ঢাকা ০১:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১০৮ বছরের পুরোনো লাইব্রেরির কথা

  • বাংলাবাঁক
  • আপডেট : ০৭:৩০:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
  • 411

১০৮ বছরের পুরোনো লাইব্রেরির কথা 

হুমায়ুন কবীর

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ। চুয়াডাঙ্গা  শহর তখন  ছোট্ট এক বাজার মাত্র। লোক সংখ্যা নিতান্তই কম—শিক্ষিত  লোক  তো আরো কম। এই স্বল্প সংখ্যক শিক্ষিতদের জন্য গড়ে তোলা হলো এক গণগ্রন্থাগার  ; নাম আবুল হোসেন স্মৃতি সাধারণ গ্রন্থাগার।  ব্রিটিশরা তখন দুর্দান্ত প্রতাপে শাসন চালাচ্ছে।   এই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার প্রায় সত্তর বছর আগে ১৮৫০ সালে  ইংল্যাণ্ডে পাবলিক লাইব্রেরি এক্ট পাস হয়েছে। ১৮৫৪ সালে রাজকোষের অর্থ ব্যয়ে   যশোর, বগুড়া, বরিশাল আর রংপুরে চারটি গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্টিত হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা তখন সামান্য একটি মহকুমা ; ঢাকায় তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়নি। সেসময়,  এই  অখ্যাত ছোট্ট মহকুমায় ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায়  একটি গণগ্রন্থাগার গড়ে উঠছে —- বিষয়টা ভাবিয়ে তোলে বই কি। প্রশ্ন জাগে কে এই  বই প্রেমিক স্বপ্নদ্রষ্টা  ; কে এই আবুল হোসেন? এদের উত্তর পুরুষ কেউ কি আছেন এই শহরে? বেশ কিছু দিন এমন প্রশ্নের সন্ধ্যানে ব্যাপৃত ছিলাম।
 অবশেষে সন্ধ্যান মিললো ; সন্ধ্যানটা দিলেন চুয়াডাঙ্গার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সরদার আলী হোসেন। তিনি বললেন,   কাইজার হোসেন জোয়ার্দার শিল্পী নামে একজন এডভোকেট
আবুল হোসেন জোয়ার্দার পরিবারের  জীবিত উত্তরসূরী। সরদার আলী হোসেনের অনুরোধে এডভোকেট সাহেব   এক শীতের সন্ধ্যায় হাজির হলেন চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদে।  আমি ইশার নামাজ পড়ে ফিরতেই আলী ভাই বললেন,কাইজার হোসেন  শিল্পী  বসে আছেন আপনার অপেক্ষায়। হ্যাঁ, সৌম্য- সুন্দর ব্যক্তিত্ববান এডভোকেট সাহেব  অপেক্ষায় আছেন সাহিত্য পরিষদের ‘কুঞ্জ আফিয়েতে’।  কথার শুরুতেই তার  বিনয়- নম্রতা আমাকে মুগ্ধ করলো।  তার   মুখোমুখি হয়ে পেয়ে গেলাম আবুল হোসেন স্মৃতি সাধারণ গ্রন্থাগারের  শিকড়ের সন্ধ্যান।
 সালটা ১৮৮০। চুয়াডাঙ্গা শহরের মাথাভাঙ্গা  নদী তীরে একটা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা স্থানীয় বিদ্যোৎসাহী জমিদার  আবুল হোসেন জোয়ার্দার।  প্রতিষ্ঠানটির প্রাক্তন নাম এস.ই.  স্কুল।  পরে এইচ.ই স্কুলে উন্নীত। ১৮৮৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়ার শাসনের রজত জয়ন্তী উপলক্ষে   নামকরণ করা হয় ভি.জে ( ভিক্টোরিয়া জুবিলি) এইচ.  ই  স্কুল।   এই স্কুলটির জন্য সাত একর জমি দান করেন আবুল হোসেন জোয়ার্দার। শুধু তা-ই  না, এই জোয়ার্দার পরিবার পরবর্তীতে  চুয়াডাঙ্গা পৌর ঈদ গাহ, চুয়াডাঙ্গা টাউন ফুটবল মাঠ এবং  চুয়াডাঙ্গা কলেজ  প্রতিষ্ঠার জন্যও  জমি দান করেন।  জোয়ার্দার পরিবারের একজন বিদূষী মহিলা সারা খাতুনের নামে সরকারি কলেজের একটি কক্ষের নামকরণ রয়েছে। প্রকাশ যে, জোয়ার্দার পরিবারের বর্তমান   উত্তরসূরি জনাব কাইজার  হোসেনের দাদি  প্রয়াত সারা খাতুন।   আবুল হোসেন জোয়ার্দারের সুযোগ্য পুত্র ওহিদ হোসেন জোয়ার্দার ভিজে স্কুলের  শিক্ষক ছিলেন।অহিদ হোসেন জোয়ার্দার একজন শিক্ষা-বান্ধব ব্যক্তি ছিলেন এবং  দীর্ঘ চল্লিশ বছর ভিক্টোরিয়া জুবিলী হাই -স্কুলে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করেছেন।  তিনি লোকাল বোর্ড, চুয়াডাঙ্গার প্রথম চেয়ারম্যান এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের জাতীয় পরিষদের সদস্য  (M.N.A) ছিলেন। আবুল হোসেন জোয়ার্দারের  এই সুযোগ্য পুত্র অহিদ হোসেন  জোয়ার্দার  পিতার স্মৃতিকে জাগরূক   রাখবার জন্য  প্রতিষ্ঠা করেন —-‘ আবুল হোসেন স্মৃতি সাধারণ গ্রন্থাগার, চুয়াডাঙ্গা’।
