশাসন/ মতিহারী ভালোবাসা ]

নারীস্বাধীনতা ও নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষের আন্দোলনের নামই নারীবাদী আন্দোলন। অপ্রিয় বাস্তবতা হলো এসকল আন্দোলন অধিকাংশ ক্ষেত্রে লোক দেখানো এবং সমস্যার মূলকে এড়িয়ে তার ডগা-পাতা নিয়ে হইচই করার নামান্তর। বেগম রোকেয়া  বা তসলিমা নাসরিনের  মতো নারীবাদীর সংখ্যা একেবারে কম বলা যেতে পারে তারা ব্যতিক্রম। সমাজের বা রাষ্ট্রের নারীবাদী নেত্রীদের বড়ো অংশটাই পারবিারিক ও রাজনৈতিক দলের স্বার্থের ক্রীড়নক মাত্র। নিজ দল অথবা গোষ্ঠীর লোকেরা নারীর বিরুদ্ধে জঘন্য প্রকৃতির অপরাধ সংঘটন করলেও এরা চুপচাপ থাকে, দেখেও না দেখার ভান করে। আর অন্য কোনো লোক নারীর বিরুদ্ধে ছোটোখাটো অন্যায় করলে এরা মিছিল স্লোগানে সোচ্চার হয়ে ওঠে। এতে করে দলীয় বা গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষিত হয় বটে কিন্তু নারীর মুক্তির খাতায় অর্জিত হয় শূন্য। বিষয়টি সূক্ষ্ণ ও শানিত স্যাটায়ার সহযোগে কবিতা করে তুলেছেন আমিনুল ইসলাম ।

নারীবাদ
টিপ নিয়ে
ফাটাফাটি
বলাৎকার বাদ
[নারীবাদ : ঢাকাই সংস্করণ / মতিহারী ভালোবাসা ]

বিশ্বায়নের এই যুগে অবাধ আকাশ মিডিয়া এবং ইন্টারনেট সারা পৃথিবীকে অন্তত যোগাযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত করেছে। এখন ঘরে বসেই সমগ্র পৃথিবী দেখা যায়। পৃথিবীর কোথায় কী ঘটছে বড়ো ধরনের তা মিনিটের মধ্যেই চলে আসছে মুঠোফোন হাতে অথবা ল্যাপটপ কোলে জাগ্রত মানুষের সামনে। আগের তুলনায় বৈশ্বিক কার্যকলাপের ট্রান্সপারেন্সি বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক অনেক বেশি। সে বিবেচনায় প্রযুক্তি শাসিত ও চারিত মানুষের হৃদয়-মন অতীতের তুলনায় বড়ো হওয়ার কথা । কিন্তু ঘটেছে উল্টোটি। আমিনুল ইসলাম ‘কুয়োর ব্যাং’’ বাগধারাটিকে কেন্দ্রে রেখে এসময়ের মানুষের হৃদয়-মনের দিক থেকে ক্ষুদ্র হয়ে যাওয়ার বাস্তবতাকে উপস্থাপন করেছেন প্রচণ্ড স্যাটায়ারের ব্যবহার ঘটিয়ে। একবিতা ভাবনার দিক থেকে অভিনব, কাব্যভাষাও উজ্জ্বল প্রাতিস্বিকতায় অনন্য। কবিতাটির শেষাংশ:

আহা কী সুখ, দার্শনিক অনিদ্রায় রাত জেগে কষ্টকল্পনার
কষ্ট থাকছে না আর! এই সুযোগে শামুকের কাছে প্রাইভেট
পড়ে শিখে নিচ্ছি গুটিয়ে নেওয়ার পাঠ;
কেননা, যেমন খাপটি- তেমনটি তলোয়ার!
ও ভাই ব্যাং, ও বোন কুয়ো,–এই কান ধরলাম,
আর গালি দেওয়া নয়,
দ্যাখো–ইতোমধ্যেই কতখানি ছোট হয়ে এসেছি আমি!
[কুয়ায়ন / আমার ভালোবাাস তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট]

এসব ক্ষুদ্র মনের মানুষ পৃথিবীকে যা কিছু উপহার দিচ্ছে সেসবই ক্ষুদ্র  ও অমহৎ। অতীতের তুলনায় আজ মানুষে মানুষে জাতিতে জাতিতে ধর্মে ধর্মে মনের দিক থেকে দূরত্ব ও বিভেদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্মকেন্দ্রিক সংকীর্ণ ও উৎকট জাতীয়তাবাদ সংখ্যালঘু মানুষের জন্য ভয়ংকর নিপীড়ন ও  যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠেছে। তেমনি অন্য মানুষের অথবা অন্য ধর্মের মানুষের মহৎ সৃষ্টি বা সুকীর্তিকে সহ্য করতে অপারগ হয় ক্ষুদ্রায়িত মনের মানুষ। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা কিংবা নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অথবা বিশ্ব-ঐতিহ্য ঘোষিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমের মিনারকে এধরনের ক্ষুদ্রমনের ক্ষমতাধারী মানুষদের মারাত্মক ঘৃণাবাদী অপপ্রচার ও ভয়ংকর প্রতিহিংসার শিকারে পরিণত হতে দেখা গেছে। আমিনুল ইসলাম বিশ্বসভ্যতা ও বিশ্বমানুষের একজন গভীর ও নিবিড় পর্যবেক্ষক হিসেবে এসব অবলোকন ও উপলব্ধি করেছেন যথাযথভাবে এবং মহৎ কাব্যশক্তিবলে তুলে ধরেছেন পরিহাসমাখা উৎকৃষ্ট মানের কবিতায়। উপরে উল্লিখিত ‘কুয়ায়ন’ শীর্ষক কবিতা ছাড়াও আরও কয়েকটি স্যাটায়ারধর্মী কবিতায় আমিনুল ইসলাম বিষয়টিকে উপস্থাপন করেছেন। সেসবের একটির নাম ‘কচুখেতের হাসি’। নামকরণটিই দারুণ সুন্দর ব্যঞ্জনাগর্ভ। কবিতাটি পাঠ করা যায় :

আমাদের চারপাশে বিস্তারিত কচুখেত
সেই খেতে খোলা হাওয়ায় দোলে
বামনচাষের হাসি
আমাদের মাটিবর্তী দেহ, শয্যাবর্তী মন
ঘাড়ে ব্যথা নিয়ে তবে আর কাম কী
আকাশবর্তী তালগাছের শাখায় ঝুলে থাকা
বাবুইয়ের স্বর্গ দেখে! তাই তো
আমরা ইতিহাসের উঠোন থেকে
কুড়াল এনেছি-
কুড়াল,
আমরা অনার্যের ওয়ারিশ কি না!
বটগাছের দিন তো শেষ
আমগাছের গোড়ায় শেষ সামন্তের জল
অতএব কচুক্ষেত; হাহা! হো-হো! হিহি! …
[কচুখেতের হাসি/ কুয়াশার বর্ণমালা]

বুদ্ধিজীবী শ্রেণিকে নিয়ে আমিনুল ইসলামের কয়েকটি কবিতায় অতি চমৎকার কয়েকটি পরিহাসসমৃদ্ধ বর্ণনা আছে। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘মাঘের চিঠি’,‘তন্ত্র থেকে দূরে’, ‘কালিহাতে জ্ঞানপাপী গুণিজন চুপ’, ‘এইসব শেয়ালেরা’,  প্রভৃতি কবিতার নাম উল্লেখযোগ্য। বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক রোমা রোলাঁ তাঁর বন্ধুর কাছে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘বুদ্ধিজীবীরা সরকারের চেইনবাঁধা কুকুর’। আল মাহমুদ তাঁর বিখ্যাত ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায় বুদ্ধিজীবীদেও সম্পর্কে বলেছেন: ‘‘মগজ বিকিয়ে দিয়ে পরিতৃপ্ত পণ্ডিতিসমাজ’’। আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের দেখেছেন দলান্ধ গোষ্ঠীবাজ, স্বার্থপর ও জাতির স্বার্থের বিপক্ষে ভূমিকা পালনকারী মানুষ হিসেবে। তিনি তাদের বিষয়ে পরিহাস ও বিদ্রুপের কটাক্ষ হেনে রচেছেন অনুপম পঙক্তিমালা :

বুঝতেই পারছো- নিজঘরে বিপন্নরাত
প্রভাত মানেই নব হতাশার আবরণ উন্মোচন;
বিভ্রান্ত যত বুদ্ধিজীবী নষ্ট আগুনে বুক পেতে
জাবর কাটে গোষ্ঠীশালায়।
এরা খায়, জাবর কাটে
আর তারকাখচিত শিং দিয়ে দুই বেলা স্বজাতিকেই গুঁতোয়!
[মাঘের চিঠি/ মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম ]

আমিনুল ইসলামের পরিহাস চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে ‘হস্তমৈথুনের কবিতা’ নামক একটি কবিতায়। হস্তমৈথুনের মতো একটি একতরফা যৌনক্রীড়া বিষয়কে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করত জন্মগতভাবে সৃজনক্ষমতারহিত ব্যক্তিদের সৃজনশীলতার চর্চা ও গলাবাজিকে বিদ্রুপ করে রচিত কবতিাটিতে হাস্যরস ও পরহিাস ব্যবহৃত হয়েছে অব্যর্থ তিরের মতো। সৃজন মেধাহীন ব্যক্তিরাও লোভে পড়ে কবিতা রচতে চেষ্টা করে, গল্প-উপন্যাস লিখার কসরৎ করে কখনো-বা চিত্র আঁকতে প্রয়াসী হয়।অভিনব চিত্রকল্প ও উপস্থাপনার নাটকীয় ব্যঞ্জনা কবিতাটিকে সমৃদ্ধ করেছে নিবিড় শিল্পরসে এবং গভীর উপভোগ্যতায়। এধরনের কবিতা নেই বললেই চলে । পাঠকের উপভোগের কথা বিবেচনায় পুরো কবিতাটিউদ্ধৃতি করছি :

আহা রে স্বপ্নের রাত–ছকবাঁধা, ফরমুলা শাসিত!
কেই নেই–বউ বা বান্ধবী
কিছু নেই–পাঠ কিংবা পাঠাগার
ছিলো কি কখনো? স্মৃতির নক্ষত্র কই?
অথচ রজনী জাগা !
জেগে জেগে কী দেখো রে চোখ!
শহরের সিলেবাস রাখেনি জোনাকি
বন্ধ বাথরুমে শুধু শুধ জমে ওঠে নিঃসঙ্গতা
দায়হীন..ভারহীন..
অতএ..আতঃপর একা একা..
ও মেরে সোনা রে .. .. সোনা!

হায় রে ভোরের পাঠশালা, কত কৌতূহল–
পুত্র না কন্যা সন্তান !
পণ্ডিতের ঘাম ঝরে.. ঘাম ঝরে.. ঘাম ঝরে..
[হস্তমৈথুনের কবিতা / আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট]

আমিনুল ইসলামের স্যাটায়ার কবিতার বিষয়-বিস্তৃতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রসারিত। তিনি ইতিহাস সচেতন কালসচেতন কবি। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, উপনিবেশবাদ, আগ্রাসন, অন্যায় যুদ্ধ, ক্ষমতাধর দেশগুলো কর্তৃক সামরিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর তেল  ও খনিজ সম্পদ লুণ্ঠন প্রভৃতি তাঁর কবিতায় স্থান পেয়েছে।  গণতন্ত্রের লেবাস পওে বড়ো বড়ো রাষ্ট্রগুলোর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দমন পীড়ন, ইতিহাস বিকৃতিকরণ, সংখ্যালঘুদের গৌরবের স্মারকগুলোর ধ্বংস সাধন এসব কিছুই তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে। এ সকল কবিতায় তির্যক শব্দাবলি, স্যাটায়ারধর্মী বাক্য ও পরিহাসগর্ভ চিত্রকল্প ব্যবহৃত হয়েছে অত্যন্ত জুতসইভাবে। এতে করে তাঁর প্রতিবাদ-পরিহাসের কবিতাও শিল্পগতভাবে উপভোগ্য ও উত্তীর্ণ হতে পেরেছে।  কয়েকটি উদাহরণ:

ক.
আলোকায়নের টাই পরে আন্তর্জাতিক ডাকাতির জন্য
মন্ত্রণালয় আছে,
ইথনিক ক্লিনজিং আর গণহত্যার জন্য মন্ত্রণালয় আছে,
আছে চোরের মায়ের রাষ্ট্রীয় সংস্করণ তথ্য মন্ত্রণালয়,
কিন্তু ভালোবাসার কথা প্রচারের জন্য
নেই কোনো মন্ত্রণালয়,
নেই কোনো বিবিসি-সিএনএন–আল জাজিরা।
[বঙ্গোপসাগরের দুইপাড়ে / প্রেমিকার জন্য সার-সংক্ষেপ]

খ
তেলির দুয়ারে হানা: ছাড় ব্যাটা জলমূল্যে তেল
তুই ব্যাটা ঘাড়ত্যারা–কথা কস্ নাহক বেহক
আমরা সুসভ্য দ্যাখ্ কাকে বলে সভ্যতার খেল!
অগ্নিবীর্যে উদবেলিত ক্রুসেডের লিঙ্গ টমাহক।
[সভ্যতার সংঘর্ষ / ভালোবাসার ভূগোলে ]

গ
তুমি আমার দ্বিতীয় জনমের বন্ধু’
আমি নিজেই জোর গলায়
একথা বলতে চাই-
হাটে মাঠে ঘাটে
বৃক্ষদের জলসায়
¯্রােতের আসরে
মিডিয়ায়, জাতিসঙ্ঘে
সবখানে;
তুমি শুধু আমার টুঁটি থেকে হাত সরিয়ে নাও!
[বন্ধুত্ব / হিজলের সার্কিট হাউস]

ঘ.
কী দোষ তাদের? হায়, তাদের পূর্ব-প্রজন্ম নাকি পড়শি
ভূগোলের আমবাগান ছিল অপ্রমাণিত কোনো এক কালে!
অতএব তাদের শাখায় থাবা, সমূহ শেকড়ে দাঁত!

