ঢাকা ০৫:১০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আহাদ আলী মোল্লার ছড়ার জগৎ 

  • বাংলাবাঁক
  • আপডেট : ১২:৪৬:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪
  • 234


হুমায়ুন কবীর 



ছড়া লিখেছেন অজস্র,গাণিতিক হিসেবে হাজার বিশেক হবে।  ছড়া- বই  প্রকাশ করেছেন মাত্র দুটো—(১) হ্যামিলনের বাঁশিঅলা (২) পাখপাখালির দেশ। লিখেছেন অসংখ্য কবিতা আর   মনোরম  কিছু  গল্প।

 ‘মাত্র দুটো বই !   বাকি লেখাগুলোর কী অবস্থা?’— এমন প্রশ্নের জবাবে ছড়াকার আহাদ আলী মোল্লা বললেন,  ‘সেগুলো  পত্রিকার পাতায় ছড়িয়ে – ছিটিয়ে আছে।  নিজস্ব  ল্যাপটপে সংরক্ষিত  রেখেছি  কিছু।’
 নিরন্তর লিখিয়ে  এই মানুষটি  চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রকাশিত  দৈনিক মাথাভাঙ্গা’র সঙ্গে আছেন সেই প্রতিষ্ঠাকাল থেকে। তিনি পত্রিকাটির  বার্তা সম্পাদক।  পেশাগত  কারণে সাংবাদিকতাধর্মী লেখা লিখতে হলেও ভিতরে ভিতরে তিনি একজন  কবি । বলা যায়, কবিতার  সাথেই তাঁর  ঘরবসতি। সাংবাদিক হিসেবে ছুটে  চলাটা এক  অর্থে তাঁর সাহিত্য চর্চার পরিপূরক।     তিনি ছড়া- কবিতার  রসদ  সংগ্রহ  করেন  এই চলমান  জীবনের পাঠশালা থেকেই। দৈনিক  মাথাভাঙ্গার পাতায়  ছড়া- টিপ্পনী রচয়িতা হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত — দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে কাজটি করছেন তিনি ।  সমকালে  নাড়া দেওয়া খবর নিয়ে লেখা এই টিপ্পনী -তে উঠে এসেছে এই সময়ের  মানুষ আর  মানুষের বিচিত্র  চালচিত্র । তাতে   সময়ের উত্তাপ  আটকে  পড়ে আছে ,   সুপ্ত হয়ে   আছে  তাক লাগিয়ে দেয়া ঘটনার কাব্যিক প্রকাশ।
 ‘হ্যামিলনের বাঁশিঅলা’ আর ‘পাখ পাখালির দেশ’ তাঁর  টিপ্পনী – ছড়া থেকে মেজাজে – চরিত্রে  আলাদা। টিপ্পনী- তে হিউমার  আছে,স্যাটায়ার আছে, শব্দের কষাঘাত আছে।  এই দুটো গ্রন্থে তা নেই, এখানে পাতায় পাতায় স্নিগ্ধতা, শব্দে- বর্ণে পেলবতা– তাতে কান পাতলে  শোনা যায় সাংগীতিক মূর্ছনা। হ্যামিলনের বাঁশিঅলায়  চোখ রাখলে অবাক বিস্ময়ে দেখি :
‘কোটি কোটি ইঁদূর মরে
কয় মিনিটেই সাফ,
নগরবাসী স্বস্তি পেল
বাঁচলো ছেড়ে হাফ।’
পাখপাখালির দেশে চোখ  রেখে দেখি:
‘এক পায়ে রয় ঠাঁই দাঁড়িয়ে  ঠোঁট যেন তার সুচ