জানা গেল, প্রথমে লাইব্রেরিটা একটা ট্রাস্টি বোর্ডের অধীনে ছিল। দীর্ঘ বছর নির্বাচিত  পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক পরিচালিত হয়ে আসছিল এই ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থাগারটি। পদাধিকার বলে সভাপতি থাকতেন  মহাকুমা প্রশাসক এবং  পরবর্তীতে জেলার মান্যবর জেলা প্রশাসক। মাসে অথবা দু’ মাসে একবার কমিটির সভা হতো। একটা গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে  দীর্ঘবছর  চলছিল  লাইব্রেরির কার্যক্রম। কিন্তু স্থানীয় রাজনীতির ঘেরাটোপে পড়ে এ অবস্থার পরিবর্তন হয় ; লাইব্রেরিটি চলে যায় চুয়াডাঙ্গা পৌর  সভার অধীনে।   সাধারণ পাঠক  পৌর কর্তৃপক্ষের  এমন অধীনতাকে  স্বাগত জানাতে পারেনি।
কাইজার হোসেন জোয়ার্দার জানালেন যে, অহিদ হোসেন জোয়ার্দার অবিবাহিত ছিলেন। অহিদ হোসেন জোয়ার্দারের ভাই সহিদ হোসেন। কাইজার হোসেন জোয়ার্দার শিল্পী সহিদ হোসেন জোয়ার্দারের নাতি।তবে, তিনি এই গ্রন্থাগার -প্রতিষ্ঠাতা অহিদ হোসেন জোয়ার্দারের কাছেই লালিত – পালিত। যতটা তিনি দেখেছেন তিনি ছিলেন একজন দক্ষ শিক্ষক,বই প্রেমিক  ও  পরিচ্ছন্ন  রাজনীতিবিদ।
 আবুল হোসেন স্মৃতি সাধারণ গ্রন্থাগারে আজিজুল হক নামে একজন দক্ষ লাইব্রেরিয়ান  সুনামের সাথে দীর্ঘ বছর দায়ীত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে   মনিরুল আযম বাবুল নামে এক ভদ্রলোক  দীর্ঘ চল্লিশ বছর  এই প্রতিষ্ঠানে সহকারী  গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ করছেন।  লাইব্রেরির  যাবতীয় তথ্য যেন  তার মেমোরিতে সুরক্ষিত —- একটা বইয়ের নাম উচ্চারণের সাথে সাথে তিনি  তালিকা না দেখেই চটজলদি বলে দেন, বইটা আছে কি নেই।  এই অসাধারণ ধী -শক্তি আর তড়িৎ তথ্য  পরিবেশন  পারঙ্গমতার জন্য প্রশাসনের  কর্মকর্তাবৃন্দ  তাকে কম্পিউটার বলে অভিহিত করতো।  উল্লেখ্য যে, কিছুদিন আগেও  আসাদুজ্জামান রাজ নামে একজন প্রধান লাইব্রেরিয়ান এখানে  কর্মরত ছিলেন। ‘২৪ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে এখন  পৌর মেয়র   অপসারিত,   একজন প্রশাসক গ্রন্থাগারের নিয়ন্ত্রণ  কর্তা।  লাইব্রেরির   কাজের ব্যাপ্তি হ্রাস পাওয়ায় ইতোমধ্যে একজন লাইব্রেরি কর্মী ছাটাই হয়েছে।  প্রধান লাইব্রেরি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামানকে পৌর সভায় পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। অগত্যা,লাইব্রেরি কার্যক্রম নিয়ে সহকারী গ্রন্থাগারিকের  সাথেই কথা বলতে হলো। প্রসঙ্গগত উল্লেখ্য যে,নতুন পৌর হল রুম নির্মাণ কালে লাইব্রেরিটি পৌর সভার পুরোন এক  ভবনে স্থানান্তরিত হলেছিল।সম্প্রতি, নব নির্মিত টাউন  হল রুমে এর স্থান হয়েছে বটে, কিন্ত আলমিরা সজ্জ্বা আর   বই -বিন্যাসটা এখনো  সুসম্পন্ন হয়নি।   কিছু বইয়ে ধূলোর আস্তরণও  পড়েছে—  এগুলো নিয়ে কিছুটা বিব্রত বোধে আক্রান্ত    লাইব্রেরিয়ান মনিরুল ইসলাম বাবুল । লাইব্রেরি নিয়ে আমার এই আগ্রহে   তিনি   সম্বিত ফিরে পেলেন ।  চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে  এই  জ্যেষ্ঠ লাইব্রেরি কর্মকর্তা আমার দিকে মনোযোগী হলেন।  মৃদুস্ব্ররে  বললেন, দেখুন,   পাঠক কমে গেছে ; একসময় তো মানুষ এখানে ঘন্টার পর ঘন্টা  বই পড়তো। বই নেওয়ার জন্য ভীড় লেগে যেত। কোথায় হারিয়ে গেল সেই পাঠক ; ভদ্রলোকের চোখেমুখে হতাশার ছায়া।  ভবিষ্যৎ পাঠক  নিয়েও    রীতিমতো শঙ্কিত  তিনি। এখন বই — গ্রাহক কমেছে, চলমান   পাঠক হারিয়ে গেছে—- কোনদিন মাত্র দু-পাঁচজন পাঠক উপস্থিত থাকেন। তিনি জানালেন, আবুল হোসেন স্মৃতি সাধারণ গ্রন্থাগারে বই আছে প্রায় বিশ হাজার,  অথচ পাতা উল্টায়ে দেখবার মানুষ কম ।এখন সদস্য সংখ্যা মাত্র ১৫০, আজীবন সদস্য ২৭১।  ১৫০০ টাকা অনুদান  প্রদান করে আবুল হোসেন স্মৃতি সাধারণ গ্রন্থাগারে আজীবন সদস্য পদ লাভ করা যায়।
