সরদারের মুখোমুখি
হুমায়ুন কবীর
চুয়াডাঙ্গা শহর । এই শহরেরই একজন মানুষ। নাম সরদার আলী হোসেন। শহরটা ছোট, মানুষটা ছোট না,বড়। কীসে বড়? বড় সাহিত্যে, বড় সংস্কৃতিতে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও একসময় সরব ছিলেন — ‘৭২ — ‘৭৩ – এ করেছেন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন ,পরে ভাসানী – ন্যাপ।’ একসময় ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা কৃষক দলের সভাপতি। এখন বয়স ৭১ ; রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে —- রাজনীতির এইসব ক্ষেত্রে তিনি বড় কি না জানি না ; হয়তো বড়, হয়তো বড় না।
সাহিত্য পরিষদ, চুয়াডাঙ্গার একাধিক টার্মে যথাক্রমে সভাপতি ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। চুয়াডাঙ্গা থিয়েটার ও আবৃত্তি পর্ষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি । চুয়াডাঙ্গা, চর্চায়নের সাবেক মহাপরিচালক এই মানুষটি নিজে চমৎকার আবৃত্তি করেন, একসময় আবৃত্তি প্রশিক্ষকও ছিলেন। সম্পাদক ছিলেন ‘ প্রতিদিন খাস খবর ‘ চুয়াডাঙ্গা’র। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র– চুয়াডাঙ্গা জেলা সমন্বয়ক ছিলেন এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। এপার বাংলা ওপার বাংলার খ্যাতিমান সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে তাঁর সখ্য। চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদে বিভিন্ন সময় অতিথি করে এনেছেন হুমায়ুন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন,আসাদ চৌধুরী, সমুদ্র গুপ্তসহ দেশবরেণ্য কবি – লেখকদের। ওপার বাংলা থেকে এনেছেন কবি সুভাস মুখোপাধ্যায়কে। বললেন, হুমায়ুন আহমেদ, আসাস চৌধুরী আর কবি নুরুল হুদার সাথে কিছু ছবি ছিল ; সবগুলো কাছে নেই,যা আছে তা এখন ধূলিধূসরিত,মলিন।
বিভিন্ন সময় বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় এই মানুষটির মুখোমুখি হয়েছি। মুখোমুখি হয়েছি জেলা গণগ্রন্থাগারে, তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে, কখনও বা টি-স্টলে। একান্তভাবে তাঁর সাথে কথা হয়েছে,হচ্ছে চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ –‘কুঞ্জ আফিয়েত’-এ। প্রতি সন্ধ্যায় প্রিয় এই সাহিত্য অঙ্গণে তিনি পা রাখেন,কবিতা পড়েন। ফাঁকে ফাঁকে কথা বলেন। ‘ সরদারের মুখোমুখি ‘ মূলত সরদার আলী হোসেনের সাথে সেইসব কথকতা।
(১)
সরদার আলী হোসেনকে দীর্ঘদিন থেকে চিনি ; সে শুধু মুখ চেনা— মানুষটা চেনা না। এখন এই সাহিত্য পরিষদে যখন তিনি কথা বলেন, মানুষটি চিনতে পারি । যখন তিনি পাঠ করেন— যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে …। তিনি আবৃত্তি করেন, তাঁর কণ্ঠে যেন নিস্তব্ধ জলে ঢেউ ওঠে। শ্রোতার হৃদয় ময়ূরের মতো পেখম মেলে। তাঁর উচ্চারণ প্রমিত,তাঁর কণ্ঠ উদাত্ত—-তাঁর আবৃত্তি শিল্পোত্তীর্ণ। শুদ্ধ উচ্চারণের অনুশীলনটা তাঁর পরিবারেও আছে। একদা তাঁর মুখেই শোনা——-” আমার পাঁচ মেয়ে আর নাতিরা সবাই প্রমিত উচ্চারণে কথা বলেন। যৌবনে বছর দু’য়েক সিলেটে ছিলেন ; সিলেটবাসী মুগ্ধ হয়েছিলেন তাঁর কথায়। একবার এক