মানুষ নেকড়ে হলে বৃহত্তম গণতন্ত্রও জঙ্গল হয়ে ওঠে।
[জঙ্গলায়ন / জলের অক্ষরে লেখা প্রেমপত্র]

ঙ.
দ্যাখো– আলোর বো টাই খুলে রেখে পাশে,
সভ্যতার দরোজায় শুয়ে আছে বাঘ এবং নেকড়ের মহামেধাবী জোট–
নিরাপদজ্ঞানে বের হয়ে আছে আণবিক নখর ও থাবা।
এই দেখে জড়োসড়ো মরণোত্তর মধ্যযুগ।
যদি চাই–জন্মসূত্রে এদের আমরা ‘লেংটু মামা’ বলে ডাকতেও পারি!
[অন্ধরাতের এক্সরে রিপোর্ট/ ভালোবাসার ভূগোলে]

চ.
সত্যেরও রং নেই
জলের ধর্মই তাদের ধর্ম।
শয়তানের পরই একথা জেনেছিলেন
মহামতি গোয়েলবস।
তাইতো আর উপেক্ষিত এডওয়ার্ড সাঈদ নয়,
মিডিয়ার নুনু নিয়ে জন্ম নিচ্ছে প্রাসাদে প্রাসাদে–
গোয়েবলসের আলোকায়িত সংস্করণ।
[বৃদ্ধ বাবা এবং সত্যের রং / জোছনার রাত বেদনার বেহালা ]

ছ.
গেরস্তপাড়ায় আজ ঘুম নেই
লাঠিহাতে দিন
লাঠিহাতে রাত;
এই নিয়ে অভিযোগ
স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে
উচ্চকণ্ঠ
ডাকাতিয়া গ্রাম।

অতএব–লাঠিগুলো সন্ত্রাসের উৎস কিনা
এমত তদন্ত নিয়ে তৎপর
মধ্যবর্তী জাতিসংঘপাড়া।
[বিশ্বায়িত গ্রাম / শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ]

জ.
আছিলা বাঁশের স্কুলে জমে ওঠা প্রাকটিক্যাাল
ক্লাস থেকে ডাকছি–
ও ইতিহাস, ও মহাকালের প্রেস সেক্রেটারি,
প্রস্তরযুগকে সঙ্গে নিয়ে একবার এসো ভাই
দেখে যাও–আলোকায়নের বিকিনি পরা রাত
ফুটো কনডম–আর ধর্ষকদের ইউনাইটেড ক্লাব!
[বিকিনি রাত এবং ফুটো কনডম / শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ]

উপরে বর্ণিত প্রতিটি কবিতাংশ আমিনুল ইসলামের আন্তর্জাতিক জ্ঞানের গভীরতা ও হালনাগাদ অবস্থা, নিপীড়িত , শোষিত ও অত্যাচারিত মানুষের মানুষের জন্য সংবেদনশীল সহমর্মিতা এবং সেসবকে মানোত্তীর্ণ কবিতা করে তোলার স্বাক্ষর বহন করে। বর্ণিত প্রতিটি কবিতাংশ নিয়ে বিস্তর ব্যাখ্যামূলক কথা বলা চলে। সেসবের বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে দুটি কবিতাংশ সম্পর্কে একটু আালোকপাত করা যায়। ঘ উদাহরণে দেখা যায় যে বহুল প্রশংসিত গণতন্ত্র আজ আর সবখানে মহৎ কোনো শাসনব্যবস্থা নয়। বেশ কিছু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষের ওপর হত্যা, গণহত্যা, নিপীড়ন চালানো হচ্ছে , তাদের জীবিকা থেকে বঞ্চিত ও ঘরবাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস এবং তাদের ধর্মীয় প্রথিস্ঠান ও গৌরবের স্মারকগুলো ধ্বংস করে দেওয়া  হচ্ছে।  কখনো অসৎ উদদ্দেশ্য প্রণোদিত আইন পাশ করে তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কায়েম করা হচ্ছে জঙ্গলের নীতি যেখানে জোর যার মুলুক তার হচ্ছে সবকিছুর নিয়ামক। আমিনুল ইসলাম তির্যকতার সঙ্গে এনাম দিয়েছেন ‘জঙ্গলায়ন’ এবং ওপরে ‘ঘ’ উদাহরণে সেই ছবি তুলে ধরেছেন স্যাটায়ার ও পরিহাসমূলক ভাষায় ও চিত্রকল্পে। বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও খনিজসম্পদ সমৃদ্ধ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ওপর চালাচ্ছে শোষণ , নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ। ইউরো-মার্কিন জোট নিজেদের সভ্য ও আলোকায়িত দেশ বলে দাবি করে আসছে এবং ঐসব দেশের ওপর আগ্রাসন, অত্যাচার ও শোষণ চালাচ্ছে সভ্যতা, গণতন্ত্র, আলোকায়ন, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার এসব মিথ্যা দাবির শতমুখী প্রচারণা চালিয়ে। ওপরের ক, খ, ঙ, চ, ছ, জ প্রভৃতি উদাহরণে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি উদাহরণেই কাব্যভাষা পরিহাসমৃদ্ধ, স্যাটায়ারে শানিত। আমিনুল ইসলামের কবিতায় আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গের ছড়াছড়ি যা সমসাময়িক কবিদের কবিতায় বিরল বললেই চলে। কিন্তু কেবল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সচেতনতার কবিতাতেই নয়, এমনকি প্রেমের কবিতার ক্ষেত্রে তিনি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞানের ছোঁয়া দিয়েছেন স্যাটায়ার ও পরিহাস সহযোগে। যেমন  তিনি একটি প্রেমের কবিতায় বলেছেন :

কিন্তু কোনো কথাই বলা হয় না
অর্থাৎ বলা যায় না।
বাগান-রক্ষকের সুরভিত ধমক নয়,
ফ্রয়েডের নুনু নুনু মস্করাও নয়,
সেমেটিক সম্পর্কের সূত্র চোখ তুলে চোখ রাঙায়;
[নিষিদ্ধ বাগানে / জলের অক্ষওে রেখা প্রেমপত্র]

গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ-সহ বিভিন্ন তন্ত্রমন্ত্র ইত্যাদির কালো অধ্যায় নিয়ে, রাষ্ট্রের ভয়ঙ্কর রূপ, ক্ষমতার দাপট, ক্ষমতার উৎস্যদের অবজ্ঞা করা, চাপিয়ে দেওয়া ইত্যাদি নিয়ে কবিতাগুলো হচ্ছে, জঙ্গলায়ন (গণতন্ত্রের ভয়ংকর রূপ উন্মোচন), আমি চেয়ার বলছি (ক্ষমতার দাপট ও অসারতা),  রাজাময় (রাষ্ট্র বা ক্ষমতার সর্বগ্রাসী বিস্তার ও  ক্ষতিকর প্রভাব), পুঁজিবাদ (পুঁজিবাদ বা ধনলিপ্সা বিষয়ে মানুষের স্ববিরোধী আচরণ), সভ্যতার সংঘর্ষ (সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতার মুখোশ উন্মোচন), অন্ধরাতের এক্সরে রিপোর্ট (আধুনিক রাষ্ট্রের প্রেমবৈরী অবস্থান ও কাজকাম), সত্য বলা না বলা (দূষিত রাষ্ট্র ও সমাজকে তীব্র কষাঘাত), ফেরকালার অধঃপতন( আধুনিক মানুষ ও রাষ্ট্রে অধঃপতন), বৃদ্ধ বাবা এবং সত্যের রঙ (রাষ্ট্র ও ক্ষমতার স্বরূপ উন্মোচন) করা হয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ :

(১) কাঁচাফলে কিল নয়, অগ্নিগর্ভ নল
দিন যায়- পচন ধরে আড়ালে আবডালে,
…জ্যেষ্ঠভ্রাতা খিস্তি পাড়ে, নষ্টভ্রাতা চতুর্মুখ;
রাষ্ট্রজ্ঞানী হতবুদ্ধি;
মুখ ঢাকে আব্রাহাম লিংকন;
লম্বোদর এ শহর চার্বাকের ঘি গিলে বেসামাল,
খুলে পড়ে পাতলুন।
নক্ষত্রখচিত গোষ্ঠীগোশালায়
পরান্নে জাবর কাটে বুদ্ধিজীবী।
এ নগরে এজমালি বৃক্ষের গোড়ায় জল দেবে কে?
…ধাবমান দিনের সন্তাপে হৃদয় আক্রাস্ত হলে
পরশ বুলিয়ে দেবে মাটিছোঁয়া সাঁঝের বাতাস।
নগরীর কুটিল দালানে জমলে জমুক যত তন্ত্রের ফ্যাসাদ
আমাদের সবুজের সংবিধান অলংঘিত-
পরিব্যপ্ত প্রাণের বর্ণমালায়।
[তন্ত্র থেকে দূরে]

(২) বটের রক্ত সুন্দরীর আঁচল রাঙিয়ে
গড়িয়ে চলেছে অর্পণগাছিয়ার জলে;
সবুজের জলসাঘরে শ্যামার আহত
কণ্ঠে বেগম আখতারের ঠুংরী…
[সংক্ষেপিত/ কল্পচিত্র]

(৪) দ্যাখো–জাতিসংঘের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে
বিকট এক অস্তিত্ব
মাথায় কেন্দ্রীয় টাক, নাভি ঘিরে মেদের বাহুল্য
হাঁটুতে বাড়তি চাপ আর
পায়ের গোড়ায় প্রবাহিত
অজস্র  মানুষের রক্ত ও ঘাম…..
[সংক্ষেপিত/ পুঁজিবাদ]

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অন্যায্য, ভণ্ডামি, কপটা, ক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে স্বরূপ উদঘাটন করা হয়েছে বাঘ-হরিণের সংসার (বড় রাষ্ট্র ও ছোট রাষ্ট্রের স¤পর্ক), কুটুম (জাতীয় রাজনীতিতে বিদেশী হস্তক্ষেপ ডেকে আনার ছবি), জল থেকে জাতিসংঘ (পক্ষপাতদুষ্ট বিচারব্যবস্থার সমালোচনা), শান্তিদেব (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডাভল স্টান্ডার্ড স্বরূপ উন্মোচন), ডায়গনোসিস আফটার অপারেশন (দুনিয়ার অশান্তির কারণ উদঘাটন) ইত্যাদি কবিতায়।

(১) ভালোবাসার মামলা ঠুকে হেরি গেছি হায়!
হেরি গেছি ভাই..হেরি গেছি বোন..
বৃথা গেলো অকাট্য সাক্ষী-সাবুদ
মেষশাবকের মতো ভাবছি ভাটিতে
ও জনক, ও জননী-,
এ কো› জঙ্গলে বলো তোমাদের গন্দম-বাগান!
…দ্যাখো- পন্ডিতের কালি মেখে গালে
শাহবাগে হাসছে কবিতা,
আর্ট গ্যালারিতে উৎফুল­ সুলতানের ভীষণ মানুষেরা!
আর তুমি! তুমি শুধু হাতে নিয়ে কাঁচি আর কড়া…..!
[সংক্ষেপিত/ জল থেকে জাতিসংঘ]

(২) ও আফ্রিকার জঙ্গলের সিংহ, ও সুন্দরবনের বাঘ
ও আমাজনের কুমির,
কবে তোমরা এসে বসবে সভ্যতার সিংহাসনে আর
আধুনিক মানুষ নামের জন্তুগুলো আলোর পাঠ নেবে
তোমাদের পদতলে বসে ? কবে ???
[সংক্ষেপিত/ রাখাইন এবং]

(৩) রবিঠাকুরের রামকানাই নই, তবু কী করো অস্বীকার করি–
ডাল ভাঙে, পত্রপু®প উড়ে যায়,
তলে তলে টান পড়ে শেকড়েও!
… বিবিসি-সিএনএন-স্টার ওয়ার্ল্ড
এরা কার কথা বলে?
পাখির টক শো কানে তোলো তুমি; ঘরে নিই আমিও।
[সংক্ষেপিত/ পাখির টক শো]

এশা (সংবেদনশীলতা ও সৃষ্টিশীলতাকে তুলে ধরা), প্রদীপের নিচে একটি অন্তর্বতীকালীন রিপোর্ট (সরকারি চাকরি অঙ্গনের ছবি), মেরুদন্ড রোগ (নীতিবান মেরুদন্ডওয়ালা মানুষের চাকরির বিপদ), থুতু (বাঙালির কপট ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতরতার ছবি), মাছিতন্ত্র (নারীস্বাধীনতা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দুই গ্রুপের একই চরিত্রের ছবি), রাইসরিষার কাব্য (তৈলমর্দন সংস্কৃতির স্বরূপ উন্মোচন), পুচ্ছ সংকীর্তন (চামচামি, দালালি ও বানরামির ছবি) ইত্যাদি কবিতায় সমাজের কদাকার কিছু দিক উঠে এসেছে। কয়েকটি উদাহরণ :

(১) আমার থুতু দিই। ওয়াক থু!
দেখুন- এ আমাদের হাল আমলের অভ্যাস
…সাপের থলিতে যেমন বিষ
ঊর্ণ-অধরে যেমন লালা
সতীনের বুকে যেমন ঈর্ষা
আমাদের পেটে তেমনি থুতু।
(সংক্ষেপিত/ থুথু)

