ঢাকা ০২:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বই আলোচনা

মা একটি নদীর নাম: বাস্তববাদ, প্রকৃতিবাদ, রোমান্টিসিজম ও সার্বজনীন জাতিস্মরের স্মারক

  • বাংলাবাঁক
  • আপডেট : ১০:৪১:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
  • 285

মা একটি নদীর নাম: বাস্তববাদ, প্রকৃতিবাদ, রোমান্টিসিজম ও সার্বজনীন জাতিস্মরের স্মারক
গোলাম রববানী 

বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে “মা একটি নদীর নাম”- কবি আরণ্যক শামছের এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে বাস্তবতা কেবল দৃশ্যমান সৌন্দর্যের বিষয় নয়; বরং বিশ্বরাজনীতি, ইতিহাস,ঐতিহ্য, প্রেম-ভালোবাসা, শিকড়ের প্রতি বীতশ্রদ্ধ, বৈচিত্র্যময় চেহারা, সত্য-মিথ্যার পর্যালোচনা-ফলাফল, ভুলের মাশুল দিতে ক্ষমা প্রার্থনা,  পুঁজিবাদী আগ্রাসন, শ্রেণিসংগ্রামের চির বহমান যুদ্ধ-লড়াই, প্রকৃতির বিপর্যয় ও বিনষ্ট, স্মৃতি, সময়, সমাজ-জীবন ও আত্মপরিচয়ের এক গভীর নান্দনিক বিনির্মাণ। এটি সময়ের একটা শ্রেষ্ঠদলিল হিসেবে পরিব্যাপ্ত।তিঁনি মনের মাধুরি মিশিয়ে, যত্ন করে, ঢের সময় নিয়ে সৃষ্টি করেছেন।তাঁর জীবনের অন্যান্য অর্জনের চেয়ে এই সৃষ্টিশীল কর্মকেই  বহুগুণেই এগিয়ে রাখছি। কবির পরিচয় বহুবিধ; কোনো একক গুণে গুণান্বিত করা মুশকিল।একেবারেই অসম্ভব!লেখাটির শেষের দিকে কবির পরিচয় সংযুক্ত থাকবে।
কবি আরণ্যক শামছ এই কাব্যগ্রন্থে নদীকে কোনো নদী হিসেবে দেখেননি; তিঁনি নদীকে মমতাময়ীরূপ দিয়েছেন- দিয়েই প্রাণবন্তভাবে জীবন্ত সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক তথা মানবিক সত্তায় গড়েছেন।এদিক থেকে বইটি পড়তে গিয়ে পাঠক শুধু প্রকৃতির চিত্র দেখবেন না, বরং চলমান সভ্যতায় অসভ্যতার অন্তর্লীন স্পন্দন অনুভব করবেন বলে প্রত্যাশা করছি।রাষ্ট্রীয় ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বমানচিত্রের বহুবৈচিত্র্যময় প্রসঙ্গের ঘটনা অনুসঙ্গের চিত্রায়ণই কবি আরণ্যক শামছের প্রতিটি কবিতার প্রাণস্পন্দন। সামান্যতম আলোচনা পর্যালোচনায় বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা কষ্টকর তবুও চেষ্টায় প্রতীয়মান। বাংলা সাহিত্যের একটি প্রাচীনতম শাখা হলো কবিতা। তাই কবিতাকে শিল্পমাধ্যমের ফাউন্ডেশন বা ভিত্তিভূমি বলা চলে।নিদর্শন হিসেবে চর্যাপদের কথাই বলতে হয়। শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির যতগুলো প্লাটফর্ম আছে- তাঁর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এই মাধ্যমটির শিকড় ধরেই অন্যান্য শাখা-প্রশাখার বিস্তৃতি লাভ করেছে। অন্যান্য শাখা-প্রশাখার গুরুত্ব লাভ করে প্রাচীন মাধ্যমটির মধ্যস্থতা করেই।সাথে সাথে ত্বরান্বিত এবং অগ্রগতিতে সবচেয়ে বেশি অবদানও রাখে সেটি নির্দ্বিধায় বলা যায় । স্বাধীন সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা রক্ষার্থে, সাম্য ও সমতার ভিত্তিতে সংবিধানের ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণে, মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা, জীবনধারা, ভাববাদ-প্রকৃতিবাদ এবং বাস্তববাদিতার চেতনা জাগ্রতচিত্ত ফলাতে, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঢাল হতে, উৎপীড়ন নিপীড়নের বিরোধিতাকরণে, অমানবিকতার বিরুদ্ধে, একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে বিশ্বকে আবদ্ধকরণে, ধর্মকে কুক্ষিগত করার বিরুদ্ধে, লড়াই-সংগ্রামে বলিষ্ঠ প্রতিবাদে, প্রেম-ভালোবাসা-বিচ্ছেদ-নিঃসঙ্গতা এবং একাকীত্বের বৈচিত্র্যময় অনুভূতি সহানুভূতির কার্যকর মূল্যায়ন থেকে শুরু করে সার্বজনীনভাবে দেশসহ গোটা পৃথিবীর প্রকৃতি, প্রাণী ও মানুষের অধিকার নিশ্চিতকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী ও যুতসই মাধ্যম/হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে এই কবিতা।সেখানে কবি আরণ্যক শামছের কবিতা কতটা অবদান রাখবে বলা কঠিন কিন্তু স্বীকার অনস্বীকার্য বলায় যায়। কবিতার বিষয়টা প্রকৃতপক্ষে কোনো ফেলনা নয়। এটি হলো বিবেক, তীর্থভূমি, পূতপবিত্র উপাসনালয়গুলোর একীভূত কর্মফলের মনছবি- যা মহাস্ত্র হিসেবে কর্ম সম্পাদন করে আসছে অনাদিকাল থেকে। বিশ্বাস ও মূল্যবোধের আদলেই উপস্থাপিত হয় সাহিত্যের আদিমতম সাহিত্য সম্পদ দর্পনারায়ণ ঠাকুরের কূলে।ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন, সংগ্রাম, অভিযাত্রা ও যুদ্ধে কবিতা অনুপ্রেরণা, প্রতিবাদ ও মানসিক শক্তি জোগাতে অতুলনীয় ভূমিকা পালন করছে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কবিতা যোদ্ধাদের, বিপ্লবীদের কালে কালে অপরিসীম ধৈর্য, সাহস ও শক্তির প্রেরণা জুগিয়েছে এবং সর্বসাধারণ মানুষকে একাত্ম পোষণে আর বিস্তারে সাহায্য করছে।তারই ধারাবাহিকতায় উল্লেখযোগ্য কিছু অধিক্ষেত্রগুলোর পুর্নমূল্যায়ণে প্রাসঙ্গিকতা টেনে তুলতেই হয়: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধ), প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভিয়েতনামের যুদ্ধ, ইসরাইল-ফিলিস্তিনের যুদ্ধ, স্পেনের গৃহযুদ্ধ সমেত অন্যান্য যুদ্ধেও বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অগণিত কবিদের কবিতা শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল মানবতার কল্যাণে।কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শামসুর রাহমান, সিকদার আমিনুল হক, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, অ্যালেন গিন্সবার্গ, মাহমুদ দারবিশ,উইলফ্রেড ওয়েন, সিগফ্রাইড স্যাসুন, পাবলো নেরুদা এবং ফেদরিকো গার্সিয়া লোরকার মতো হাজার হাজার কবিরা বিভিন্ন আগ্রাসন ও অমানবিকতা, যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার, মানবিক মহাসংকট ও বিপর্যয় কবিতার মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন এবং সকল কালের সংগ্রামী বিপ্লবী সৈনিকদের করেছিলো সাহসী ও শক্তিমান।সাধারণ মানুষের মনে দেশপ্রেম ও বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতেই কবিতা প্রভাব ফেলেছিলেন।সেটা আজ অবধি চলমান এবং আগামীতে আরও উজ্জ্বলতা ছড়াবে কবিতা। আশাবাদী।এতো কথা বলার মূল উদ্দ্যেশ্যে ও লক্ষ্য হলো সময়ের শক্তিশালী কবি আরণ্যক শামছের
“মা একটি নদীর নাম” কাব্যগ্রন্থের শানে নজুল বয়ান করা। এখানে এইসমস্ত বিষয় কবি ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পিত কলমের ঐশ্বর্যে।

উপর্যুক্ত সবকিছুতেই ব্যবহার ও প্রয়োগে স্বাধীনোত্তর বাঙালিদের মধ্যে বর্তমান অগ্রনায়ক কবি আরণ্যক শামছ।কবি মা একটি নদীর নামে নির্যাতিত নিপীড়িত ভুক্তভোগীদের জন্য তার হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ এবং ক্ষতবিক্ষত হয়েছে তা তুলে ধরার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।পাশাপাশি স্মৃতিচারণ করেছেন জনমদুখিনী মাকে নিয়ে। পারিবারিক, সাংসারিক ও গ্রাম্যজীবনের কাতরতার অনুভূতিপ্রবণতায় ডুব দিয়েছেন কবি। মা হারানোর ব্যথা-ক্রন্দনে হয়েছেন অগ্নিশিখা!প্রকৃতির অকৃত্রিম পূজারী, রোমান্টিক ধারার পাইওনিয়ার- কেননা প্রাকৃতিক দৃশ্যকে শুধু সুন্দর দৃশ্য হিসেবেই দেখেননি; বরঞ্চ মানুষের সুপারন্যাচারাল টিচার্স, গার্ডিয়ান এবং আত্মার নিরাময়ক হিসেবে প্রসারণ ঘটিয়েছেন। এটা সহজেই উপলব্ধিজাত যে,  শান্তিপূর্ণময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পুণ্যভূমি অধ্যুষিত শাহজালালের দেশের কবি তিঁনি কতটা আন্তরিক আর কতটা অগ্রগামী কলম সৈনিক।

কবি আরণ্যক শামছের ‘মা একটি নদীর নাম’ কাব্যগ্রন্থটিতে একদিকে নন্দনতত্ত্ব, নীতিবিদ্যা, সত্তাতত্ত্বীয় মনোবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানদর্শন মনোভাবের ছোঁয়া যেমন বিদ্যমান অন্যদিকে তেমনই শিল্পের গভীর সৌন্দর্যের অপরিহার্য শীর্ষক বহুমাত্রিকতার প্রবোধ বির্নিমান করেছেন। তিঁনি কখনো দেশ কাল পাত্রের জবজবে ক্ষতগুলোর সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে করিয়েছেন আবার কখনো চিরচেনা সম্পর্কগুলোর টানাপোড়েনের হৃদয়স্পর্শী স্মৃতি বিস্মৃতির রেখাচিত্র এঁকে দিয়েছেন। কবি তাঁর এ গ্রন্থের কবিতাগুলোতে মূলত পরিবার, সময়, সমাজ,সংসার, প্রকৃতি, রাজনীতি, মৃত্যু, ভালোবাসা, আধ্যাত্মিকতা, ও মানুষের জীবন লড়াই-সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি চিত্রিত করেছেন।উত্তরাধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিঁনি অন্যতম- তাঁর অসাধারণ পরিচয় তিঁনি সব্যসাচী লেখক। জনমানুষের কবি- গণমানুষের লেখক।কবি সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বার্থের কথা বলেছেন- সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে তাল মিলিয়েছেন। কবি মার্কসবাদের মূল ভিত্তি ও ধারণাকে পুঁজি করে মালিক শ্রেণির তথা বুর্জোয়া শ্রেণির শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সুর তুলেছেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাসের চেতনার সঙ্গে সাদৃশ্যকরণ লক্ষণীয় কবি আরণ্যক শামছের মধ্যে। ‘মা একটি নদীর নাম’- কবি আরণ্যক শামছ কী ভেবে নামকরণ করেছেন তিঁনি ভালো বলতে পারবেন তবে নামকরণটি সার্থক ভাষাশিল্পী হিসেবে অকপটে স্বীকার করতেই হয়। কবিতার উপকরণে নিখুঁত প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়; ভাব, ভাষা, ছন্দ(বহুমুখী ও বৈচিত্র্য প্রয়োগ), অলঙ্কার, রূপক, উপমা, বিবর্তন, আবর্তন, তির্যক, ব্যঙ্গ ও রসের।
‘মা একটি নদীর নাম’ নেহাতই একটি কাব্যগ্রন্থ নয়; এটি সত্যিকারের জীবনগাঁথা, আত্মমুক্তি বা আত্মমূল্যায়ন, জাগতিকজ্ঞান এবং মানবিকবিজ্ঞানের সর্বোৎকৃষ্ট দলিল বলে বিশ্বাস করতেই হয়।

দুই.
কবি আরণ্যক শামছের ‘মা একটি নদীর নাম’ কাব্যগ্রন্থটি পড়ে কেন মুগ্ধ হবেন? কেন পড়বেন? আমার এই লেখাটি পড়ে শেষ করলেই বুঝবেন বইটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।প্রতিটি কবিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব কিন্তু পাঠকের ধৈর্যচ্যুতির দিকে লক্ষ্য রেখে কয়েকটি কবিতা আলোচনা করার চেষ্টা করলাম। তাহলে আর দেরি কেন? চলুন কয়েকটি কবিতা সম্পর্কে জানার বোঝার চেষ্টা করি।

