হুমায়ুন কবীর 
অনেকের দৃষ্টি থাকে, সৃষ্টি থাকে না—আহাদ আলী মোল্লার দৃষ্টি আর সৃষ্টি দু’টোই আছে। যাপিত জীবনের উপর সদা জাগ্রত তার সুতীক্ষ্ণ বাজ –পাখির দৃষ্টি । এখানে- ওখানে স্বাভাবিকতার ব্যত্যয় ঘটলেই চট জলদি ক্যামেরা হাতে ছুটে চলেন তিনি । ঘটনা ক্যামেরা বন্দী করেন, বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্ট ছেপে দেন পত্রিকার পাতায়। সেইসাথে শব্দে- ছন্দে বেঁধে ফেলেন আলোচিত- সমালোচিত অম্ল অথবা মধুর যত ঘটনা। শব্দে গাঁথা সেই ছান্দসিক বর্ণনই হচ্ছে আহাদ আলী মোল্লার “টিপ্পনী”। চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রকাশিত দৈনিক মাথাভাঙ্গা’র প্রথম পাতায় এর নিত্য ঠিকানা। টিপ্পনীর ভাষা কখনো রসাত্মক,কখনো- শ্লেষাত্মক, কখনো বা প্রতিবাদমূখর। মজার বিষয় এই যে, নিউজ রিপোর্ট ছাপিয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় নিউজ নিয়ে লেখা তাঁর টিপ্পনী — পত্রিকার পাতায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে পাঠকের চোখ। চলুন, পাঠক পাড়া থেকে একটু ঘুরে আসি।
শ্রমিকের কুঁড়ে ঘরে : সকালের সোনা রোদ ঝরে পড়ছে শ্রমিকের কুঁড়ে ঘরে। কাজে বের হবার আগে দৈনিক মাথাভাঙ্গায় ‘দেশব্যাপী ৪৮ ঘন্টার অবরোধ ‘ –শিরোনাম পড়ে শ্রমিকের কপালে চিন্তার ভাঁজ । অমনি ৮ বছরের শিশুটি দৌড়ে এসে বলে,বাবা,বাবা, এই দেখ, কী লিখেছে আহাদ আলী মোল্লা ?
:কী লিখেছে? দেখি, দেখি?
:লিখেছে—
‘দয়া করে হরতাল- অবরোধ বাদ দাও
পার যদি মানুষের পাতে দু’টো ভাত দাও।” মোটা ফ্রেমের চশমাটা খুলতে খুলতে বাবা বলে, হ্যাঁ,খুকি, মোল্লা ঠিকই বলেছে।কিন্ত…
: কিন্তু, কী বাবা?
: দ্যাখ,খুকি, কে শোনে, কার কথা!
: তাহলে কি তোমার আজ কাজে যাওয়া হবে না,বাবা?
: নাহ্!
: তাহলে, আমরা খাব কী?
: এ এক প্রশ্ন বটে ¡ তাই তো আহাদ আলী মোল্লা বলছে :
“গরিবের ঘর খালি চাল ডাল খুঁজছে
যার পেটে খিদে আছে,সেই জ্বালা বুঝছে ।
আকাশের তলে কেন হরতাল আসবে
গরীবের-চোখ কেন অশ্রুতে ভাসবে?”
মোড়ের মাথায় চা- স্টলে: সকাল থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। তবুও মোড়ের মাথায় চায়ের দোকানে জমেছে কেউ কেউ। দৈনিক মাথাভাঙ্গা সংখ্যাটি এক হাত থেকে ঘুরছে আরেক হাতে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে এক যুবক পড়ে চলেছে—-
চোর ডাকাতের জ্বালায় মলাম
হচ্ছে সদায় চুরি
সবখানে আজ দেখছি সবাই
চোরের বাহাদুরি।
পাশ থেকে এক মুরুব্বী বলে উঠলো,বাপু, কোথায় চুরি হলো গো?
: দর্শনায় ইজি বাইক চোর চক্রের দুই সদস্য গ্রেফতার হয়েছে, চাচা।
:ও হ্যাঁ,তা- ই তো পত্রিকায় পড়লাম।
: হ্যাঁ, চাচা। ওই খবর নিয়েই তো আহাদ আলী মোল্লা টিপ্পনী বানিয়েছে।
: তা, ছড়ায় ছড়ায় বেশ ভালোই তো লিখেছে। তা,বাপু,ওই টুকুই শেষ, না আরও আছে?
: আছে….