(২) এটা কোনো প্রাচ্যতত্ত¡ নয়, অপ্রিয় বাস্তবতা এই যে
প্রাচ্যের শরীরে এক কঠিন রোগের আনাগোনা আজ;
সে-রোগ সংক্রমণে দিনদিন মানব-জঙ্গল হয়ে উঠছে
শত সভ্যতার সূতিকাগার–পূবের দুনিয়া! অথচ
প্রথমদিনের সূর্য একদিন উঠেছিল … 
আর বনের আকাশে ওঠা চাঁদের পিঠে চড়ে দ্যাখো-
দুর্বলদের ভেড়া জ্ঞানে নিজেদের নেকড়ে-ভ‚মি
রচনায় তৎপর সনখর সবলের দল!
কোনো মানবীয় ঘ্রাণ নয়,
অলৌকিক খোশবুও নয়,
তাদের শরীর থেকে বের হয়ে আসে
জিঘাংসা ব্রান্ডের বিকট গন্ধ
…এবং কোনো ধর্মগুরু নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানীও নয়
ধর্মের নিতম্ব থেকে–
এই রোগের জীবাণু আবিস্কার করেছেন
মহামান্য রাজনীতিবিদগণ; ছড়াচ্ছেনও তারাই।
[সংক্ষেপিত/ প্রাচ্যের অসুখ]

(৩) আছিলা বাঁশের স্কুলে জমে ওঠা প্রাকটিক্যাাল
ক্লাস থেকে ডাকছি-
ও ইতিহাস, ওগো মহাকালের প্রেস সেক্রেটারি,
প্রস্তরযুগকে সঙ্গে নিয়ে একবার এসো ভাই
দেখে যাও- আলোকায়নের বিকিনি পরা রাত
ফুটো কনডম- আর ধর্ষকদের ইউনাইটেড ক্লাব!
[সংক্ষেপিত/ বিকিনি রাত এবং ফুটো কনডম]

ব্যঙ্গাত্বক হচ্ছে প্রতিশ্রুতিশীল এবং দায়িত্বের অংশের বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। অতীতের তুলনায় এ ধারার প্রতিশ্রুতিশীল সম্প্রসারণ বলে দেয়, ক্রমান্বয়ে কবিতারা আরও অর্থবোধক, নৈতিক ও মানবিক  হয়ে উঠছে। অবশ্য, কবিদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথা উপস্থাপন হচ্ছে। এ-দিকটি বিবেচনা করে বা বাইরে রেখেই বলছি। আমিনুল ইসলামের ব্যঙ্গাত্বক কবিতা বুদ্ধিবৃত্তিক, পেশাভিত্তিক, ধর্মীয়, আদর্শিক, রাজিনৈতিক, নারীবাদী চেতনা, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রেম-অপ্রেম, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক ইত্যাদি বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জনাথান সুইফট (১৬৬৭–১৭৪৫) হচ্ছেন স্যাটায়ার সাহিত্যের সোনালি যুগের প্রতিনিধি। তিনি স্যাটায়ারধর্মী কবিতাও লিখেছেন।  সব বিখ্যাত কবিই এ ধারা এড়িয়ে যাননি। সুইফট স্যাটায়ার ধারাকে আয়না হিসাবে দেখেছেন। আয়নায় যেমন নিজেকে ছাড়া অন্যকে দেখা যায় না। ব্যক্তি গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তর ব্যাঙ্গ-বিদ্রæপের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। কবি আমিনুল ইসলামও ব্যতিক্রম নন। ব্যঙ্গাত্বক রীতিনীতি, অভ্যাস, সামাজিক বিভিন্ন সম্প্রদায় ও শ্রেণির অবনতি, অবক্ষয় ইত্যাদিকে আক্রমণ করে সংশোধন করাই এ-ধারার লক্ষ্য। রাজনীতির ক্ষেত্রে এ ধারা ক্রমবর্ধমান হচ্ছে। সম্প্রসারণের প্রবণতাই বলে দিচ্ছে রাজনীতি দিন-দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃত দুঃখ, বঞ্চনা, বৈষম্য, অসংগতি ইত্যাদির মধ্যে ভার্চুয়াল বন্ধন কিংবা সুখের মধ্যে বিরাট ফাঁক থাকায় কবিকে ব্যঙ্গাত্বক কবিতা লিখতে উৎসাহিত করে। যে কবি যত বিবেকবান ও সচেতন তিনি ততই এ কবিতা লেখার ক্ষেত্রে সার্থক। কবি আমিনুল ইসলাম কবিতায় কখনো ব্যক্তি বা দেশীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অঙ্গকে লক্ষ করে রচিত হয়েছে। তাঁর কবিতা পরোক্ষভাবে কখনো বা প্রত্যক্ষভাবে, নোংরামি, দুর্নীতি, অনৈতিকতা ইত্যাদি নেতিবাচক বিষয়াদি উপহাসমূলক সুরে কণ্ঠস্বর নির্মিত হয়েছে। তিনি কখনো কখনো সংকীর্ণমনা ও ঈর্ষান্বিত প্রতিদ্ব›দ্বীদের স¤পর্কে ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপন করেছেন। চেরাপেটে পাওয়া গেছে সারমেয় লেজ (ডায়াগনসিস আফটার অপারেশন),  এমনকি শেয়ালশাসিত কলাকেন্দ্র (পাখি সংকলন), আমাদের মাটিবর্তী দেহ, শয্যাবর্তী মন (কচুক্ষেতের হাসি), নেকড়ীয় প্রটেকশন (কল্পচিত্র), মানুষ নেকড়ে হলে বৃহত্তম গণতন্ত্রও জঙ্গল হয়ে ওঠে (জঙ্গলায়ন) ইত্যাদি শব্দশ্রেণি তিনি ব্যবহার করেছেন। দেখিয়েছেন সংকট ও অসঙ্গতির প্রতি তাঁর আক্রোশ ও কঠোরতা।  আরও কিছু কবিতাংশ তুলে ধরতে ইচ্ছে করছে :

(১)  ও ভুল, ও লালসা, অতএব মেতে ওঠো উৎসবে!
পরোয়া কীসের!
তোমরা এখন প্রতিকারহীন মহাশক্তির অনুগত থাবা!
[সংক্ষেপিত/ অডিটবিহীন দিন]

(২) নজরে পড়বে
কালের কুকুরের—ঘেউ ঘেউ, ঘেউ ঘেউ!
এমনটা কতদিন ধরেই তো দেখে আসছি!
আর হ্যাঁ, সত্যি কথাটা বলতে আমার লজ্জা নেই
আমি চেয়ার খুব পিছলা স্বভাবের
জাদুবাস্তবতার তেল মেখে মাঝে মাঝে বাঁশ হয়ে উঠি।
এবং জ্ঞানীদের জন্য বহু দৃষ্টান্ত ইতিহাসে।
[সংক্ষেপিত/ আমি চেয়ার বলছি]

(৩) রাজপ্রাসাদ তো নেই, নেই রাজমুকুটও
অথচ যেখানেই হাতটি দিই,
সেখানেই রাজার শরীর;
…হে রাজামশাই, ওগো মহামাননীয়,
আমার এ ভালোবাসার উঠোন থেকে
কবে যে সরাবে তোমাদের বীভৎস নিতম্ব !
[সংক্ষেপিত/ রাজাময়]

বাংলাদেশের কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হচ্ছে স্যাটায়ারধর্মী কবিতা। তবে, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বললে অনেকটাই পিছিয়ে থাকবেন বাংলাদেশের কবিরা। কিন্তু আমিনুল ইসলাম পিছিয়ে নেই। যুগপৎ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবং আন্তর্জাতিক ল্যান্ডস্কেপের প্রেক্ষিতে তিনি জোরালো ভূমিকা পালন করে স্যাটায়ার কবিতায় তিনি উজ্জ্বল এক অধ্যায় রেখে যাচ্ছেন। কবি আমিনুল ইসলাম সমাজ-রাষ্ট্রের ত্রুটি ও সংকট, পার্থক্য ইত্যাদি বড় করে পাঠকের নিকট উপস্থাপন করতে চেয়েছেন এবং পাঠকের মনোযোগ ও আকর্ষণ ভালোর দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। কবিতায় পরিহাস স্যাটায়ার শিল্পসম্মতভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমিনুল ইসলাম শীর্ষেই থাকবেন বলে মনে করি। সংখ্যাগত দিক দিয়ে তো বটেই, মানস, বিষয় এবং শৈলীগত দিক দিয়েও তিনি সফল।

জনপ্রিয় পোস্ট

আবু আফজাল সালেহর ছড়া: সমাজ, প্রকৃতি ও উৎসবের মেলবন্ধন

জন্মদিন স্মরণ : আমিনুল ইসলাম

আমিনুল ইসলামের স্যাটায়ার-কবিতা : শিল্পরূপ ও শাণিত উচ্চারণ

আপডেট : ১০:৫৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪

আমিনুল ইসলামের স্যাটায়ার-কবিতা : শিল্পরূপ ও শাণিত উচ্চারণ
আবু আফজাল সালেহ


বিদ্রুপাত্মক এবং ব্যঙ্গাত্মক কবিতা বা কথাসাহিত্য হচ্ছে চতুর/শানিত বুদ্ধিযুক্ত/ জুতসই শব্দাবলি ব্যবহার করে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সম্পর্কে ধারণার যোগাযোগের শিল্প। একটি গোষ্ঠী বা ব্যক্তির অবস্থা, অনুভূতির ব্যঙ্গাত্বক প্রকাশ করার জন্য ভাষার একটি স্টাইল হচ্ছে স্যাটায়ার। এটাকে বাংলায় পরিহাস বললে সবচেয়ে সুন্দর হয়। এটি একটি পরিস্থিতি বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি সিন্ডিকেট প্রকাশ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। গদ্যসাহিত্য (বিশেষকরে নাটক) স্যাটায়ার ব্যবহার বহুল হলেও কবিতায় ব্যবহার করতে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিতে হয়। উপহাসের অর্থকে বোঝাতে কবিকে শব্দনির্মাণে অধিক চতুর হতে হয়। অভিজ্ঞতাও অবশ্য চতুর হতে সহয়তা করে। কবি আমিনুল ইসলাম (জন্ম : ২৯ ডিসেম্বর ১৯৬৩) প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে চাকরির সুবাদে বিভিন্ন বিষয়ে বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছেন। ফলে, অন্ধকার দিকের বিভিন্ন বিষয় তাঁর কান, কণ্ঠ, ত্বক, চোখ ইত্যাদিকে জাগিয়ে তুলেছে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা।

অন্য সাধারণ কবিতার মতোই আমিনুল ইসলাম এ-ধারায় নতুন কিছু জানালা খুলেছেন। তাঁর কাব্যিক থিম এবং বিষয়গুলো প্রধানত জনগণ ও বিভিন্ন গোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের বেদনা, হতাশা, অনিরপেক্ষতা, মোড়লগিরি এবং বিভিন্ন দেশীয়-আন্তর্জাতিক সমস্যার প্রকাশ ও নেপথ্যদের চরিত্র ও চিত্র তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন অস্বাভাবিকতার সমালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি করে সমাজ ও নাগরিকদের কৌশল ও চিন্তা করার আমন্ত্রণ করেছেন। শুধু শব্দাবলির প্রয়োগই নয়, বাক্য ও বিষয়বস্তু বাছাইয়ে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন মূল্যবোধ ইত্যাদি তুলে ধরেছেন। দাপ্তরিক, প্রযুক্তিগত ও আন্তর্জাতিক শব্দ/পরিভাষা, ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ইত্যাদি শব্দশ্রেণি ব্যবহারে জুতসই বাগ্মীতা ও শৈল্পিক মূল্যের পাশাপাশি পাঠকের হৃদয়ের কাছাকাছি যেতে পেরেছেন। ধর্ম-অধর্ম, সাম্প্রদায়িক নিয়ে লেখা আসল চরিত্র উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে প্রাচ্যের অসুখ (শেষ চার লাইন), রাখাইন ইত্যাদি কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে। দুর্নীতি, লুটেরা, ক্ষমতাবান ইত্যাদি চরিত্র কল্পচিত্র (সন্ত্রাসী ও হত্যাকারীরা ক্ষমতার চেয়ারে আসীন), কচুক্ষেতের হাসি (বামনদের জয়জয়কারে ছবি), শেয়ালের সিংহরোগ (অযোগ্যদের দখলবাজির ছবি), আঁধার বন্দনা (সাহিত্যে শিল্পে নেতিবাচকতা ও বিমানবকীকরণকে কটাক্ষ) ইত্যাদি কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতার অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে চোরের জন্য কনসালটেন্সি (দুর্নীতি ও লুটপাটের রামরাজত্ব স¤পর্কে আলোকপাত), অডিটবিহীন দিন (লুটপাটের সংস্কৃতির জয়জয়কারকে তুলে ধরা), আমার বোন এবং আমি (নারীস্বাধীনতা বিষয়ে পুরুষের ভন্ডামি), বেদখল হয়ে যায় পরানের পার্ক (আধুনিক মানুষের অর্থলিপ্সা ও প্রেমহীন যৌনতা), কিউপিডের মিউজিয়াম এবং (দেহবাদী প্রেম ও নগ্নতার সমর্থকদের তীব্র কষাঘাত), বোমাবাঁধা মানুষ (মরণশীল মানুষের লোভ ও লিপ্সার ছবি), স্বপ্নের কথা (রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে জোরাজুরিকে কটাক্ষ) ইত্যাদি কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে। বাইরে ফিটফাট ও উদার মনে হলেও আধুনিক এ যুগের শিক্ষিত ও উচুঁস্থানের ব্যক্তিত্বদের আসল চরিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে পর্বতবিরোধী গান (ঈর্ষাকাতর বামন মানুষ, রাজনীতিক-কবি-শিল্পীদের ছোটমনকে তুলে ধরা), কুড়ালের হাসি (জোর যার মুলুক তার দর্শনের সমালোচনা), ভালোবেসে কী হবে? (আধুনিক সভ্যমানুষ ও আধুনিক রাষ্ট্রের প্রেমবৈরী স্বরূপ উন্মোচন), কুয়ায়ন (আধুনিক মানুষের মানসিক ক্ষুদ্রতার ছবি), আমি হতে পারিনি আকাশ (মানুষের আসল রূপ উন্মোচন), বিকিনি রাত ও ফুটো কন্ডোম (দ্বিচারী আধনিকতাকে কটাক্ষ), এইসব শেয়ালেরা (সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গনের গোষ্ঠীবাদের কটাক্ষ), নিয়মের সৎপুত্র (প্রশাসনে দলবাজিতার কুফল), বিষবৃক্ষের বাগান (রাষ্টযন্ত্রে ও প্রশাসনে অবিশ্বাস, সন্দেহ, সংশয়) ইত্যাদি কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে।

উপমহাদেশীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির একটা বড়ো অনুষঙ্গ চাটুকারিতা নিয়ে গল্প কবিতা,কাহিনি , কিংবদন্তি। ইউসুফের গল্প, নাসিরউদ্দিন হোজার কিসসা, গোপাল ভাঁড়ের গল্প এক্ষেত্রে আজও ঘরে ঘওে জনপ্রিয় কিংবদন্তি হয়ে আছে। নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজদরবারে মন্ত্রী বা পরামর্শক ছিলেন গোপাল ভাঁড়। উজির নাজির নায়েব গোমস্তারা রাজাকে চাটুকারিতার দ্বারা খুশি রাখার ও প্রায়শ ক্ষেত্রে ভুল পথে পরিচালিত করতে চাইতেন। কিন্তু গোপাল ভাঁড় সময়োচিত পদক্ষেপ নিয়ে রাজাকে স্যাটায়ারধর্মী গল্পের ও ঘটনার অবতারণা করে রক্ষা করতেন ভুল সংঘটনের হাত থেকে। চাটুকারিতা নিয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর  ‘তৈল’ একটি বহুলপঠিত কালজয়ী প্রবন্ধ। কিন্তু সেই চাটুকারিতার সিলসিলা আজও বহমান কোথাও কোথাও তা আওর বেগবান হয়ে দেখা দেয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাজনীতির অলিতে গলিতে চাটুকারিতা আজ স্বাথ হাসিলে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। আমিনুল ইসলামের এই ঐতিহ্যিক অনুষঙ্গকে নতুন দিনের কবিতা করে তুলেছেন। উপস্থাপনার নাটকীয়তা, উপমা ও চিত্রকল্পের অভিনব ব্যবহার, সাম্প্রতিকতম সময়ের অনুষঙ্গ সংযোজন তার কবিতায় স্যাটায়ারকে শিল্পে উন্নীত করেছে। তেমনি একটি উৎকৃষ্ট কবিতার নাম ‘ রাইসরিষার গল্প’। কবিতাটি :

নদীর ব্যর্থতা অপরিহার্য হলে শস্যের সংসারে টানাটানি বাড়ে;
তথাপি ভুলে গেলেও চলে না যে আমাদের খুশিতরিকার জল
সনাতনী স্রোতে বয়ে যায় আজো। ফলে সঙ্গোপনে আমরাও
যথেষ্ট সিক্ত হয়েই আছি। আজও তো আমাদের ছোট জুতোয়
বড় পা-এমনতর প্রকল্পের প্রশংসা করতে হয়! আর সিক্ত না হলে
স্নিগ্ধ শব্দগুলো হয়তোবা ঠেকে যাবে অধরে, বিদ‚ষক উঠোনে
এও তো কাম্য নয়! আমাদের ইতিহাসবোধ নিয়ে পর্যাপ্ত সন্দেহ
উচ্চারিত; কিন্তু দ্যাখো-যাবতীয় শক্তিকেন্দ্রে নদীয়ার দরবারী
দৃশ্য আজো হাঁটু গেড়ে আছে! আহা নদীয়ার মহারাজ মহাশয়!

আর আমরা তো নদীর দেশের লোক; পেছনের ঢেউ এসে বারবার
পা ধুয়ে দিলেও ঠিক সময়ে রিফর্মেশন ইন-সিটু হয়ে যেতে পারি।
স্বভাবতই হৃদরোগবিষয়ক বিজ্ঞাপন বেড়ে গেলেও তৈলবীজবৈরী
আমাদের কিছুই করার নেই। তাই অভ্যাস বিষয়ে সা¤প্রতিক ফতোয়া
প্রবলতর হলেও আমরা রাইসরিয়ার চাষ বাড়িয়ে দিতে চাই। দ্যাখো-
আস্কিং রানরেটের মতন চাহিদারেখা উঠে যায় শক্তিকেন্দ্রের চ‚ড়ায়।
[রাই সরিষারকাব্য/ শেষ হেমন্তের জোছনা]

“আজও তো আমাদের ছোট জুতোয়/ বড় পা-এমনতর প্রকল্পের প্রশংসা করতে হয়!’’ এই পঙক্তিতে ব্যবহৃত শ্লেষ, কষাঘাত এবং তারসঙ্গে রচনার রসময় বুনন ইত্যাদি স্যাটায়ারকে উপভোগ্য শিল্প উন্নীত করেছে। অনুরূপভাবে “ দ্যাখো- আস্কিং রানরেটের মতন চাহিদারেখা উঠে যায় শক্তিকেন্দ্রের চ‚ড়ায়।’’ পঙক্তিটি তৈলবাজির ক্রমবর্ধমান ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও ব্যবহারের দিকটিকে ক্রিকেট খেলার প্রতিযোগিতার চিত্রকল্পে মূর্ত  করে তোলা হয়েছে নান্দনিক সৌন্দর্যের দিকটি অক্ষুণ্ণ রেখে সবটুকু। আমিনুল ইসলাম সরকারি করেছেন বহু বছর। সরকারি চাকরিতে তার নানাবিধ অভিজ্ঞতা তাঁকে সমৃদ্ধ প্রজ্ঞার অধিকারী করেছে। তিনি রাষ্ট্রের আইনকানুন বিধিবিধান ইত্যাদি বিষয়ে পুরোমাত্রায় ওয়াকিফহাল।  সেসবের ফাঁকফোকর সম্পর্কেও তার ধারণা পরিস্কার । আমিনুল ইসলাম তাঁর বিভিন্ন কবিতায় আইনকানুন বিধিবিধানের মতো নীরস বিষয়কেও ব্যবহার করেছেন দক্ষতা সাথে। কবিতায় যাতে শৈল্পিক রসের অভাব না ঘটে সেজন্য তিনি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কবিতার ভাঁজে ভাঁজে গুঁজে দিয়েছেন স্যাটায়ার বা পরিহাসধর্মী উপাদান ও উপকারণ। সমাজে চুর ডাকাতি রাহাজানি ধর্ষণ, লুণ্ঠন, সাম্প্রদায়িক হানাহানি, যুদ্ধবিগ্রহ প্রভৃতি সকল ধরনের অপরাধের ও অন্যায়কর্মের হোতা হচ্ছেন পুরুষজাতি এবং তাদের মূল অস্ত্র পুরুষতন্ত্র। অথচ হাজার অপকর্ম করেও তারা লজ্জিত বোধ করে না। সাজাপ্রাপ্ত হয়েজেল খাটার পরও তারা সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে পারে , গলাবাজি করতে পারে। আবার উলটো তারা লজ্জাশীলতা, শরম , সম্ভ্রম ইত্যকার বিষয়গুলো কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করে নারীর ওপর চাপিয়ে রেখেছে। রাষ্ট্রের আইন পুরুষ ও পুরুষতন্ত্রের সৃষ্টি। সেই আইনে শ্লীলতাহানি বা শালীনতাহানি কিংবা সতীত্বহানির গ্লানি কেবলমাত্র নারীর জন্য রেখেছে। আইন মোতাবেক কোনোকিছুতেই পুরুষের শালীনতা বা শ্লীলতাহানি ঘটেনি, তার সতীত্ব নষ্ট হয় না। আমিনুল ইসলাম পরিহাস ও বিদ্রুপের কষাঘাতে পুরুষতন্ত্র ও তার ধারকবাহক পুরুষজাতিকে জর্জরিত করতে চেয়েছেন তাঁর কবিতায়। উপমা, চিত্রকল্প, শব্দ ইত্যাদির অভিনবব্যবহার এবং রসালো নাটকীয়তা তাঁর স্যাটায়ারকে উন্নতও উপভোগ্য শিল্পে উন্নীত করেছে।  তেমন অনেক কবিতার একটির নাম ‘লজ্জার পক্ষপাত’।

এই আমিন, তুমি এত এত খারাপ
কাম করো,
হরহামেশাই—
ক্ষমতার উগ্র অপব্যবহার,
লুঙ্গির নিচের গালি,
তারপরও দাঁত কেলিয়ে হাসো !

রাতে এলে টিয়াপাখি নিয়ে-
মাতো ক্লাবে,
দিনের বেলা–
টিপে ধরো তারই গলা;

আর এসব নিয়ে কিছু বলতে গেলে
সাতখুন মাফের স্লোগান দিয়ে
গলাবাজি করো !

আচ্ছা, তোমার লজ্জা করে না?

না রে মনু, মুই বরিশালের
হই বা না হই,
মোরা হক্কলেই ব্যাডা ছেলে-
আইনের লোক।

আর দ্যাখো—
পুরোনো ৩৫৪ অথবা নতুন ১০,
আইন বলছে,
পুরুষের কোনো সম্ভ্রম নেই
লুঙ্গি-প্যান্ট খুলে নিলেও তার
শ্লীলতাহানি হয় না,
অতএব তার-
লজ্জা থাকার কোনো সুযোগ নেই..
হা হা হা ! হি হি হি !! হো হো হো !!!
[লজ্জার পক্ষপাত / হিজলের সার্কিট হাউস]

পুরুষজাতির একটা বড়ো অংশই যৌনতার বিবেচন ভণ্ড ও প্রতারক। তারা মুখে পরকিয়াকে ব্যাভিচার বলে নিন্দা করে, পুুরষ সৃষ্ট আইনেও সেজন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তারা চায় তাদের নিজেদেও স্ত্রীগণ পতিভক্ত ও সতীসাধ্বী থাকবে। কিন্তু নিজেদের স্ত্রীদের ফাঁকি দিয়ে অন্য নারীর সঙ্গে পরকিয়ায় লিপ্ত হওয়াকে গৌরবের মনে করে, একে কেউ কেউ প্রগতিশীল জীবনের উজ্জ্বল অংশ বলেও প্রচার করে। পুরুষজাতির এই ভণ্ডামি ও প্রতারণামূলক আচরণকে আমিনুল ইসলাম স্যাটায়ারধর্মী কবিতা করে তুলেছেন। বাস্তব অভিজ্ঞতা, কল্পনাশক্তির জোর, ইতিহাসের উপাদান , সমাজবিজ্ঞান ও ধর্মশাস্ত্রের প্রয়োগ, সর্বোপরি  উপস্থাপনার উপভোগ্যতা তাঁর এধরনের কবিতাকে উৎকৃষ্ট শিল্পে পরিণতি দান করেছে। তেমন একটি কবিতার নাম ‘হেরেমখানা’।  রাজা-বাদশাহ-সম্পদের হেরেমখানা ছিল। সেটাকে এখন নিন্দনীয় মনে করা হয়। আসলেও সেটা নিন্দনীয়  বলে গণ্য হওয়া সমীচীন। কিন্তু বাস্তবে কেবল রাজা বাদশাহ আর সম্রাটগণই নয়, পুরুষরা নানা কৌশলে নানা কিসিমে নানা অজুহাতে একই সঙ্গে বহু নারীকে যৌনতায় ভোগ করে এসেছে এবং সেই ধারা এখনও অব্যাহত আছে কোথাও আগের ধরনে কোথাও-বা রূপ পাল্টিয়ে।

অবশ্য এসব হেরেমখানা
ফাইভ স্টার অন্ধকারের চাদরে মোড়ানো।
অধিকন্তু বহুগামিতার সুপারস্টার–
ব্রাহ্মণ পুরোহিত আর মোল্লারা
আজও ধরে রেখেছে বহুগামিতার সিলসিলা।
ডেরা সাচ্চা সৌদা, জলক্লাব,
প্রযোজক-পরিচালকের দপ্তর
এবং আরও কত স্থানে হেরেমখানার ঘ্রাণ!