দৌড়ে সবার আগে ছোটে চঞ্চলা কালকুঁচ।
কুসুম ভোরে পুব আকাশে সূর্য ওঠে রাঙা
উড়াল দিয়ে বিলে- ঝিলে যায় সারস শামুকভাঙা। ‘
 হ্যামিলনের বাঁশিঅলা’ একটা জার্মান উপকথা।    এই উপকথাটা আমরা অনেকেই জানি। জানাশোনা  এই    প্রচলিত কাহিনীটির  কাব্যিক পরিবেশক  তিনি। কাহিনী নির্মানে না,    সরস আর সুখপাঠ্য কাব্যরূপ নির্মানে  তাঁর কৃতিত্ব। এটা তাঁর প্রথম ছড়া গ্রন্থ,  প্রকাশকাল  ২০১২। বইটির প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন সিকদার আবুল বাশার। পাতায় পাতায় অলঙ্করণগুলো শিশু- কিশোরদের  মন ভরিয়ে দেয়।  ছবির ভাষা আর ছড়ার  ভাষা এসে মিলে যায় এক রেখায়— পাঠকের মানস- চক্ষে ভেসে ওঠে বিচিত্র রঙের আলখাল্লা পরা এক বাঁশিঅলা। শিশুরা যুগপৎ  মুগ্ধ হয় ছবি আর ছড়ায় ——  একই সাথে  পেয়ে যায় ছড়া আর গল্পের  স্বাদ।
 ছড়ার  শুরুটা  এভাবে :
একেবারেই সত্যি কথা
মন দিয়ে তা  শোনো
এর মাঝে নেই নকল – ভেজাল
গলদ কিছু কোনো।
আদ্যিকালে হ্যামিলনের
ছোট্ট শহর জার্মানে,
কেউ কি জানো সব মানুষই
কাদের কাছে হার মানে?
সে বাপু এক বিরাট ব্যাপার
সে কী আজব কারখানা,
লাখে ইঁদূর ঝাঁকে ইঁদূর
নয় দুটো বা চারখানা।
ছড়াগুলোয় ধ্বনি আর ছন্দ নিয়ে খেলেছেন কবি।অন্তমিলের খেলা খেলতে তেমন বেগ পেতে হয়নি তাকে ।এটা বোধহয় তাঁর ঐশ্বরিক গুণ। তাঁর ছড়ার  গতিময় ছন্দ  শিশুদের  নিয়ে চলে সেই হ্যামিলনের বাঁশিঅলার জাদুর ভূবণে।তাদের চোখে ভেসে ওঠে  ইঁদুরের উৎপাতে নাস্তানাবুদ এক শহরের ছবি——
‘ছেলেপিলে জড়োসড়ো
ইঁদূর দেখে ডরায়,
ছন্নছাড়া জীবন যেন
গজব নামে ধরায়।
ভাত রুটি খায় তরকারি চাল
মুড়কি চিড়ে খই
কাগজ খাতা খেলনাপাতি
কিতাব কলম বই।’
আহাদ আলী মোল্লার ছড়া যেন ছুটে চলা ছোট নদী।  ছোট নদীর ঢেউয়ের মতো তাঁর  ছন্দ। পাঠের সময়  নিস্তরঙ্গ ঢেউ তুলে যায় পাঠকের মনে। তাঁর শব্দ বিন্যাসের নিপুণতা এমন:
‘শহরজুড়ে নামলো খুশি
ফিরলো মুখে গান,
কেটে গেলো ষাট বছরের
পুরোনো টেনশান।
দু’হাত তুলে ছেলাম ঠুকে
ঠিক মেয়রের সামনেই,
কয় দাঁড়িয়ে,  মেয়র সাহেব
আমার তো আর কাম নেই।
হাতের বাঁশি আস্তে করে
লম্বা ঝোলায় ঢুকিয়ে,
বললো জনাব,এবার আমার
পাওনাটা দিন চুকিয়ে।’