 জনাব মনিরুল আযমের মুখেব বিশ হাজার   সংখ্যাটা শুনে চমকে উঠলাম।  সজ্জিত  বইয়ের তাকের সারিতে অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে রইলাম।  রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত বাণী মনে হলো : মহা সমূদ্রের শত বৎসরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারিত যে,সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মত চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহা শব্দের সহিত এই লাইব্রেরির তুলনা হইত।’ হ্যাঁ, এই এখানে যথার্থ অর্থেই ছাপার অক্ষরে জ্ঞান চুপ করে আছে। একটু পাতা মেললেই যেন কথা বলা যায় রবীন্দ্র – নজরুল- জসীমের সাথে।  এই এখানে ম্যাক্সিম গোর্কি, টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি’র সাক্ষাৎ মেলে। শারীরিক উপস্থিতি নেই তাতে কী — রয়ে গেছে : পৃথিবীর পথে,   আনা ক্যারেনিনা, ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট ..। এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার  অনেকগুলো  খণ্ড  একটা কাঠের আলমিরায় শোভা পাচ্ছে।  এক সেল্ফে আল কুরআনের তাফসির এবং বেশ কিছু ধর্মীয় বই দেখলাম। উপমহাদেশের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ আবুল কালাম আজাদ, আবুল আলা মওদুদী এবং কবি আল্লামা  ইকবালের বই দেখলাম ; কিছু বইয়ের ‘পর ধূলার আস্তরণ পড়ে গেছে।  শত  বছরের পুরোনো  লাইব্রেরির প্রতি পাঠকের উদাসীনতা দেখে মন খারাপ হলো।
 পাশেই একটা চেয়ারে বসা পরিচ্ছন্নতা কর্মী ফিরোজা খাতুন। উনি লাইব্রেরি  রুম পরিচ্ছন্ন রাখেন। যথাসম্ভব বইগুলো যত্ন নেন,ধূলো মুক্ত রাখেন।  ফিরোজা খাতুনের মুখে এক খিলা পান–পরম তৃপ্তির সাথে   পান চিবাচ্ছিলেন তিনি। ব্যস্ততা নেই; বোধহয় অবসরে বিধ্বস্ত তিনি।  সহসা আমাদের আলাপে  ঢুকে পড়ে  বললেন, এখানে অনেক ভালো ভালো বই আছে। পড়ার মানুষ কম।
লাইব্রেরি ভালো নেই, লাইব্রেরি সংশ্লিষ্ট আপনারা কেমন আছেন —- এ প্রশ্ন রেখেছিলাম তাদের দুজনের  কাছে।  প্রশ্নটা তারা  দু’জনেই লুফে নিলেন, কেন জানি  দুজনেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। একটু নড়ে চড়ে বসলেন। বললেন, সংসার খরচ না,কর্তৃপক্ষ হাত খরচটা আমাদের  দেন। এই গ্রন্থাগার এক সময়  সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন ছিল ; ২০১১ সালে জেলা প্রশাসনের নিকট থেকে  গ্রন্থাগারটির তত্ত্বাবধানের  দায়িত্ব নেন চুয়াডাঙ্গা  পৌর সভা।কিন্তু,  কোন কর্তৃপক্ষই  লাইব্রেরি  কর্মচারীদের আর্থিক দিকটা বিবেচনায় নেননি।  সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বই কেনার বরাদ্দ দিত। নির্বাহী কমিটি রচনা প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি  এবং অন্যান্য জাতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন  করতো। তখন লাইব্রেরি কার্যক্রম বেগবান ছিল।কিন্তু, কর্মচারীগণ  তখনও তিমিরে ছিলো ; আজও সেই তিমিরে।
 ‘ আমি চলে যাবো বলে
চালতা ফুল কি আর ভিজবে না শিশিরের জলে
নরম গন্ধের ঢেউয়ে? —-এমনই প্রশ্ন করেছিলেন জীবনানন্দ দাস। কবি চলে গেছে দূরে… বহু দূরে।  শিশিরে চালতা ফুল  ভেজে , কিন্তু  আমার   প্রশ্ন সেখানে না। আমার হাতে কবির  রূপসী বাংলা, বেলা  অবেলা কালবেলা, বনলতা সেন। এই লাইব্রেরি কক্ষে   সুনসান নীরবতায় পড়ছি ‘ জানি,তবু জানি নারীর হৃদয় — প্রেম, শিশু — গৃহ — নয় সবখানি, অর্থ নয়..কীর্তি নয়,স্বচ্ছলতা নয়—আর এক বিপন্ন বিষ্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে…’ নিজেকে প্রশ্ন করলাম, কেমন সেই  বিপন্ন বিষ্ময়?