যার হেরেমখানা আছে, সে তো তা প্রতিদিন
স¤প্রসারণের চেষ্টা করে
আর যার নাই,–
সে চেয়ে থাকে–কবে হবে একটি হেরেমখানা তার!
(হেরেমখানা/ মতিহারী ভালোবাসা)

আজকাল প্রগতিশীল এবং মৌলবাদী এই দুই ধরনে মানুষকে বিভক্ত করা হয় যদিও এই বিভাজন সবসময় বস্তুনিষ্ঠ হয় না । মূলত যাারা ধর্মের কড়া অনুসারী তাদেরকে মৌলবাদী বলা হয়। আর যারা নাস্তিক ও বিজ্ঞানচেতনার অধিকারী তাদের বলা হয় প্রগতিশীল। এই বিভাজনের স্রষ্টা পুরুষ এবং বিভাজিতও তারাই।  ধর্মীয় মৌলবাদীরা নারীজাতিকে ঘরে আটকে রাখতেচায় ধর্মের দোহাই দিয়ে আর প্রগতিশীলরা নারীকে স্বল্পবসনা, নগ্ন , ন্যুড ইত্যাদি হতে প্ররোচিত করে। উভয় গ্রæপের পুরুষই নারীকে ভোগের চোখে দেখে এবং সুযোগ পেলেই ভোগ করতেচায় এবং ভোগ করে।  তারার কেউই বা কোনো গ্রুপের পুরুষই নারীকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখে না, নারীতে তার ব্যক্তিত্বের, সৃজনশীলতার ও প্রতিষ্ঠা সৌন্দর্যে দেখে না। আবার তারাই নারীর সমাধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে গলা ফাটায়। আমিনুল ইসলাম তার ‘সখিনার সুন্দরী হওয়া’, ‘মাছিতন্ত্র’, ‘সোনাভান’, ‘সে আমার এমনই একজন’ প্রভৃতি কবিতায় বিষয়টি তুলে ধরেছেন হাস্যরস সহকারে।

যুবতিদের কালো হাঁড়িতে ঢুকিয়ে ঢাকনা আঁটা হচ্ছে;
তর্জন গর্জন সহযোগে তাড়ানো হচ্ছে মধুপ:
দেখ্ছ না কত রস! কত কীট! ঢেকে দাও;
নইলে আসমান ভেঙে পড়বে রাজার মাথায়!

অন্যদিকে প্রতিপক্ষ গলা: ভারি অন্যায়! ঢাকনা কেন?
বরং নীবিবন্ধ খুলে দিয়ে অবাধ হাওয়ায় ছেড়ে দাও
তারা তো প্রকৃতিরই বোন। আর আমাদের পুরুষচন্দ্র
রাজা তো আধুনিক মানুষ- খোলামেলাই পছন্দ করেন!

হাতাহাতিরত শব্দের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে যুবতিদের গলা।
[মাছিতন্ত্র / কুয়াশার বর্ণমালা]

সমাজের মানুষকে শাসন করে রাষ্ট্র। আর রাষ্ট্র চালায় রাজনীতিকগণ। উন্নত বিশ্বেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে নাগরিকদের অধিকার বেশি এবং রাজনীতিও সামাজিক দায়বদ্ধতার নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু অনুন্নত বা উন্নয়নশীল তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনীতি থাকে গডফাদার, মাফিয়া ডন, অসাধু ব্যবসায়ী ও লুটেরা শ্রেণির মানুষের হাতে। এদের একটা বড়ো অংশই ফৌজদারী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে ভয়ংকরভাবে। কিন্তু  আইনের শাসনের ন্যায়বিচারের অভাবজনিতকারণে তাদের কোনো শাস্তি হয় না। শাস্তি হয় শুধু দুর্বলের। শাস্তিহয় কেবল সাধারণ মানুষের। এমনকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর গণহত্যা চালানো রাজনৈতিক নেতা বা মাফিয়া ডন দেশের প্রধান নির্বাচিত হন– এমন নজিরও রাজনীতিতে আছে। আমিনুল ইসলাম বিষয়টিকে পরিহাসের কষাঘাতে রক্তাক্ত কবিতায় রূপ দান করেছেন। অনন্য প্রাতিস্বিক কাব্যভাষার গুণে আমিনুলের এধরনের কবিতা স্লোগানধর্মিতাকে পরিহার করে নান্দনিক সৌন্দর্যের শিল্পে উন্নীত হয়েছে। এখানেই আমিনুলের কাব্যশক্তির উজ্জ্বল অনন্যতা।

যদি একটা খুন করেছো,- ফৌজদারী অপরাধ
ফাঁসি অথবা যাবজ্জীবন;
আর যদি সাত কিংবা সহস্র খুন
তুমি হিরো,
হতে পারে–রাজ্য থেকে রাজধানী
তোমার গাড়িতে রাষ্ট্রীয় পতাকা
তোমার উপস্থিতিকে সশব্দ স্যালুট,
তোমাকে স্বাগত জানাতে পারে সিংহাসনও।

দ্যাখো, ইতিহাস রেপ্লিকেটেড আজ–
খণ্ড খণ্ড
এখানে ওখানে দেখা না-দেখা কতখানে…
[পরাবাস্তব চিত্রকল্প/ মতিহারী ভালোবাসা]

আমরা রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ নামক কবিতায় দেখেছি, সমাজের বড়ো বড়ো চোর কীভাবে সম্পদ চুর করে নিজে সাধু সাজে আর সম্পদ খোয়ানো নিরীহ নির্দোষ মানুষকে সমাজে কাছে চোর সাব্যস্ত করে। জমি হারানো উপেন জমি গ্রাসকারী জমিদারের উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বলে:

আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি এই ছিল মোর ঘটে
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ আমি আজ চোর বটে।
[দুই বিঘা জমি/ চিত্রা]

এ বিষয়টি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিভিন্ন কবিতায় তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষায় তুলে ধরেছেন।

কে তোমায় বলে ডাকাত বন্ধু, কে তোমায় চোর বলে?
চারিদিকে বাজে ডাকাতি ডঙ্কা, চোরেরই রাজ্য চলে!
চোর-ডাকাতের করিছে বিচার কোন সে ধর্মরাজ?
জিজ্ঞাসা করো, বিশ্ব জুড়িয়া কে নহে দস্যু আজ?
বিচারক! তব ধর্মদণ্ড ধরো,
ছোটোদের সব চুরি করে আজ বড়োরা হয়েছ বড়ো!
যারা যত বড়ো ডাকাত-দস্যু জোচ্চোর দাগাবাজ
তারা তত বড়ো সম্মানী গুণী জাতি-সঙ্ঘেতে আজ।
[চোর-ডাকাত/ সাম্যবাদী]

আগে চুরি ছিল পেটের দায়ে এবং ধনী হওয়ার লোভে। ক্ষুধাতুর অন্নহীন এক প্লেট খাবার পেলে চুরি করতো অন্যদিকে জমিদার-শিল্পপতি চুরি করতো শ্রমিকের প্রাপ্যের একাংশ। সেসব চুরি সহজে শনাক্ত বোঝা যেতে তা এবং সনাক্তযোগ্য ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের, প্রযুক্তির বিকাশে এবং মানুষের উচ্চশিক্ষাজনিত মেধার জোরে এখন চুরিতে নানাবিধ মাত্রা ও ধরন যুক্ত হয়েছে। আগে বলা হতো গোরুর চুরি, মুরগিচুরি, ফসলচুরি, কম্বলচোর, সিঁধেলচুরি, পুকুরচুরি। এখন আরও বলা তেলচোর, খনিচোর, সমুদ্রচুরি, ব্যাংকডাকাত, ভোটচোর। অবস্থা এমন যে ছোটোখাটো চুরি চোরোর ধরা পড়লে আইনে তাদের শাস্তি হয় কিন্তু বড়ো বড়ো চোরেরা থেকে যা ধরাছোঁয়ার বাইরে। থানা-পুলিশ আইন-আদালত, জাতিসংঘ কেউই তাদের স্পর্শ করতে পারে না। কারণ সেসব তারাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আমিনুল ইসলাম কটাক্ষ করে বলেছেন,“বর্গীর রকের্ড মোছে বিশ্বব্যাংক ধূর্তহাতে জলে ও ডাঙায়।’’ (অক্ষম উচ্চারণ)  তবে আমিনুল ইসরাম যখন কবিতায় পরিহাস বা স্যাটায়ারের আশ্রয় নেন, তখন তা সৃষ্টি হিসেবে আরও বেশি শানিত, তির্যক ও লক্ষ্যভেদী অর্থব্যঞ্জনার ও শৈল্পিক সৌন্দর্যের অনুপম সৃষ্টি হয়ে ওঠে। তেমনি একটি কবিতা :

সাবধান হে চোর মহোদয়, আর মুরগিচুরি নয়!
হাজতের চাবি আর হাতকড়া হাতে নিয়ে
দ্যাখো নাকি–দাঁড়িয়ে আছেন থানা মহাশয়!
জেনে রাখো–মুরগি চোরকে ঘৃণা করে–
জনতা ও জেলখানা, থানা ও দুদক,
উকিল ও আদালত–, অধিকন্তু সকলেই প্রায়।

তারচেয়ে–যদি পারো গিলে খাও দিঘি ও পুকুর
জেনে নাও হজমের হাল;
ভালো? অতএব
অতঃপর আস্ত একটি বঙ্গোপসাগর
জঙ্গলে বা জাতিসংঘে তখন আর কে তোমাকে আটকায় হে বীর!
[চোরের জন্য কনসালটেন্সি/ আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট]

আমিনুল ইসলামের পরিহাস থেকে রক্ষা পায়নি দেশ থেকে বিদেশ, উঠোন থেকে জাতিসংঘ কোনোকিছুরই দ্বিচারিতা ও ভণ্ডামি। অন্তর্জাতিকপর্যায়ের নেতাগণ সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্ব, আলোকিত বিশ্ব  ইত্যাদি গাল ভরা বুলি আওড়ায় আর তারা  নিজেরাই সামরিক সন্ত্রাস চালিয়ে ধ্বংস করে দুর্বলদেশগুলোকে, লুট করে নেয় তাদের ভূ-গর্ভস্থ তরল সম্পদ, উন্নতসভ্যতার নামে তারা রচনা করে মাৎস্যন্যায় ও জঙ্গলনামা। তারা বেশে বেশিষ কওে উৎপাদন করে মারণাস্ত্র আর সেসব কিনতে বাধ্য করে অন্য রাষ্ট্রসমূহকে। তারা প্রগতিশীলতার কথা বলে মুখে কিন্তু নিজেরাই নতুন ধরনের ক্রুসেডের জন্ম দেয়। সেইপথেই আজ বিশেষত মধ্য্রপাচ্য ও আফ্রিকার মুসলমান জন-অধ্যুষিত দেশগুলোকে ধ্বংস করে এসেছ একের পর এক এবং সেই সর্বনাশা ধারার এখনও অব্যাহত আছে। একইভাবে দেশে-বিদেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, অবাধ ভোটধিকার, সবার জন্য কর্মসংস্থান ইত্যাদি গালভরা বুলিগুলো রাজনীতিবিদদের মুখে আওড়াতে দেখেছেন আমিনুল ইসলাম। আজকাল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনীতিবদগণের একটা বড়ো অংশই তাদের জনগণ বা ভোটার ক্ষমতায় গেলে তাদের জন্য আকাশপাতাল করার স্বপ্ন দেখায় মোটেও বাস্তবায়িত হয় না।  রাজনীতিবিদরা জেনেশুনে ভোটারদের এসব স্বপ্ন দেখিয়ে বোকা বানিয়ে ভোট নিয়ে ক্ষমতায় যায়।  এ-বিষয়টি আমিনুল ইসলাম তার একাধিক কবিতায় পরিহাস ও কৌতুকের ভাষায় পরিবেশন করেছেন।  ‘স্বপ্নের কথা’, ‘মাঘের চিঠি’, ‘ভ্রম্যমাণ ক্যামেরায়’, প্রভৃতি কবিতায় বিষয়টি ভয়ংকর সুন্দর আকার ধারণ করেছে।

হঠাৎ বামদিক হতে এক ফেরিওয়ালা
কপালে মোহন চুমু দিয়ে আমাকে জাগায়,
শব্দের ফুলঝুরি ছড়িয়ে বলে:
‘স্বপ্নছাড়া বাঁচবে কী করে ভাই?
আমার কাছে স্বপ্ন আছে!
লাল স্বপ্ন,
নীল স্বপ্ন,
লম্বা স্বপ্ন,
খাটো স্বপ্ন,
এবং পাঁচমিশালী স্বপ্ন।
স্বপ্ন দিয়েই ঢাকা আমাদের অতীত,
স্বপ্ন দিয়ে ভরা আমাদের বর্তমান,
স্বপ্ন নিয়েই যাবো আমরা ভবিষ্যতে।
তুমি হয়তো জানো না, তোমার সে পূর্বপুরুষেরা
ভূুরি ভুরি স্বপ্ন দেখতেন,
আর প্রত্যেক সকালে খোয়াবনামা ঘেঁটে
গফুর মারফতীর কাছে ব্যাখ্যা শুনতেন হা করে;
আর তাজ্জব তুমি-
সেই বংশের ছেলে হয়ে কাটাতে চাও স্বপ্নহীন রাত?’

আমি বলি: ‘শূন্য গোলা, শূন্য গোয়ালও–
আকাশের নিচে অগণিত মাথা;
স্বপ্ন দিয়ে তো ক্ষুধাতুরের পেট ভরে না একবেলাও!’

