আবু আফজাল সালেহ
লোকজ ও দেশজ উপাদানে নির্মিত চিত্রকল্পকে আধুনিক রুচিতে রূপদান করতে সক্ষম হয়েছেন কবি আল মাহমুদ (জন্ম: ১১ জুলাই ১৯৩৬—মৃত্যু: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)। তিনি আমাদেরকে তাঁর নিপুণ কবিতা নির্মাণ-বিনির্মাণের মাধ্যমে চিত্রকল্পের এক অপূর্ব যাত্রার সড়কপথে তুলে দিয়েছেন। পাঠকরা সময়ের সাথে সাথে তার জাদু দেখেছেন এবং বারবার মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছেন। ফলে, আধুনিক বাংলা কবিতার সামগ্রিক বিবেচনায় শীর্ষস্থানীদের একজন হতে পেরেছেন তিনি। কবিতায় তাঁর স্টাইল, ভাষা ও চিত্রকল্পের নতুন ব্যবহার অন্যান্য কবি থেকে আলাদা করেছে।
বাংলা কবিতায় আল মাহমুদের প্রবেশ মসৃণ ছিল না। তিনি ১৯৫৪ সালে যৌবনে ঢাকায় এসেছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কাব্যজগতে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়নি। প্রায় এক দশক পরে তিনি পাঠক এবং সহকবিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি স্বতন্ত্র মেজাজ এবং উচ্চারণসহ একজন কবি হয়ে ওঠেন। আল মাহমুদ তাঁর প্রথম কাব্য সংকলন ‘লোক লোকান্তর’ দিয়ে ঢাকা-ভিত্তিক বাংলা কবিতায় একটি স্বতন্ত্র স্থান তৈরি করতে পেরেছিলেন। তিনি বাংলা কবিতায় ধাক্কার সম্ভাবনা নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন বলে পরে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি কিছু উপাদান/স্টাইল ব্যবহার করেছেন যা বাংলা কবিতায় আগে দেখা যায়নি। আল মাহমুদ একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং বেশ কিছু সাহিত্য ও প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। শেষজীবনে ধর্মের দিকে প্রবলভাবে ঝুকে পড়েন। ফলে শেষের দিকের সাহিত্যে ‘জাজমেন্টাল’ হিসাবে পিছিয়ে পড়েন বলে মনে করি। তাঁর কবিতায় আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়গুলোকেও তুলে ধরেছেন। তিনি নিয়মিত চতুষ্কোণ, চতুরঙ্গ, সমকাল, কৃত্তিবাস প্রভৃতি পত্রিকায় লিখতেন। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় তাঁর বেশ কিছু কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। এ বিষয়টি সমসাময়িক সাহিত্যিকদের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল।
অনেকে মনে করেন যে, জসীমউদদীন ও জীবনানন্দ দাশের শৈলী অনুসরণ করে আল মাহমুদ কবিতার জগতে প্রবেশ করেন। লোকজ উপাদানের কথা স্মরণ রেখে হয়তো এমন কথা বলা হয়ে থাকে। ফলে, কথাটির আংশিক সত্যতা থাকতে পারে। তবে উপমা-চিত্রকল্প-অলংকার-রস-ছন্দ ইত্যাদিতে দক্ষ প্রয়োগ এবং প্রয়োগে যথার্থতার মান বিবেচনায় তিনি একটি ভিন্নস্বর তৈরি করতে পেরেছেন। জসীম উদদীন তাঁর কবিতায় গ্রামীণ বাংলার চিত্র অনন্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর স্টাইল আলাদা। আবার জীবনানন্দ বাংলাসাহিত্যের বিবেচনায় সর্বাধিক চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন। কবিতায় তাকে ছাড়িয়ে যাওয়া খুব কষ্টকর হবে। এক্ষেত্রে তাঁর ধরনও আলাদা প্রকৃতির। কৃষিভিত্তিক বাঙালি সমাজের মানুষ ও জীবনপযাত্রার বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। তাদের দুঃখ-কষ্ট, দারির্দ্য, ক্ষুধা-ভালোবাসা তাঁর কবিতায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এসব বৈষিষ্ট্য ধরে রেখে তিনি আখ্যানমূলক কবিতাও লিখেছেন। আল মাহমুদ কিন্তু আখ্যানকাব্য লিখেননি। জীবনানন্দ দাশের ক্ষেত্রে আবার আলাদা কথা। গ্রামবাংলার প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য চিত্রিত করেছেন করেছেন তিনি। একারণে তাকে প্রকৃতির কবি বা নির্জনতার কবিও বলা হয়। আল মাহমুদের কবিতার উপাদান গ্রামবাংলার, আশে-পাশের। কিন্তু ধর্মীয় মিথ, শব্দের দ্যোতনা, উন্নত মর্জি ইত্যাদির সংমিশ্রণে আধুনিক রুচির স্বাদ দিয়েছেন—যেখানে নাগরিক চেতনার কাছাকাছিও গেছে।