‘পাখপাখালির দেশ ‘ ছড়া গ্রন্থে আহাদ আলী মোল্লার পাখি প্রেম ফুটে উঠেছে। নদীবিধৌত গ্রামীণ জনপদে তাঁর জন্ম। এখানে  হরহামেশা তাঁর চোখে পড়ে টুনিটুনি,দোয়েল, শ্যামা, চড়ুই।তাঁর পাশেই ঘুরে বেড়ায় শালিক,বুলবুলি , পিয়াল, ঈগল।  পাখির সাথে  খাল – বিল-  নদী- , পাখির  সাথে বৃক্ষ- লতা- গুল্ম — এই ইকোলজিটা  অখণ্ডভাবে   পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। তাই,তাঁর ছড়ায়  পাখি আর প্রকৃতি একাকার।
‘টুনিটুনিরা ফুড়ুত ফুড়ুত ওড়ে ডালিম গাছে
দোয়েল পাখি লেজ নাচিয়ে শিমের মাচায় নাচে
ফটিকজলের গান শোনা যায় গাছের পাতার ফাঁকে
সাতসকালে মিষ্টি সুরে চড়ুই পাখি ডাকে।’—– এই পঙতিতে পাখি:টুনিটুনি -দোয়েল – ফটিকজল ;
গাছ: ডালিম, শিম ;   সময়: সাতসকাল । এসবের মাঝে টুনিটুনির ফুড়ুৎ করে ছুটে চলা, দোয়েলের লেজ উঁচিয়ে নৃত্য,  ফটিকজলের গান আর  চড়ুই পাখির ডাক —এইসব নিয়েই শিল্পের ঘরবসতি। প্রচণ্ড  শিল্পবোধ না থাকলে   উন্মুক্ত প্রকৃতি থেকে এগুলো কবিতার খাতায় আনা যায় না। আমাদের  সবার সামনেই প্রকৃতি  তার এই অপার  সম্ভার উন্মুক্ত করে রেখেছে।  কিন্তু সকলে  শব্দে- বাক্যে – ছন্দে তা  বাঁধতে পারি না ; কেউ কেউ পারি ।আহাদ আলী মোল্লা পেরেছেন— তাকে কবিই বলবো আমরা।
 আহাদ আলী মোল্লার কবিত্বশক্তি  প্রবল,  দেখবার শক্তি প্রবলতর। কিন্ত  প্রকাশটা ভারি  সাদামাটা -সহজ। চোখ মেলে দেখা ছবিটা ছন্দে বাঁধেন সহজে — এখানেই আহাদ আলী মোল্লা অনন্য।   দেখুন, ছড়ায় তাঁর  সহজিয়া  প্রকাশ :
মিষ্টি সুরে কোকিল ডাকে রঙিন ফাগুন কালে
ফিঙেরাজা নেচে বেড়ায় নিমের ডালে ডালে
কৃষ্ণচূড়ার ফুলে ফুলে পাপিয়া  গায় গান
মোহনচূড়ার শিঙের চুলে হাওয়ায় তোলে তান।’
 তাঁর ছড়া পড়তে  পড়তে মনে হলো, তিনি সর্বোত্তম  শব্দের  সর্বোত্তম ব্যবহারটাই করেছেন। তাঁর শব্দ- স্বকীয়তা আছে । তাঁর ছড়ার ছন্দটা গতিময় ,  গাঁথুনিটা পোক্ত। ছন্দব্যাকরণ ভালো বুঝিনা, তবে কানে  ভালো শোনালে মেনে নিই ।ভালো শোনায় তাঁর এই পঙতি:
‘জল- লাগোয়া ঝোপের ভেতর ডাহুক পাড়ে ডিম
নদীর ধারে মাছরাঙারা সময় কাটায় হিম
নদী নালা খালের পাড়ে মাছরাঙাদের বাস
জল- শেঁওলার কোলে কোলে সাঁতার কাটে হাঁস।’
