-
-
হুমায়ুন কবীর
এ জনপদের ইতিহাসে চোখ মেললে মোটাদাগে কিছু রক্তাক্ত অধ্যায় দেখি। খুব বেশি পিছনে না গেলেও ‘৫২ , ‘৬৯ , ‘৭১ আর সাম্প্রতিক ‘২৪ এখনো আমাদের চোখে জ্বলজ্বল করছে। কবিতা,উপন্যাস, নাটকসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় এই রক্তাক্ত দিনগুলো স্থান করে নিয়েছে।
গেল জুলাই – আগস্টে ছাত্র- জনতা প্রাণ উৎসর্গ করেছে। বৈষম্য বিরোধী এই আন্দোলন কবিদের সংবেদনশীল মনকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে । কবিরা ছাত্র- জনতার সংগ্রামকে যেভাবে মহিমান্বিত করেছে তা আমাদের সাহিত্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। সত্যি বলতে কি, তাদের কবিতায় দারুণভাবে উঠে এসেছে জুলাই – আগস্টের রক্তাক্ত ছবি। পত্রিকার সাহিত্য পাতায়, ফেসবুকে জুলাই – আগস্টের কবিতা পড়ে আপ্লূত হয়েছি।
দম বন্ধ হয়ে আছে এখনো
বারুদের গন্ধে
রক্তের গন্ধে
দূষিত বাতাস
ঢাকায় চট্টগ্রামে রংপুরে…
সারা বাংলাদেশ আজকে কাঁদছে
সন্তানহারা মায়ের শোকে
মানবতার খুনে।
সমগ্র বাংলাদেশই তো আজ সন্তানহারা মা।’—কবিতায় রক্তাক্ত জুলাই – আগস্টকে এভাবেই ধরেছেন কবি আবু আফজাল সালেহ। কবি আবু আফজাল সালেহ একজন সংবেদনশীল কবি ; পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা, প্রবন্ধ, ফিচার লেখেন। তাঁর এই ক্ষুদ্রাবয়ব কবিতায় ‘দম বন্ধ হয়ে আছে এখনো’ শব্দগুচ্ছ ভয়াল চিত্রকে মনে করিয়ে দেয়। তাঁর কবিতায় মানবিক প্রতিবাদ এবং কবিতার ভাষায় হাহাকারের প্রতিধ্বনি —-‘সমগ্র বাংলাদেশ আজকে সন্তানহারা মা’ —পাঠককে ব্যাকুল করে তোলে। অনেকটা বিনম্র এবং কাতর উচ্চারণে আবু আফজাল সালেহ নিষ্ঠুর- রক্তাক্ত অবস্থাটা পাঠকের সামনে মেলে ধরেন। পাঠকের কাজটা কবি পাঠককেই করতে দেন। কবির মনোবিশ্ব বোধহয় সমূদ্র না,শান্ত নদী। রুদ্রতা-নিষ্ঠুরতা অংঙ্কনে কবির কবিতায় তাই উথাল পাথাল ঢেউ না, ছোট – ছোট ঢেউ। থরোথরো আবেগে না ভেসে বর্ণনায় সত্যনিষ্ঠ বলেই হয়তো তাঁর এমন বস্তুনিষ্ঠ উচ্চারণ :
রক্তাক্ত জুলাইয়ে শুরু রক্তখেলা
বুলেটের সামনে লাঠি
হায়েনা – বাহিনীর সামনে দাঁড়ায় পতাকা- লাল- সবুজ
অবিবেক আর ক্ষমতার কুয়াশায় ঢাকা
যেন ব্লাডস্টেশন, না- না যেন রক্তভাগাড়
রোডডিভাইডারে রক্তদাগ
অলিগলিতে খুলি,বিচ্ছিন্ন হাত,ছুটে যাওয়া
ছোপ – ছোপ রক্ত,চোখ,রক্তাক্ত – ঘর্মাক্ত পরিধেয়...