“মা একটি নদীর নাম” বইটির প্রথম কবিতা “ফ্যাসিবাদের পুঁজ’। এটি মূলত গদ্যকবিতা। কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতার মোহে মানুষ নিজের আত্মা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও ইতিহাসকে বিক্রি করে দিচ্ছে।যা বর্তমানে অধুনা সভ্যতায় প্রাসঙ্গিক। আর অপ্রাসঙ্গিক অসভ্যতা বেহায়াপনা- এর ফলে সমাজে ভণ্ডামি, ফ্যাসিবাদী মানসিকতা, পুঁজিবাদী লোভ এবং সাংস্কৃতিক অবক্ষয় বেড়ে যাচ্ছে। দিনান্তে মানুষ নিজের আসল পরিচয় হারিয়ে ফেলে এবং নতুন নতুন মুখের আড়ালে নিজের সত্যিকারের সত্তাকে খুঁজে পায় না।

কবি আরণ্যক শামছ তাঁর ‘মানচিত্রের গল্প’ কবিতায় দেখাতে চেয়েছেন যে সমাজের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কদর্য সত্য একসময় প্রকাশ পায়।যা কিছু সত্য তা একদিন না একদিন সূর্যের মতো জ্বলে ওঠে। ক্ষমতা, রাজনীতি ও লোভের কারণে মানুষ তার ঐতিহ্য, সম্ভাবনা ও মানবিকতা হারিয়ে অন্ধকার, অনিশ্চয়তা ও ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কবি নিজেকে অসহায় দর্শকের মতো অনুভব করেন এবং ভাবেন এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা কতটুকু তিঁনি সহ্য করতে পারবেন।

‘মা’কে আমার মনে পড়ে’ এই কবিতাটিতে কবি দেখিয়েছেন যে মায়ের স্মৃতি মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর আবেগের সঙ্গে জড়িত। মাকে মনে পড়লেই শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের কষ্ট, হারিয়ে যাওয়া সময় এবং মমতার অনুভূতি জেগে ওঠে। মা না থাকলেও তাঁর ভালোবাসা ও স্মৃতি কবির হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে। এ কথাগুলোর আলেখ্যদর্শন হলো সর্বজনের অনুভূতির গভীরতা সীমাহীন করে তোলা

“মা একটি নদীর নাম” কাব্যগ্রন্থের নামকবিতাই হলো ‘মা একটি নদীর নাম’। প্রচলিত অর্থে এটি ক্ষুদ্রাকৃতির
কবিতা নয়; বরং দীর্ঘ গদ্যকবিতা অথবা কাব্যিক আখ্যান বলা চলে- যেখানে স্মৃতি, মাতৃসত্তা, নদী, বৃক্ষ, শৈশব, প্রকৃতি ও অপরাধবোধ একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার।হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে কবির কারসাজি। সামগ্রিকভাবে কবিতাটি অত্যন্ত আবেগঘন, প্রতীকসমৃদ্ধ এবং দৃশ্যকল্পনির্ভর। কবিতাটির মূলকেন্দ্রবিন্দু মাকে হারানোর বেদনা এবং প্রকৃতির মধ্যে মায়ের পুনরাবিষ্কার।
‘আমি মা মা বলে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ি’- এই জায়গাটি কবিতার অত্যন্ত আবেগগত জায়গা বলা যায়।কবিতাটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক গভীর মিথ-নির্মাণ এবং প্রতীক ব্যবহারের ক্যারিশমাটিক দেখানো। বৃক্ষের কঙ্কাল, পাতা, পাখি, ঘাসের বর্শা, নদী, মা, স্মৃতি, শৈশব এসব যেন  জীবন ও পরিশুদ্ধি
এবং মলা মাছ, সরপুঁটি, রানিমাছ যেন গ্রামীণ শৈশব ও মায়ের স্নেহ ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি শ্যাওলাকে মায়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে লেগে থাকার আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন।
হেলেঞ্চা শাককে অভিমানী অথচ আঁকড়ে থাকা অস্তিত্ব অকপটে স্বীকার করেছেন। অন্যত্রও কুঠার-শাবলকে প্রকৃতি ধ্বংসের হাতিয়ার হিসেবে ভেবেছেন। শব্দের ব্যবহারে যেমন সচেতন, তেমনি ভাষা সৌন্দর্যেও কবি অনন্য ও অসামান্য। মা একটি নদীর নাম কবিতায় কবির আসল সৌন্দর্য:
‘পাতারা এসে শুনিয়ে যায় বৃক্ষদের শব্দহীন পতনের ইতিহাস।’
এটিকে কবির গভীর ভাবনার উন্মেষের বহিঃপ্রকাশ বলা যায়।নামকরণটি অত্যন্ত স্বার্থক, চমকপ্রদ এবং নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় তা বলা বলাবাহুল্য। মা আর নদী কবির হৃদয় গভীরের ছবি আর প্রকৃতি তারই চিত্র যা দৃশ্যমান; যেখানে মনোজাগতিক বাস্তবতার হীনমন্যতা অতিক্রম করে জড়তা ও সংকোচ ভেঙে প্রাণসঞ্চারের গতিকে করেছেন প্রবলতর।এখানে কবি নিজের ভুল, পথভ্রষ্টতা ও জীবনের ক্লান্তির মধ্যে মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।এটাই স্বাভাবিক- এটাই নিয়ম! নদীর রূপকে মা সন্তানের প্রতি মমতা, ক্ষমা ও পথ দেখানোর শক্তি হয়ে ওঠেন। মা সন্তানের জীবনে এমন এক চিরন্তন আশ্রয়, যিনি সব দুঃখ ও ক্লান্তি ধুয়ে দিতে পারেন। কবি এখানে চিরকালীন বাস্তবতার নিরূপণ করেছেন।

আমি কে? কবিতায় কবি এক বিভ্রান্ত সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় খুঁজতে থাকেন। চারপাশে মৃত্যু, শূন্যতা ও সময়ের নিষ্ঠুর গতি তাকে অস্তিত্বের প্রশ্নে আঘাত করে। শেষ পর্যন্ত তিনি উপলব্ধি করেন- মায়ের মমতাই মানুষের চূড়ান্ত আশ্রয়, যেখানে সব ভয়, বিভ্রান্তি ও একাকীত্ব প্রশমিত হয়।

‘আর্তনাদ’ কবিতায় কবি গভীর রাতের অন্ধকার, নিঃসঙ্গতা ও এক অজানা শক্তির দমন-পীড়নের কথা বলেছেন। এই অন্ধকারের মধ্যেও তাঁর ভেতরে দেশপ্রেম ও প্রতিবাদের অনুভূতি জেগে থাকে। সব ভয় ও দুঃখ সত্ত্বেও কবি মাতৃভূমিকে ভালোবাসেন এবং সেই ভালোবাসা তাঁর অন্তরে আর্তনাদের মতো প্রতিধ্বনিত হয়।

কবি আরণ্যক শামছ তাঁর ‘মৃত্যুর ফসিল’ কবিতাটির শিরোনাম ইউনিক এবং বিরল স্বকীয়তায় গেঁথেছেন।কবিতার বাহির অবলোকন করেই বোধদয় সুনিশ্চিত হয় যে ভেতরে কী আছে। কথায় বলে- যে মুলোটা বাড়ে তার পাতাটা দেখেই বোঝা যায়। কবিতাও তেমন চোখ বুলালেই বোঝা যায়! তিঁনি এক্ষেত্রে সাকসেসফুল। নির্যাসটুকু শিরোনাম পড়েই আস্বাদিত।
কবি তাঁর এ কবিতায় আধুনিক মানুষের জীবনকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেখানে চারপাশে অনেক কিছু ঘটছে, পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু মানুষ নিজেই যেন স্থির ও অর্থহীন অবস্থায় আটকে আছে। সে নিজের অতীত হারাচ্ছে, বর্তমানকে অনুভব করতে পারছে না এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চিত। ফলে তার জীবন এক ধরনের অস্তিত্বহীনতা ও শূন্যতার মধ্যে আটকে পড়ে, যা শেষে ‘মৃত্যুর ফসিল’-এর মতো অতীতের স্মৃতিতে পরিণত হয়। ভাব ও ভাষায় কবি অতুলনীয়! কবির সুদূরপ্রসারী প্রভাব কবিতার তথা বাস্তব দর্শনকেই অগ্রসর করতে পারদর্শী।

‘অন্তিম প্রয়াণে’ কবিতাটিতে কবি একটি বিধ্বস্ত সময়ের চিত্র তুলে ধরেছেন যেখানে যুদ্ধ, ধ্বংস, শিশুদের মৃত্যু এবং মানবিক সংকট মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এসব বেদনাময় ঘটনার মাঝেও কবি নতুন একটি ভালো বছরের আশা করেন- যেখানে শান্তি, সত্য ও মানবতার পুনর্জাগরণ ঘটবে। কবিরা যে স্বপ্নবাজ, আশাবাদী, শান্তিপ্রিয়, মানবতাবাদী তিঁনি কবিতায় তাঁর স্বাক্ষর রেখেছেন।

‘কেমন আছ একুশ?’ এই কবিতাটির নামকরণই বলে দিচ্ছে যে কবি কবিতাটি অমর একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে লিখেছেন। কবিতায় ‘একুশ’ অর্থাৎ ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও চেতনাকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিঁনি দেখিয়েছেন- বাংলা ভাষার জন্য যে রক্তপাত ও আত্মত্যাগ হয়েছিল, সেই বেদনাময় ইতিহাস আজও মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেঁচে আছে। কিন্তু বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় সেই চেতনা যেন হয়েছে আহত ও প্রশ্নবিদ্ধ!  কবি ব্যথিত পীড়িত হয়েছেন এটি সেই চিন্তাভাবনার ফসল।

আরণ্যক শামছ তাঁর ‘প্রান্তিক কবি’ কবিতায় দেখিয়েছেন যে সমাজের ক্ষমতাবান ও ধনী শ্রেণি (বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তি) সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষকে বঞ্চিত করে রেখেছেন। কিন্তু প্রান্তিক কবি সেই বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে সত্য প্রকাশ করতে চান এবং শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।সমাজের অপাংক্তেয় ও অবহেলিত মানুষের ক্ষোভ, দ্রোহ এবং কর্পোরেট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু তীব্র প্রতিবাদের ছবি ফুটে উঠেছে। এখানে কবি নিজেকে সমাজের শেষপ্রান্তে থাকা পলিথিন ব্যাগের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন মনে হলেও যেকোনো সময় ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম।

নারী কবিতায় কবি নারীকে প্রকৃতির অংশ, সভ্যতার মাধুর্য এবং সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু নারীর প্রতি সমাজের বস্তুতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাকে ‘বিনিয়োগ’ বা ‘পুঁজিবাজার’-এ পরিণত করে। এই বিপর্যয় কবির দৃষ্টিতে নারীকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে ব্যর্থতার বেদনাকে জন্ম দেয়।

একমুঠো কবিতায় প্রতিটি ছন্দে কবি কিছু ‘এক মুঠো’ জিনিস চেয়েছেন- যা  তার কাছে প্রিয়- সাথে নিজের সমস্ত দেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। এটি জীবনের ক্ষুদ্র আনন্দ, বেদনা ও সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করার এবং অন্যের সঙ্গে তা ভাগ করার রূপক।

বাংলাদেশকে শুধু ভূগোল বা ইতিহাস হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি এটিকে সঙ্গীত, সাহিত্য, বিপ্লবী চেতনা ও স্বপ্নের প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করেছেন।- যা সোনার বাংলা কবিতার মূখ্য বিষয়। দেশের সব ধরণের কাব্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বৈচিত্র্য মিলিয়ে তাঁর “সোনার বাংলা” রূপ নেয়। এটি চমৎকার ও অসাধারণ- ভাব, ভাষা, শব্দ,  ছন্দ, অলঙ্করণে।

শীত, আমি ও মা- এই কবিতায় কবি শীতকে মা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে- শীতের নরম, স্নেহময় আদর যেন শৈশবের কোল ও মাতৃস্নেহের স্মৃতি জাগায়। অন্যদিকে, শীতের ভেতর লুকিয়ে থাকা সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের নির্মমতা, শিশু হত্যার ছবি, শোষণ ও যুদ্ধের চিহ্ন প্রকাশ করা হয়েছে। কবি দেখিয়েছেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা (শৈশব, মা) এবং সামাজিক ইতিহাস (শোষণ, যুদ্ধ, সাম্যবাদের লড়াই) একত্রিত হয়ে একটি গভীর মানসিক ও নৈতিক উপলব্ধি তৈরি করে।

বসন্তের কবিতা: এবার ফাগুনে(১)-এ  কবি বসন্তকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন- ফুল, বাতাস, গ্রীষ্মের প্রশান্তি, চৈত্রের শেষ মুহূর্ত সব মিলিয়ে জীবনের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা, ক্ষত ও ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব প্রকাশ করেছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ক্ষত, প্রেম ও সময়ের মিলন বসন্তের রঙে ফুটিয়ে তুলেছেন।

‘শিকড়’ এর প্রতিটি দৃশ্য- চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া, নদীর পাড়, ঘাসে ঝরাধ্বনি- কবির শিকড়ের সঙ্গে পুনঃসংযোগের প্রতীক। আধুনিক জীবন ও শহরের ভিড়ের মধ্যে, কবি তার অন্তর্নিহিত মূল ও আত্মিক নির্ভরতার খোঁজ করছেন।

আকাশ কিনবো বলে
একটা আকাশ কিনবো বলে
নিলাম করি জমানো সব সুখ

মানুষের জীবনে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসার জন্য সবকিছু ত্যাগ করার প্রবণতা। কবি  ‘আকাশ কেনা’কে একটি বড় স্বপ্ন বা পরম প্রাপ্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি নিজের সাধ, সুখ, নিঃসঙ্গতা সবকিছু যেন বিলিয়ে দেন। কিন্তু বাস্তবতার আঘাতে দেখা যায়, সব চেষ্টা সত্ত্বেও সেই স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। তখন মানুষের ভেতরে জন্ম নেয় বেদনা, নিঃসঙ্গতা ও শূন্যতার অনুভূতি।কবিতাটি সত্যিই প্রশংসনীয়!