পাখিদের নিয়ে কাব্য করতে যেয়ে  তাকে অনেক প্রজাতির পাখি দেখতে হয়েছে। অথবা তাকে  পাখিদের  নিয়ে অন্যের লেখা পড়তে হয়েছে। অন্যথা পাখিদের স্বভাব – প্রকৃতি, আকার- আকৃতি তিনি ছড়ায় অনুপুঙ্খ তুলে ধরতে পারতেন না। এদিক থেকে তাকে পাখি বিশেষজ্ঞ বললে অত্যুক্তি হয় না। তিনিই আমাদের জানান,
‘কুড়াবাজের বড়শি থাবায় শিকার ওঠে গেঁথে
গাঙচিলেরা আহার  করে  উড়াল যেতে যেতে
পদ্মফুলের থালাপাতায় জলপিপিরা হাঁটে
রঙিলা বক উঁকি মারে রাইসা বিলের ঘাটে।’
অবশ্য  বিশেষ জ্ঞান  ছড়ায় দিতে হবে  মোটেও তা  না— ছড়ায় ধ্বনি- মিল, ছন্দ- মিল এগুলোই  মূখ্য। বুঝতে পারাটা মূখ্য না,আনন্দটা মূখ্য। শুনেছি,ফরাসি দেশে কেউ কেউ শব্দ না,বাক্য না— স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জন বর্ণের মিল ঘটিয়ে নির্মাণ করেন অপূর্ব কবিতা।
ছন্দ- বন্ধনে  যে    মনোলোভা ছবি আহাদ আলী মোল্লার ছড়ায় উঠে এসেছে  সাহিত্যের ভাষায় এগুলোকে চিত্রকল্প বলে। চিত্রকর  তুলি,রঙ,রেখা দিয়ে ছবি আঁকেন।কবির হাতে এসব সরঞ্জামাদি নেই , তবু বর্ণে- শব্দে একটা চিত্রকল্প তৈরি করেন কবি।একটা স্বার্থক চিত্রকল্প অনেক পৃষ্ঠার বর্ণনার চেয়ে বাঙময়।  আহাদ আলী মোল্লার ছড়ায় তা এসেছে    এমন:
‘হোগলা বনের ঝোপের ভেতর ঘুরছে জোড়া জোড়া
জলমুরগি রেইল ঢেঙা জিরিয়া  আর  কোড়া
পুরুষ কোড়ার মাঝকপালে টুকটুকে রঙ  লাল
রাঙা আঙুল রাঙা দু চোখ পান্না সবুজ গাল।’—-
পাখিদের নিয়ে তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টি ধরা পড়েছে ছন্দোময় শিল্পের বাঁধনে। ছড়ায় তাঁর  এই  শিল্প- নৈপুণ্য
আমাদের মুগ্ধ করে।
 একটা বাঁশিঅলা বাঁশির সুরে অসাধ্য সাধন করে চলেছে— এই ছবিটা চেনা।চেনা জগতের ছান্দসিক শৈল্পিক  রূপটা  কবির  স্বনির্মিত। পাখপাখালিগুলো আমাদের  হয়তো  চেনা,  হয়তো অচেনা। কিন্তু,  রঙে- রূপে-স্বভাবে  বিচিত্র  পাখপাখালির যে   কাব্যিক উপস্থাপন   তা  কবির নিজের   সৃজন।  শিশুদের প্রতি ভালোবাসাই  বোধহয়  তাঁর এই সৃজন প্রেরণার উৎস।  তাঁর    টিপ্পনী – জাতীয় ছড়াগুলো কল্পনাপ্রসূত না, ঘটনাবহুল জনজীবনের অবিকল ছবি। টিপ্পনী রচনার প্রেরণাটা বোধহয় তিনি পেয়ে থাকবেন  সমাজের প্রতি  দায় থেকে। তবে  প্রেরণার উৎস যাই হোক     ছড়াগুলোর কিন্তু একটা    অমল  সৌন্দর্য আছে। সেই  সৌন্দর্য   স্বপ্রকাশিত  ;  তা দেখতে  উত্তল কাঁচ লাগে না, খালি চোখেই দেখা যায়।