বাসায় নিমন্ত্রণ খেতে গেছেন। কথা শুনে মুগ্ধ গৃহকর্তা- গৃহকর্তী। পরদিন আবারও নিমন্ত্রণ ! পাশের বাসা থেকে এসেছে একঝাঁক তরুণী — কথা শুনতে চাই সকলে। একটা ট্রাজিক নাটকের সংলাপ শুরু করলেন সরদার আলী হোসেন ; শুনে চোখে জল এলো সবার। তাদের মন্তব্য, কুষ্টিয়া – চুয়াডাঙ্গার ভাষা দারুণ মধুর—ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতনি ভাষা। তিনি বলেন, শুধু কবিতা লেখা, ছবি আঁকাই শিল্প না,কথা বলাও শিল্প।
অভিনয় শিল্পেও তাঁর সুনাম ছিল। একসময় মঞ্চ নাটকে অভিনয় করতেন। রবীন্দ্রনাথের ‘বৈকুন্ঠের খাতা ‘ , আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘মেরাজ ফকিরের মা ‘ ‘এখনো ক্রীতদাস ‘ প্রভৃতি নাটকে অভিনয় করেছেন। বললাম, সুবচন নির্বাসনে ? কাজল মাহমুদ পাশ থেকে বললেন, না, আলী ভাই ‘ সুবচন নির্বাসনে ‘ নাটকে অভিনয় করেনি। তাঁর অভিনয় নৈপুন্যে মুগ্ধ হয়েছেন প্রখ্যাত লেখক সৈয়দ শামসুল হক, শেলিনা হোসেন, কবি শামসুর রাহমান প্রমুখ। বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, ‘ আসেন, ঢাকায় চলে আসেন,বিটিভিতে আপনাকে জায়গা করে দিই।’ কথার শিল্পী এই মানুষটি কথা শোনেননি, রয়ে গেছেন চুয়াডাঙ্গায়। মাটি আর মানুষকে ভালোবেসে এই শহরেই রয়ে গেছেন তিনি।

(২)
‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে,
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’ ,
সুন্দর হল সে। ‘ —–সাহিত্য পরিষদের ছোট্ট কক্ষে দরাজ কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের এই পঙতি ছড়িয়ে দিলেন সরদার আলী হোসেন। চারপাশে সবার দিকে চেয়ে বললেন, কে বলবেন, আচ্ছা, হুমায়ুন ভাই, আপনিই বলেন, —-কী বুঝলেন?
বললাম, এটা তো সাব্জেক্টিভ কবিতা —এখানে কবির ব্যক্তিগত আবেগটাই মুখ্য। গোলাপ সুন্দর এ বিচার করে কে, কে দেয় তার সৌন্দর্যের স্বীকৃতি ? মানুষের মন। মানুষের মন সৌন্দর্যের উপভোক্তা —- মূল্যায়নের যোগ্যতা তারই আছে।
এবার শুরু হলো তার পালা। তিনি বলে চললেন…. তিনি কথা বল্লে শুনতে ইচ্ছে হয়। যখন জেলা বিএনপির সেক্রেটারি ছিলেন মাঠে- ময়দানে হাজার শ্রোতাকে মাতিয়ে রাখতেন ।
কিছুক্ষণ আগে সাংবাদিক মানিক আকবর পরিষদে এসেছিলেন ; আলী ভাই কথা বলছেন,মানিক আকবর তেমন কথা বলছেন না, চুপটি করে আছেন। শেষমেষ বললেন, আলী ভাইয়ের কথা শুনতে আসি — সেই আশি সাল থেকে শুনে আসছি ;আজও শুনি।
মানিক আকবর ভাইকে বললাম, উনি তো লেখালিখি করেন না, শুধু বলেন। বললেন, ‘লেখেন না, কিন্তু এক সময় লিখেছেন — না, মানে উনাকে দিয়ে আমরা লিখেয়ে নিতাম। বলতাম,আপনি এই যে এত সুন্দর করে কথা বলেন,এটাই লিখবেন। তখন চুয়াডাঙ্গা থেকে ‘ সাপ্তাহিক চুয়াডাঙ্গা, ও ‘সাপ্তাহিক দর্পন’ নামে পত্রিকা প্রকাশ হতো। ‘ সরদারের কলাম’ আর ‘প্রতিবিম্বিত ‘ শিরোনামে পত্রিকায় কলাম লিখতেন তিনি। মানিক আকবর ভাইয়ের ফোন বেজে উঠলো ; ফোনটা রিসিভ করে কথা বলতে বলতে তিনি বেরিয়ে গেলেন।
আলী ভাই পাঠে মগ্ন ছিলেন । সাময়িকভাবে আমাদের দিকে মন ছিল না ; সহসা মুখ তুললেন।
বইয়ের পাতা বন্ধ করে বললেন, হ্যাঁ, এবার কিছু বলেন,শুনি। বললাম,একদা লিখতেন তো ; সেইসব লেখা কি সংগ্রহে আছে?