কবিতাটি আর পড়া হলো না—- কিন্ত অন্য একটা  বিষ্ময়… আমার  রক্তের ভিতরে খেলা করতে লাগলো; মনে হতে লাগলো  —- বই বিমুখ এক আজব জাতি এই আমরা  ! আন্তভ চেখভ গ্রন্থ – বিমূখতাকে ব্যর্থ সমাজের বৈশিষ্ট বলেছিলেন। তার বিবেচনায়, ব্যর্থ সমাজের মানুষ লাইব্রেরি বিমূখ, ব্যর্থ সমাজের  মানুষ  স্লোগান  সর্বস্ব। প্রশ্ন জাগে, আমাদের সমাজ কি ব্যর্থ হতে চলেছে?
  কোলাহল থেকে দূরে  লাইব্রেরির এই নির্জন কক্ষে অন্য রকম অনুভূতি পেয়ে বসলো — মনে হলো যারা নেই, জানি, তাদের দেখা মিলবে না কখনও ; তবুও যেন আছেন সেই কবি- গল্পকার – লেখক  ; আমি যেন এই কক্ষে  তাদের সাথে কথা বলছি। লাইব্রেরি প্রতিষ্টাতা সেই মহান পুরুষের প্রতি শ্রদ্ধাবনত হচ্ছি। শুধুই মনে হচ্ছে,  সেই মানুষগুলো আসলেই  ভালো মনের মানুষ যারা  বাগান অথবা লাইব্রেরি গড়ে তোলে।
লাইব্রেরি সমৃদ্ধ তবে পাঠকের সমাগম কম কেন — এ প্রস্নের উত্তরে জনাব মনিরুল আযম প্রযুক্তির আধিপত্যকে দায়ী করলেন।বললেন, এক সময় শিক্ষার্থীদের বিনোদন ছিল ফুটবল খেলা এবং অল্প-বিস্তর ক্রিকেট খেলা। তখন মানুষ বইয়ের পাতায় বিনোদন খুঁজতো। এখন হাতের মুঠোয় বিনোদনের উপকরণ। তাই  দিনে দিনে পাঠক শূন্য হচ্ছে পাঠাগার। আফসোস করে এক কবি বলেছিলেন :
হায় মোর পাঠাগার !
কার তুমি, তুমি কার?
কেউ নেই পড়বার ;
ভয় সব হারাবার —
পাঠাগার !
আযম সাহেব বললেন, সেকালে  জ্ঞান অর্জন এবং বিনোদন সমান্তরালে চলতো —- মুঠোফোনে  বিনোদন হচ্ছে বটে, কিন্তু  অধিকাংশ ক্ষেত্রে  তা  জ্ঞান- বিযুক্ত ।   এর একটা  দীর্ঘ মেয়াদি খারাপ ফল আছে। জাতিকে  একদিন  এর মূল্য দিতে হবে।
চাকরি প্রার্থীরা এখানে আসেন কেউ কেউ। এখানে ইতিহাস  পড়েন, পত্রিকা পড়েন। নিরেট সাহিত্য পড়ুয়া মানুষ নিতান্তই কম — হাতের কর গুণে বলে দেওয়া যায় সেই নগন্য সংখ্যা।
লাইব্রেরির বিষয় বিন্যাস ভালো লাগলো।  বইয়ের শ্রেণি বিন্যাসটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেই করা হয়েছে।কবিতা,প্রবন্ধ, উপন্যাসের জন্য পৃথক পৃথক সেল্ফ,পৃথক রেজিস্টার। তবে এগুলো কম্পিউটারাইজড করা যুগের দাবি। সমগ্র বই তালিকা সংরক্ষণ ,বই ইস্যু, জমা, সদস্য নাম – ঠিকানা  কম্পিউটারের  মাধ্যমে  করা যেতে পারে। সেল্ফে সারি সারি সাজানো ধর্ম- দর্শন – রাজনীতি আর ইতিহাসের বই।মনিরুল আযম বললেন, এখানে যত দুষ্প্রাপ্য বই পাবেন, খুলনা বিভাগে  কোন লাইব্রেরিতে তা পাবেন না।
আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, একটা জিনিস কিন্তু আপনাকে অবশ্যই  জানতে হবে,তা হলো লাইব্রেরির ঠিকানা। পাঠক,  জেনে নিন   ঠিকানাটা : শহিদ  আবুল কাশেম সড়ক,  পৌর টাউন  হল, চুয়াডাঙ্গা ।  মনে রাখবেন, এ প্রতিষ্ঠানটি কিন্তু সরকারি ছুটির সাথে সংগতি রক্ষা করে চলে।  সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার আর শনিবার। প্রতি কর্মদিবসে  বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যে ৭টা পর্যন্ত  খোলা থাকে। যে কোন পাঠক এখানে  বিকেল অথবা  সন্ধ্যেটা   কাটিয়ে যেতে পারেন। দেখবেন, সময়টা বৃথা যাবে না,আনন্দ পাবেন— বই পড়ার আনন্দই আলাদা।
জনপ্রিয় পোস্ট

আবু আফজাল সালেহর ছড়া: সমাজ, প্রকৃতি ও উৎসবের মেলবন্ধন

১০৮ বছরের পুরোনো লাইব্রেরির কথা

আপডেট : ০৭:৩০:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

১০৮ বছরের পুরোনো লাইব্রেরির কথা 

হুমায়ুন কবীর