‘শঙ্খঘোষের শঙ্খধ্বনি’  কবিতাটি মূলত কবি শঙ্খঘোষের  প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, স্মরণ এবং তাঁর অনুপস্থিতির বেদনা প্রকাশ করেছেন।একজন মহান কবির মৃত্যু হলেও তাঁর সৃষ্টি, স্মৃতি ও প্রভাব চিরকাল বেঁচে থাকে।একজন মানুষে বহু জীবনের অস্তিত্ব, স্মৃতি ও প্রভাবের স্থায়িত্ব, স্নেহ অনুভূতির গভীরতা, অপূর্ণতা ও আক্ষেপ, কবির অনুপস্থিতি, কিন্তু শিল্পের উপস্থিতি।

কবি ‘একটি ছোবলের অপেক্ষায়’ কবিতাটি গভীরভাবে সমাজবাস্তবতা, ক্ষুধা, বৈষম্য এবং মানুষের ভেতরের নৈতিক সংকটকে তুলে ধরে।পুঁজিবাদী সমাজের বৈষম্য ও ক্ষুধার যন্ত্রণা মানুষের মানবিকতা ধ্বংস করে দিচ্ছে, আর মানুষ এক অনিবার্য বিপর্যয়ের (ছোবল) অপেক্ষায় আছে।

‘ভয়ংকর সুন্দর’ কবিতাটি প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মৃত্যুর একসাথে উপস্থিতি- এই গভীর দ্বৈত সত্যকে তুলে ধরে।প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝেই লুকিয়ে থাকে মৃত্যু ও ক্ষয়; আর এই মিলনই ‘ভয়ংকর সুন্দর’।সৌন্দর্য ও বেদনা একসাথে উপস্থিতি, জীবনের ক্ষয় ও শেষ হয়ে যাওয়া, প্রকৃতির চক্র, মানুষের উপলব্ধি ও প্রশ্ন ইত্যাদি অনুসঙ্গগুলো গভীর ভাবনার মাধ্যমে তুলেছে ধরেছেন

‘ইমাম মাহদীর ঘোড়া’য় কবির এক গভীর দার্শনিক ও প্রতীকধর্মী কবিতা, যেখানে মানুষের ভেতরের দ্বৈত সত্তা- ধ্বংস ও মুক্তি, অহংকার ও আত্মজাগরণ-
তুলে ধরা হয়েছে।মানুষের ভেতরে যেমন ধ্বংসাত্মক শক্তি আছে, তেমনি আছে সত্য ও ন্যায়ের পথে জেগে ওঠার সম্ভাবনাও- কোন পথে যাবে, সেটাই তার আসল নির্বাচন। তাঁকে যেমন বাস্তবতার কবি বলা চলে তেমনই মনস্তাত্ত্বিক কবিও।

কবি আরণ্যক শামছের “শূন্যের কাছে’ কবিতাটি একটি দার্শনিক ভাবনার কবিতা, যেখানে ‘জিরো ও ‘শূন্য’- এর মাধ্যমে জীবনের দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।শূন্যতা যদি ইতিবাচকভাবে দেখা যায়, তবে তা নতুন সম্ভনার সূচনা হয়ে উঠতে পারে।

কাঁটাতারে তিঁনি মূলত এক গভীর বিচ্ছিন্নতা, সীমাবদ্ধতা এবং জীবনের সংগ্রামের মাঝেও আশ্রয় খোঁজার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।

সাদা একুশ-এ তিঁনি একুশের প্রকৃত চেতনা আজ বিকৃত, বাণিজ্যিক ও শূন্য হয়ে গেছে- মানুষ তা ভুলে গিয়ে শুধু বাহ্যিক আচার পালন করছেন।একুশের রক্তঝরা চেতনা আজ হারিয়ে গিয়ে কৃত্রিম, বাণিজ্যিক ও শূন্য আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে সে কথায় বোঝানোর প্রচেষ্টা।সাদা একুশ কবিতাটি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদের কবিতা, যেখানে ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে ভয়াবহ বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে।

‘সব বলে দেবো’ কবিতাটির মূলভাব মানুষের অসচেতনতা, স্বার্থপরতা ও হিংস্রতার কারণে পৃথিবী ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; অথচ মানুষ সেই বিপর্যয় দেখেও নীরব ও উদাসীন।
কবিতায় কবি বলেছেন- “চোখের সমুখ দিয়ে হেঁটে যায় পৃথিবী”- এই পুনরুক্তির মাধ্যমে সময়, প্রকৃতি, সৌন্দর্য, মানবিকতা ও পরিচিত পৃথিবীর ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার চিত্র ফুটে উঠেছে। যুদ্ধ, গ্রেনেড-বোমা, রক্তপাত, প্রকৃতির বিপন্নতা এবং মানুষের কোলাহলপ্রিয় অথচ কর্মহীন অবস্থার মধ্য দিয়ে কবি সভ্যতার গভীর সংকট তুলে ধরেছেন।
শেষে যে শিশুটি বলেছিলো ‘সব বলে দেব’’-এই শিশুটি যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতীক। বর্তমান মানুষের অপরাধ ও ধ্বংসযজ্ঞের হিসাব একদিন তাদের কাছেই দিতে হবে- এই সতর্কবার্তাই কবিতার অন্যতম তাৎপর্য।

সভ্যতা’য় তিঁনি আধুনিক সভ্যতার নামে যুদ্ধ, সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক শোষণ, ধর্মীয় বিভাজন ও মানবিকতার অবক্ষয়ের ভয়াবহ পরিণতির বিরুদ্ধে কবির তীব্র প্রতিবাদ এবং শান্তি ও মানবতার পক্ষে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন।এখাবনে  ট্যাংক, ড্রোন, ন্যাটো, নাজি, বোমারু বিমান, কৃষ্ণসাগর, লাশ ও শকুন- এসব চিত্রকল্পের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর নির্মম বাস্তবতা উঠিয়ে এঁনেছেন। এখানে ‘সভ্যতা’ শব্দটি এক ধরনের ব্যঙ্গাত্মক প্রতীক- যে সভ্যতার একদিকে প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তির উৎকর্ষ, অন্যদিকে মানুষের রক্ত, শিশুর শব এবং ধ্বংসস্তূপ।
‘একহাতে শিশুর শব / আরেকটি হাতে বই’- এই বৈপরীত্যের মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষায় উন্নত হয়েও মানুষ মানবিকতায় কতটা ব্যর্থ ও বিপর্যস্ত। আর ‘আমরা সবাই আছি যুদ্ধে / আমরা সবাই পরাজিত’ পঙ্‌ক্তিতে বোঝানো হয়েছে- যুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে কোনো পক্ষই বিজয়ী হয় না; মানবতাই পরাজিত হয়।কবি হতাশার মধ্যেও আশার কথা বলেছেন- এখনও সময় আছে, মানুষ যদি বিভেদ ভুলে মমতা, ঐক্য ও মানবতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে ধ্বংসের পথ থেকে পৃথিবীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

‘একদিন এইখানে’ একটি গভীর বিষণ্নতা, অস্তিত্বের অনিত্যতা এবং ভবিষ্যতের শূন্যতার কবিতা। কবি কল্পিত এক ‘একদিন’-এর মাধ্যমে এমন একটি সময়ের ছবি এঁকেছেন, যখন পৃথিবী থেকে ফুল, মেঘ, পাখির কোলাহল, শিশুর গান- সব প্রাণময়তার চিহ্ন হারিয়ে যাবে। ফলে কবিতাটি শুধু ব্যক্তিগত বিষাদ নয়; এটি প্রকৃতি, মানবসভ্যতা ও কবিতার সম্ভাব্য অবসান নিয়ে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী আশঙ্কা প্রকাশ করে।প্রথম স্তবকে ফুল, মেঘ, পাখি ও শিশির- প্রকৃতির কোমল ও প্রাণময় উপাদানগুলোর অনুপস্থিতি দেখানো হয়েছে। ‘নিরুত্তাপ আবেগ’ কথাটি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ; আবেগ থাকবে, কিন্তু তার উষ্ণতা থাকবে না- এ যেন জীবনের অন্তর্গত প্রাণশক্তি নিঃশেষ হওয়ার প্রতীক।
দ্বিতীয় স্তবকে শিশুর গান, পার্ক, কবির সুমন, পৃথিবীর পাতাঝরা পথ এবং অমৃত সদনে কবিতার চলে যাওয়া- এসব চিত্র কবিতাটিকে আরও সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক মাত্রা দিয়েছে। এখানে কবিতার ‘অমৃত সদন’-এ চলে যাওয়া যেন ইঙ্গিত করে, পৃথিবীর বাস্তব জীবন থেকে সৌন্দর্য ও সৃজনশীলতার বিলুপ্তিকে।
তৃতীয় স্তবকটি সবচেয়ে তীব্র। ‘শকুন-দল’, ‘হায়েনা’ এবং ‘মানব-অরণ্য’- এই প্রতীকগুলো সভ্যতার অবক্ষয় ও মানবিকতার পশুত্বে পরিণত হওয়ার ভয়াবহ চিত্র তৈরি করেছে।
‘মানব-অরণ্য হবে পশুর আবাস’- পংক্তিটি কবিতার অন্যতম শক্তিশালী বক্তব্য। মানুষ থাকবে, কিন্তু মানবিকতা থাকবে না- এই বিপরীতার্থক অবস্থানই কবিতার অন্তর্নিহিত ট্র্যাজেডিকে তীব্র করেছেন।

‘ওই যে দূরের সাঁকো’তে কবি মূলত হারিয়ে যাওয়া শৈশব, অতীতের স্মৃতি, জীবনের ক্ষয়, একাকিত্ব, অনিবার্য বিষণ্ণতা এবং মৃত্যুর দিকে মানুষের অবধারিত যাত্রা নিয়ে রচিত।
কবি অতীতের হারিয়ে যাওয়া সময়কে স্মরণ করেন। সেই সময় আর ফিরে আসবে না, কিন্তু তার কিছু সুবাস, স্মৃতি ও আবেগ এখনো কবির মনে লেগে আছে। পুরোনো পুঁথির গন্ধ, অলস দুপুর, হলুদ পাখির গান, ঝরাপাতা ও বৈশাখী অভিমান—এসবের মধ্য দিয়ে হারানো শৈশবের মধুর স্মৃতি ফিরে আসে। কিন্তু সেই স্মৃতির বিপরীতে বর্তমান জীবনে রয়েছে অবহেলা, শূন্যতা ও বেদনা।
কবি উপলব্ধি করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনও ক্ষয়ে যাচ্ছে- যেন পাঁজরের ভেতর লুকিয়ে থাকা উইপোকা আয়ু খেয়ে চলেছে। তবু মানুষ আবেগ, স্বপ্ন ও স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে। জীবনের সঞ্চিত আনন্দ-বেদনা, বৃষ্টি, বিকেল, বিষণ্ণতা- সবকিছু মিলিয়ে জীবন যেন শেষ পর্যন্ত শূন্যতার এক মেলা।
শেষ স্তবকে কবিতাটি গভীর অস্তিত্ববাদী তাৎপর্য লাভ করেছে। অজানা গল্পগুলো অজানা ব্যাংকে জমা থাকুক, জীবনের পাপগুলো ক্ষমার আড়ালে ঢাকা থাকুক—কারণ মৃত্যুর ডাক ক্রমেই কাছে আসছে। ”দূরের সাঁকো’, এখানে মৃত্যুর প্রতীক; যে সাঁকো পার হয়ে মানুষকে একদিন অজানা জগতে চলে যেতে হবে।