: লিখতাম কে বললো?
: এডভোকেট মানিক আকবর বললেন।
স্মিত হাস্যে বললেন : নাহ্, নেই।
বললাম, কোন্ কাগজে লিখতেন? কী বিষয়ে লিখতেন?
:পত্রিকার নাম… নামটা যেন কী? কাজল মাহমুদ বললেন, সাপ্তাহিক চুয়াডাঙ্গা, সাপ্তাহিক দর্পন। আলী ভাই বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ সাপ্তাহিক চুয়াডাঙ্গার সম্পাদক ছিলেন শেখ সেলিম। শেখ সেলিম তো অনেক সময় আমার বাড়ি চলে আসতেন। লেখা না দিলে উঠতেন না।
সহসা বলে উঠলেন, যাকগে, এই শুনুন —- —
‘ আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের ‘পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান!
না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ। ‘ কবিতার ভাষা আর ছন্দের বৈভবে তিনি হারিয়ে গেলেন। বললেন, দারুণ কবিতা, তাই না?
(৩)
বিষয় নির্ধারিত নেই । সাহিত্য নিয়ে কথা হয় । কখন, কোন্ ফাঁকে ঢুকে পড়ে রাজনীতি, ধর্ম ; ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা। এ ধরনের বৈঠককে বলি আড্ডা। আমরা বাঙালিরা রাজনীতিতে অসহিষ্ণু, ধর্মে আবেগপ্রবণ। এসব বিষয়ে তাঁর সাথে দ্বিমত হয় ; কাজল মাহমুদ ইশারায় অনৈক্য এড়াতে বলেন। অবশ্য সরদার আলী হোসেন ভিন্নমত কাটিয়ে যান এক অভিনব কায়দায় । ভিন্নমতকে শাখা মেলতে দেন না—-হাতের কবিতা বই থেকে সহসা পড়ে শোনান :
‘ হায় ছায়াবৃত,
কালো ঘোমটার নীচে
অপরিচিত ছিল তোমার মানব রূপ
উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে।
এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে….’
রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা ‘ কবিতা থেকে এই আবৃত্তি উপস্থিত ভিন্ন মতকে প্রশমিত করে। আফ্রিকা মহাদেশে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নির্যাতন স্মরণ করিয়ে দেয় এই কবিতা—- এ কবিতার সাথে সাদাচামড়া – কালোচামড়া রাজনীতি চলে আসে বটে ; কিন্তু সরদার আলী হোসেন কবিতার শেষ পঙতি পড়েন—-
: আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে
দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে;
বলো ‘ ক্ষমা কর’…। তাঁর গম্ভীর কণ্ঠ ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। একটা শান্ত – স্নিগ্ধ আবহে ছেয়ে যায় সাহিত্য পরিষদের ছোট্ট কক্ষ।
(৪)
একদিন হলো কী— আলাপে চলে এল ধর্ম। ধর্মের অনেক টার্ম তো যাচাইয়ের বিষয় না,বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু, উনি বিশ্বাস না,জাগতিক ব্যাখ্যার ‘পর জোর দিলেন।
বললেন, একটা বিষয় কি হুমায়ুন ভাই, নবী – রাসুলরা মনুষ্যকূলে সবচেয়ে মেধাবী মানুষ।তাঁরা পাপে ভরা সমাজটা পালটাতে চাই। মানুষকে তৈরি করতে চাই, কাজে লাগাতে চাই। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব —- এ প্রশ্ন তাদের অস্থির করে,ব্যাকুল করে অহর্নিশ।
: তা বটে সত্য।
ক্ষণকাল চুপ রইলেন তিনি। কী ভাবনায় অন্তর্লীন হলেন কে জানে?