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ। চুয়াডাঙ্গা  শহর তখন  ছোট্ট এক বাজার মাত্র। লোক সংখ্যা নিতান্তই কম—শিক্ষিত  লোক  তো আরো কম। এই স্বল্প সংখ্যক শিক্ষিতদের জন্য গড়ে তোলা হলো এক গণগ্রন্থাগার  ; নাম আবুল হোসেন স্মৃতি সাধারণ গ্রন্থাগার।  ব্রিটিশরা তখন দুর্দান্ত প্রতাপে শাসন চালাচ্ছে।   এই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার প্রায় সত্তর বছর আগে ১৮৫০ সালে  ইংল্যাণ্ডে পাবলিক লাইব্রেরি এক্ট পাস হয়েছে। ১৮৫৪ সালে রাজকোষের অর্থ ব্যয়ে   যশোর, বগুড়া, বরিশাল আর রংপুরে চারটি গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্টিত হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা তখন সামান্য একটি মহকুমা ; ঢাকায় তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়নি। সেসময়,  এই  অখ্যাত ছোট্ট মহকুমায় ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায়  একটি গণগ্রন্থাগার গড়ে উঠছে —- বিষয়টা ভাবিয়ে তোলে বই কি। প্রশ্ন জাগে কে এই  বই প্রেমিক স্বপ্নদ্রষ্টা  ; কে এই আবুল হোসেন? এদের উত্তর পুরুষ কেউ কি আছেন এই শহরে? বেশ কিছু দিন এমন প্রশ্নের সন্ধ্যানে ব্যাপৃত ছিলাম।
 অবশেষে সন্ধ্যান মিললো ; সন্ধ্যানটা দিলেন চুয়াডাঙ্গার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সরদার আলী হোসেন। তিনি বললেন,   কাইজার হোসেন জোয়ার্দার শিল্পী নামে একজন এডভোকেট
আবুল হোসেন জোয়ার্দার পরিবারের  জীবিত উত্তরসূরী। সরদার আলী হোসেনের অনুরোধে এডভোকেট সাহেব   এক শীতের সন্ধ্যায় হাজির হলেন চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদে।  আমি ইশার নামাজ পড়ে ফিরতেই আলী ভাই বললেন,কাইজার হোসেন  শিল্পী  বসে আছেন আপনার অপেক্ষায়। হ্যাঁ, সৌম্য- সুন্দর ব্যক্তিত্ববান এডভোকেট সাহেব  অপেক্ষায় আছেন সাহিত্য পরিষদের ‘কুঞ্জ আফিয়েতে’।  কথার শুরুতেই তার  বিনয়- নম্রতা আমাকে মুগ্ধ করলো।  তার   মুখোমুখি হয়ে পেয়ে গেলাম আবুল হোসেন স্মৃতি সাধারণ গ্রন্থাগারের  শিকড়ের সন্ধ্যান।
 সালটা ১৮৮০। চুয়াডাঙ্গা শহরের মাথাভাঙ্গা  নদী তীরে একটা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা স্থানীয় বিদ্যোৎসাহী জমিদার  আবুল হোসেন জোয়ার্দার।  প্রতিষ্ঠানটির প্রাক্তন নাম এস.ই.  স্কুল।  পরে এইচ.ই স্কুলে উন্নীত। ১৮৮৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়ার শাসনের রজত জয়ন্তী উপলক্ষে   নামকরণ করা হয় ভি.জে ( ভিক্টোরিয়া জুবিলি) এইচ.  ই  স্কুল।   এই স্কুলটির জন্য সাত একর জমি দান করেন আবুল হোসেন জোয়ার্দার। শুধু তা-ই  না, এই জোয়ার্দার পরিবার পরবর্তীতে  চুয়াডাঙ্গা পৌর ঈদ গাহ, চুয়াডাঙ্গা টাউন ফুটবল মাঠ এবং  চুয়াডাঙ্গা কলেজ  প্রতিষ্ঠার জন্যও  জমি দান করেন।  জোয়ার্দার পরিবারের একজন বিদূষী মহিলা সারা খাতুনের নামে সরকারি কলেজের একটি কক্ষের নামকরণ রয়েছে। প্রকাশ যে, জোয়ার্দার পরিবারের বর্তমান   উত্তরসূরি জনাব কাইজার  হোসেনের দাদি  প্রয়াত সারা খাতুন।   আবুল হোসেন জোয়ার্দারের সুযোগ্য পুত্র ওহিদ হোসেন জোয়ার্দার ভিজে স্কুলের  শিক্ষক ছিলেন।অহিদ হোসেন জোয়ার্দার একজন শিক্ষা-বান্ধব ব্যক্তি ছিলেন এবং  দীর্ঘ চল্লিশ বছর ভিক্টোরিয়া জুবিলী হাই -স্কুলে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করেছেন।  তিনি লোকাল বোর্ড, চুয়াডাঙ্গার প্রথম চেয়ারম্যান এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের জাতীয় পরিষদের সদস্য  (M.N.A) ছিলেন। আবুল হোসেন জোয়ার্দারের  এই সুযোগ্য পুত্র অহিদ হোসেন  জোয়ার্দার  পিতার স্মৃতিকে জাগরূক   রাখবার জন্য  প্রতিষ্ঠা করেন —-‘ আবুল হোসেন স্মৃতি সাধারণ গ্রন্থাগার, চুয়াডাঙ্গা’।