পরিত্যক্ত শৈশব- এ হারিয়ে যাওয়া শৈশব, শৈশবের স্মৃতি, সম্পর্কের ক্ষয় এবং প্রকৃতি-নদীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একজন মানুষের গভীর নস্টালজিয়া ও বিষণ্নতার বহিঃপ্রকাশ।কবিতায় কবি বহু বছর পর নিজের ফেলে আসা শৈশবের উঠোনে ফিরে আসেন। ঘাস, ফড়িং, ঘুঘু ডাকা দুপুর, নারিকেল পাতার বাঁশি, বৃষ্টির শব্দ, খেলার মাঠ, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্মৃতি, শৈশবের বন্ধু- সবকিছু তাঁর স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে মায়ের অসুস্থতা, বাবার ঋণের বোঝা এবং শৈশবের নানা দুঃখও ফিরে আসে।
সময়ের প্রবাহে সেই পরিচিত মানুষ, সম্পর্ক ও পরিবেশ বদলে গেছে। সম্পর্কের ‘পলেস্তারা’ খসে পড়েছে, বন্ধনের ‘সিমেন্ট’সরে গেছে- অর্থাৎ শৈশবের নির্মল সম্পর্কগুলো প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের স্বার্থ, দূরত্ব ও মিথ্যার চাপে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।
এর পাশাপাশি লোলা নদীর পরিবর্তন কবিতাটিকে আরও গভীর তাৎপর্য দিয়েছে। যে নদী একসময় জীবনের অংশ ছিল, মানুষের লোভ ও দখলের কারণে তার স্বাভাবিক অস্তিত্বও বিপন্ন। তাই নদীর ক্ষয় যেন শুধু প্রকৃতির ক্ষয় নয়, মানুষের মানবিকতারও ক্ষয়। অতঃপর শৈশবের সেই বাঁশের সাঁকো হয়ে উঠেছে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি প্রতীকী সেতু। সাঁকোর দুলতে থাকা যেন কবির স্মৃতি, অস্তিত্ব ও হারানো শৈশবের অনিশ্চিত অথচ অবিরাম ফিরে আসার প্রতীক।

কবি আরণ্যক শামছ’র ‘ঈশ্বর’ কবিতাটিতে জীবনের ব্যর্থতা, হারানো, ভুল পথ ও অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যেও ঈশ্বরের প্রতি মানুষের গভীর আশ্রয়, ক্ষমাপ্রার্থনা ও আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা।
কবি জীবনে অনেক কিছু পাওয়ার আশায় চলতে গিয়ে অনেক কিছু হারিয়েছেন এবং জেনেও ভুল পথে পা বাড়িয়েছেন। সেই হারানো ও বিপথগামিতার জন্য তাঁর মধ্যে অনুশোচনা আছে। ঈশ্বর কখনো তাঁকে শূন্য করেছেন, আবার কখনো নতুন সম্ভাবনা ও আশার উর্বরতা দিয়েছেন। তাই কবি ঈশ্বরকে নিজের স্বর, আশ্রয় ও ভরসার প্রতীক হিসেবে দেখেছেন।

“বিপথু হই আমি, তবু তুমি, হও মোর স্বর,
আমার দীনতা ভুলে, করো ক্ষমা, হে ঈশ্বর।
মুছে দাও হিংসা, মুছে দাও জমে থাকা ক্লেশ, ধ্বংসস্তূপের মাঝে, যেন ভুলি সকল বিদ্বেষ।”

এখানে কবি নিজের দীনতা ও ভুলের জন্য ক্ষমা চান এবং অন্তর থেকে হিংসা, ক্লেশ ও বিদ্বেষ মুছে ফেলার আকুতি জানান। শেষ স্তবকে ঈশ্বরকে ভুলে থাকার চেষ্টা করলেও বিপদের মুহূর্তে তাঁকেই আবার ভরসার চর হিসেবে খুঁজে পান। শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে নিজের অহং, বিদ্বেষ ও পুরোনো সত্তাকে বিলীন করে দিতে চান।

“তোমাক খুঁজবো বলে’ এখাবনে একজন মানুষের দীর্ঘ জীবনের অপূর্ণ অনুসন্ধান, একাকিত্ব, নিরাপদ আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা।
কবি ‘তোমাকে’ খুঁজতে গিয়ে বছরের পর বছর, দেশ-শহর-নদী পেরিয়েছেন। কিন্তু এই অনুসন্ধান শুধু কোনো নির্দিষ্ট মানুষের খোঁজ নয়; এটি যেন ভালোবাসা, আশ্রয়, মমতা, নিরাপত্তা ও আপনজনের সন্ধান। দীর্ঘ পথচলায় তিনি জীবনের কঠিন, বিভৎস ও পিচ্ছিল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। বারবার হোঁচট খেলেও এমন কাউকে পাননি, যে কাঁধে হাত রেখে বলবে- ‘আমি আছি, ‘ভয় নেই’, ‘এক গ্লাস জল খাবে?’
সবচেয়ে বেদনাদায়ক পরিণতি আসে শেষ স্তবকে। যাকে খুঁজতে গিয়ে কবি ঘর ছেড়েছিলেন, সেই ‘তুমি’ শেষ পর্যন্ত অন্য পথে চলে গিয়ে নিজের সাজানো সংসার বা ‘ড্রইং রুমে’ পৌঁছে গেছে। আর কবির জীবনের সব পথ যেন ঘুরেফিরে ‘রোমে’- অর্থাৎ এমন এক গন্তব্যে পৌঁছেছে, যেখানে কাঙ্ক্ষিত মানুষটির সঙ্গে তাঁর আর মিলন ঘটেনি।

‘জলের চোখে জল’ বর্তমান সময়ে কবিতাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কবি এই কবিতায় নিদারুণভাবে সমাজের সকল স্তরের মানুষ করুণ কাহিনির বিবৃতি দিয়েছেন।নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির ফলে বাজার তালিকায় বিপদ, দুঃশ্চিন্তা ও মহাবিপদ সংকেত দিয়েছেন।যা ভেবে কবি সত্যিই ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে গেছেন।সমাজ, রাষ্ট্রের বেজন্মাদের হাতে গোটা দেশের মানুষ জিম্মি হয়ে আছে- চিত্রটা এখানে উজ্জ্বল। নানাবিধ শ্রেণি-পেশা মানুষের জন্য তিঁনি মুক্তি প্রার্থনা করেছেন।এই যেমন: বৃদ্ধ কলিম, রিকসাওয়ালা, খেটেখুটে খাওয়া শ্রমিক, দিনমজুর এমনকি স্বয়ং কবিও যেন পরিত্রাণ পাচ্ছেন না। দাড়কিনা মাছ- শোষকেরা তবুও চুপচাপ- কোনো পদক্ষেপ নেই।দেশটাকে যাঁরা এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর তাঁদের জীবন দুর্বিষহ- কবি তাঁদের অবমূল্যায়নই থেকে শব্দের মৌমাছিদের উদাত্তকণ্ঠে আহবান জানিয়েছেন কবিতাটিতে। কবিতায় কবি ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা অপব্যবহারের চিত্রটা চিত্রকল্পের দৃশ্যগত করেছেন।চিল, ঈগল, শকুন, পশুরাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

একদিন কবিতা মিছিলে- কবিতায় কবি বলেছেন-

“একদিন রাজপথে কবিতার মিছিল হবে
শব্দেরা হয়ে যাবে মিছিলের শব-
কাব্যের শ্লোগান হবে, কণ্ঠের প্লাবন হবে
স্তবক হয়ে যাবে কফিনের রব।”

কবিতাটি রূপকধর্মী।তবে চিত্রকল্পের চমৎকার প্রকাশ। সমাজ-সংস্কৃতির চরম অবক্ষয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদের হাতিহার কবিতাটিতে চরম অসংগতি এবং আদর্শিক বিচ্যুতির প্রেক্ষাপটে রচিত। সঙ্গে মেকি তথা দেখানো দেশপ্রেম, কবিদের দলীয়করণ ও বাণিজ্যিকীকরণই মূল উপজীব্য! বলাবাহুল্য, কবি আরণ্যক শামছ সমাজবাস্তবতার বর্তমান চিত্র তথ্য চিরকালীনতার সুর তুলেছেন।যেখানে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার এবং বুদ্ধিজীবীদের আপোষকামিতা, কৃত্রিমরূপ এবং নকল রূপটাকে প্রদর্শন করার প্রচেষ্টা মাত্র।এখন সাহিত্য যে কতটা লোকদেখানো, ফিকে বিনোদনের আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে তা- দেশপ্রেমের লেগো,  একটিও কবিতা না লেখা চাদর জড়ানো কবি, পতাকা পাঞ্জাবি, এসি নিয়ন্ত্রিত স্টুডিও টকশোতে চিত্রই বলে দেয়।

‘জাতিস্মরের ভোট’ কবিতায় প্রকৃতপক্ষে একটি তীব্র ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কবিতা, যেখানে নির্বাচনকেন্দ্রিক সমাজ ও নেতাদের ভণ্ডামিকে তুলে ধরেছেন। ভোটের সময় সাধারণ মানুষকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু ভোট শেষ হলেই তারা আবার অবহেলিত হয়ে পড়ে। কবি কতটা সমাজসচেতন কবিতাটি পড়লেই তা অনুধাবন করা সম্ভব। লক্ষ্য করুন, কী নান্দনিকভাবে কবিতা উপস্থাপন করেছেন:

“রাতের বেলা আড়াল খোঁজে, পকেট ভারী নোট, সকালবেলা গদগদে সব, চাইছে কেবল ভোট। কেউবা দেবে ব্রিজ-কালভার্ট, কেউবা দেবে রাস্তা, ভোট ফুরালে জনতা সব সস্তা কিংবা নাস্তা।
ইশতেহারের রঙ চড়েছে, স্বপ্ন আকাশ-ছোঁয়া, বাস্তবে সব উবেই যাবে- যেমন বিড়ির ধোঁয়া। মার্কা তোমার যাই হোক না- আপেল কিংবা হাতি, দিন শেষে ওই আমরাই তো বলির পাঁঠার জ্ঞাতি।”

বইটিতে মোট ৮০ টা কবিতা রয়েছে।প্রতিটি কবিতায় কবি অসাধারণ লিখেছেন।শব্দ, ভাব,ছন্দ, ভাষা, রূপক, উপমা, অলঙ্কার, আবর্তন, বিবর্তন এবং ব্যঙ্গাত্মক হাস্যরসের মাধ্যম দেশ, জাতি, রাষ্ট্র ও বিশ্বের শ্রেণি ব্যবধান, পুঁজিবাদী আগ্রাসন, নাড়ির সম্পর্কের অবনতি-উন্নতি, প্রকৃতির বিনষ্টের এক সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন কাব্যটিতে। প্রতিটি কবিতায়ই হৃদয়স্পর্শী মা ও নদীর মতো গভীর মনোযোগ ধরে রাখে।কিছু কবিতার শব্দ জটিল হলেও প্রণম্য পাঠকদের কাছে তা নস্যি।কবির বিদ্রোহ, প্রেম, ভালোবাসা, আধ্যাত্মিকতা, আত্ম-জিজ্ঞাসা এবং মানবজীবন তথা মানবজাতির একটি দলিল। ‘মা একটি নদীর নাম ‘ কবিতার এই সংকলনে সমস্ত পৃষ্ঠাজুড়ে অর্থাৎ ৮০ টা কবিতায় মানব ও প্রকৃতির শান্তি, সাম্য, সমতা ও স্বস্তির কথা বলা হয়েছে। গ্রন্থটি যদি জাতি ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেন,তাহলে সমাজের অবক্ষয়ের হাত থেকে মুক্তি পাবেন- এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

কবি তাঁর এই অমূল্য গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর প্রয়াত মা নুরুন্নেছা ও বাবা মোঃ পাখী মিয়াকে।বইটির প্রকাশক সৃজন। প্রচ্ছদ এঁকেছেন দেওয়ান আতিকুর রহমান।২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইটি প্রকাশিত হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলায়।বইটির মূল্য ৩০০ টাকা। বইটির পাঠক হিসেবে মনেপ্রাণে চাই পাঠকপ্রিয়তায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করুক।

আরণ্যক শামছ (সনদপত্রের নাম: মোহাম্মদ শামছ উদ্দিন)। জন্ম ৬ মার্চ ১৯৭২, সুরমা পাড়ের জনপদ সিলেটের বিয়ানীবাজারে। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এই লেখক পেশায় একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও শিক্ষক-প্রশিক্ষক। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি সিলেটের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘স্কলার্সহোম’ (টিলাগড়  ক্যাম্পাস)-এর অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত।

পেশাগত ব্যস্ততার সমান্তরালে আরণ্যক শামছ একজন মননশীল প্রাবন্ধিক, দক্ষ অনুবাদক ও গবেষক। তাঁর সম্পাদিত লিটলম্যাগ ‘আরণ্যক’ এবং ‘GATE SELTA ELT Journal’ সাহিত্য ও ভাষা গবেষণায় তাঁর নিবিড় সম্পৃক্ততার সাক্ষ্য দেয়। ইতিপূর্বে তাঁর রচিত ইতিহাসধর্মী লেখা-‘নানকার বিদ্রোহে বিয়ানীবাজার’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধে বিয়ানীবাজার’ এবং কাব্যগ্রন্থ-‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’ ও ‘যে দিন সকল মুকুল গেল ঝরে’ সুধী পাঠক ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

বর্তমানে তিনি ‘কবিকণ্ঠ সিলেট’-এর মুখ্য নির্বাহী সম্পাদক এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘সৃজন’-এর পর্ষদ সদস্য। লেখক ও গবেষক হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও তিনি GATE-SELTA-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং ETAB-এর কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভাষা শিক্ষা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

গোলাম রববানী (কবি, লেখক ও শিক্ষক), সিলেট, বাংলাদেশ 

 