জনপ্রিয় পোস্ট

আবু আফজাল সালেহর ছড়া: সমাজ, প্রকৃতি ও উৎসবের মেলবন্ধন

আহাদ আলী মোল্লার ছড়ার জগৎ 

আপডেট : ১২:৪৬:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪


হুমায়ুন কবীর 



ছড়া লিখেছেন অজস্র,গাণিতিক হিসেবে হাজার বিশেক হবে।  ছড়া- বই  প্রকাশ করেছেন মাত্র দুটো—(১) হ্যামিলনের বাঁশিঅলা (২) পাখপাখালির দেশ। লিখেছেন অসংখ্য কবিতা আর   মনোরম  কিছু  গল্প।

 ‘মাত্র দুটো বই !   বাকি লেখাগুলোর কী অবস্থা?’— এমন প্রশ্নের জবাবে ছড়াকার আহাদ আলী মোল্লা বললেন,  ‘সেগুলো  পত্রিকার পাতায় ছড়িয়ে – ছিটিয়ে আছে।  নিজস্ব  ল্যাপটপে সংরক্ষিত  রেখেছি  কিছু।’
 নিরন্তর লিখিয়ে  এই মানুষটি  চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রকাশিত  দৈনিক মাথাভাঙ্গা’র সঙ্গে আছেন সেই প্রতিষ্ঠাকাল থেকে। তিনি পত্রিকাটির  বার্তা সম্পাদক।  পেশাগত  কারণে সাংবাদিকতাধর্মী লেখা লিখতে হলেও ভিতরে ভিতরে তিনি একজন  কবি । বলা যায়, কবিতার  সাথেই তাঁর  ঘরবসতি। সাংবাদিক হিসেবে ছুটে  চলাটা এক  অর্থে তাঁর সাহিত্য চর্চার পরিপূরক।     তিনি ছড়া- কবিতার  রসদ  সংগ্রহ  করেন  এই চলমান  জীবনের পাঠশালা থেকেই। দৈনিক  মাথাভাঙ্গার পাতায়  ছড়া- টিপ্পনী রচয়িতা হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত — দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে কাজটি করছেন তিনি ।  সমকালে  নাড়া দেওয়া খবর নিয়ে লেখা এই টিপ্পনী -তে উঠে এসেছে এই সময়ের  মানুষ আর  মানুষের বিচিত্র  চালচিত্র । তাতে   সময়ের উত্তাপ  আটকে  পড়ে আছে ,   সুপ্ত হয়ে   আছে  তাক লাগিয়ে দেয়া ঘটনার কাব্যিক প্রকাশ।
 ‘হ্যামিলনের বাঁশিঅলা’ আর ‘পাখ পাখালির দেশ’ তাঁর  টিপ্পনী – ছড়া থেকে মেজাজে – চরিত্রে  আলাদা। টিপ্পনী- তে হিউমার  আছে,স্যাটায়ার আছে, শব্দের কষাঘাত আছে।  এই দুটো গ্রন্থে তা নেই, এখানে পাতায় পাতায় স্নিগ্ধতা, শব্দে- বর্ণে পেলবতা– তাতে কান পাতলে  শোনা যায় সাংগীতিক মূর্ছনা। হ্যামিলনের বাঁশিঅলায়  চোখ রাখলে অবাক বিস্ময়ে দেখি :
‘কোটি কোটি ইঁদূর মরে
কয় মিনিটেই সাফ,
নগরবাসী স্বস্তি পেল
বাঁচলো ছেড়ে হাফ।’
পাখপাখালির দেশে চোখ  রেখে দেখি:
‘এক পায়ে রয় ঠাঁই দাঁড়িয়ে  ঠোঁট যেন তার সুচ