জানা গেল, প্রথমে লাইব্রেরিটা একটা ট্রাস্টি বোর্ডের অধীনে ছিল। দীর্ঘ বছর নির্বাচিত  পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক পরিচালিত হয়ে আসছিল এই ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থাগারটি। পদাধিকার বলে সভাপতি থাকতেন  মহাকুমা প্রশাসক এবং  পরবর্তীতে জেলার মান্যবর জেলা প্রশাসক। মাসে অথবা দু’ মাসে একবার কমিটির সভা হতো। একটা গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে  দীর্ঘবছর  চলছিল  লাইব্রেরির কার্যক্রম। কিন্তু স্থানীয় রাজনীতির ঘেরাটোপে পড়ে এ অবস্থার পরিবর্তন হয় ; লাইব্রেরিটি চলে যায় চুয়াডাঙ্গা পৌর  সভার অধীনে।   সাধারণ পাঠক  পৌর কর্তৃপক্ষের  এমন অধীনতাকে  স্বাগত জানাতে পারেনি।
কাইজার হোসেন জোয়ার্দার জানালেন যে, অহিদ হোসেন জোয়ার্দার অবিবাহিত ছিলেন। অহিদ হোসেন জোয়ার্দারের ভাই সহিদ হোসেন। কাইজার হোসেন জোয়ার্দার শিল্পী সহিদ হোসেন জোয়ার্দারের নাতি।তবে, তিনি এই গ্রন্থাগার -প্রতিষ্ঠাতা অহিদ হোসেন জোয়ার্দারের কাছেই লালিত – পালিত। যতটা তিনি দেখেছেন তিনি ছিলেন একজন দক্ষ শিক্ষক,বই প্রেমিক  ও  পরিচ্ছন্ন  রাজনীতিবিদ।
 আবুল হোসেন স্মৃতি সাধারণ গ্রন্থাগারে আজিজুল হক নামে একজন দক্ষ লাইব্রেরিয়ান  সুনামের সাথে দীর্ঘ বছর দায়ীত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে   মনিরুল আযম বাবুল নামে এক ভদ্রলোক  দীর্ঘ চল্লিশ বছর  এই প্রতিষ্ঠানে সহকারী  গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ করছেন।  লাইব্রেরির  যাবতীয় তথ্য যেন  তার মেমোরিতে সুরক্ষিত —- একটা বইয়ের নাম উচ্চারণের সাথে সাথে তিনি  তালিকা না দেখেই চটজলদি বলে দেন, বইটা আছে কি নেই।  এই অসাধারণ ধী -শক্তি আর তড়িৎ তথ্য  পরিবেশন  পারঙ্গমতার জন্য প্রশাসনের  কর্মকর্তাবৃন্দ  তাকে কম্পিউটার বলে অভিহিত করতো।  উল্লেখ্য যে, কিছুদিন আগেও  আসাদুজ্জামান রাজ নামে একজন প্রধান লাইব্রেরিয়ান এখানে  কর্মরত ছিলেন। ‘২৪ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে এখন  পৌর মেয়র   অপসারিত,   একজন প্রশাসক গ্রন্থাগারের নিয়ন্ত্রণ  কর্তা।  লাইব্রেরির   কাজের ব্যাপ্তি হ্রাস পাওয়ায় ইতোমধ্যে একজন লাইব্রেরি কর্মী ছাটাই হয়েছে।  প্রধান লাইব্রেরি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামানকে পৌর সভায় পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। অগত্যা,লাইব্রেরি কার্যক্রম নিয়ে সহকারী গ্রন্থাগারিকের  সাথেই কথা বলতে হলো। প্রসঙ্গগত উল্লেখ্য যে,নতুন পৌর হল রুম নির্মাণ কালে লাইব্রেরিটি পৌর সভার পুরোন এক  ভবনে স্থানান্তরিত হলেছিল।সম্প্রতি, নব নির্মিত টাউন  হল রুমে এর স্থান হয়েছে বটে, কিন্ত আলমিরা সজ্জ্বা আর   বই -বিন্যাসটা এখনো  সুসম্পন্ন হয়নি।   কিছু বইয়ে ধূলোর আস্তরণও  পড়েছে—  এগুলো নিয়ে কিছুটা বিব্রত বোধে আক্রান্ত    লাইব্রেরিয়ান মনিরুল ইসলাম বাবুল । লাইব্রেরি নিয়ে আমার এই আগ্রহে   তিনি   সম্বিত ফিরে পেলেন ।  চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে  এই  জ্যেষ্ঠ লাইব্রেরি কর্মকর্তা আমার দিকে মনোযোগী হলেন।  মৃদুস্ব্ররে  বললেন, দেখুন,   পাঠক কমে গেছে ; একসময় তো মানুষ এখানে ঘন্টার পর ঘন্টা  বই পড়তো। বই নেওয়ার জন্য ভীড় লেগে যেত। কোথায় হারিয়ে গেল সেই পাঠক ; ভদ্রলোকের চোখেমুখে হতাশার ছায়া।  ভবিষ্যৎ পাঠক  নিয়েও    রীতিমতো শঙ্কিত  তিনি। এখন বই — গ্রাহক কমেছে, চলমান   পাঠক হারিয়ে গেছে—- কোনদিন মাত্র দু-পাঁচজন পাঠক উপস্থিত থাকেন। তিনি জানালেন, আবুল হোসেন স্মৃতি সাধারণ গ্রন্থাগারে বই আছে প্রায় বিশ হাজার,  অথচ পাতা উল্টায়ে দেখবার মানুষ কম ।এখন সদস্য সংখ্যা মাত্র ১৫০, আজীবন সদস্য ২৭১।  ১৫০০ টাকা অনুদান  প্রদান করে আবুল হোসেন স্মৃতি সাধারণ গ্রন্থাগারে আজীবন সদস্য পদ লাভ করা যায়।