জনপ্রিয় পোস্ট

বই আলোচনা

মা একটি নদীর নাম: বাস্তববাদ, প্রকৃতিবাদ, রোমান্টিসিজম ও সার্বজনীন জাতিস্মরের স্মারক

আপডেট : ১০:৪১:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

মা একটি নদীর নাম: বাস্তববাদ, প্রকৃতিবাদ, রোমান্টিসিজম ও সার্বজনীন জাতিস্মরের স্মারক
গোলাম রববানী 

বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে “মা একটি নদীর নাম”- কবি আরণ্যক শামছের এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে বাস্তবতা কেবল দৃশ্যমান সৌন্দর্যের বিষয় নয়; বরং বিশ্বরাজনীতি, ইতিহাস,ঐতিহ্য, প্রেম-ভালোবাসা, শিকড়ের প্রতি বীতশ্রদ্ধ, বৈচিত্র্যময় চেহারা, সত্য-মিথ্যার পর্যালোচনা-ফলাফল, ভুলের মাশুল দিতে ক্ষমা প্রার্থনা,  পুঁজিবাদী আগ্রাসন, শ্রেণিসংগ্রামের চির বহমান যুদ্ধ-লড়াই, প্রকৃতির বিপর্যয় ও বিনষ্ট, স্মৃতি, সময়, সমাজ-জীবন ও আত্মপরিচয়ের এক গভীর নান্দনিক বিনির্মাণ। এটি সময়ের একটা শ্রেষ্ঠদলিল হিসেবে পরিব্যাপ্ত।তিঁনি মনের মাধুরি মিশিয়ে, যত্ন করে, ঢের সময় নিয়ে সৃষ্টি করেছেন।তাঁর জীবনের অন্যান্য অর্জনের চেয়ে এই সৃষ্টিশীল কর্মকেই  বহুগুণেই এগিয়ে রাখছি। কবির পরিচয় বহুবিধ; কোনো একক গুণে গুণান্বিত করা মুশকিল।একেবারেই অসম্ভব!লেখাটির শেষের দিকে কবির পরিচয় সংযুক্ত থাকবে।
কবি আরণ্যক শামছ এই কাব্যগ্রন্থে নদীকে কোনো নদী হিসেবে দেখেননি; তিঁনি নদীকে মমতাময়ীরূপ দিয়েছেন- দিয়েই প্রাণবন্তভাবে জীবন্ত সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক তথা মানবিক সত্তায় গড়েছেন।এদিক থেকে বইটি পড়তে গিয়ে পাঠক শুধু প্রকৃতির চিত্র দেখবেন না, বরং চলমান সভ্যতায় অসভ্যতার অন্তর্লীন স্পন্দন অনুভব করবেন বলে প্রত্যাশা করছি।রাষ্ট্রীয় ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বমানচিত্রের বহুবৈচিত্র্যময় প্রসঙ্গের ঘটনা অনুসঙ্গের চিত্রায়ণই কবি আরণ্যক শামছের প্রতিটি কবিতার প্রাণস্পন্দন। সামান্যতম আলোচনা পর্যালোচনায় বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা কষ্টকর তবুও চেষ্টায় প্রতীয়মান। বাংলা সাহিত্যের একটি প্রাচীনতম শাখা হলো কবিতা। তাই কবিতাকে শিল্পমাধ্যমের ফাউন্ডেশন বা ভিত্তিভূমি বলা চলে।নিদর্শন হিসেবে চর্যাপদের কথাই বলতে হয়। শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির যতগুলো প্লাটফর্ম আছে- তাঁর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এই মাধ্যমটির শিকড় ধরেই অন্যান্য শাখা-প্রশাখার বিস্তৃতি লাভ করেছে। অন্যান্য শাখা-প্রশাখার গুরুত্ব লাভ করে প্রাচীন মাধ্যমটির মধ্যস্থতা করেই।সাথে সাথে ত্বরান্বিত এবং অগ্রগতিতে সবচেয়ে বেশি অবদানও রাখে সেটি নির্দ্বিধায় বলা যায় । স্বাধীন সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা রক্ষার্থে, সাম্য ও সমতার ভিত্তিতে সংবিধানের ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণে, মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা, জীবনধারা, ভাববাদ-প্রকৃতিবাদ এবং বাস্তববাদিতার চেতনা জাগ্রতচিত্ত ফলাতে, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঢাল হতে, উৎপীড়ন নিপীড়নের বিরোধিতাকরণে, অমানবিকতার বিরুদ্ধে, একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে বিশ্বকে আবদ্ধকরণে, ধর্মকে কুক্ষিগত করার বিরুদ্ধে, লড়াই-সংগ্রামে বলিষ্ঠ প্রতিবাদে, প্রেম-ভালোবাসা-বিচ্ছেদ-নিঃসঙ্গতা এবং একাকীত্বের বৈচিত্র্যময় অনুভূতি সহানুভূতির কার্যকর মূল্যায়ন থেকে শুরু করে সার্বজনীনভাবে দেশসহ গোটা পৃথিবীর প্রকৃতি, প্রাণী ও মানুষের অধিকার নিশ্চিতকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী ও যুতসই মাধ্যম/হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে এই কবিতা।সেখানে কবি আরণ্যক শামছের কবিতা কতটা অবদান রাখবে বলা কঠিন কিন্তু স্বীকার অনস্বীকার্য বলায় যায়। কবিতার বিষয়টা প্রকৃতপক্ষে কোনো ফেলনা নয়। এটি হলো বিবেক, তীর্থভূমি, পূতপবিত্র উপাসনালয়গুলোর একীভূত কর্মফলের মনছবি- যা মহাস্ত্র হিসেবে কর্ম সম্পাদন করে আসছে অনাদিকাল থেকে। বিশ্বাস ও মূল্যবোধের আদলেই উপস্থাপিত হয় সাহিত্যের আদিমতম সাহিত্য সম্পদ দর্পনারায়ণ ঠাকুরের কূলে।ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন, সংগ্রাম, অভিযাত্রা ও যুদ্ধে কবিতা অনুপ্রেরণা, প্রতিবাদ ও মানসিক শক্তি জোগাতে অতুলনীয় ভূমিকা পালন করছে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কবিতা যোদ্ধাদের, বিপ্লবীদের কালে কালে অপরিসীম ধৈর্য, সাহস ও শক্তির প্রেরণা জুগিয়েছে এবং সর্বসাধারণ মানুষকে একাত্ম পোষণে আর বিস্তারে সাহায্য করছে।তারই ধারাবাহিকতায় উল্লেখযোগ্য কিছু অধিক্ষেত্রগুলোর পুর্নমূল্যায়ণে প্রাসঙ্গিকতা টেনে তুলতেই হয়: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধ), প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভিয়েতনামের যুদ্ধ, ইসরাইল-ফিলিস্তিনের যুদ্ধ, স্পেনের গৃহযুদ্ধ সমেত অন্যান্য যুদ্ধেও বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অগণিত কবিদের কবিতা শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল মানবতার কল্যাণে।কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শামসুর রাহমান, সিকদার আমিনুল হক, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, অ্যালেন গিন্সবার্গ, মাহমুদ দারবিশ,উইলফ্রেড ওয়েন, সিগফ্রাইড স্যাসুন, পাবলো নেরুদা এবং ফেদরিকো গার্সিয়া লোরকার মতো হাজার হাজার কবিরা বিভিন্ন আগ্রাসন ও অমানবিকতা, যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার, মানবিক মহাসংকট ও বিপর্যয় কবিতার মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন এবং সকল কালের সংগ্রামী বিপ্লবী সৈনিকদের করেছিলো সাহসী ও শক্তিমান।সাধারণ মানুষের মনে দেশপ্রেম ও বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতেই কবিতা প্রভাব ফেলেছিলেন।সেটা আজ অবধি চলমান এবং আগামীতে আরও উজ্জ্বলতা ছড়াবে কবিতা। আশাবাদী।এতো কথা বলার মূল উদ্দ্যেশ্যে ও লক্ষ্য হলো সময়ের শক্তিশালী কবি আরণ্যক শামছের
“মা একটি নদীর নাম” কাব্যগ্রন্থের শানে নজুল বয়ান করা। এখানে এইসমস্ত বিষয় কবি ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পিত কলমের ঐশ্বর্যে।

উপর্যুক্ত সবকিছুতেই ব্যবহার ও প্রয়োগে স্বাধীনোত্তর বাঙালিদের মধ্যে বর্তমান অগ্রনায়ক কবি আরণ্যক শামছ।কবি মা একটি নদীর নামে নির্যাতিত নিপীড়িত ভুক্তভোগীদের জন্য তার হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ এবং ক্ষতবিক্ষত হয়েছে তা তুলে ধরার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।পাশাপাশি স্মৃতিচারণ করেছেন জনমদুখিনী মাকে নিয়ে। পারিবারিক, সাংসারিক ও গ্রাম্যজীবনের কাতরতার অনুভূতিপ্রবণতায় ডুব দিয়েছেন কবি। মা হারানোর ব্যথা-ক্রন্দনে হয়েছেন অগ্নিশিখা!প্রকৃতির অকৃত্রিম পূজারী, রোমান্টিক ধারার পাইওনিয়ার- কেননা প্রাকৃতিক দৃশ্যকে শুধু সুন্দর দৃশ্য হিসেবেই দেখেননি; বরঞ্চ মানুষের সুপারন্যাচারাল টিচার্স, গার্ডিয়ান এবং আত্মার নিরাময়ক হিসেবে প্রসারণ ঘটিয়েছেন। এটা সহজেই উপলব্ধিজাত যে,  শান্তিপূর্ণময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পুণ্যভূমি অধ্যুষিত শাহজালালের দেশের কবি তিঁনি কতটা আন্তরিক আর কতটা অগ্রগামী কলম সৈনিক।

কবি আরণ্যক শামছের ‘মা একটি নদীর নাম’ কাব্যগ্রন্থটিতে একদিকে নন্দনতত্ত্ব, নীতিবিদ্যা, সত্তাতত্ত্বীয় মনোবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানদর্শন মনোভাবের ছোঁয়া যেমন বিদ্যমান অন্যদিকে তেমনই শিল্পের গভীর সৌন্দর্যের অপরিহার্য শীর্ষক বহুমাত্রিকতার প্রবোধ বির্নিমান করেছেন। তিঁনি কখনো দেশ কাল পাত্রের জবজবে ক্ষতগুলোর সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে করিয়েছেন আবার কখনো চিরচেনা সম্পর্কগুলোর টানাপোড়েনের হৃদয়স্পর্শী স্মৃতি বিস্মৃতির রেখাচিত্র এঁকে দিয়েছেন। কবি তাঁর এ গ্রন্থের কবিতাগুলোতে মূলত পরিবার, সময়, সমাজ,সংসার, প্রকৃতি, রাজনীতি, মৃত্যু, ভালোবাসা, আধ্যাত্মিকতা, ও মানুষের জীবন লড়াই-সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি চিত্রিত করেছেন।উত্তরাধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিঁনি অন্যতম- তাঁর অসাধারণ পরিচয় তিঁনি সব্যসাচী লেখক। জনমানুষের কবি- গণমানুষের লেখক।কবি সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বার্থের কথা বলেছেন- সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে তাল মিলিয়েছেন। কবি মার্কসবাদের মূল ভিত্তি ও ধারণাকে পুঁজি করে মালিক শ্রেণির তথা বুর্জোয়া শ্রেণির শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সুর তুলেছেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাসের চেতনার সঙ্গে সাদৃশ্যকরণ লক্ষণীয় কবি আরণ্যক শামছের মধ্যে। ‘মা একটি নদীর নাম’- কবি আরণ্যক শামছ কী ভেবে নামকরণ করেছেন তিঁনি ভালো বলতে পারবেন তবে নামকরণটি সার্থক ভাষাশিল্পী হিসেবে অকপটে স্বীকার করতেই হয়। কবিতার উপকরণে নিখুঁত প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়; ভাব, ভাষা, ছন্দ(বহুমুখী ও বৈচিত্র্য প্রয়োগ), অলঙ্কার, রূপক, উপমা, বিবর্তন, আবর্তন, তির্যক, ব্যঙ্গ ও রসের।
‘মা একটি নদীর নাম’ নেহাতই একটি কাব্যগ্রন্থ নয়; এটি সত্যিকারের জীবনগাঁথা, আত্মমুক্তি বা আত্মমূল্যায়ন, জাগতিকজ্ঞান এবং মানবিকবিজ্ঞানের সর্বোৎকৃষ্ট দলিল বলে বিশ্বাস করতেই হয়।

দুই.
কবি আরণ্যক শামছের ‘মা একটি নদীর নাম’ কাব্যগ্রন্থটি পড়ে কেন মুগ্ধ হবেন? কেন পড়বেন? আমার এই লেখাটি পড়ে শেষ করলেই বুঝবেন বইটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।প্রতিটি কবিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব কিন্তু পাঠকের ধৈর্যচ্যুতির দিকে লক্ষ্য রেখে কয়েকটি কবিতা আলোচনা করার চেষ্টা করলাম। তাহলে আর দেরি কেন? চলুন কয়েকটি কবিতা সম্পর্কে জানার বোঝার চেষ্টা করি।