যা ঘটেছে তা কবিতায় তুলে ধরা — যেন ঘটনার অবিকল ফটোগ্রাফ। এমন উচ্চারণের একটা সুবিধে হচ্ছে পাঠক নিজেই তীব্র প্রতিক্রিয়াটা দেখাবে—- হয়তো তা হবে কবির শব্দের চেয়ে শক্তিশালী, কবির পঙতির চেয়ে সোচ্চার। শোষণ – দুঃশাসন- বৈষম্য বিরোধী সংগ্রামে যে রক্ত ঝরেছে তার জন্য কবি দায়ী করেছেন পুলিশ আর স্বৈরাচারকে। কবি লিখেছেন : ‘কার হাতে এ- রক্তভাগাড়?–পুলিশ আর স্বৈরাচারের!’ কবি বিস্মিত হয়েছেন শিশু – কিশোর আর শান্তিকামীদের কিংবা নিরীহদের রক্ত ঝরতে দেখে।তিনি বলেছেন :
যারা কিছুই বোঝে না তাদের রক্তের অনেক রঙ আমরা দেখেছি
লাল- নীল- সাদা- কালো…
কবি আবু আফজাল সালেহ জুলাই – আগস্টে ঘটে যাওয়া তারুণ্যের জয়কে উপলব্ধি করেছেন।অন্যদিকে তিনি দেখেছেন স্বৈরাচারের নিষ্ঠুরতায় তরুণদের মুখ কীভাবে সাদা বিবর্ণ হয়ে গেছে। তিনি দেখেছেন, তরুণদের মর্মবেদনা মায়ের মনকে কীভাবে ভেঙে দিয়েছে , বাবার হৃদয়কে কীভাবে অঙ্গার করে তুলেছে আর অভিজাতদের বাকশক্তিকে কীভাবে বোবা করে তুলেছে। কবির এই অনুভূতির প্রকাশ — ‘অভিজাতও বোবা হয়ে গেছে’ কবিতায় উঠে এসেছে —-
একজন মা এসেছেন খালি বুকে
রক্ত- বুলেট চোখে নিয়ে
কাঁখের শিশুর বড় – গোল চোখে বিস্ময়
মায়ের হাতে – ধরে- থাকা কিশোরীর মুখে কয়েকটি
শব্দ
ভাই, পুলিশ, খুন…
কী চায় তিনজন, বলতে পারে না !
অভিজাতও কী বোবা হয়ে গেছে?
কবি আবেগ সংযত রাখতে পছন্দ করেন। বিজয় অর্জিত হয়েছে বটে, তবু্ও তো চোখে বেদনার জল— বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত শরীর। বেদনার বাণী কবিতায়, তাই কবিতায় তাঁর পরিমিতিবোধ; বিজয়োন্মত্ত হতে বারন করে কবিতায় উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন এই বলে—-
উল্লাস করার সময় আসেনি এখনো
ওত পেতে আছে
নিষ্ঠুরতা,হিংস্রতা আর অন্ধকার
আকাশটা এখনো হয়নি উদার
ধোঁয়ায় বিষাক্ত – বাতাসে ভারী।
বরং চলো পাহাড় গড়ে তুলি
বৈষম্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ি।
অশ্রু আর ক্রোধ এ দুটোই তাকে তাড়িত করে। কবির চোখ জুলাই – আগস্টের প্রতিবাদী মিছিল দেখেছে,তারুন্যের রুধির ঝরতে দেখেছে। কবি এই দেখা থেকে নির্মাণ করেছেন রক্তাক্ত জুলাই, রক্তাক্ত আগস্ট। রক্তাক্ত জুলাই – আগস্টের কবিতায় মিশিয়েছেন বাঙালির চেতনার রঙ। জুলাইয়ের এইসব কবিতায় পুস্পিত গোলাপ নেই, আগস্টের এইসব কবিতায় প্রস্ফুটিত বেলি নেই— আছে ছোপ-ছোপ রক্তের দাগ। সেই অর্থে তাঁর এই কবিতা –পাঠ প্রচলিত অর্থে সুখকর নয় ; বিপ্লব – অভিজ্ঞতাজাত কষ্টকর এক উচ্চারণ। বিপ্লব অভিজ্ঞতা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে এক স্বাধীন উপত্যকায়। তিনি বলেন :
তোমার স্বার্থপরতাই আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছে
বিরাট স্বাধীনতা। নীল আকাশে ঘাসের স্বাধীনতা
শঙ্ক্ষচোখে ভাসার স্বাধীনতা
জারুল বনে উড়ার স্বাধীনতা ——
আমার স্বাধীনতা একখানে বন্দি নেই আর।
নদীর সঙ্গে ছুটে যাওয়া, ইনানী পাথরে হোঁচট খাওয়া
চাকমা পাহাড় আর শালবনে হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই আর।
শিকলের ঝনঝনানি হারিয়ে গেছে তোমার স্বার্থপরতায়।
ফ্যাসিস্ট সিস্টেম ও ফ্যাসিস্ট-তৈরিকারীদের প্রতি জোরালো প্রতিবাদী আরও কিছু কবিতা। ক্ষেত্রবিশেষে প্রতীকী শব্দ ব্যবহার করে আরও গভীর অনুভূতি ও অভিঘাত সৃষ্টির প্রয়াস দেখা যায়:
(১)
প্রথম শঙ্খ বাজিয়েছিলে হৃদয়ে
তুলেছিলে হাজার হাজার সুর
সেদিন দেখেছিলাম, তোমার বুকে হাজার ফুলের গাছ
শুঁকেছিলাম বকুলের সুবাস
হাসনাহেনার মউ।
সেদিন এখন অতীত! তবুও ভাসে মহুয়ার গন্ধ—
মাতাল হয়ে হারিয়েছি একুল-ওকুল।
ঘুম নেই অনেক দিন
রোদ্দুর পাইনি অনেক বছর
তোমার বুকেও এখন রক্ত—নীল রক্ত প্রবাহিত।
চারিদিকে রক্তের চাহিদা। ব্যাপক।
হাসপাতাল, রণক্ষেত্রে
দুর্ঘটনায়
তোমার প্রেমেও রক্ত
শুধু শুধু রক্ত-প্রত্যাশীদের কী দেখে দোষ দেই !