ফেরদৌস নামে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন। তিনি স্তব্ধতা ভাঙলেন। ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্য পড়ান এই ভদ্রলোক। ভদ্রলোক মুক্ত মনে কথা বলে যাচ্ছেন ; বলছেন ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা বড় কিছু না, হাদিস শাস্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুললেন —-জোর দিচ্ছেন আল কুরআনের মূল স্প্রিটের ‘পর ।আল কুরআনের অনুবাদ নিয়ে বললেন, দেখুন আল কুরআন আশি শতাংশ কাব্য ; সেই কাব্যিক অনুবাদ বাংলা ভাষায় হয়নি। আল কুরআনে আরবে প্রচলিত অনেক বাক বিধি আছে, সেগুলো বাংলা অনুবাদে যথাযথ আসেনি—- তিনি নাকি এ বিষয় নিয়ে গবেষণা করছেন। হাদিস শাস্ত্র নিয়ে তাঁর অবস্থান মানতে পারছি না। আজান হয়ে গেছে। ইশার জামাত আসন্ন ; প্রফেসর সাহেব যখন ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা গৌণ বলে মন্তব্য করছেন, তখন কথার চলমান অনুষ্ঠান থেকে আমি উঠতে উদ্যত হলাম, বললাম, আমি একটু আনুষ্ঠানিকতা সেরে আসি। সবাই হেসে ফেললেন।
কিন্তু, সরদার আলী হোসেন বললেন, বসেন, কথা শেষ হয়নি,হুমায়ুন ভাই। তিনি শান্ত, তাঁর ঠোঁটে মৃদু হাসি।
বললাম, আচ্ছা, বসলাম, বলেন।
তিনি বললেন দেখুন, আড্ডায় ভিন্নমত এসে যায়। ইচ্ছে করে আসে,ইচ্ছের বাইরেও আসে।
: ইচ্ছে করে কেন?
: আড্ডা জমানোর জন্য ; বিরুদ্ধ মত না হলে কি আড্ডা জমে,বলুন? তিনি চশমাটা চোখ থেকে খুলতে খুলতে হো, হো করে হেসে উঠলেন।
(৫)
সাহিত্য পরিষদের আসর চলছে। চলছে কবিতা পাঠ। তিনি একজন প্রাজ্ঞবান মানুষ। সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ইকবাল আতাহার তাজ তাঁর অনুজ । তাজ ভাই বললেন, আলী ভাই, আপনিই কবিতা পর্যালোচনা করেন । আলী ভাই শুরু করেন , ছোট্ট কক্ষটি তাঁর কণ্ঠ নিঃসৃত শব্দে ধ্বনিত – প্রতিধ্বনিত হতে থাকে । তাঁর উদাত্ত উচ্চারণ হয়ে ওঠে শ্রুতি- শিল্প। আমরা কান পেতে রই। তাঁর শব্দ- নির্বাচন, শব্দ- প্রয়োগ, শব্দ- উচ্চারণ আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। তাঁর সাহিত্য আলোচনা আমাদের মুগ্ধ করে। ইব্রাহীম খলীল ভাই কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে করে বললেন,আলী ভাইয়ের কাছে কথা বলা শিখতে হবে। হেঁয়ালী করি, বলি কেন আমরা কি কথা বলতে জানিনে?
তিনি জাত পাঠক। তাঁর কবিতা পর্যালোচনা তাঁর নিবিড় পাঠ অভ্যাসকে স্বপ্রমাণ করে। তিনি বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারেন, বিশ্লেষণ করতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন। শ্রোতাদের বোধকে জাগ্রত না করে পাণ্ডিত্য জাহির করায় তার বিস্তর আপত্তি। এজন্য পাঠ পর্যালোচনা করবার আগে পাঠ সংশ্লিষ্ট বিষয় সুস্পষ্ট করবার পক্ষে তার অবস্থান।’ সত্য ‘ শব্দ উচ্চারিত হলে সেই সত্য কোন্ সত্য— সাহিত্যের সত্য, না ইতিহাসের সত্য —এ প্রশ্ন তোলেন এই প্রাজ্ঞ পুরুষ। পঠিত কবিতা নিয়ে আলোচনা করবার আগে তিনি — সুনীল, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ পড়তে বলেন ; বোধহয় কবিতা লেখবার আগে বুঝতে বলেন কবিতা কী তা। দরাজ কণ্ঠে উচ্চারণ করেন , ‘ চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নেশা… তারপর বলেন বিদিশা কী না জানলে বনলতা সেন কবিতা বুঝবেন কী করে? ‘বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগত ‘অথবা ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্য’ বুঝতে হলে ইতিহাস চেতনা না থাকলে কী করে হবে ? তিনিই বলেন, কবিতা বুঝতে হলে বুঝতে হয় ইতিহাস। ইতিহাস চেতনা,কাব্য চেতনা এক করে দেখেন তিনি। তাঁর প্রমিত উচ্চারণ আমাদের মুগ্ধ করে, তার সাহিত্য প্রেম আমাদের অনুপ্রাণিত করে, তাঁর নিবিড় পাঠ আমাদের পাঠে অনুরাগী করে। সরদার আলী হোসেন যখন কথা বলেন,তখন আমরা লজ্জাবতী লতাগুল্মের মতো সংকুচিত হই, শ্রদ্ধায় বিনীত হই। ইব্রাহীম ভাইকে বলি,আপনি কিন্তু যথার্থই বলেছেন, আলী ভাইয়ের কাছে শিখতে হবে যথাযথ শব্দ।
(৬)
রবিবার। সাহিত্য পরিষদে কবিতা পাঠের আসর নেই। সন্ধ্যা রাতে হাঁটতে বেরিয়েছি ; দেখি সাহিত্য পরিষদের দরজা উন্মুক্ত। এগিয়ে যায়। ভেতরে পাঠে মগ্ন সরদার আলী হোসেন। পাশে বসে কাজল মাহমুদ, কাজল গুরু আর হোসেন মোহাম্মদ ফারুক। বই থেকে চোখ তুলে আলী ভাই বললেন, আরে! হুমায়ুন ভাই এসেছেন, বসেন, বসেন।
বসে পড়ি, বলি, আপনার কথা শুনতে এলাম।
: শুনবেন?