“মা একটি নদীর নাম” বইটির প্রথম কবিতা “ফ্যাসিবাদের পুঁজ’। এটি মূলত গদ্যকবিতা। কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতার মোহে মানুষ নিজের আত্মা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও ইতিহাসকে বিক্রি করে দিচ্ছে।যা বর্তমানে অধুনা সভ্যতায় প্রাসঙ্গিক। আর অপ্রাসঙ্গিক অসভ্যতা বেহায়াপনা- এর ফলে সমাজে ভণ্ডামি, ফ্যাসিবাদী মানসিকতা, পুঁজিবাদী লোভ এবং সাংস্কৃতিক অবক্ষয় বেড়ে যাচ্ছে। দিনান্তে মানুষ নিজের আসল পরিচয় হারিয়ে ফেলে এবং নতুন নতুন মুখের আড়ালে নিজের সত্যিকারের সত্তাকে খুঁজে পায় না।

কবি আরণ্যক শামছ তাঁর ‘মানচিত্রের গল্প’ কবিতায় দেখাতে চেয়েছেন যে সমাজের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কদর্য সত্য একসময় প্রকাশ পায়।যা কিছু সত্য তা একদিন না একদিন সূর্যের মতো জ্বলে ওঠে। ক্ষমতা, রাজনীতি ও লোভের কারণে মানুষ তার ঐতিহ্য, সম্ভাবনা ও মানবিকতা হারিয়ে অন্ধকার, অনিশ্চয়তা ও ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কবি নিজেকে অসহায় দর্শকের মতো অনুভব করেন এবং ভাবেন এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা কতটুকু তিঁনি সহ্য করতে পারবেন।

‘মা’কে আমার মনে পড়ে’ এই কবিতাটিতে কবি দেখিয়েছেন যে মায়ের স্মৃতি মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর আবেগের সঙ্গে জড়িত। মাকে মনে পড়লেই শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের কষ্ট, হারিয়ে যাওয়া সময় এবং মমতার অনুভূতি জেগে ওঠে। মা না থাকলেও তাঁর ভালোবাসা ও স্মৃতি কবির হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে। এ কথাগুলোর আলেখ্যদর্শন হলো সর্বজনের অনুভূতির গভীরতা সীমাহীন করে তোলা

“মা একটি নদীর নাম” কাব্যগ্রন্থের নামকবিতাই হলো ‘মা একটি নদীর নাম’। প্রচলিত অর্থে এটি ক্ষুদ্রাকৃতির
কবিতা নয়; বরং দীর্ঘ গদ্যকবিতা অথবা কাব্যিক আখ্যান বলা চলে- যেখানে স্মৃতি, মাতৃসত্তা, নদী, বৃক্ষ, শৈশব, প্রকৃতি ও অপরাধবোধ একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার।হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে কবির কারসাজি। সামগ্রিকভাবে কবিতাটি অত্যন্ত আবেগঘন, প্রতীকসমৃদ্ধ এবং দৃশ্যকল্পনির্ভর। কবিতাটির মূলকেন্দ্রবিন্দু মাকে হারানোর বেদনা এবং প্রকৃতির মধ্যে মায়ের পুনরাবিষ্কার।
‘আমি মা মা বলে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ি’- এই জায়গাটি কবিতার অত্যন্ত আবেগগত জায়গা বলা যায়।কবিতাটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক গভীর মিথ-নির্মাণ এবং প্রতীক ব্যবহারের ক্যারিশমাটিক দেখানো। বৃক্ষের কঙ্কাল, পাতা, পাখি, ঘাসের বর্শা, নদী, মা, স্মৃতি, শৈশব এসব যেন  জীবন ও পরিশুদ্ধি
এবং মলা মাছ, সরপুঁটি, রানিমাছ যেন গ্রামীণ শৈশব ও মায়ের স্নেহ ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি শ্যাওলাকে মায়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে লেগে থাকার আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন।
হেলেঞ্চা শাককে অভিমানী অথচ আঁকড়ে থাকা অস্তিত্ব অকপটে স্বীকার করেছেন। অন্যত্রও কুঠার-শাবলকে প্রকৃতি ধ্বংসের হাতিয়ার হিসেবে ভেবেছেন। শব্দের ব্যবহারে যেমন সচেতন, তেমনি ভাষা সৌন্দর্যেও কবি অনন্য ও অসামান্য। মা একটি নদীর নাম কবিতায় কবির আসল সৌন্দর্য:
‘পাতারা এসে শুনিয়ে যায় বৃক্ষদের শব্দহীন পতনের ইতিহাস।’
এটিকে কবির গভীর ভাবনার উন্মেষের বহিঃপ্রকাশ বলা যায়।নামকরণটি অত্যন্ত স্বার্থক, চমকপ্রদ এবং নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় তা বলা বলাবাহুল্য। মা আর নদী কবির হৃদয় গভীরের ছবি আর প্রকৃতি তারই চিত্র যা দৃশ্যমান; যেখানে মনোজাগতিক বাস্তবতার হীনমন্যতা অতিক্রম করে জড়তা ও সংকোচ ভেঙে প্রাণসঞ্চারের গতিকে করেছেন প্রবলতর।এখানে কবি নিজের ভুল, পথভ্রষ্টতা ও জীবনের ক্লান্তির মধ্যে মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।এটাই স্বাভাবিক- এটাই নিয়ম! নদীর রূপকে মা সন্তানের প্রতি মমতা, ক্ষমা ও পথ দেখানোর শক্তি হয়ে ওঠেন। মা সন্তানের জীবনে এমন এক চিরন্তন আশ্রয়, যিনি সব দুঃখ ও ক্লান্তি ধুয়ে দিতে পারেন। কবি এখানে চিরকালীন বাস্তবতার নিরূপণ করেছেন।

আমি কে? কবিতায় কবি এক বিভ্রান্ত সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় খুঁজতে থাকেন। চারপাশে মৃত্যু, শূন্যতা ও সময়ের নিষ্ঠুর গতি তাকে অস্তিত্বের প্রশ্নে আঘাত করে। শেষ পর্যন্ত তিনি উপলব্ধি করেন- মায়ের মমতাই মানুষের চূড়ান্ত আশ্রয়, যেখানে সব ভয়, বিভ্রান্তি ও একাকীত্ব প্রশমিত হয়।

‘আর্তনাদ’ কবিতায় কবি গভীর রাতের অন্ধকার, নিঃসঙ্গতা ও এক অজানা শক্তির দমন-পীড়নের কথা বলেছেন। এই অন্ধকারের মধ্যেও তাঁর ভেতরে দেশপ্রেম ও প্রতিবাদের অনুভূতি জেগে থাকে। সব ভয় ও দুঃখ সত্ত্বেও কবি মাতৃভূমিকে ভালোবাসেন এবং সেই ভালোবাসা তাঁর অন্তরে আর্তনাদের মতো প্রতিধ্বনিত হয়।

কবি আরণ্যক শামছ তাঁর ‘মৃত্যুর ফসিল’ কবিতাটির শিরোনাম ইউনিক এবং বিরল স্বকীয়তায় গেঁথেছেন।কবিতার বাহির অবলোকন করেই বোধদয় সুনিশ্চিত হয় যে ভেতরে কী আছে। কথায় বলে- যে মুলোটা বাড়ে তার পাতাটা দেখেই বোঝা যায়। কবিতাও তেমন চোখ বুলালেই বোঝা যায়! তিঁনি এক্ষেত্রে সাকসেসফুল। নির্যাসটুকু শিরোনাম পড়েই আস্বাদিত।
কবি তাঁর এ কবিতায় আধুনিক মানুষের জীবনকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেখানে চারপাশে অনেক কিছু ঘটছে, পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু মানুষ নিজেই যেন স্থির ও অর্থহীন অবস্থায় আটকে আছে। সে নিজের অতীত হারাচ্ছে, বর্তমানকে অনুভব করতে পারছে না এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চিত। ফলে তার জীবন এক ধরনের অস্তিত্বহীনতা ও শূন্যতার মধ্যে আটকে পড়ে, যা শেষে ‘মৃত্যুর ফসিল’-এর মতো অতীতের স্মৃতিতে পরিণত হয়। ভাব ও ভাষায় কবি অতুলনীয়! কবির সুদূরপ্রসারী প্রভাব কবিতার তথা বাস্তব দর্শনকেই অগ্রসর করতে পারদর্শী।

‘অন্তিম প্রয়াণে’ কবিতাটিতে কবি একটি বিধ্বস্ত সময়ের চিত্র তুলে ধরেছেন যেখানে যুদ্ধ, ধ্বংস, শিশুদের মৃত্যু এবং মানবিক সংকট মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এসব বেদনাময় ঘটনার মাঝেও কবি নতুন একটি ভালো বছরের আশা করেন- যেখানে শান্তি, সত্য ও মানবতার পুনর্জাগরণ ঘটবে। কবিরা যে স্বপ্নবাজ, আশাবাদী, শান্তিপ্রিয়, মানবতাবাদী তিঁনি কবিতায় তাঁর স্বাক্ষর রেখেছেন।

‘কেমন আছ একুশ?’ এই কবিতাটির নামকরণই বলে দিচ্ছে যে কবি কবিতাটি অমর একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে লিখেছেন। কবিতায় ‘একুশ’ অর্থাৎ ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও চেতনাকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিঁনি দেখিয়েছেন- বাংলা ভাষার জন্য যে রক্তপাত ও আত্মত্যাগ হয়েছিল, সেই বেদনাময় ইতিহাস আজও মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেঁচে আছে। কিন্তু বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় সেই চেতনা যেন হয়েছে আহত ও প্রশ্নবিদ্ধ!  কবি ব্যথিত পীড়িত হয়েছেন এটি সেই চিন্তাভাবনার ফসল।

আরণ্যক শামছ তাঁর ‘প্রান্তিক কবি’ কবিতায় দেখিয়েছেন যে সমাজের ক্ষমতাবান ও ধনী শ্রেণি (বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তি) সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষকে বঞ্চিত করে রেখেছেন। কিন্তু প্রান্তিক কবি সেই বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে সত্য প্রকাশ করতে চান এবং শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।সমাজের অপাংক্তেয় ও অবহেলিত মানুষের ক্ষোভ, দ্রোহ এবং কর্পোরেট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু তীব্র প্রতিবাদের ছবি ফুটে উঠেছে। এখানে কবি নিজেকে সমাজের শেষপ্রান্তে থাকা পলিথিন ব্যাগের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন মনে হলেও যেকোনো সময় ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম।

নারী কবিতায় কবি নারীকে প্রকৃতির অংশ, সভ্যতার মাধুর্য এবং সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু নারীর প্রতি সমাজের বস্তুতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাকে ‘বিনিয়োগ’ বা ‘পুঁজিবাজার’-এ পরিণত করে। এই বিপর্যয় কবির দৃষ্টিতে নারীকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে ব্যর্থতার বেদনাকে জন্ম দেয়।

একমুঠো কবিতায় প্রতিটি ছন্দে কবি কিছু ‘এক মুঠো’ জিনিস চেয়েছেন- যা  তার কাছে প্রিয়- সাথে নিজের সমস্ত দেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। এটি জীবনের ক্ষুদ্র আনন্দ, বেদনা ও সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করার এবং অন্যের সঙ্গে তা ভাগ করার রূপক।

বাংলাদেশকে শুধু ভূগোল বা ইতিহাস হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি এটিকে সঙ্গীত, সাহিত্য, বিপ্লবী চেতনা ও স্বপ্নের প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করেছেন।- যা সোনার বাংলা কবিতার মূখ্য বিষয়। দেশের সব ধরণের কাব্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বৈচিত্র্য মিলিয়ে তাঁর “সোনার বাংলা” রূপ নেয়। এটি চমৎকার ও অসাধারণ- ভাব, ভাষা, শব্দ,  ছন্দ, অলঙ্করণে।

শীত, আমি ও মা- এই কবিতায় কবি শীতকে মা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে- শীতের নরম, স্নেহময় আদর যেন শৈশবের কোল ও মাতৃস্নেহের স্মৃতি জাগায়। অন্যদিকে, শীতের ভেতর লুকিয়ে থাকা সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের নির্মমতা, শিশু হত্যার ছবি, শোষণ ও যুদ্ধের চিহ্ন প্রকাশ করা হয়েছে। কবি দেখিয়েছেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা (শৈশব, মা) এবং সামাজিক ইতিহাস (শোষণ, যুদ্ধ, সাম্যবাদের লড়াই) একত্রিত হয়ে একটি গভীর মানসিক ও নৈতিক উপলব্ধি তৈরি করে।

বসন্তের কবিতা: এবার ফাগুনে(১)-এ  কবি বসন্তকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন- ফুল, বাতাস, গ্রীষ্মের প্রশান্তি, চৈত্রের শেষ মুহূর্ত সব মিলিয়ে জীবনের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা, ক্ষত ও ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব প্রকাশ করেছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ক্ষত, প্রেম ও সময়ের মিলন বসন্তের রঙে ফুটিয়ে তুলেছেন।

‘শিকড়’ এর প্রতিটি দৃশ্য- চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া, নদীর পাড়, ঘাসে ঝরাধ্বনি- কবির শিকড়ের সঙ্গে পুনঃসংযোগের প্রতীক। আধুনিক জীবন ও শহরের ভিড়ের মধ্যে, কবি তার অন্তর্নিহিত মূল ও আত্মিক নির্ভরতার খোঁজ করছেন।

আকাশ কিনবো বলে
একটা আকাশ কিনবো বলে
নিলাম করি জমানো সব সুখ

মানুষের জীবনে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসার জন্য সবকিছু ত্যাগ করার প্রবণতা। কবি  ‘আকাশ কেনা’কে একটি বড় স্বপ্ন বা পরম প্রাপ্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি নিজের সাধ, সুখ, নিঃসঙ্গতা সবকিছু যেন বিলিয়ে দেন। কিন্তু বাস্তবতার আঘাতে দেখা যায়, সব চেষ্টা সত্ত্বেও সেই স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। তখন মানুষের ভেতরে জন্ম নেয় বেদনা, নিঃসঙ্গতা ও শূন্যতার অনুভূতি।কবিতাটি সত্যিই প্রশংসনীয়!