এখন তুমি শুধুই ফ্যাসিস্ট! তোমার গায়েও নীল রক্ত
হে ফ্যাসিস্ট, তোমাকে হাজার ঘৃণা !
(এখন তুমি শুধুই ফ্যাসিস্ট/প্রকাশ: ৪ আগস্ট, ২০২৪/ বাংলাবাঁক)
(২)
আমার না, সূর্যাস্তের সময় সবুজ কচুরিপানার ভিড়ে
জোড়াহাঁস দেখার লোভ রয়েছে
সেই অনেকদিন থেকেই
অনেকদিন মানে অনেক দিন—বলতে পারো বুঝে ওঠার পর থেকেই
কী যে মিলের! কী যে সম্প্রীতির বিউটি !
আসলেই ভুলে থাকা যায় ?
আগে প্রায়ই দেখতাম এ দৃশ্য
এবার দেখব এবার দেখব করতে করতে না
বেশ কয়েক বছর চলে গেছে—যুগ পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই ।
তো এই বর্ষাকালে রাজহাঁসের খেলা দেখব বলে
অনেক দিনের অপেক্ষায়
হঠাৎ দেখি , একটি রাজহাঁসের গায়ে রক্ত
ছোপ ছোপ, ফিনকি…
সৌন্দর্য থেকে যারা বঞ্চিত করছে তাদেরকে ক্ষমা করা যায়?
প্রকৃতির আকাশটা তো তারও
পুকুরটা তো আমাদেরই, তাই না!
(প্রকৃতির আকাশটা তো তারও/প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৪, বাংলাবাঁক)
(৩)
লু-হাওয়া শুরু হয় মাঝেমধ্যে
কী যে ভীষণ ভালো লাগে তখন ! কী যে ভালো লাগে !
এই বুঝি পরিষ্কার হবে আলো, দুর্গন্ধের ভাগাড়গুলো
এই বুঝি নিষ্কণ্টক হবে আমার জমিন, আমার বাতাসগুলো।
অবশেষে, লু হাওয়া বাঁক নেয় মরুভূমির দিকেই
কী যে মায়া লাগে তখন !
রাতগুলো শুধু অন্ধকারই হয়।
ওহ সেনাপতি, আরো গভীর হও
আরো শক্ত হও, আরো বিচক্ষণ হও।
(ওহ সেনাপতি, আরো গভীর হও/ প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৪, বাংলাবাঁক)
বোধহয়, কবিতা এভাবেই স্বৈরাচারীর পথ আগলে দাঁড়ায়। কবিতা এভাবেই হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা,প্রতিবাদের ভাষা। কবিতার বর্ণ হয়ে ওঠে ঘৃনা, ক্রোধ আর শক্তির প্রতীক। এই যেমন, শামসুর রাহমানের কলমে আসাদের শার্ট হয়ে ওঠে আমাদের প্রাণের পতাকা। ক্ষোভে – দুঃখে- শোকে কবিকে একদা বলতে হয়েছিল —-‘ এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়? এমন যোগ্য সমাধি কই?’ আবু আফজাল সালেহ তরুন লিখিয়ে তাঁর কবিতার ভাষা অত শক্তিশালী না, কিন্তু তবু্ও তাঁর ‘ যুদ্ধ বাঁধে বুকের ভেতর /খণ্ডিত হয় হৃদয়’—উচ্চারণ কম কীসে?
কবি আবু আফজাল সালেহ অনেক প্রেমের কবিতা লিখেছেন। ‘ভালোবাসি’ উচ্চারণে তাঁর দ্বিধা —-‘বলব ? নাকি বলব না? —- আজীবন হৃদয় গভীরে রেখেই দেব?’ এই দ্বিধান্বিত কবিকে জুলাই – আগস্টের রক্তাক্ত পঙতি নির্মাণে অকপট হতে দেখি। তাঁর প্রেমের কবিতা পাঠে পাঠক আত্মিক পুলক অনুভব করে। তাঁর প্রবন্ধে চিন্তার খোরাক খুঁজে পাই। কিন্তু জুলাই – আগস্টের কবিতাগুলো পাঠককে বেদনার্ত করে, এক বীভৎসতার মুখোমুখি করে। কবিতাগুলো উৎকৃষ্ট শিল্পকর্ম কি না জানি না, তবে সেগুলো আমাদের শরীরের পেশিতে টানটান অস্থিরতা নিয়ে আসে। তাঁর কবিতাগুলো আমাদের মনে শুধুই সৌরভ ছড়ায় না, আমাদের মনকে উদ্ভ্রান্ত করে। আবু আফজাল সালেহ’র রক্তাক্ত কবিতাগুচ্ছ আমাদের মস্তিষ্ককে যুগপৎ ক্লান্ত করে আর স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্ন দেখানো আর ক্লান্ত করে তোলা দুটোই বোধহয় কবিতার কাজ।
লেখক: হুমায়ুন কবীর, শিক্ষকও প্রাবন্ধিক