‘আজকে চোর, কালকে ডাকাত
পরশু করে ছিনতাই,
কখন, কোথায় কী হয়ে যায়
আছি সবাই চিন্তায়…’
: তা,বাপু, আহাদ আলী কিন্তু ঠিকই বলেছে,তাই না?
: হ্যাঁ, চাচা।
জনতার ভীড়ে : উৎসুক জনতার ভীড়। সবার চোখ লোকটির দিকে। জানা গেল ,লোকটির গায়ে পুলিশের ড্রেস, অথচ তিনি আসল পুলিশ না,নকল পুলিশ। পরদিন ঘটনাটি পত্রিকার শিরোনাম হয় —‘ আলমডাঙ্গায় আসল পুলিশের কাছে নকল পুলিশ গ্রেফতার’ ।এদিকে একই দিনে পত্রিকার প্রথম পাতার বামদিকে শোভা পেল আহাদ আলী মোল্লার টিপ্পনী —
এই পুলিশের মধ্যে মিশে
আছে নকল পুলিশ,
ওরাও পুলিশ দেয় পরিচয়।
এই কথা ক্যান ভুলিস?’
সময়ের চাহিদা মেনে টিপ্পনীগুলো রচিত বলে জনতার কণ্ঠে এগুলো স্থান করে নেয়। ক্ষমতার পালাবদল প্রেক্ষিতে তাঁর রচিত পঙতি চলে আসে মানুষের কণ্ঠে —-
যেই গদি যায় উল্টে কারোর
অমনি বদল সুর–
বসত ভিটায় হামলা আগুন
বীভৎস ভাঙচুর।
আহাদ আলী মোল্লার কিছু টিপ্পনী আছে যার আবেদন সাময়িক।আবার এমন কিছু আছে যেগুলোর আবেদন চিরকালীন।তিনি ‘কথা’ শিরোনামের টিপ্পনীতে চিরন্তন বাকসংযমের ছবক দেন এভাবে :
কথায় যেমন মধু থাকে
কথায় থাকে বিষ,
কথা নিয়ে যত শয়তানি
করে যে ইবলিশ।
শিক্ষার্থীদের চোখে : আহাদ আলী মোল্লার একটা শব্দ- স্বকীয়তা আছে। সেই সাথে আছে প্রবল সেন্স অব হিউমার। এগুলোই বোধহয় শিক্ষার্থীদের টানে।একদিন দেখলাম কিছু শিক্ষার্থী শিক্ষা নিয়ে তার টিপ্পনী মজা করে পড়ছে :
মাথায় আমার বুদ্ধি অনেক
দিচ্ছে গুঁতো কিল
সকাল বিকাল বুদ্ধি করে
মগজে কিলবিল।
সবাই জানেন মাথায় আমার
জ্ঞান গরিমা অতি,
ইচ্ছে হলেই বাতিল করি
পরীক্ষা পদ্ধতি।
এই বেলা এক চিন্তা আসে
আরেক বেলা বাদ
দেশের তাবৎ আবর আমায়
ডাকে বড় ওস্তাদ।
সৃজনশীলের ভূত তাড়ালাম
আসছে এবার কী?
শিক্ষা নিয়ে নতুন কিছু
রোজ রোজই ভাবছি।

সুত্র: দৈনিক মাথাভাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা
আহাদ আলী মোল্লা প্রতিনিয়ত চলমান এই জীবনকে দেখছেন। তাই তাঁর টিপ্পনীতে সমাজ – রাষ্ট্রের চলমান ঘটনার উত্তাপ উঠে আসতে দেখি। বিশেষ করে সমাজ ও রাষ্ট্রের অসঙ্গতিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দেন এই কবি ও ছড়াকার। সাহিত্যে নির্মল আনন্দ আর নিগূঢ় বাস্তবতার সহাবস্থান রক্ষা নিতান্তই কঠিন ।অথচ তিনি এই কঠিন কাজটি সহজেই করেন টিপ্পনীর ছন্দে। সাম্প্রতিক সময়ে তার উচ্চারণ :
আপনি হঠাৎ দেশ থেকে হন পিড়িক
লাগলো থানায় মামলা করার হিড়িক
পালের গোদা চামচা ক্যাডার
যাচ্ছে না কেউ বাদ ;
দেখছি এখন অনেক নেতার
জীবনই বরবাদ ।