‘শঙ্খঘোষের শঙ্খধ্বনি’  কবিতাটি মূলত কবি শঙ্খঘোষের  প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, স্মরণ এবং তাঁর অনুপস্থিতির বেদনা প্রকাশ করেছেন।একজন মহান কবির মৃত্যু হলেও তাঁর সৃষ্টি, স্মৃতি ও প্রভাব চিরকাল বেঁচে থাকে।একজন মানুষে বহু জীবনের অস্তিত্ব, স্মৃতি ও প্রভাবের স্থায়িত্ব, স্নেহ অনুভূতির গভীরতা, অপূর্ণতা ও আক্ষেপ, কবির অনুপস্থিতি, কিন্তু শিল্পের উপস্থিতি।

কবি ‘একটি ছোবলের অপেক্ষায়’ কবিতাটি গভীরভাবে সমাজবাস্তবতা, ক্ষুধা, বৈষম্য এবং মানুষের ভেতরের নৈতিক সংকটকে তুলে ধরে।পুঁজিবাদী সমাজের বৈষম্য ও ক্ষুধার যন্ত্রণা মানুষের মানবিকতা ধ্বংস করে দিচ্ছে, আর মানুষ এক অনিবার্য বিপর্যয়ের (ছোবল) অপেক্ষায় আছে।

‘ভয়ংকর সুন্দর’ কবিতাটি প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মৃত্যুর একসাথে উপস্থিতি- এই গভীর দ্বৈত সত্যকে তুলে ধরে।প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝেই লুকিয়ে থাকে মৃত্যু ও ক্ষয়; আর এই মিলনই ‘ভয়ংকর সুন্দর’।সৌন্দর্য ও বেদনা একসাথে উপস্থিতি, জীবনের ক্ষয় ও শেষ হয়ে যাওয়া, প্রকৃতির চক্র, মানুষের উপলব্ধি ও প্রশ্ন ইত্যাদি অনুসঙ্গগুলো গভীর ভাবনার মাধ্যমে তুলেছে ধরেছেন

‘ইমাম মাহদীর ঘোড়া’য় কবির এক গভীর দার্শনিক ও প্রতীকধর্মী কবিতা, যেখানে মানুষের ভেতরের দ্বৈত সত্তা- ধ্বংস ও মুক্তি, অহংকার ও আত্মজাগরণ-
তুলে ধরা হয়েছে।মানুষের ভেতরে যেমন ধ্বংসাত্মক শক্তি আছে, তেমনি আছে সত্য ও ন্যায়ের পথে জেগে ওঠার সম্ভাবনাও- কোন পথে যাবে, সেটাই তার আসল নির্বাচন। তাঁকে যেমন বাস্তবতার কবি বলা চলে তেমনই মনস্তাত্ত্বিক কবিও।

কবি আরণ্যক শামছের “শূন্যের কাছে’ কবিতাটি একটি দার্শনিক ভাবনার কবিতা, যেখানে ‘জিরো ও ‘শূন্য’- এর মাধ্যমে জীবনের দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।শূন্যতা যদি ইতিবাচকভাবে দেখা যায়, তবে তা নতুন সম্ভনার সূচনা হয়ে উঠতে পারে।

কাঁটাতারে তিঁনি মূলত এক গভীর বিচ্ছিন্নতা, সীমাবদ্ধতা এবং জীবনের সংগ্রামের মাঝেও আশ্রয় খোঁজার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।

সাদা একুশ-এ তিঁনি একুশের প্রকৃত চেতনা আজ বিকৃত, বাণিজ্যিক ও শূন্য হয়ে গেছে- মানুষ তা ভুলে গিয়ে শুধু বাহ্যিক আচার পালন করছেন।একুশের রক্তঝরা চেতনা আজ হারিয়ে গিয়ে কৃত্রিম, বাণিজ্যিক ও শূন্য আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে সে কথায় বোঝানোর প্রচেষ্টা।সাদা একুশ কবিতাটি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদের কবিতা, যেখানে ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে ভয়াবহ বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে।

‘সব বলে দেবো’ কবিতাটির মূলভাব মানুষের অসচেতনতা, স্বার্থপরতা ও হিংস্রতার কারণে পৃথিবী ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; অথচ মানুষ সেই বিপর্যয় দেখেও নীরব ও উদাসীন।
কবিতায় কবি বলেছেন- “চোখের সমুখ দিয়ে হেঁটে যায় পৃথিবী”- এই পুনরুক্তির মাধ্যমে সময়, প্রকৃতি, সৌন্দর্য, মানবিকতা ও পরিচিত পৃথিবীর ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার চিত্র ফুটে উঠেছে। যুদ্ধ, গ্রেনেড-বোমা, রক্তপাত, প্রকৃতির বিপন্নতা এবং মানুষের কোলাহলপ্রিয় অথচ কর্মহীন অবস্থার মধ্য দিয়ে কবি সভ্যতার গভীর সংকট তুলে ধরেছেন।
শেষে যে শিশুটি বলেছিলো ‘সব বলে দেব’’-এই শিশুটি যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতীক। বর্তমান মানুষের অপরাধ ও ধ্বংসযজ্ঞের হিসাব একদিন তাদের কাছেই দিতে হবে- এই সতর্কবার্তাই কবিতার অন্যতম তাৎপর্য।

সভ্যতা’য় তিঁনি আধুনিক সভ্যতার নামে যুদ্ধ, সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক শোষণ, ধর্মীয় বিভাজন ও মানবিকতার অবক্ষয়ের ভয়াবহ পরিণতির বিরুদ্ধে কবির তীব্র প্রতিবাদ এবং শান্তি ও মানবতার পক্ষে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন।এখাবনে  ট্যাংক, ড্রোন, ন্যাটো, নাজি, বোমারু বিমান, কৃষ্ণসাগর, লাশ ও শকুন- এসব চিত্রকল্পের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর নির্মম বাস্তবতা উঠিয়ে এঁনেছেন। এখানে ‘সভ্যতা’ শব্দটি এক ধরনের ব্যঙ্গাত্মক প্রতীক- যে সভ্যতার একদিকে প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তির উৎকর্ষ, অন্যদিকে মানুষের রক্ত, শিশুর শব এবং ধ্বংসস্তূপ।
‘একহাতে শিশুর শব / আরেকটি হাতে বই’- এই বৈপরীত্যের মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষায় উন্নত হয়েও মানুষ মানবিকতায় কতটা ব্যর্থ ও বিপর্যস্ত। আর ‘আমরা সবাই আছি যুদ্ধে / আমরা সবাই পরাজিত’ পঙ্‌ক্তিতে বোঝানো হয়েছে- যুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে কোনো পক্ষই বিজয়ী হয় না; মানবতাই পরাজিত হয়।কবি হতাশার মধ্যেও আশার কথা বলেছেন- এখনও সময় আছে, মানুষ যদি বিভেদ ভুলে মমতা, ঐক্য ও মানবতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে ধ্বংসের পথ থেকে পৃথিবীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

‘একদিন এইখানে’ একটি গভীর বিষণ্নতা, অস্তিত্বের অনিত্যতা এবং ভবিষ্যতের শূন্যতার কবিতা। কবি কল্পিত এক ‘একদিন’-এর মাধ্যমে এমন একটি সময়ের ছবি এঁকেছেন, যখন পৃথিবী থেকে ফুল, মেঘ, পাখির কোলাহল, শিশুর গান- সব প্রাণময়তার চিহ্ন হারিয়ে যাবে। ফলে কবিতাটি শুধু ব্যক্তিগত বিষাদ নয়; এটি প্রকৃতি, মানবসভ্যতা ও কবিতার সম্ভাব্য অবসান নিয়ে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী আশঙ্কা প্রকাশ করে।প্রথম স্তবকে ফুল, মেঘ, পাখি ও শিশির- প্রকৃতির কোমল ও প্রাণময় উপাদানগুলোর অনুপস্থিতি দেখানো হয়েছে। ‘নিরুত্তাপ আবেগ’ কথাটি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ; আবেগ থাকবে, কিন্তু তার উষ্ণতা থাকবে না- এ যেন জীবনের অন্তর্গত প্রাণশক্তি নিঃশেষ হওয়ার প্রতীক।
দ্বিতীয় স্তবকে শিশুর গান, পার্ক, কবির সুমন, পৃথিবীর পাতাঝরা পথ এবং অমৃত সদনে কবিতার চলে যাওয়া- এসব চিত্র কবিতাটিকে আরও সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক মাত্রা দিয়েছে। এখানে কবিতার ‘অমৃত সদন’-এ চলে যাওয়া যেন ইঙ্গিত করে, পৃথিবীর বাস্তব জীবন থেকে সৌন্দর্য ও সৃজনশীলতার বিলুপ্তিকে।
তৃতীয় স্তবকটি সবচেয়ে তীব্র। ‘শকুন-দল’, ‘হায়েনা’ এবং ‘মানব-অরণ্য’- এই প্রতীকগুলো সভ্যতার অবক্ষয় ও মানবিকতার পশুত্বে পরিণত হওয়ার ভয়াবহ চিত্র তৈরি করেছে।
‘মানব-অরণ্য হবে পশুর আবাস’- পংক্তিটি কবিতার অন্যতম শক্তিশালী বক্তব্য। মানুষ থাকবে, কিন্তু মানবিকতা থাকবে না- এই বিপরীতার্থক অবস্থানই কবিতার অন্তর্নিহিত ট্র্যাজেডিকে তীব্র করেছেন।

‘ওই যে দূরের সাঁকো’তে কবি মূলত হারিয়ে যাওয়া শৈশব, অতীতের স্মৃতি, জীবনের ক্ষয়, একাকিত্ব, অনিবার্য বিষণ্ণতা এবং মৃত্যুর দিকে মানুষের অবধারিত যাত্রা নিয়ে রচিত।
কবি অতীতের হারিয়ে যাওয়া সময়কে স্মরণ করেন। সেই সময় আর ফিরে আসবে না, কিন্তু তার কিছু সুবাস, স্মৃতি ও আবেগ এখনো কবির মনে লেগে আছে। পুরোনো পুঁথির গন্ধ, অলস দুপুর, হলুদ পাখির গান, ঝরাপাতা ও বৈশাখী অভিমান—এসবের মধ্য দিয়ে হারানো শৈশবের মধুর স্মৃতি ফিরে আসে। কিন্তু সেই স্মৃতির বিপরীতে বর্তমান জীবনে রয়েছে অবহেলা, শূন্যতা ও বেদনা।
কবি উপলব্ধি করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনও ক্ষয়ে যাচ্ছে- যেন পাঁজরের ভেতর লুকিয়ে থাকা উইপোকা আয়ু খেয়ে চলেছে। তবু মানুষ আবেগ, স্বপ্ন ও স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে। জীবনের সঞ্চিত আনন্দ-বেদনা, বৃষ্টি, বিকেল, বিষণ্ণতা- সবকিছু মিলিয়ে জীবন যেন শেষ পর্যন্ত শূন্যতার এক মেলা।
শেষ স্তবকে কবিতাটি গভীর অস্তিত্ববাদী তাৎপর্য লাভ করেছে। অজানা গল্পগুলো অজানা ব্যাংকে জমা থাকুক, জীবনের পাপগুলো ক্ষমার আড়ালে ঢাকা থাকুক—কারণ মৃত্যুর ডাক ক্রমেই কাছে আসছে। ”দূরের সাঁকো’, এখানে মৃত্যুর প্রতীক; যে সাঁকো পার হয়ে মানুষকে একদিন অজানা জগতে চলে যেতে হবে।