: শুনতেই তো এলাম।
হাতের বইটা পাশে সরিয়ে রাখলেন, একটু নড়ে-চড়ে উঠলেন। বললেন, ‘ একজন উর্দুভাষী শুধু রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসে বাংলা শিখেছিলেন। তাঁর কথা বলি— নামটা আবু সয়ীদ আইয়ুব। গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ পড়ে তিনি এতটাই মুগ্ধ হন যে, বাঙলা ভাষাটা শিখে ফেলেন। শুধু তাই না–অসাধারণ বাংলা লিখতেন। পান্থজনের সখা,আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ,পথের শেষ কোথায় এগুলো তাঁর অনন্য কীর্তি। বইগুলো আছে আমার সংগ্রহে।’ প্রসঙ্গক্রমে এক সময়ের তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান, হাবিবুর রহমানের কথা উঠে এলো। –বললেন, বেশ পাণ্ডিত্য ছিল লোকটার। তার লেখা যথা-শব্দ,কোরআন সূত্র, গঙ্গাঋধি থেকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কিছু বললেন। আড্ডায় যা হয় ; কোথা থেকে মুখে এলো সোফোক্লিস ও রাজা ইডিপাস। রাজা ইডিপাস গ্রীক নাট্যকার সফোক্লিসের বিশ্ববিশ্রুত এক নাটক। প্রশ্ন রাখলাম, ফ্রয়েড যে ইডিপাস কমপ্লেক্সের কথা বলেছিলেন, সেটা কি রাজা ইডিপাসের নাম থেকেই নেওয়া?
বললেন, হ্যাঁ, তাই তো। নাটকটি নিয়ে দু’কথা শুনিয়ে দিলেন তিনি । এভাবে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে, বাংলা সাহিত্য থেকে বিশ্বসাহিত্যে প্রবেশ করেন তিনি। তাঁর এই সাহিত্য পরিভ্রমণ আমাদের মুগ্ধ করে। আবিস্কার করি একজন সরদার আলী হোসেন, একজন চলিষ্ণু সাহিত্য বোদ্ধা। এর ফাঁকে সহসা বলছেন, চা আনতে বলি ; চিনিবাদে ক’জন? হুমায়ুন ভাই তো চিনি বাদে; আমি কিন্তু চা বাদে চিনি… বলেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। সময়ে এমন হয়, আমরা সময় মতো খড় যোগাতে পারি না ; আলোচনা স্তিমিত হয়ে যায় যায় —- অমনি আলী ভাই উনুনে একগুচ্ছ খড় দেন, বলেন, এই শোনেন
: আমি আমার পূর্বপুরুষদের কথা বলছি
তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল।
তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল। ‘—- ক্ষণকালের জন্য যেন আমরা চলে যায় আমাদের পূর্বপুরুষদের সান্নিধ্যে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে এস এম সুলতানের হৃষ্টপুস্ট পূর্বপুরুষদের সুঠাম অবয়বের ছবি।
(৭)
আত্মতত্ব বিষয়ে কথা হচ্ছিল। আত্মতত্ব বিষয়টা পুরাতন। সরদার আলী হোসেন বললেন, প্রাচীন গ্রীসের দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন, নো দায়সেল্ফ। বললাম, আমাদের শাস্ত্রে আছে , যে নিজেকে চিনেছে, সে তার রবকে চিনেছে। কাজল গুরু লালন শাহকে উদ্ধৃত করে বললেন — ও যার আপন খবর আপনার হয় না, আপনারে চিনলে পরে যায় অজানারে চেনা। কাজল গুরু নিজের মধ্যে পরম সত্বার সন্ধান করেন —- লালন সংগীত থেকে অধ্যাত্ম সংগীতের চুম্বক চরণ শোনাতে লাগলেন । কাজল মাহমুদ, হোসেন মোহাম্মদ ফারুক উৎসুক হয়ে ওঠেন— কক্ষের সবাই যেন আজ এক একজন মিনি- দার্শনিক। মনে হলো ‘ নিজেকে চেন’ –এই চির পুরোন তত্ত্ব নিয়ে এবার জমবে আলাপ। সহসা আলী ভাইয়ের ফোন- তৌহিদ ভাই আসছেন সাহিত্য পরিষদে।