মাদক ব্যবসা, সিন্ডিকেট, প্রশ্ন ফাঁস, প্রতারণা, নেতার ছড়া,পাগল ক্রেতা,সোনার দাম,নিয়ম,গাঁজা খোর, গড ফাদারদের জন্য,সান্টিং, হরতাল – অবরোধ, ফেনসিডিলের বস্তা,নির্বাচন, কিশোর গ্যাং,নাটের গুরু,শিক্ষা নিয়ে,বাজার মানে,বখাটে,নৈরাজ্য,গ্যাস, ঘুষ, নেশাখোর প্রভৃতি শিরোনামে টিপ্পনী রচনা আহাদ আলী মোল্লার সমাজ ও দেশজ ভাবনার পরিচয় বহন করে। বিষয় ভিন্ন, কিন্ত প্রকাশ – স্টাইল আহাদীয় ;একটা হিউমার বা স্যাটায়ার লুকিয়ে আছে তাতে। এগুলো পাঠে মনে হয়, আহাদ আলী মোল্লা যুগের ভাষা বোঝেন, চাহিদা অনুযায়ী যোগান দিতেও জানেন । তাঁর এই কাজে অন্যের অনুকরণ – ছাপ দেখতে পাই না। বলা যায়, নির্মাণ শৈলীটা একেবারেই তাঁর নিজস্ব।একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে ‘ ত্রাণ’ নামক টিপ্পনীতে তিনি লেখেন :
উঠোন- ভিটেই পানির জোয়ার
আতঙ্ক আর ভয়
দেশজুড়ে আজ নামলো বুঝি
এক মহাবিপর্যয়।
আজকে সময় যাচ্ছে কঠিন
ত্রাণ পাঠানো লাগবে
বানভাসিদের পাশে আছি
অন্যরা সব জাগবে।

সুত্র: দৈনিক মাথাভাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা
আহাদ আলীর টিপ্পনীগুলো সুখপাঠ্য এবং সহজেই পাঠকের ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। সমাজ জীবনে টিপ্পনীগুলোর একটা প্রভাব এই যে, পাঠ শেষে পাঠকের মনে একটা স্পন্দন চলতে থাকে। শেষতক একটা ইতিবাচক ধাক্কা দেয়। টিপ্পনীগুলোতে ছন্দ- বন্ধনে আটকে পড়ে একটা কাল । আটকা পড়ে কালের মানুষ, কালের সংস্কৃতি আর তথাকথিত সভ্য মানুষের যত অনাচার । পাঠক এইসব হয় ভালোবাসে, নয় তো ঘৃনা করে। বিচার – বিশ্লেষণ করে পাঠক নির্বাচন করে সত্যে উদ্ভাসিত সমুজ্জ্বল পথ। নির্মল আনন্দের হাত ধরে পাঠককে সত্যের দ্বারে পৌঁছে দেওয়া — এই হলো টিপ্পনী নির্মাণের স্বার্থকতা । এটা একজন সাহিত্যিকের কাজ আর এই কাজটিই তিনি করেন এক অসাধারণ দক্ষতায়।
বর্তমানে এগুলো ছড়াসাহিত্য,কিন্তু দূর ভবিষ্যতে এগুলো ইতিহাসের দলিল হয়ে থাকবে এতে সন্দেহ নেই। সফেদ কাজীর কুৎসিত স্বার্থপরতা কালির অক্ষরে মুদ্রিত থাকবে এভাবে :
উনি এমন কাজি;
এক পিড়িতেই বিয়ে- তালাক
সব কাজে হন রাজি।
আবার শতবর্ষ পরে কোন পাঠকের চোখে পড়ে যাবে নেশার জগতের মানুষের ভ্রষ্ট চিত্র :
গাঁজা খেয়ে পড়ে থাকে ওরা
রাজা- রাজা ভাব ভঙ্গি
মাদকের সাথে যত খাদকেরা
রাতারাতি হয় সঙ্গী
টিপ্পনীর পঙতিগুলোর সাহিত্য মূল্য অস্বীকার করা চলে না। বিশেষ করে আহাদ আলী মোল্লার ধ্বনি ও ছন্দ নিয়ে খেলাটা আমাদের মনোযোগ আকৃষ্ট করে। অন্তমিলের খেলাটা সহজেই পারেন তিনি। টিপ্পনীর শরীরে সহজেই ছড়িয়ে দিতে পারেন জাদুর আবেশ।কবিতা বা ছড়ায় কবি আপন মনের মাধুরী মিশাতে পারেন। কিন্তু নিউজ রিপোর্ট নিয়ে ছড়া নির্মানে সেই স্বাধীনতা নেই।অথচ কী করে যে পারেন তিনি— এ এক বিষ্ময় ! প্রিয় আহাদ আলী মোল্লা,’ আপনার প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের অন্ত নাই।’
বাংলাবাঁক 