দৌড়ে সবার আগে ছোটে চঞ্চলা কালকুঁচ।
কুসুম ভোরে পুব আকাশে সূর্য ওঠে রাঙা
উড়াল দিয়ে বিলে- ঝিলে যায় সারস শামুকভাঙা। ‘
 হ্যামিলনের বাঁশিঅলা’ একটা জার্মান উপকথা।    এই উপকথাটা আমরা অনেকেই জানি। জানাশোনা  এই    প্রচলিত কাহিনীটির  কাব্যিক পরিবেশক  তিনি। কাহিনী নির্মানে না,    সরস আর সুখপাঠ্য কাব্যরূপ নির্মানে  তাঁর কৃতিত্ব। এটা তাঁর প্রথম ছড়া গ্রন্থ,  প্রকাশকাল  ২০১২। বইটির প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন সিকদার আবুল বাশার। পাতায় পাতায় অলঙ্করণগুলো শিশু- কিশোরদের  মন ভরিয়ে দেয়।  ছবির ভাষা আর ছড়ার  ভাষা এসে মিলে যায় এক রেখায়— পাঠকের মানস- চক্ষে ভেসে ওঠে বিচিত্র রঙের আলখাল্লা পরা এক বাঁশিঅলা। শিশুরা যুগপৎ  মুগ্ধ হয় ছবি আর ছড়ায় ——  একই সাথে  পেয়ে যায় ছড়া আর গল্পের  স্বাদ।
 ছড়ার  শুরুটা  এভাবে :
একেবারেই সত্যি কথা
মন দিয়ে তা  শোনো
এর মাঝে নেই নকল – ভেজাল
গলদ কিছু কোনো।
আদ্যিকালে হ্যামিলনের
ছোট্ট শহর জার্মানে,
কেউ কি জানো সব মানুষই
কাদের কাছে হার মানে?
সে বাপু এক বিরাট ব্যাপার
সে কী আজব কারখানা,
লাখে ইঁদূর ঝাঁকে ইঁদূর
নয় দুটো বা চারখানা।
ছড়াগুলোয় ধ্বনি আর ছন্দ নিয়ে খেলেছেন কবি।অন্তমিলের খেলা খেলতে তেমন বেগ পেতে হয়নি তাকে ।এটা বোধহয় তাঁর ঐশ্বরিক গুণ। তাঁর ছড়ার  গতিময় ছন্দ  শিশুদের  নিয়ে চলে সেই হ্যামিলনের বাঁশিঅলার জাদুর ভূবণে।তাদের চোখে ভেসে ওঠে  ইঁদুরের উৎপাতে নাস্তানাবুদ এক শহরের ছবি——
‘ছেলেপিলে জড়োসড়ো
ইঁদূর দেখে ডরায়,
ছন্নছাড়া জীবন যেন
গজব নামে ধরায়।
ভাত রুটি খায় তরকারি চাল
মুড়কি চিড়ে খই
কাগজ খাতা খেলনাপাতি
কিতাব কলম বই।’
আহাদ আলী মোল্লার ছড়া যেন ছুটে চলা ছোট নদী।  ছোট নদীর ঢেউয়ের মতো তাঁর  ছন্দ। পাঠের সময়  নিস্তরঙ্গ ঢেউ তুলে যায় পাঠকের মনে। তাঁর শব্দ বিন্যাসের নিপুণতা এমন:
‘শহরজুড়ে নামলো খুশি
ফিরলো মুখে গান,
কেটে গেলো ষাট বছরের
পুরোনো টেনশান।
দু’হাত তুলে ছেলাম ঠুকে
ঠিক মেয়রের সামনেই,
কয় দাঁড়িয়ে,  মেয়র সাহেব
আমার তো আর কাম নেই।
হাতের বাঁশি আস্তে করে
লম্বা ঝোলায় ঢুকিয়ে,
বললো জনাব,এবার আমার
পাওনাটা দিন চুকিয়ে।’