সাথে তার বেয়াই সাহেব ; আলী ভাই উতলা হয়ে উঠলেন ; বললেন, আরে মেহমান সঙ্গে আসছেন —- কী আপ্যায়ন করি বলুন তো! বাসা থেকে আমার ফোন ; আলী ভাই বলেন, ভাবি ফোন করেছেন, হুমায়ুন ভাইকে তো যেতে হবে। মিতাকে সতর্ক করেন,বাসায় হেঁটে না, ইজিবাইকে যাবে। অন্য এক মানবিক, অন্য এক স্নেহপ্রবন সরদার আলী হোসেনকে পেয়ে যাই আমরা । নো দায়সেল্ফ তত্বালোচনায় আমি ঠিক নিজেকে পাই না। যারা পায় বলে মনে হয় তারা কতটা পান তারাই জানেন। তাদের কথায় কিছু মান্যবর , যেমন :সক্রেটিস, রুমি, লালন অথবা অন্যকারও উক্তি কচলানো ছাড়া উপলব্ধিজাত কিছু দেখি না। আজ কি কিছু অর্জন হতো? জানি না ; আলোচনাটা এগুলো না,অন্যদিকে মোড় নিল । তাতে আফসোস নেই। নিজেকে চেনা না হলেও সরদার আলী হোসেনকে তো চেনা হচ্ছে, হোক, তাই হোক।
(৮)
সরদার আলী হোসেন আবৃত্তির কলাকৌশল নিয়ে কাজ করছেন সেই কবে থেকে। আজ এই সন্ধ্যায় তাঁর হাতে একটা কবিতার বই —- অসীমের ভেলা । বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আবদুল্লাহ আবু সাঈদ সংকলনটা করেছেন। ভুমিকাটা পড়ে শোনালেন। বাংলা কবিতার আদি থেকে অন্ত পেয়ে যাবেন তাঁর সংকলনে। হোসেন মোহাম্মদ ফারুক ‘ আদি থেকে অন্ত ‘ কথাটা ধরে বসলেন,প্রশ্ন ছূড়ে দিলেন, অন্ত ক্যামনে বলি? কত লেখা হবে ভবিষ্যতে, এখনই অন্ত কেন— এই তার জিজ্ঞাসা। সরদার আলী হোসেন কেন যেন কথাটা মাখলেন না,অন্ত বলতে সর্বশেষ সংস্করণ বুঝতে হবে —- সম্ভবত এই তাঁর বক্তব্য। সংকলনে ‘ছিন্ন মুকুল ‘ কবিতাটা পড়লাম ; আমাদের সময় নবম দশম শ্রেণির পাঠ্য ছিল কবিতাটি। এই কবিতার মতো আরও দুটো বিয়োগান্তক কবিতা — ‘কবর’ ও ‘কাজলা দিদি’ও পাঠ্য বইয়ে পড়েছি।এই তিনটি বিয়োগান্তক কবিতার তুলনামূলক সাহিত্য আলোচনা দাবি করলাম আলী ভাইয়ের কাছে।আলী ভাই তখন ভাসা ভাসা চোখ বুলাচ্ছেন অসীমের ভেলায়।বললেন, আচ্ছা দেখা যাবে।
মনোযোগ আকর্ষণ করলেন সুমন ইকবাল, বললেন একটা কবিতা শোনেন। মোবাইল থেকে পড়ে শোনালেন সুমন ইকবাল। সেদিককার মতো আমার দাবি অই তিন কবিতার তুলনামূলক আলোচনা ভেস্তে গেল। সুমন ইকবাল আলী ভাইকে বললেন, আপনার কন্ঠে কবিতাটির আবৃত্তি শুনতে চাই। আলী ভাই ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে সঙ্গে এনেছেন আবু জাফর স্যারের ‘ বাজারে দুর্নাম তবু তুমিই সর্বস্ব । সেখান থেকে নির্বাচিত কবিতা আবৃত্তি করছেন। সম্প্রতি প্রয়াত এই লেখকের ‘ এই পদ্মা,এই মেঘনা,এই যমুনা সুরমা নদী তটে আমার রাখাল মন গান গেয়ে যায় , তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম,সে এখন ঘোমটা পরা কাজল বঁধু, অথবা নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে প্রেমের কী স্বাদ আছে বলো—- অসাধারণ সংগীতের কথা উঠে