ফেরিওয়ালার বিরক্ত স্বর: ‘আহা! বোঝো না কেন-
স্বপ্নটাই মানুষের জীবন!
রুটি-মাংস-ডালভাত এইসব আদতে ইতর-চাহিদা;
জেনে রাখো–একমুঠো স্বপ্ন বহুগুণে মূল্যবান
একগুদাম মোটা চালের চেয়ে;
আমাদের গরুমার্কা স্বপ্নগুলো কালোত্তীর্ণ
আর এ কৃষিপ্রধান দেশে কার্যকরী ষোলআনা;
অতএব নিজে নাও,
বাড়তি দামে অন্যদেরও দাও,
বেশি বেশি;  ঠকবে নাকো মোটেই।’
[স্বপ্নের কথা/ তন্ত্র থেকেদূরে]

ভীষণভাবে সমাজ সচেতন আমিনুল ইসলাম  দেশের বিদেশের অনেক রাজনীতিবিদ দেশের সম্পদ লুণ্ঠন ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে রাতারাতি অঢেল সম্পদেও মালিক বনে যাওয়া এবং যোগ্যতা  না -থাকা সত্ত্বেও সাহিত্য-সংগীতের আসরে প্রধান অতিথি হওয়ার বিষয়টিকে ব্যঙ্গ  করে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। পাশাপাশি আমলাতন্ত্রে রয়েছে নানাবিধ দ্বিচারিতা এবং সবকিছুর মাঝে প্রটোকল-প্রিয়তা ও প্রটোকল-উৎকণ্ঠা। আমলাতন্ত্রের পারিবারিক জীবনের একটি দিক নিয়ে আবদুল গণি হাজারী রচিত ‘কতিপয় আমলার স্ত্রী’’ কবিতাটি ব্যাপকভাবে পরিচিত ও বিখ্যাত। আমিনুল ইসলাম রচিত এ-ধরনের কবিতাসমূহের মধ্যে ‘প্রদীপের নিচে: একটি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট’, ‘ভিআইপি ভবন এবং রমনার কোকিল’, ‘ব্যুরোক্রেসি: এ থ্যাংকলেস জব’,  ‘স্বপ্নের উঠোনে সনদহীন উমেদার’  ‘হাওলাদার ভাই’ ইত্যাদি প্রধান। যথোপযুক্ত শব্দের ব্যবহার, অভিনব উপমার প্রয়োগ, অসাধারণ সুন্দর চিত্রকল্প এবং হাস্যরসের শৈল্পিক সচ্ছলতা কবিতাগুলোকে লক্ষার্জন সহায়ক এবং উপভোগ্য করে তুলেছে। এসব কবিতায় আমিনুল ইসলামের অসম সৎসাহস ও অতুলনীয় সৃজনশীল শক্তির ছাপ পরিস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। দু-ধরনের দুটি উদাহরণ:

ক.
রবীন্দ্রসংগীতের ঘ্যানঘ্যানানি আর নজরুলসংগীতের ঘোরপ্যাঁচে
সময়ের অপচয় করার মতো সময় নেই! ভাওয়াইয়ার হুল্লোড়ে
তালা লাগে তার কানে। অথচ সংগীত প্রতিযোগিতার উৎসবে মূল
মেহমানের আসনে বসে সে কী মাথাদোলানী! সম্রাট আকবরের
তৃণমূল সংস্করণ বলে ফিসফাস করেছিলেন গুটিকয় হরফুন মৌলা।

আঙুল-কলাগাছের উপমা তো নয়, তার কাছে জগতশেঠও নস্যি;
অথচ আয়কর বিভাগ খুঁজে পায় নাকো তাকে কোনো উৎসেই!
[হাওয়লাদার ভাই/ জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার ]

খ.
পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন ও আইন জমে হয়েছে পাহাড়!
তবে ‘কর্তার ইচ্ছাই কর্ম’-এটাই হিমাদ্রীর চূড়া,
আর একথা সেখানে স্বপ্নেও ভোলে না কেউ;
অবশ্য কর্তা কে-এই প্রশ্নের উত্তর–
কখনো রোদ, কখনো-বা জোছনা।
উঠুন!
জী স্যার।
বসুন!
জী স্যার।
হাঁটুন!
জী স্যার।
দৌড়ান!
জী স্যার।
ফলে কোনোদিনও শেখা হয় না দাঁড়াতে নিজপায়ে;
ফলে নিজ মেরুদন্ডে সোজা হয়ে দাঁড়ায়নি সিস্টেম।
[প্রদীপের নিচে: একটি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট / জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার ]

আইনকানুন ও বিধিবিধান মোতাবেক আমলাতন্ত্র বা রাষ্ট্রের যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা বিভাগ পরিচালিত হওয়ার কথা। সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম, জনস্বার্থ ইত্যাদি হওয়ার কথা সবচেয়ে বড়ো পরিচালিকা শক্তি। তবেসবার ওপরে থাকাকর কথা নিরপক্ষেতা। সরকার বদল হয় কিন্তু রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র ও নানবিধ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীও কর্মকর্তারা রয়ে যান। তারা কোনো দলীয় কর্মীও নন। দল-মত-ধর্ম-গোষ্ঠী-অঞ্চল নিরপেক্ষতাই তাদের অক্ষুণ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে  বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-মায়ানমারসহ অনেক দেশেই এই নিরপক্ষেতা ক্ষুণ্ণ হয়। তাতে করে অন্যায় এবং অবিচারের সম্মুখীন হয় সংশ্লিষ্ট দেশ ও সমাজের নাগরিকদের একটা অংশ যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাছাড়াও নানাবিধ হস্তক্ষেপ ও তদবিরের নামে চাপ আসে। যে সকল কর্মচারী-কর্মকর্তা সেই হস্তক্ষেপ ও চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন না, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কপালে ‘শাস্তিমূলক বদলি’,‘ পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়া’ ‘ওএসডি হওয়া’ ইত্যাদি জুটে।  আমিনুল ইসলাম একটি ছোটো আয়তনের পরিহাসমূলক কবিতাটির মাধ্যমে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন শিল্পের ধর্ম ও সৌন্দর্য বজায় রেখে।

ছেলের কথায় বদলি করিনি
ছেলের কথায় বদলি হয়েছি
ছেলেটি আমার ছিল নাকো
বদলিটাও ছিল নাকো আমার
ছেলেটি আমার হয়নিকো
বদলিটা আমার হয়েছে।
[প্রশাসন/ মতিহারী ভালোবাসা ]

নারীস্বাধীনতা ও নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষের আন্দোলনের নামই নারীবাদী আন্দোলন। অপ্রিয় বাস্তবতা হলো এসকল আন্দোলন অধিকাংশ ক্ষেত্রে লোক দেখানো এবং সমস্যার মূলকে এড়িয়ে তার ডগা-পাতা নিয়ে হইচই করার নামান্তর। বেগম রোকেয়া  বা তসলিমা নাসরিনের  মতো নারীবাদীর সংখ্যা একেবারে কম বলা যেতে পারে তারা ব্যতিক্রম। সমাজের বা রাষ্ট্রের নারীবাদী নেত্রীদের বড়ো অংশটাই পারবিারিক ও রাজনৈতিক দলের স্বার্থের ক্রীড়নক মাত্র। নিজ দল অথবা গোষ্ঠীর লোকেরা নারীর বিরুদ্ধে জঘন্য প্রকৃতির অপরাধ সংঘটন করলেও এরা চুপচাপ থাকে, দেখেও না দেখার ভান করে। আর অন্য কোনো লোক নারীর বিরুদ্ধে ছোটোখাটো অন্যায় করলে এরা মিছিল স্লোগানে সোচ্চার হয়ে ওঠে। এতে করে দলীয় বা গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষিত হয় বটে কিন্তু নারীর মুক্তির খাতায় অর্জিত হয় শূন্য। বিষয়টি সূক্ষ্ণ ও শানিত স্যাটায়ার সহযোগে কবিতা করে তুলেছেন আমিনুল ইসলাম ।

নারীবাদ
টিপ নিয়ে
ফাটাফাটি
বলাৎকার বাদ
[নারীবাদ : ঢাকাই সংস্করণ / মতিহারী ভালোবাসা ]

বিশ্বায়নের এই যুগে অবাধ আকাশ মিডিয়া এবং ইন্টারনেট সারা পৃথিবীকে অন্তত যোগাযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত করেছে। এখন ঘরে বসেই সমগ্র পৃথিবী দেখা যায়। পৃথিবীর কোথায় কী ঘটছে বড়ো ধরনের তা মিনিটের মধ্যেই চলে আসছে মুঠোফোন হাতে অথবা ল্যাপটপ কোলে জাগ্রত মানুষের সামনে। আগের তুলনায় বৈশ্বিক কার্যকলাপের ট্রান্সপারেন্সি বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক অনেক বেশি। সে বিবেচনায় প্রযুক্তি শাসিত ও চারিত মানুষের হৃদয়-মন অতীতের তুলনায় বড়ো হওয়ার কথা । কিন্তু ঘটেছে উল্টোটি। আমিনুল ইসলাম ‘কুয়োর ব্যাং’’ বাগধারাটিকে কেন্দ্রে রেখে এসময়ের মানুষের হৃদয়-মনের দিক থেকে ক্ষুদ্র হয়ে যাওয়ার বাস্তবতাকে উপস্থাপন করেছেন প্রচণ্ড স্যাটায়ারের ব্যবহার ঘটিয়ে। একবিতা ভাবনার দিক থেকে অভিনব, কাব্যভাষাও উজ্জ্বল প্রাতিস্বিকতায় অনন্য। কবিতাটির শেষাংশ:

আহা কী সুখ, দার্শনিক অনিদ্রায় রাত জেগে কষ্টকল্পনার
কষ্ট থাকছে না আর! এই সুযোগে শামুকের কাছে প্রাইভেট
পড়ে শিখে নিচ্ছি গুটিয়ে নেওয়ার পাঠ;
কেননা, যেমন খাপটি- তেমনটি তলোয়ার!
ও ভাই ব্যাং, ও বোন কুয়ো,–এই কান ধরলাম,
আর গালি দেওয়া নয়,
দ্যাখো–ইতোমধ্যেই কতখানি ছোট হয়ে এসেছি আমি!
[কুয়ায়ন / আমার ভালোবাাস তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট]

এসব ক্ষুদ্র মনের মানুষ পৃথিবীকে যা কিছু উপহার দিচ্ছে সেসবই ক্ষুদ্র  ও অমহৎ। অতীতের তুলনায় আজ মানুষে মানুষে জাতিতে জাতিতে ধর্মে ধর্মে মনের দিক থেকে দূরত্ব ও বিভেদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্মকেন্দ্রিক সংকীর্ণ ও উৎকট জাতীয়তাবাদ সংখ্যালঘু মানুষের জন্য ভয়ংকর নিপীড়ন ও  যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠেছে। তেমনি অন্য মানুষের অথবা অন্য ধর্মের মানুষের মহৎ সৃষ্টি বা সুকীর্তিকে সহ্য করতে অপারগ হয় ক্ষুদ্রায়িত মনের মানুষ। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা কিংবা নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অথবা বিশ্ব-ঐতিহ্য ঘোষিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমের মিনারকে এধরনের ক্ষুদ্রমনের ক্ষমতাধারী মানুষদের মারাত্মক ঘৃণাবাদী অপপ্রচার ও ভয়ংকর প্রতিহিংসার শিকারে পরিণত হতে দেখা গেছে। আমিনুল ইসলাম বিশ্বসভ্যতা ও বিশ্বমানুষের একজন গভীর ও নিবিড় পর্যবেক্ষক হিসেবে এসব অবলোকন ও উপলব্ধি করেছেন যথাযথভাবে এবং মহৎ কাব্যশক্তিবলে তুলে ধরেছেন পরিহাসমাখা উৎকৃষ্ট মানের কবিতায়। উপরে উল্লিখিত ‘কুয়ায়ন’ শীর্ষক কবিতা ছাড়াও আরও কয়েকটি স্যাটায়ারধর্মী কবিতায় আমিনুল ইসলাম বিষয়টিকে উপস্থাপন করেছেন। সেসবের একটির নাম ‘কচুখেতের হাসি’। নামকরণটিই দারুণ সুন্দর ব্যঞ্জনাগর্ভ। কবিতাটি পাঠ করা যায় :

আমাদের চারপাশে বিস্তারিত কচুখেত
সেই খেতে খোলা হাওয়ায় দোলে
বামনচাষের হাসি
আমাদের মাটিবর্তী দেহ, শয্যাবর্তী মন
ঘাড়ে ব্যথা নিয়ে তবে আর কাম কী
আকাশবর্তী তালগাছের শাখায় ঝুলে থাকা
বাবুইয়ের স্বর্গ দেখে! তাই তো
আমরা ইতিহাসের উঠোন থেকে
কুড়াল এনেছি-
কুড়াল,
আমরা অনার্যের ওয়ারিশ কি না!
বটগাছের দিন তো শেষ
আমগাছের গোড়ায় শেষ সামন্তের জল
অতএব কচুক্ষেত; হাহা! হো-হো! হিহি! …
[কচুখেতের হাসি/ কুয়াশার বর্ণমালা]

বুদ্ধিজীবী শ্রেণিকে নিয়ে আমিনুল ইসলামের কয়েকটি কবিতায় অতি চমৎকার কয়েকটি পরিহাসসমৃদ্ধ বর্ণনা আছে। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘মাঘের চিঠি’,‘তন্ত্র থেকে দূরে’, ‘কালিহাতে জ্ঞানপাপী গুণিজন চুপ’, ‘এইসব শেয়ালেরা’,  প্রভৃতি কবিতার নাম উল্লেখযোগ্য। বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক রোমা রোলাঁ তাঁর বন্ধুর কাছে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘বুদ্ধিজীবীরা সরকারের চেইনবাঁধা কুকুর’। আল মাহমুদ তাঁর বিখ্যাত ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায় বুদ্ধিজীবীদেও সম্পর্কে বলেছেন: ‘‘মগজ বিকিয়ে দিয়ে পরিতৃপ্ত পণ্ডিতিসমাজ’’। আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের দেখেছেন দলান্ধ গোষ্ঠীবাজ, স্বার্থপর ও জাতির স্বার্থের বিপক্ষে ভূমিকা পালনকারী মানুষ হিসেবে। তিনি তাদের বিষয়ে পরিহাস ও বিদ্রুপের কটাক্ষ হেনে রচেছেন অনুপম পঙক্তিমালা :

বুঝতেই পারছো- নিজঘরে বিপন্নরাত
প্রভাত মানেই নব হতাশার আবরণ উন্মোচন;
বিভ্রান্ত যত বুদ্ধিজীবী নষ্ট আগুনে বুক পেতে
জাবর কাটে গোষ্ঠীশালায়।
এরা খায়, জাবর কাটে
আর তারকাখচিত শিং দিয়ে দুই বেলা স্বজাতিকেই গুঁতোয়!
[মাঘের চিঠি/ মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম ]