‘পাখপাখালির দেশ ‘ ছড়া গ্রন্থে আহাদ আলী মোল্লার পাখি প্রেম ফুটে উঠেছে। নদীবিধৌত গ্রামীণ জনপদে তাঁর জন্ম। এখানে  হরহামেশা তাঁর চোখে পড়ে টুনিটুনি,দোয়েল, শ্যামা, চড়ুই।তাঁর পাশেই ঘুরে বেড়ায় শালিক,বুলবুলি , পিয়াল, ঈগল।  পাখির সাথে  খাল – বিল-  নদী- , পাখির  সাথে বৃক্ষ- লতা- গুল্ম — এই ইকোলজিটা  অখণ্ডভাবে   পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। তাই,তাঁর ছড়ায়  পাখি আর প্রকৃতি একাকার।
‘টুনিটুনিরা ফুড়ুত ফুড়ুত ওড়ে ডালিম গাছে
দোয়েল পাখি লেজ নাচিয়ে শিমের মাচায় নাচে
ফটিকজলের গান শোনা যায় গাছের পাতার ফাঁকে
সাতসকালে মিষ্টি সুরে চড়ুই পাখি ডাকে।’—– এই পঙতিতে পাখি:টুনিটুনি -দোয়েল – ফটিকজল ;
গাছ: ডালিম, শিম ;   সময়: সাতসকাল । এসবের মাঝে টুনিটুনির ফুড়ুৎ করে ছুটে চলা, দোয়েলের লেজ উঁচিয়ে নৃত্য,  ফটিকজলের গান আর  চড়ুই পাখির ডাক —এইসব নিয়েই শিল্পের ঘরবসতি। প্রচণ্ড  শিল্পবোধ না থাকলে   উন্মুক্ত প্রকৃতি থেকে এগুলো কবিতার খাতায় আনা যায় না। আমাদের  সবার সামনেই প্রকৃতি  তার এই অপার  সম্ভার উন্মুক্ত করে রেখেছে।  কিন্তু সকলে  শব্দে- বাক্যে – ছন্দে তা  বাঁধতে পারি না ; কেউ কেউ পারি ।আহাদ আলী মোল্লা পেরেছেন— তাকে কবিই বলবো আমরা।
 আহাদ আলী মোল্লার কবিত্বশক্তি  প্রবল,  দেখবার শক্তি প্রবলতর। কিন্ত  প্রকাশটা ভারি  সাদামাটা -সহজ। চোখ মেলে দেখা ছবিটা ছন্দে বাঁধেন সহজে — এখানেই আহাদ আলী মোল্লা অনন্য।   দেখুন, ছড়ায় তাঁর  সহজিয়া  প্রকাশ :
মিষ্টি সুরে কোকিল ডাকে রঙিন ফাগুন কালে
ফিঙেরাজা নেচে বেড়ায় নিমের ডালে ডালে
কৃষ্ণচূড়ার ফুলে ফুলে পাপিয়া  গায় গান
মোহনচূড়ার শিঙের চুলে হাওয়ায় তোলে তান।’
 তাঁর ছড়া পড়তে  পড়তে মনে হলো, তিনি সর্বোত্তম  শব্দের  সর্বোত্তম ব্যবহারটাই করেছেন। তাঁর শব্দ- স্বকীয়তা আছে । তাঁর ছড়ার ছন্দটা গতিময় ,  গাঁথুনিটা পোক্ত। ছন্দব্যাকরণ ভালো বুঝিনা, তবে কানে  ভালো শোনালে মেনে নিই ।ভালো শোনায় তাঁর এই পঙতি:
‘জল- লাগোয়া ঝোপের ভেতর ডাহুক পাড়ে ডিম
নদীর ধারে মাছরাঙারা সময় কাটায় হিম
নদী নালা খালের পাড়ে মাছরাঙাদের বাস
জল- শেঁওলার কোলে কোলে সাঁতার কাটে হাঁস।’