 জনাব মনিরুল আযমের মুখেব বিশ হাজার   সংখ্যাটা শুনে চমকে উঠলাম।  সজ্জিত  বইয়ের তাকের সারিতে অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে রইলাম।  রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত বাণী মনে হলো : মহা সমূদ্রের শত বৎসরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারিত যে,সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মত চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহা শব্দের সহিত এই লাইব্রেরির তুলনা হইত।’ হ্যাঁ, এই এখানে যথার্থ অর্থেই ছাপার অক্ষরে জ্ঞান চুপ করে আছে। একটু পাতা মেললেই যেন কথা বলা যায় রবীন্দ্র – নজরুল- জসীমের সাথে।  এই এখানে ম্যাক্সিম গোর্কি, টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি’র সাক্ষাৎ মেলে। শারীরিক উপস্থিতি নেই তাতে কী — রয়ে গেছে : পৃথিবীর পথে,   আনা ক্যারেনিনা, ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট ..। এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার  অনেকগুলো  খণ্ড  একটা কাঠের আলমিরায় শোভা পাচ্ছে।  এক সেল্ফে আল কুরআনের তাফসির এবং বেশ কিছু ধর্মীয় বই দেখলাম। উপমহাদেশের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ আবুল কালাম আজাদ, আবুল আলা মওদুদী এবং কবি আল্লামা  ইকবালের বই দেখলাম ; কিছু বইয়ের ‘পর ধূলার আস্তরণ পড়ে গেছে।  শত  বছরের পুরোনো  লাইব্রেরির প্রতি পাঠকের উদাসীনতা দেখে মন খারাপ হলো।
 পাশেই একটা চেয়ারে বসা পরিচ্ছন্নতা কর্মী ফিরোজা খাতুন। উনি লাইব্রেরি  রুম পরিচ্ছন্ন রাখেন। যথাসম্ভব বইগুলো যত্ন নেন,ধূলো মুক্ত রাখেন।  ফিরোজা খাতুনের মুখে এক খিলা পান–পরম তৃপ্তির সাথে   পান চিবাচ্ছিলেন তিনি। ব্যস্ততা নেই; বোধহয় অবসরে বিধ্বস্ত তিনি।  সহসা আমাদের আলাপে  ঢুকে পড়ে  বললেন, এখানে অনেক ভালো ভালো বই আছে। পড়ার মানুষ কম।
লাইব্রেরি ভালো নেই, লাইব্রেরি সংশ্লিষ্ট আপনারা কেমন আছেন —- এ প্রশ্ন রেখেছিলাম তাদের দুজনের  কাছে।  প্রশ্নটা তারা  দু’জনেই লুফে নিলেন, কেন জানি  দুজনেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। একটু নড়ে চড়ে বসলেন। বললেন, সংসার খরচ না,কর্তৃপক্ষ হাত খরচটা আমাদের  দেন। এই গ্রন্থাগার এক সময়  সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন ছিল ; ২০১১ সালে জেলা প্রশাসনের নিকট থেকে  গ্রন্থাগারটির তত্ত্বাবধানের  দায়িত্ব নেন চুয়াডাঙ্গা  পৌর সভা।কিন্তু,  কোন কর্তৃপক্ষই  লাইব্রেরি  কর্মচারীদের আর্থিক দিকটা বিবেচনায় নেননি।  সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বই কেনার বরাদ্দ দিত। নির্বাহী কমিটি রচনা প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি  এবং অন্যান্য জাতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন  করতো। তখন লাইব্রেরি কার্যক্রম বেগবান ছিল।কিন্তু, কর্মচারীগণ  তখনও তিমিরে ছিলো ; আজও সেই তিমিরে।
 ‘ আমি চলে যাবো বলে
চালতা ফুল কি আর ভিজবে না শিশিরের জলে
নরম গন্ধের ঢেউয়ে? —-এমনই প্রশ্ন করেছিলেন জীবনানন্দ দাস। কবি চলে গেছে দূরে… বহু দূরে।  শিশিরে চালতা ফুল  ভেজে , কিন্তু  আমার   প্রশ্ন সেখানে না। আমার হাতে কবির  রূপসী বাংলা, বেলা  অবেলা কালবেলা, বনলতা সেন। এই লাইব্রেরি কক্ষে   সুনসান নীরবতায় পড়ছি ‘ জানি,তবু জানি নারীর হৃদয় — প্রেম, শিশু — গৃহ — নয় সবখানি, অর্থ নয়..কীর্তি নয়,স্বচ্ছলতা নয়—আর এক বিপন্ন বিষ্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে…’ নিজেকে প্রশ্ন করলাম, কেমন সেই  বিপন্ন বিষ্ময়?