আসছে। আবু জাফর স্যার চুয়াডাঙ্গা কলেজে অধ্যাপনা করেছেন, উঠে আসছে সেই স্মৃতি। কিন্তু এই মনীষীর পরবর্তী জীবনের বাঁক পরিবর্তন, রাসুলুল্লাহ’র জীবনীসহ বহুবিধ ইসলামি সাহিত্য রচনার বিষয় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে ; এই এখন যারা সাহিত্য পরিষদে সক্রিয়, মনে করি, এটা তাদের দৈন্য। সরদার আলী হোসেন বললেন, ‘ আমি তো কলেজে পড়িনি, পড়লে আমি তাঁর ছাত্র হতাম।’ সরদার আলী হোসেন মানুষটি স্বশিক্ষিত কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষিতদের এক বিস্ময় তিনি । স্কুল জীবনের গন্ডি না পেরেনো মানুষটি রপ্ত করেছেন পরিশীলিত ভাষা, মার্জিত আচরণ। সাহিত্য-সংস্কৃতি – রাজনীতির ময়দানে স্বপ্রকাশ তাঁর প্রতিভা, ঈর্ষনীয় তাঁর বাগ্মিতা।
যাকগে, সেদিনকার মতো তিন কবিতার তুলনামূলক আলোচনা ভেস্তে গেল। ফিরে এলাম সাহিত্য পরিষদ থেকে। কিন্তু, তাঁর কথা চঞ্চল ভ্রমরের মতো আমার চারপাশ গুণ গুন করতে লাগলো। কানে বাজতে লাগলো তাঁর কণ্ঠ ধ্বনি—-
‘ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে,মুক্তবেণী পিঠের ‘পরে লোটে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ– চোখ। ‘
(৯)
সরদার আলী হোসেন আবৃত্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন । নিজ শহরের আবৃত্তি শিল্পকে অনেকটা এগিয়ে নিয়েছেন এই মানুষটি । স্কুলে – স্কুলে যেয়ে শিক্ষার্থীদের শুদ্ধ উচ্চারণ শিখিয়েছেন। কীভাবে কণ্ঠস্বরের সাধনা করতে হয় তার অনুশীলন করিয়েছেন। সঠিক অভিব্যক্তি প্রকাশ, স্বরের তীব্রতা, হ্রাস – বৃদ্ধি, স্বরের অনুরণন আবৃত্তির জন্য কতটা জরুরি তা বুঝিয়েছেন। কোনটা আবৃত্তি আর কোনটা পাঠ তা স্পষ্ট করেছেন। সাহিত্য অন্ত প্রাণ ব্যক্তিত্ব সরদার আলী হোসেন যখন সাহিত্য পরিষদে বসেন, তাঁর টেবিলে শোভা পায় কবিতার বই। বর্ণে- শব্দে আটকা পড়ে থাকা মৃত অক্ষরগুলো তাঁর দরাজ কণ্ঠে প্রাণ পায়। তিনি নিজেও শিহরিত হন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। রবীন্দ্রনাথ একটা সংগীতে বলেছিলেন —‘
গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি
তখন তারে চিনি আমি, তখন তারে চিনি…। ‘
সরদার আলী হোসেনের কাব্য অনুরাগ দেখে মনে হয়, তিনি বোধহয় কবিতার ভিতর দিয়ে জগৎ টাকে দেখতে চান। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ’র ‘ বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা ‘পাঠ করবার সময় তাকে মনে হয়েছে কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি এই জগৎটাকেই দেখছেন ?তিনি পাঠ করছিলেন :
‘পাখিরা বসতে পারে এমন কোন বৃক্ষ নেই
জোনাকি লুকাতে পারে এমন কোন গুল্ম নেই
সূর্য শীতল হবে এমন কোন নদী নেই…।’ —–এই পঙতি পাঠে তিনি বোধহয় জগতের ক্ষয়িষ্ণু রূপ দেখছিলেন। তাঁর মুখে শুনিনি — প্রশ্ন করে উত্তর নিতে চাইনি ; শুধু তাকে দেখে এমন মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, কবিতা শুধু কবির কীর্তি না, কবিতার যথার্থ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলেন একজন আবৃত্তিকার।