পাখিদের নিয়ে কাব্য করতে যেয়ে  তাকে অনেক প্রজাতির পাখি দেখতে হয়েছে। অথবা তাকে  পাখিদের  নিয়ে অন্যের লেখা পড়তে হয়েছে। অন্যথা পাখিদের স্বভাব – প্রকৃতি, আকার- আকৃতি তিনি ছড়ায় অনুপুঙ্খ তুলে ধরতে পারতেন না। এদিক থেকে তাকে পাখি বিশেষজ্ঞ বললে অত্যুক্তি হয় না। তিনিই আমাদের জানান,
‘কুড়াবাজের বড়শি থাবায় শিকার ওঠে গেঁথে
গাঙচিলেরা আহার  করে  উড়াল যেতে যেতে
পদ্মফুলের থালাপাতায় জলপিপিরা হাঁটে
রঙিলা বক উঁকি মারে রাইসা বিলের ঘাটে।’
অবশ্য  বিশেষ জ্ঞান  ছড়ায় দিতে হবে  মোটেও তা  না— ছড়ায় ধ্বনি- মিল, ছন্দ- মিল এগুলোই  মূখ্য। বুঝতে পারাটা মূখ্য না,আনন্দটা মূখ্য। শুনেছি,ফরাসি দেশে কেউ কেউ শব্দ না,বাক্য না— স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জন বর্ণের মিল ঘটিয়ে নির্মাণ করেন অপূর্ব কবিতা।
ছন্দ- বন্ধনে  যে    মনোলোভা ছবি আহাদ আলী মোল্লার ছড়ায় উঠে এসেছে  সাহিত্যের ভাষায় এগুলোকে চিত্রকল্প বলে। চিত্রকর  তুলি,রঙ,রেখা দিয়ে ছবি আঁকেন।কবির হাতে এসব সরঞ্জামাদি নেই , তবু বর্ণে- শব্দে একটা চিত্রকল্প তৈরি করেন কবি।একটা স্বার্থক চিত্রকল্প অনেক পৃষ্ঠার বর্ণনার চেয়ে বাঙময়।  আহাদ আলী মোল্লার ছড়ায় তা এসেছে    এমন:
‘হোগলা বনের ঝোপের ভেতর ঘুরছে জোড়া জোড়া
জলমুরগি রেইল ঢেঙা জিরিয়া  আর  কোড়া
পুরুষ কোড়ার মাঝকপালে টুকটুকে রঙ  লাল
রাঙা আঙুল রাঙা দু চোখ পান্না সবুজ গাল।’—-
পাখিদের নিয়ে তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টি ধরা পড়েছে ছন্দোময় শিল্পের বাঁধনে। ছড়ায় তাঁর  এই  শিল্প- নৈপুণ্য
আমাদের মুগ্ধ করে।
 একটা বাঁশিঅলা বাঁশির সুরে অসাধ্য সাধন করে চলেছে— এই ছবিটা চেনা।চেনা জগতের ছান্দসিক শৈল্পিক  রূপটা  কবির  স্বনির্মিত। পাখপাখালিগুলো আমাদের  হয়তো  চেনা,  হয়তো অচেনা। কিন্তু,  রঙে- রূপে-স্বভাবে  বিচিত্র  পাখপাখালির যে   কাব্যিক উপস্থাপন   তা  কবির নিজের   সৃজন।  শিশুদের প্রতি ভালোবাসাই  বোধহয়  তাঁর এই সৃজন প্রেরণার উৎস।  তাঁর    টিপ্পনী – জাতীয় ছড়াগুলো কল্পনাপ্রসূত না, ঘটনাবহুল জনজীবনের অবিকল ছবি। টিপ্পনী রচনার প্রেরণাটা বোধহয় তিনি পেয়ে থাকবেন  সমাজের প্রতি  দায় থেকে। তবে  প্রেরণার উৎস যাই হোক     ছড়াগুলোর কিন্তু একটা    অমল  সৌন্দর্য আছে। সেই  সৌন্দর্য   স্বপ্রকাশিত  ;  তা দেখতে  উত্তল কাঁচ লাগে না, খালি চোখেই দেখা যায়।