কবিতাটি আর পড়া হলো না—- কিন্ত অন্য একটা  বিষ্ময়… আমার  রক্তের ভিতরে খেলা করতে লাগলো; মনে হতে লাগলো  —- বই বিমুখ এক আজব জাতি এই আমরা  ! আন্তভ চেখভ গ্রন্থ – বিমূখতাকে ব্যর্থ সমাজের বৈশিষ্ট বলেছিলেন। তার বিবেচনায়, ব্যর্থ সমাজের মানুষ লাইব্রেরি বিমূখ, ব্যর্থ সমাজের  মানুষ  স্লোগান  সর্বস্ব। প্রশ্ন জাগে, আমাদের সমাজ কি ব্যর্থ হতে চলেছে?
  কোলাহল থেকে দূরে  লাইব্রেরির এই নির্জন কক্ষে অন্য রকম অনুভূতি পেয়ে বসলো — মনে হলো যারা নেই, জানি, তাদের দেখা মিলবে না কখনও ; তবুও যেন আছেন সেই কবি- গল্পকার – লেখক  ; আমি যেন এই কক্ষে  তাদের সাথে কথা বলছি। লাইব্রেরি প্রতিষ্টাতা সেই মহান পুরুষের প্রতি শ্রদ্ধাবনত হচ্ছি। শুধুই মনে হচ্ছে,  সেই মানুষগুলো আসলেই  ভালো মনের মানুষ যারা  বাগান অথবা লাইব্রেরি গড়ে তোলে।
লাইব্রেরি সমৃদ্ধ তবে পাঠকের সমাগম কম কেন — এ প্রস্নের উত্তরে জনাব মনিরুল আযম প্রযুক্তির আধিপত্যকে দায়ী করলেন।বললেন, এক সময় শিক্ষার্থীদের বিনোদন ছিল ফুটবল খেলা এবং অল্প-বিস্তর ক্রিকেট খেলা। তখন মানুষ বইয়ের পাতায় বিনোদন খুঁজতো। এখন হাতের মুঠোয় বিনোদনের উপকরণ। তাই  দিনে দিনে পাঠক শূন্য হচ্ছে পাঠাগার। আফসোস করে এক কবি বলেছিলেন :
হায় মোর পাঠাগার !
কার তুমি, তুমি কার?
কেউ নেই পড়বার ;
ভয় সব হারাবার —
পাঠাগার !
আযম সাহেব বললেন, সেকালে  জ্ঞান অর্জন এবং বিনোদন সমান্তরালে চলতো —- মুঠোফোনে  বিনোদন হচ্ছে বটে, কিন্তু  অধিকাংশ ক্ষেত্রে  তা  জ্ঞান- বিযুক্ত ।   এর একটা  দীর্ঘ মেয়াদি খারাপ ফল আছে। জাতিকে  একদিন  এর মূল্য দিতে হবে।
চাকরি প্রার্থীরা এখানে আসেন কেউ কেউ। এখানে ইতিহাস  পড়েন, পত্রিকা পড়েন। নিরেট সাহিত্য পড়ুয়া মানুষ নিতান্তই কম — হাতের কর গুণে বলে দেওয়া যায় সেই নগন্য সংখ্যা।
লাইব্রেরির বিষয় বিন্যাস ভালো লাগলো।  বইয়ের শ্রেণি বিন্যাসটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেই করা হয়েছে।কবিতা,প্রবন্ধ, উপন্যাসের জন্য পৃথক পৃথক সেল্ফ,পৃথক রেজিস্টার। তবে এগুলো কম্পিউটারাইজড করা যুগের দাবি। সমগ্র বই তালিকা সংরক্ষণ ,বই ইস্যু, জমা, সদস্য নাম – ঠিকানা  কম্পিউটারের  মাধ্যমে  করা যেতে পারে। সেল্ফে সারি সারি সাজানো ধর্ম- দর্শন – রাজনীতি আর ইতিহাসের বই।মনিরুল আযম বললেন, এখানে যত দুষ্প্রাপ্য বই পাবেন, খুলনা বিভাগে  কোন লাইব্রেরিতে তা পাবেন না।
আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, একটা জিনিস কিন্তু আপনাকে অবশ্যই  জানতে হবে,তা হলো লাইব্রেরির ঠিকানা। পাঠক,  জেনে নিন   ঠিকানাটা : শহিদ  আবুল কাশেম সড়ক,  পৌর টাউন  হল, চুয়াডাঙ্গা ।  মনে রাখবেন, এ প্রতিষ্ঠানটি কিন্তু সরকারি ছুটির সাথে সংগতি রক্ষা করে চলে।  সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার আর শনিবার। প্রতি কর্মদিবসে  বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যে ৭টা পর্যন্ত  খোলা থাকে। যে কোন পাঠক এখানে  বিকেল অথবা  সন্ধ্যেটা   কাটিয়ে যেতে পারেন। দেখবেন, সময়টা বৃথা যাবে না,আনন্দ পাবেন— বই পড়ার আনন্দই আলাদা।