(১০)
তিনি পড়েন। যা পড়েন তা আত্মস্থ করেন। সক্রেটিসের মতো তিনিও মনে করেন, জ্ঞান হচ্ছে অন্বেষা ; দীর্ঘদিন সেই অন্বেষণ করে চলেছেন এই গ্রন্থ – অনুসন্ধানী মানুষটি। বই পাড়ায় গেলে পছন্দমত বই তিনি কিনবেনই — পকেটে টাকা নেই, তবু দেনা করেই কিনবেন । এ-যুগে বই পড়ার আগ্রহ কমেছে, তাঁর কমেনি। বই কিনে কেউ কখনও দেউলে হয়নি—- একথা তিনি বিশ্বাস করেন। এপার – ওপার দু’ বাংলার সাহিত্য নিয়েই তাঁর সমান আগ্রহ। সুনীল – সমরেশ যেমন পড়েন,আল মাহমুদ , শামসুর রাহমান তেমনিই পড়েন। কলকাতা – ঢাকার অনেক সাহিত্যিকের সাথে তার হার্দিক সম্পর্ক। দু’ বাংলার ভাষা এক তবু্ও এক না, একটা সূক্ষ্ম প্রভেদ আছে— এই তাঁর পর্যবেক্ষণ। তিনি বলেন, ‘আমি পন্ডিত হওয়ার জন্য পড়ি না,যেটা জানা প্রয়োজন মনে করি সেটা পড়ি।’ অবশ্য, সাহিত্য পরিষদে যখন তিনি কবিতা পড়েন,দেখে মনে হয় আনন্দের ঝর্ণাধারা বহিছে প্রাণে ; মনে হয় তিনি আনন্দের জন্যে পড়েন। বললেন, সাইকোলজি পড়েছেন শুধুই নিজের মনকে বুঝতে । ফ্রয়েড পড়েছেন চেতন- অচেতন – অবচেতন মনের চরিত্র বুঝতে ।সম্মোহনী বিদ্যায়ও এক সময় ছিলো তাঁর অখণ্ড মনোযোগ।
তিনি পড়েন, তিনি লেখেন না— তিনি যেন চুয়াডাঙ্গা জেলার মকবুলার রহমান। মকবুলার রহমান চলে গেলে সাহিত্য প্রেমিকরা আফসোস করে বলেছিলেন , ‘ — আহ্! লোকটা কিছু লিখে গেলেন না! জানি, আলী ভাই চলে গেলে এই কথাটাই বলবে চুয়াডাঙ্গাবাসী। একবার মনে হয়,তিনি চুয়াডাঙ্গার আব্দূর রাজ্জাক, আব্দুর রাজ্জাকরা লেখেন না,বলেন। একদিন তাঁর বাসায় গিয়ে দেখি ঘরঠাসা বই—- বইয়ের স্তুপে ডুবে আছেন তিনি। তার ঘর ভর্তি বইয়ের স্তুপে আমার দৃষ্টি আটকে যায় ; আলী ভাইকে এই শহরে এখানে – ওখানে দেখি — বইগুলো তো দেখি না। ক্ষণকালের জন্য বইগুলোই মুখ্য হয়ে গেল, আলী ভাই গৌণ। তবে হ্যাঁ, বিখ্যাত লেখকদের ধ্রুপদি ঘরানার বই দেখে মানুষটা সম্পর্কে ভাবতে হলো। কে, কী ধরনের বই পড়ে এটা দিয়ে তাকে মাপা যায়। দীর্ঘদেহের এই সুঠাম মানুষটাকে মনের অজান্তেই একটা মাফজোক করে ফেললাম। সরদার আলী হোসেনের আনন্দ বইয়ের পাতায় —-বই পড়া যে অপার আনন্দের উৎস হতে পারে, তা এই মানুষটির সান্নিধ্যে না গেলে অন্যরা বুঝবেন না। ধর্ম, কাব্য, জীবনী, দর্শন —কী নেই তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ? রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন শেক্সপিয়ার, সফোক্লিক্স কে নেই তাঁর পাঠে? এই শহরে আর কে আছে তাহার মতো ; তার মতো ? তাঁর পানে চেয়ে আমাদের বিস্ময় সীমা ছাড়িয়ে যায় ; সরদার আলী হোসেনরা লেখেন না — তাদেরকে নিয়ে লিখতে হয়।
লেখক: হুমায়ুন কবীর শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
বাংলাবাঁক 