আমিনুল ইসলামের পরিহাস চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে ‘হস্তমৈথুনের কবিতা’ নামক একটি কবিতায়। হস্তমৈথুনের মতো একটি একতরফা যৌনক্রীড়া বিষয়কে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করত জন্মগতভাবে সৃজনক্ষমতারহিত ব্যক্তিদের সৃজনশীলতার চর্চা ও গলাবাজিকে বিদ্রুপ করে রচিত কবতিাটিতে হাস্যরস ও পরহিাস ব্যবহৃত হয়েছে অব্যর্থ তিরের মতো। সৃজন মেধাহীন ব্যক্তিরাও লোভে পড়ে কবিতা রচতে চেষ্টা করে, গল্প-উপন্যাস লিখার কসরৎ করে কখনো-বা চিত্র আঁকতে প্রয়াসী হয়।অভিনব চিত্রকল্প ও উপস্থাপনার নাটকীয় ব্যঞ্জনা কবিতাটিকে সমৃদ্ধ করেছে নিবিড় শিল্পরসে এবং গভীর উপভোগ্যতায়। এধরনের কবিতা নেই বললেই চলে । পাঠকের উপভোগের কথা বিবেচনায় পুরো কবিতাটিউদ্ধৃতি করছি :

আহা রে স্বপ্নের রাত–ছকবাঁধা, ফরমুলা শাসিত!
কেই নেই–বউ বা বান্ধবী
কিছু নেই–পাঠ কিংবা পাঠাগার
ছিলো কি কখনো? স্মৃতির নক্ষত্র কই?
অথচ রজনী জাগা !
জেগে জেগে কী দেখো রে চোখ!
শহরের সিলেবাস রাখেনি জোনাকি
বন্ধ বাথরুমে শুধু শুধ জমে ওঠে নিঃসঙ্গতা
দায়হীন..ভারহীন..
অতএ..আতঃপর একা একা..
ও মেরে সোনা রে .. .. সোনা!

হায় রে ভোরের পাঠশালা, কত কৌতূহল–
পুত্র না কন্যা সন্তান !
পণ্ডিতের ঘাম ঝরে.. ঘাম ঝরে.. ঘাম ঝরে..
[হস্তমৈথুনের কবিতা / আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট]

আমিনুল ইসলামের স্যাটায়ার কবিতার বিষয়-বিস্তৃতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রসারিত। তিনি ইতিহাস সচেতন কালসচেতন কবি। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, উপনিবেশবাদ, আগ্রাসন, অন্যায় যুদ্ধ, ক্ষমতাধর দেশগুলো কর্তৃক সামরিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর তেল  ও খনিজ সম্পদ লুণ্ঠন প্রভৃতি তাঁর কবিতায় স্থান পেয়েছে।  গণতন্ত্রের লেবাস পওে বড়ো বড়ো রাষ্ট্রগুলোর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দমন পীড়ন, ইতিহাস বিকৃতিকরণ, সংখ্যালঘুদের গৌরবের স্মারকগুলোর ধ্বংস সাধন এসব কিছুই তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে। এ সকল কবিতায় তির্যক শব্দাবলি, স্যাটায়ারধর্মী বাক্য ও পরিহাসগর্ভ চিত্রকল্প ব্যবহৃত হয়েছে অত্যন্ত জুতসইভাবে। এতে করে তাঁর প্রতিবাদ-পরিহাসের কবিতাও শিল্পগতভাবে উপভোগ্য ও উত্তীর্ণ হতে পেরেছে।  কয়েকটি উদাহরণ:

ক.
আলোকায়নের টাই পরে আন্তর্জাতিক ডাকাতির জন্য
মন্ত্রণালয় আছে,
ইথনিক ক্লিনজিং আর গণহত্যার জন্য মন্ত্রণালয় আছে,
আছে চোরের মায়ের রাষ্ট্রীয় সংস্করণ তথ্য মন্ত্রণালয়,
কিন্তু ভালোবাসার কথা প্রচারের জন্য
নেই কোনো মন্ত্রণালয়,
নেই কোনো বিবিসি-সিএনএন–আল জাজিরা।
[বঙ্গোপসাগরের দুইপাড়ে / প্রেমিকার জন্য সার-সংক্ষেপ]

খ
তেলির দুয়ারে হানা: ছাড় ব্যাটা জলমূল্যে তেল
তুই ব্যাটা ঘাড়ত্যারা–কথা কস্ নাহক বেহক
আমরা সুসভ্য দ্যাখ্ কাকে বলে সভ্যতার খেল!
অগ্নিবীর্যে উদবেলিত ক্রুসেডের লিঙ্গ টমাহক।
[সভ্যতার সংঘর্ষ / ভালোবাসার ভূগোলে ]

গ
তুমি আমার দ্বিতীয় জনমের বন্ধু’
আমি নিজেই জোর গলায়
একথা বলতে চাই-
হাটে মাঠে ঘাটে
বৃক্ষদের জলসায়
¯্রােতের আসরে
মিডিয়ায়, জাতিসঙ্ঘে
সবখানে;
তুমি শুধু আমার টুঁটি থেকে হাত সরিয়ে নাও!
[বন্ধুত্ব / হিজলের সার্কিট হাউস]

ঘ.
কী দোষ তাদের? হায়, তাদের পূর্ব-প্রজন্ম নাকি পড়শি
ভূগোলের আমবাগান ছিল অপ্রমাণিত কোনো এক কালে!
অতএব তাদের শাখায় থাবা, সমূহ শেকড়ে দাঁত!

মানুষ নেকড়ে হলে বৃহত্তম গণতন্ত্রও জঙ্গল হয়ে ওঠে।
[জঙ্গলায়ন / জলের অক্ষরে লেখা প্রেমপত্র]

ঙ.
দ্যাখো– আলোর বো টাই খুলে রেখে পাশে,
সভ্যতার দরোজায় শুয়ে আছে বাঘ এবং নেকড়ের মহামেধাবী জোট–
নিরাপদজ্ঞানে বের হয়ে আছে আণবিক নখর ও থাবা।
এই দেখে জড়োসড়ো মরণোত্তর মধ্যযুগ।
যদি চাই–জন্মসূত্রে এদের আমরা ‘লেংটু মামা’ বলে ডাকতেও পারি!
[অন্ধরাতের এক্সরে রিপোর্ট/ ভালোবাসার ভূগোলে]

চ.
সত্যেরও রং নেই
জলের ধর্মই তাদের ধর্ম।
শয়তানের পরই একথা জেনেছিলেন
মহামতি গোয়েলবস।
তাইতো আর উপেক্ষিত এডওয়ার্ড সাঈদ নয়,
মিডিয়ার নুনু নিয়ে জন্ম নিচ্ছে প্রাসাদে প্রাসাদে–
গোয়েবলসের আলোকায়িত সংস্করণ।
[বৃদ্ধ বাবা এবং সত্যের রং / জোছনার রাত বেদনার বেহালা ]

ছ.
গেরস্তপাড়ায় আজ ঘুম নেই
লাঠিহাতে দিন
লাঠিহাতে রাত;
এই নিয়ে অভিযোগ
স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে
উচ্চকণ্ঠ
ডাকাতিয়া গ্রাম।

অতএব–লাঠিগুলো সন্ত্রাসের উৎস কিনা
এমত তদন্ত নিয়ে তৎপর
মধ্যবর্তী জাতিসংঘপাড়া।
[বিশ্বায়িত গ্রাম / শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ]

জ.
আছিলা বাঁশের স্কুলে জমে ওঠা প্রাকটিক্যাাল
ক্লাস থেকে ডাকছি–
ও ইতিহাস, ও মহাকালের প্রেস সেক্রেটারি,
প্রস্তরযুগকে সঙ্গে নিয়ে একবার এসো ভাই
দেখে যাও–আলোকায়নের বিকিনি পরা রাত
ফুটো কনডম–আর ধর্ষকদের ইউনাইটেড ক্লাব!
[বিকিনি রাত এবং ফুটো কনডম / শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ]

উপরে বর্ণিত প্রতিটি কবিতাংশ আমিনুল ইসলামের আন্তর্জাতিক জ্ঞানের গভীরতা ও হালনাগাদ অবস্থা, নিপীড়িত , শোষিত ও অত্যাচারিত মানুষের মানুষের জন্য সংবেদনশীল সহমর্মিতা এবং সেসবকে মানোত্তীর্ণ কবিতা করে তোলার স্বাক্ষর বহন করে। বর্ণিত প্রতিটি কবিতাংশ নিয়ে বিস্তর ব্যাখ্যামূলক কথা বলা চলে। সেসবের বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে দুটি কবিতাংশ সম্পর্কে একটু আালোকপাত করা যায়। ঘ উদাহরণে দেখা যায় যে বহুল প্রশংসিত গণতন্ত্র আজ আর সবখানে মহৎ কোনো শাসনব্যবস্থা নয়। বেশ কিছু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষের ওপর হত্যা, গণহত্যা, নিপীড়ন চালানো হচ্ছে , তাদের জীবিকা থেকে বঞ্চিত ও ঘরবাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস এবং তাদের ধর্মীয় প্রথিস্ঠান ও গৌরবের স্মারকগুলো ধ্বংস করে দেওয়া  হচ্ছে।  কখনো অসৎ উদদ্দেশ্য প্রণোদিত আইন পাশ করে তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কায়েম করা হচ্ছে জঙ্গলের নীতি যেখানে জোর যার মুলুক তার হচ্ছে সবকিছুর নিয়ামক। আমিনুল ইসলাম তির্যকতার সঙ্গে এনাম দিয়েছেন ‘জঙ্গলায়ন’ এবং ওপরে ‘ঘ’ উদাহরণে সেই ছবি তুলে ধরেছেন স্যাটায়ার ও পরিহাসমূলক ভাষায় ও চিত্রকল্পে। বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও খনিজসম্পদ সমৃদ্ধ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ওপর চালাচ্ছে শোষণ , নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ। ইউরো-মার্কিন জোট নিজেদের সভ্য ও আলোকায়িত দেশ বলে দাবি করে আসছে এবং ঐসব দেশের ওপর আগ্রাসন, অত্যাচার ও শোষণ চালাচ্ছে সভ্যতা, গণতন্ত্র, আলোকায়ন, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার এসব মিথ্যা দাবির শতমুখী প্রচারণা চালিয়ে। ওপরের ক, খ, ঙ, চ, ছ, জ প্রভৃতি উদাহরণে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি উদাহরণেই কাব্যভাষা পরিহাসমৃদ্ধ, স্যাটায়ারে শানিত। আমিনুল ইসলামের কবিতায় আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গের ছড়াছড়ি যা সমসাময়িক কবিদের কবিতায় বিরল বললেই চলে। কিন্তু কেবল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সচেতনতার কবিতাতেই নয়, এমনকি প্রেমের কবিতার ক্ষেত্রে তিনি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞানের ছোঁয়া দিয়েছেন স্যাটায়ার ও পরিহাস সহযোগে। যেমন  তিনি একটি প্রেমের কবিতায় বলেছেন :

কিন্তু কোনো কথাই বলা হয় না
অর্থাৎ বলা যায় না।
বাগান-রক্ষকের সুরভিত ধমক নয়,
ফ্রয়েডের নুনু নুনু মস্করাও নয়,
সেমেটিক সম্পর্কের সূত্র চোখ তুলে চোখ রাঙায়;
[নিষিদ্ধ বাগানে / জলের অক্ষওে রেখা প্রেমপত্র]

গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ-সহ বিভিন্ন তন্ত্রমন্ত্র ইত্যাদির কালো অধ্যায় নিয়ে, রাষ্ট্রের ভয়ঙ্কর রূপ, ক্ষমতার দাপট, ক্ষমতার উৎস্যদের অবজ্ঞা করা, চাপিয়ে দেওয়া ইত্যাদি নিয়ে কবিতাগুলো হচ্ছে, জঙ্গলায়ন (গণতন্ত্রের ভয়ংকর রূপ উন্মোচন), আমি চেয়ার বলছি (ক্ষমতার দাপট ও অসারতা),  রাজাময় (রাষ্ট্র বা ক্ষমতার সর্বগ্রাসী বিস্তার ও  ক্ষতিকর প্রভাব), পুঁজিবাদ (পুঁজিবাদ বা ধনলিপ্সা বিষয়ে মানুষের স্ববিরোধী আচরণ), সভ্যতার সংঘর্ষ (সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতার মুখোশ উন্মোচন), অন্ধরাতের এক্সরে রিপোর্ট (আধুনিক রাষ্ট্রের প্রেমবৈরী অবস্থান ও কাজকাম), সত্য বলা না বলা (দূষিত রাষ্ট্র ও সমাজকে তীব্র কষাঘাত), ফেরকালার অধঃপতন( আধুনিক মানুষ ও রাষ্ট্রে অধঃপতন), বৃদ্ধ বাবা এবং সত্যের রঙ (রাষ্ট্র ও ক্ষমতার স্বরূপ উন্মোচন) করা হয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ :

(১) কাঁচাফলে কিল নয়, অগ্নিগর্ভ নল
দিন যায়- পচন ধরে আড়ালে আবডালে,
…জ্যেষ্ঠভ্রাতা খিস্তি পাড়ে, নষ্টভ্রাতা চতুর্মুখ;
রাষ্ট্রজ্ঞানী হতবুদ্ধি;
মুখ ঢাকে আব্রাহাম লিংকন;
লম্বোদর এ শহর চার্বাকের ঘি গিলে বেসামাল,
খুলে পড়ে পাতলুন।
নক্ষত্রখচিত গোষ্ঠীগোশালায়
পরান্নে জাবর কাটে বুদ্ধিজীবী।
এ নগরে এজমালি বৃক্ষের গোড়ায় জল দেবে কে?
…ধাবমান দিনের সন্তাপে হৃদয় আক্রাস্ত হলে
পরশ বুলিয়ে দেবে মাটিছোঁয়া সাঁঝের বাতাস।
নগরীর কুটিল দালানে জমলে জমুক যত তন্ত্রের ফ্যাসাদ
আমাদের সবুজের সংবিধান অলংঘিত-
পরিব্যপ্ত প্রাণের বর্ণমালায়।
[তন্ত্র থেকে দূরে]

(২) বটের রক্ত সুন্দরীর আঁচল রাঙিয়ে
গড়িয়ে চলেছে অর্পণগাছিয়ার জলে;
সবুজের জলসাঘরে শ্যামার আহত
কণ্ঠে বেগম আখতারের ঠুংরী…
[সংক্ষেপিত/ কল্পচিত্র]

(৪) দ্যাখো–জাতিসংঘের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে
বিকট এক অস্তিত্ব
মাথায় কেন্দ্রীয় টাক, নাভি ঘিরে মেদের বাহুল্য
হাঁটুতে বাড়তি চাপ আর
পায়ের গোড়ায় প্রবাহিত
অজস্র  মানুষের রক্ত ও ঘাম…..
[সংক্ষেপিত/ পুঁজিবাদ]

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অন্যায্য, ভণ্ডামি, কপটা, ক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে স্বরূপ উদঘাটন করা হয়েছে বাঘ-হরিণের সংসার (বড় রাষ্ট্র ও ছোট রাষ্ট্রের স¤পর্ক), কুটুম (জাতীয় রাজনীতিতে বিদেশী হস্তক্ষেপ ডেকে আনার ছবি), জল থেকে জাতিসংঘ (পক্ষপাতদুষ্ট বিচারব্যবস্থার সমালোচনা), শান্তিদেব (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডাভল স্টান্ডার্ড স্বরূপ উন্মোচন), ডায়গনোসিস আফটার অপারেশন (দুনিয়ার অশান্তির কারণ উদঘাটন) ইত্যাদি কবিতায়।

(১) ভালোবাসার মামলা ঠুকে হেরি গেছি হায়!
হেরি গেছি ভাই..হেরি গেছি বোন..
বৃথা গেলো অকাট্য সাক্ষী-সাবুদ
মেষশাবকের মতো ভাবছি ভাটিতে
ও জনক, ও জননী-,
এ কো› জঙ্গলে বলো তোমাদের গন্দম-বাগান!
…দ্যাখো- পন্ডিতের কালি মেখে গালে
শাহবাগে হাসছে কবিতা,
আর্ট গ্যালারিতে উৎফুল­ সুলতানের ভীষণ মানুষেরা!
আর তুমি! তুমি শুধু হাতে নিয়ে কাঁচি আর কড়া…..!
[সংক্ষেপিত/ জল থেকে জাতিসংঘ]

(২) ও আফ্রিকার জঙ্গলের সিংহ, ও সুন্দরবনের বাঘ
ও আমাজনের কুমির,
কবে তোমরা এসে বসবে সভ্যতার সিংহাসনে আর
আধুনিক মানুষ নামের জন্তুগুলো আলোর পাঠ নেবে
তোমাদের পদতলে বসে ? কবে ???
[সংক্ষেপিত/ রাখাইন এবং]

(৩) রবিঠাকুরের রামকানাই নই, তবু কী করো অস্বীকার করি–
ডাল ভাঙে, পত্রপু®প উড়ে যায়,
তলে তলে টান পড়ে শেকড়েও!
… বিবিসি-সিএনএন-স্টার ওয়ার্ল্ড
এরা কার কথা বলে?
পাখির টক শো কানে তোলো তুমি; ঘরে নিই আমিও।
[সংক্ষেপিত/ পাখির টক শো]

এশা (সংবেদনশীলতা ও সৃষ্টিশীলতাকে তুলে ধরা), প্রদীপের নিচে একটি অন্তর্বতীকালীন রিপোর্ট (সরকারি চাকরি অঙ্গনের ছবি), মেরুদন্ড রোগ (নীতিবান মেরুদন্ডওয়ালা মানুষের চাকরির বিপদ), থুতু (বাঙালির কপট ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতরতার ছবি), মাছিতন্ত্র (নারীস্বাধীনতা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দুই গ্রুপের একই চরিত্রের ছবি), রাইসরিষার কাব্য (তৈলমর্দন সংস্কৃতির স্বরূপ উন্মোচন), পুচ্ছ সংকীর্তন (চামচামি, দালালি ও বানরামির ছবি) ইত্যাদি কবিতায় সমাজের কদাকার কিছু দিক উঠে এসেছে। কয়েকটি উদাহরণ :

(১) আমার থুতু দিই। ওয়াক থু!
দেখুন- এ আমাদের হাল আমলের অভ্যাস
…সাপের থলিতে যেমন বিষ
ঊর্ণ-অধরে যেমন লালা
সতীনের বুকে যেমন ঈর্ষা
আমাদের পেটে তেমনি থুতু।
(সংক্ষেপিত/ থুথু)

(২) এটা কোনো প্রাচ্যতত্ত¡ নয়, অপ্রিয় বাস্তবতা এই যে
প্রাচ্যের শরীরে এক কঠিন রোগের আনাগোনা আজ;
সে-রোগ সংক্রমণে দিনদিন মানব-জঙ্গল হয়ে উঠছে
শত সভ্যতার সূতিকাগার–পূবের দুনিয়া! অথচ
প্রথমদিনের সূর্য একদিন উঠেছিল … 
আর বনের আকাশে ওঠা চাঁদের পিঠে চড়ে দ্যাখো-
দুর্বলদের ভেড়া জ্ঞানে নিজেদের নেকড়ে-ভ‚মি
রচনায় তৎপর সনখর সবলের দল!
কোনো মানবীয় ঘ্রাণ নয়,
অলৌকিক খোশবুও নয়,
তাদের শরীর থেকে বের হয়ে আসে
জিঘাংসা ব্রান্ডের বিকট গন্ধ
…এবং কোনো ধর্মগুরু নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানীও নয়
ধর্মের নিতম্ব থেকে–
এই রোগের জীবাণু আবিস্কার করেছেন
মহামান্য রাজনীতিবিদগণ; ছড়াচ্ছেনও তারাই।
[সংক্ষেপিত/ প্রাচ্যের অসুখ]

(৩) আছিলা বাঁশের স্কুলে জমে ওঠা প্রাকটিক্যাাল
ক্লাস থেকে ডাকছি-
ও ইতিহাস, ওগো মহাকালের প্রেস সেক্রেটারি,
প্রস্তরযুগকে সঙ্গে নিয়ে একবার এসো ভাই
দেখে যাও- আলোকায়নের বিকিনি পরা রাত
ফুটো কনডম- আর ধর্ষকদের ইউনাইটেড ক্লাব!
[সংক্ষেপিত/ বিকিনি রাত এবং ফুটো কনডম]

ব্যঙ্গাত্বক হচ্ছে প্রতিশ্রুতিশীল এবং দায়িত্বের অংশের বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। অতীতের তুলনায় এ ধারার প্রতিশ্রুতিশীল সম্প্রসারণ বলে দেয়, ক্রমান্বয়ে কবিতারা আরও অর্থবোধক, নৈতিক ও মানবিক  হয়ে উঠছে। অবশ্য, কবিদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথা উপস্থাপন হচ্ছে। এ-দিকটি বিবেচনা করে বা বাইরে রেখেই বলছি। আমিনুল ইসলামের ব্যঙ্গাত্বক কবিতা বুদ্ধিবৃত্তিক, পেশাভিত্তিক, ধর্মীয়, আদর্শিক, রাজিনৈতিক, নারীবাদী চেতনা, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রেম-অপ্রেম, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক ইত্যাদি বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জনাথান সুইফট (১৬৬৭–১৭৪৫) হচ্ছেন স্যাটায়ার সাহিত্যের সোনালি যুগের প্রতিনিধি। তিনি স্যাটায়ারধর্মী কবিতাও লিখেছেন।  সব বিখ্যাত কবিই এ ধারা এড়িয়ে যাননি। সুইফট স্যাটায়ার ধারাকে আয়না হিসাবে দেখেছেন। আয়নায় যেমন নিজেকে ছাড়া অন্যকে দেখা যায় না। ব্যক্তি গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তর ব্যাঙ্গ-বিদ্রæপের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। কবি আমিনুল ইসলামও ব্যতিক্রম নন। ব্যঙ্গাত্বক রীতিনীতি, অভ্যাস, সামাজিক বিভিন্ন সম্প্রদায় ও শ্রেণির অবনতি, অবক্ষয় ইত্যাদিকে আক্রমণ করে সংশোধন করাই এ-ধারার লক্ষ্য। রাজনীতির ক্ষেত্রে এ ধারা ক্রমবর্ধমান হচ্ছে। সম্প্রসারণের প্রবণতাই বলে দিচ্ছে রাজনীতি দিন-দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃত দুঃখ, বঞ্চনা, বৈষম্য, অসংগতি ইত্যাদির মধ্যে ভার্চুয়াল বন্ধন কিংবা সুখের মধ্যে বিরাট ফাঁক থাকায় কবিকে ব্যঙ্গাত্বক কবিতা লিখতে উৎসাহিত করে। যে কবি যত বিবেকবান ও সচেতন তিনি ততই এ কবিতা লেখার ক্ষেত্রে সার্থক। কবি আমিনুল ইসলাম কবিতায় কখনো ব্যক্তি বা দেশীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অঙ্গকে লক্ষ করে রচিত হয়েছে। তাঁর কবিতা পরোক্ষভাবে কখনো বা প্রত্যক্ষভাবে, নোংরামি, দুর্নীতি, অনৈতিকতা ইত্যাদি নেতিবাচক বিষয়াদি উপহাসমূলক সুরে কণ্ঠস্বর নির্মিত হয়েছে। তিনি কখনো কখনো সংকীর্ণমনা ও ঈর্ষান্বিত প্রতিদ্ব›দ্বীদের স¤পর্কে ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপন করেছেন। চেরাপেটে পাওয়া গেছে সারমেয় লেজ (ডায়াগনসিস আফটার অপারেশন),  এমনকি শেয়ালশাসিত কলাকেন্দ্র (পাখি সংকলন), আমাদের মাটিবর্তী দেহ, শয্যাবর্তী মন (কচুক্ষেতের হাসি), নেকড়ীয় প্রটেকশন (কল্পচিত্র), মানুষ নেকড়ে হলে বৃহত্তম গণতন্ত্রও জঙ্গল হয়ে ওঠে (জঙ্গলায়ন) ইত্যাদি শব্দশ্রেণি তিনি ব্যবহার করেছেন। দেখিয়েছেন সংকট ও অসঙ্গতির প্রতি তাঁর আক্রোশ ও কঠোরতা।  আরও কিছু কবিতাংশ তুলে ধরতে ইচ্ছে করছে :

(১)  ও ভুল, ও লালসা, অতএব মেতে ওঠো উৎসবে!
পরোয়া কীসের!
তোমরা এখন প্রতিকারহীন মহাশক্তির অনুগত থাবা!
[সংক্ষেপিত/ অডিটবিহীন দিন]

(২) নজরে পড়বে
কালের কুকুরের—ঘেউ ঘেউ, ঘেউ ঘেউ!
এমনটা কতদিন ধরেই তো দেখে আসছি!
আর হ্যাঁ, সত্যি কথাটা বলতে আমার লজ্জা নেই
আমি চেয়ার খুব পিছলা স্বভাবের
জাদুবাস্তবতার তেল মেখে মাঝে মাঝে বাঁশ হয়ে উঠি।
এবং জ্ঞানীদের জন্য বহু দৃষ্টান্ত ইতিহাসে।
[সংক্ষেপিত/ আমি চেয়ার বলছি]

(৩) রাজপ্রাসাদ তো নেই, নেই রাজমুকুটও
অথচ যেখানেই হাতটি দিই,
সেখানেই রাজার শরীর;
…হে রাজামশাই, ওগো মহামাননীয়,
আমার এ ভালোবাসার উঠোন থেকে
কবে যে সরাবে তোমাদের বীভৎস নিতম্ব !
[সংক্ষেপিত/ রাজাময়]

বাংলাদেশের কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হচ্ছে স্যাটায়ারধর্মী কবিতা। তবে, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বললে অনেকটাই পিছিয়ে থাকবেন বাংলাদেশের কবিরা। কিন্তু আমিনুল ইসলাম পিছিয়ে নেই। যুগপৎ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবং আন্তর্জাতিক ল্যান্ডস্কেপের প্রেক্ষিতে তিনি জোরালো ভূমিকা পালন করে স্যাটায়ার কবিতায় তিনি উজ্জ্বল এক অধ্যায় রেখে যাচ্ছেন। কবি আমিনুল ইসলাম সমাজ-রাষ্ট্রের ত্রুটি ও সংকট, পার্থক্য ইত্যাদি বড় করে পাঠকের নিকট উপস্থাপন করতে চেয়েছেন এবং পাঠকের মনোযোগ ও আকর্ষণ ভালোর দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। কবিতায় পরিহাস স্যাটায়ার শিল্পসম্মতভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমিনুল ইসলাম শীর্ষেই থাকবেন বলে মনে করি। সংখ্যাগত দিক দিয়ে তো বটেই, মানস, বিষয় এবং শৈলীগত দিক দিয়েও তিনি সফল।