পরিত্যক্ত শৈশব- এ হারিয়ে যাওয়া শৈশব, শৈশবের স্মৃতি, সম্পর্কের ক্ষয় এবং প্রকৃতি-নদীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একজন মানুষের গভীর নস্টালজিয়া ও বিষণ্নতার বহিঃপ্রকাশ।কবিতায় কবি বহু বছর পর নিজের ফেলে আসা শৈশবের উঠোনে ফিরে আসেন। ঘাস, ফড়িং, ঘুঘু ডাকা দুপুর, নারিকেল পাতার বাঁশি, বৃষ্টির শব্দ, খেলার মাঠ, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্মৃতি, শৈশবের বন্ধু- সবকিছু তাঁর স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে মায়ের অসুস্থতা, বাবার ঋণের বোঝা এবং শৈশবের নানা দুঃখও ফিরে আসে।
সময়ের প্রবাহে সেই পরিচিত মানুষ, সম্পর্ক ও পরিবেশ বদলে গেছে। সম্পর্কের ‘পলেস্তারা’ খসে পড়েছে, বন্ধনের ‘সিমেন্ট’সরে গেছে- অর্থাৎ শৈশবের নির্মল সম্পর্কগুলো প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের স্বার্থ, দূরত্ব ও মিথ্যার চাপে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।
এর পাশাপাশি লোলা নদীর পরিবর্তন কবিতাটিকে আরও গভীর তাৎপর্য দিয়েছে। যে নদী একসময় জীবনের অংশ ছিল, মানুষের লোভ ও দখলের কারণে তার স্বাভাবিক অস্তিত্বও বিপন্ন। তাই নদীর ক্ষয় যেন শুধু প্রকৃতির ক্ষয় নয়, মানুষের মানবিকতারও ক্ষয়। অতঃপর শৈশবের সেই বাঁশের সাঁকো হয়ে উঠেছে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি প্রতীকী সেতু। সাঁকোর দুলতে থাকা যেন কবির স্মৃতি, অস্তিত্ব ও হারানো শৈশবের অনিশ্চিত অথচ অবিরাম ফিরে আসার প্রতীক।

কবি আরণ্যক শামছ’র ‘ঈশ্বর’ কবিতাটিতে জীবনের ব্যর্থতা, হারানো, ভুল পথ ও অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যেও ঈশ্বরের প্রতি মানুষের গভীর আশ্রয়, ক্ষমাপ্রার্থনা ও আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা।
কবি জীবনে অনেক কিছু পাওয়ার আশায় চলতে গিয়ে অনেক কিছু হারিয়েছেন এবং জেনেও ভুল পথে পা বাড়িয়েছেন। সেই হারানো ও বিপথগামিতার জন্য তাঁর মধ্যে অনুশোচনা আছে। ঈশ্বর কখনো তাঁকে শূন্য করেছেন, আবার কখনো নতুন সম্ভাবনা ও আশার উর্বরতা দিয়েছেন। তাই কবি ঈশ্বরকে নিজের স্বর, আশ্রয় ও ভরসার প্রতীক হিসেবে দেখেছেন।

“বিপথু হই আমি, তবু তুমি, হও মোর স্বর,
আমার দীনতা ভুলে, করো ক্ষমা, হে ঈশ্বর।
মুছে দাও হিংসা, মুছে দাও জমে থাকা ক্লেশ, ধ্বংসস্তূপের মাঝে, যেন ভুলি সকল বিদ্বেষ।”

এখানে কবি নিজের দীনতা ও ভুলের জন্য ক্ষমা চান এবং অন্তর থেকে হিংসা, ক্লেশ ও বিদ্বেষ মুছে ফেলার আকুতি জানান। শেষ স্তবকে ঈশ্বরকে ভুলে থাকার চেষ্টা করলেও বিপদের মুহূর্তে তাঁকেই আবার ভরসার চর হিসেবে খুঁজে পান। শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে নিজের অহং, বিদ্বেষ ও পুরোনো সত্তাকে বিলীন করে দিতে চান।

“তোমাক খুঁজবো বলে’ এখাবনে একজন মানুষের দীর্ঘ জীবনের অপূর্ণ অনুসন্ধান, একাকিত্ব, নিরাপদ আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা।
কবি ‘তোমাকে’ খুঁজতে গিয়ে বছরের পর বছর, দেশ-শহর-নদী পেরিয়েছেন। কিন্তু এই অনুসন্ধান শুধু কোনো নির্দিষ্ট মানুষের খোঁজ নয়; এটি যেন ভালোবাসা, আশ্রয়, মমতা, নিরাপত্তা ও আপনজনের সন্ধান। দীর্ঘ পথচলায় তিনি জীবনের কঠিন, বিভৎস ও পিচ্ছিল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। বারবার হোঁচট খেলেও এমন কাউকে পাননি, যে কাঁধে হাত রেখে বলবে- ‘আমি আছি, ‘ভয় নেই’, ‘এক গ্লাস জল খাবে?’
সবচেয়ে বেদনাদায়ক পরিণতি আসে শেষ স্তবকে। যাকে খুঁজতে গিয়ে কবি ঘর ছেড়েছিলেন, সেই ‘তুমি’ শেষ পর্যন্ত অন্য পথে চলে গিয়ে নিজের সাজানো সংসার বা ‘ড্রইং রুমে’ পৌঁছে গেছে। আর কবির জীবনের সব পথ যেন ঘুরেফিরে ‘রোমে’- অর্থাৎ এমন এক গন্তব্যে পৌঁছেছে, যেখানে কাঙ্ক্ষিত মানুষটির সঙ্গে তাঁর আর মিলন ঘটেনি।

‘জলের চোখে জল’ বর্তমান সময়ে কবিতাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কবি এই কবিতায় নিদারুণভাবে সমাজের সকল স্তরের মানুষ করুণ কাহিনির বিবৃতি দিয়েছেন।নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির ফলে বাজার তালিকায় বিপদ, দুঃশ্চিন্তা ও মহাবিপদ সংকেত দিয়েছেন।যা ভেবে কবি সত্যিই ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে গেছেন।সমাজ, রাষ্ট্রের বেজন্মাদের হাতে গোটা দেশের মানুষ জিম্মি হয়ে আছে- চিত্রটা এখানে উজ্জ্বল। নানাবিধ শ্রেণি-পেশা মানুষের জন্য তিঁনি মুক্তি প্রার্থনা করেছেন।এই যেমন: বৃদ্ধ কলিম, রিকসাওয়ালা, খেটেখুটে খাওয়া শ্রমিক, দিনমজুর এমনকি স্বয়ং কবিও যেন পরিত্রাণ পাচ্ছেন না। দাড়কিনা মাছ- শোষকেরা তবুও চুপচাপ- কোনো পদক্ষেপ নেই।দেশটাকে যাঁরা এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর তাঁদের জীবন দুর্বিষহ- কবি তাঁদের অবমূল্যায়নই থেকে শব্দের মৌমাছিদের উদাত্তকণ্ঠে আহবান জানিয়েছেন কবিতাটিতে। কবিতায় কবি ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা অপব্যবহারের চিত্রটা চিত্রকল্পের দৃশ্যগত করেছেন।চিল, ঈগল, শকুন, পশুরাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

একদিন কবিতা মিছিলে- কবিতায় কবি বলেছেন-

“একদিন রাজপথে কবিতার মিছিল হবে
শব্দেরা হয়ে যাবে মিছিলের শব-
কাব্যের শ্লোগান হবে, কণ্ঠের প্লাবন হবে
স্তবক হয়ে যাবে কফিনের রব।”

কবিতাটি রূপকধর্মী।তবে চিত্রকল্পের চমৎকার প্রকাশ। সমাজ-সংস্কৃতির চরম অবক্ষয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদের হাতিহার কবিতাটিতে চরম অসংগতি এবং আদর্শিক বিচ্যুতির প্রেক্ষাপটে রচিত। সঙ্গে মেকি তথা দেখানো দেশপ্রেম, কবিদের দলীয়করণ ও বাণিজ্যিকীকরণই মূল উপজীব্য! বলাবাহুল্য, কবি আরণ্যক শামছ সমাজবাস্তবতার বর্তমান চিত্র তথ্য চিরকালীনতার সুর তুলেছেন।যেখানে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার এবং বুদ্ধিজীবীদের আপোষকামিতা, কৃত্রিমরূপ এবং নকল রূপটাকে প্রদর্শন করার প্রচেষ্টা মাত্র।এখন সাহিত্য যে কতটা লোকদেখানো, ফিকে বিনোদনের আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে তা- দেশপ্রেমের লেগো,  একটিও কবিতা না লেখা চাদর জড়ানো কবি, পতাকা পাঞ্জাবি, এসি নিয়ন্ত্রিত স্টুডিও টকশোতে চিত্রই বলে দেয়।

‘জাতিস্মরের ভোট’ কবিতায় প্রকৃতপক্ষে একটি তীব্র ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কবিতা, যেখানে নির্বাচনকেন্দ্রিক সমাজ ও নেতাদের ভণ্ডামিকে তুলে ধরেছেন। ভোটের সময় সাধারণ মানুষকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু ভোট শেষ হলেই তারা আবার অবহেলিত হয়ে পড়ে। কবি কতটা সমাজসচেতন কবিতাটি পড়লেই তা অনুধাবন করা সম্ভব। লক্ষ্য করুন, কী নান্দনিকভাবে কবিতা উপস্থাপন করেছেন:

“রাতের বেলা আড়াল খোঁজে, পকেট ভারী নোট, সকালবেলা গদগদে সব, চাইছে কেবল ভোট। কেউবা দেবে ব্রিজ-কালভার্ট, কেউবা দেবে রাস্তা, ভোট ফুরালে জনতা সব সস্তা কিংবা নাস্তা।
ইশতেহারের রঙ চড়েছে, স্বপ্ন আকাশ-ছোঁয়া, বাস্তবে সব উবেই যাবে- যেমন বিড়ির ধোঁয়া। মার্কা তোমার যাই হোক না- আপেল কিংবা হাতি, দিন শেষে ওই আমরাই তো বলির পাঁঠার জ্ঞাতি।”

বইটিতে মোট ৮০ টা কবিতা রয়েছে।প্রতিটি কবিতায় কবি অসাধারণ লিখেছেন।শব্দ, ভাব,ছন্দ, ভাষা, রূপক, উপমা, অলঙ্কার, আবর্তন, বিবর্তন এবং ব্যঙ্গাত্মক হাস্যরসের মাধ্যম দেশ, জাতি, রাষ্ট্র ও বিশ্বের শ্রেণি ব্যবধান, পুঁজিবাদী আগ্রাসন, নাড়ির সম্পর্কের অবনতি-উন্নতি, প্রকৃতির বিনষ্টের এক সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন কাব্যটিতে। প্রতিটি কবিতায়ই হৃদয়স্পর্শী মা ও নদীর মতো গভীর মনোযোগ ধরে রাখে।কিছু কবিতার শব্দ জটিল হলেও প্রণম্য পাঠকদের কাছে তা নস্যি।কবির বিদ্রোহ, প্রেম, ভালোবাসা, আধ্যাত্মিকতা, আত্ম-জিজ্ঞাসা এবং মানবজীবন তথা মানবজাতির একটি দলিল। ‘মা একটি নদীর নাম ‘ কবিতার এই সংকলনে সমস্ত পৃষ্ঠাজুড়ে অর্থাৎ ৮০ টা কবিতায় মানব ও প্রকৃতির শান্তি, সাম্য, সমতা ও স্বস্তির কথা বলা হয়েছে। গ্রন্থটি যদি জাতি ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেন,তাহলে সমাজের অবক্ষয়ের হাত থেকে মুক্তি পাবেন- এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

কবি তাঁর এই অমূল্য গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর প্রয়াত মা নুরুন্নেছা ও বাবা মোঃ পাখী মিয়াকে।বইটির প্রকাশক সৃজন। প্রচ্ছদ এঁকেছেন দেওয়ান আতিকুর রহমান।২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইটি প্রকাশিত হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলায়।বইটির মূল্য ৩০০ টাকা। বইটির পাঠক হিসেবে মনেপ্রাণে চাই পাঠকপ্রিয়তায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করুক।

আরণ্যক শামছ (সনদপত্রের নাম: মোহাম্মদ শামছ উদ্দিন)। জন্ম ৬ মার্চ ১৯৭২, সুরমা পাড়ের জনপদ সিলেটের বিয়ানীবাজারে। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এই লেখক পেশায় একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও শিক্ষক-প্রশিক্ষক। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি সিলেটের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘স্কলার্সহোম’ (টিলাগড়  ক্যাম্পাস)-এর অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত।

পেশাগত ব্যস্ততার সমান্তরালে আরণ্যক শামছ একজন মননশীল প্রাবন্ধিক, দক্ষ অনুবাদক ও গবেষক। তাঁর সম্পাদিত লিটলম্যাগ ‘আরণ্যক’ এবং ‘GATE SELTA ELT Journal’ সাহিত্য ও ভাষা গবেষণায় তাঁর নিবিড় সম্পৃক্ততার সাক্ষ্য দেয়। ইতিপূর্বে তাঁর রচিত ইতিহাসধর্মী লেখা-‘নানকার বিদ্রোহে বিয়ানীবাজার’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধে বিয়ানীবাজার’ এবং কাব্যগ্রন্থ-‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’ ও ‘যে দিন সকল মুকুল গেল ঝরে’ সুধী পাঠক ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

বর্তমানে তিনি ‘কবিকণ্ঠ সিলেট’-এর মুখ্য নির্বাহী সম্পাদক এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘সৃজন’-এর পর্ষদ সদস্য। লেখক ও গবেষক হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও তিনি GATE-SELTA-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং ETAB-এর কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভাষা শিক্ষা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

গোলাম রববানী (কবি, লেখক ও শিক্ষক), সিলেট, বাংলাদেশ