আল মাহমুদের গ্রামীণ উপভাষার উদার ব্যবহার অনেক সাহিত্যিকদের বিরক্ত করেছিল বলে দেখা যায়। কিন্তু, স্থানীয় ভাষা/ কথোপকথন ব্যবহার করে অনেক কবিতায় গতিশীলতা এনেছেন। এ প্রবণতা শব্দগুলিকে চালিত করার মাধ্যমে কাব্যিক আবেদনকে উন্নত করেছে। প্রাসঙ্গিক বিষয়ের সূচনা, এবং কবিতায় স্পষ্টভাষী দৃষ্টিভঙ্গি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তাকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে গেছে, আন্তর্জাতিক পাঠক ও বোদ্ধাদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে। জসিমউদদীন প্রথম বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের ছোটখাটো বিবরণ চিত্রিত করতে পারদর্শী ছিলেন। তবে আল মাহমুদ দেখিয়েছিলেন যে গ্রাম এবং এর বাসিন্দাদের সাথে আচরণগত চিত্র এবং তার শক্তি। আধুনিক প্রকাশশৈলী মাহমুদকে জসীমউদদীন বা অন্য কারও থেকে আলাদা করেছিল। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নারী, প্রকৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে তার গভীর অনুভূতির প্রকাশ ছিল অনেক গভীরে, অনেক সুক্ষ্ণ ছিল সে অনুভূতি। ফলে সামগ্রিকভাবে কাব্যজগতে একটি নতুন ভাষা গড়ে তুলতে পেরেছিলেন তিনি। এই কৃতিত্ব আল মাহমুদকে বাঁচিয়ে রেখেছে এবং বাঁচিয়ে রাখবে ভবিষ্যতে। তাঁর কবিতার নতুন চিত্রকল্প বা ভাষা এতটা কঠিন (কিন্তু বাঙালির কাছের) যে তাঁর কবিতার সঠিক অনুবাদ করা কঠিন। বিভিন্ন ধর্মীয় মিথ, গ্রামবাংলার উপকথা, ভাষা ইত্যাদি অনুবাদককে দক্ষ ও অভিজ্ঞ হতে হবে। তাঁর সমসাময়িক প্রধান দুই কবি শামসুর রাহমান ও শহীদ কাদেরী ছিলেন সম্পূর্ণ শহুরে, নাগরিক কবি ছিলেন তারা। তাদের কবিতাগুলি শহুরে বাস্তবতায়। অপরদিকে কবিতা লেখার বয়স যতই বাড়তে থাকে, আল মাহমুদের কবিতায় গ্রামীণ ও লোকজ শিকড় পরিব্যাপ্ত হতে থাকে। তিনি গ্রামীণ ল্যান্ডস্কেপের সাথে তার সুক্ষ্ণ এবং নিপুণ বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ করেছেন। তাঁর প্রথম তিনটি কাব্যে—লোকান্তর’ (১৯৬৩), ‘কালের কলস’ (১৯৬৬), এবং ‘সোনালি কাবিন’ (১৯৭৩)—প্রেম, কাম ও নারীর সৌন্দর্যের উপস্থিতি এবং জুতসই প্রয়োগ পাঠককে মুগ্ধ করেছে, বিমোহিত করেছে। বিশেষকরে, ‘সোনালি কাবিন’ গ্রন্থের কবিতাগুলো (বলা চলে সনেটগুলো) তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসা ও সমীহ পেতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।
সমসাময়িক অন্য কবিদের থেকে শুরু থেকেই আল মাহমুদের কাব্যিক রূপ ও প্রকাশে ছিল ভিন্নতা। আল মাহমুদ সুন্দর কাব্যিক শৈলী উপহার দিয়েছিলেন। তিনি মাত্রাবৃত্ত এবং স্বরবৃত্ত ছন্দ বিশেষ পছন্দ ও লালন করেছিলেন। গীতিমূলক এবং রোমান্টিক অভিব্যক্তির জন্য স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দ আদর্শ বলে বিবেচিত হয়। অথচ আল মাহমুদ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহারে নান্দনিক শৈলীর জন্য সমস্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পেরেছেন। জনপ্রিয় জবি জীবনানন্দ দাশ বা মাহমুদের সমসাময়িক শক্তিমান কবি শামসুর রাহমান (সমসাময়িক অনেকে) অক্ষরবৃত্ত বেছে নিয়েছেন। শামসুর রাহমান অক্ষরবৃত্ত ছন্দে প্রেম-ভিত্তিক এবং সামাজিক-রাজনৈতিক কবিতা লিখেছেন। আল মাহমুদের মাত্রাবৃত্ত রোমান্সকে আলিঙ্গন করেছে। আমরা জানি অনুভূতি ও ভাবের গভীরতা আনতে হলে অক্ষরবৃত্তের বিকল্প ব্যবহার করা খুবই কঠিন। আল মাহমুদ কিন্তু সেটা করতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদের থেকে তার এ ফর্মের পার্থক্য তাকে আলাদা করেছে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে, অক্ষরবৃত্ত ছাড়াও কবিতার বক্তব্যের মেজাজে গভীরতা আনা সম্ভব। আল মাহমুদও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। কিন্তু তাঁর অভিব্যক্তি ছিল ভিন্ন। ১৯৬০-দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় লেখা আল মাহমুদের কবিতা পাঠকদের মনের গভীরে প্রবেশ করেছিল। কবিতার পরিপূর্ণ প্রকৃতির প্রতি তার ভালবাসা, সঠিক ফর্ম এবং উপযুক্ত বিষয়বস্তু নির্বাচন তাঁর কবিতার এ মর্যাদা দিয়েছিল বলে মনে করি।
সমসাময়িক বা একইধারার কবিদের থেকে আল মাহমুদের কবিতা আলাদা করা সহজ। লোকজ উপাদান ব্যবহার করে আধুনিক কবিতাশৈলী উপহার, চিত্রকল্প ও ভাষায় নতুনত্ব, উপযুক্ত শব্দ-উপমা (অথচ আগে কেউ ব্যবহার করেনি) নির্বাচন/ ব্যবহার ইত্যাদির কারণে তাঁর কবিতা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। আবার বিশ্বযুদ্ধোত্তর টালমাটাল অবস্থা, ভাষা-আন্দোলন-মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায় ইত্যাদিকে এড়িয়ে যাননি তিনি। সাহিত্যে সময়কে এড়িয়ে না গিয়ে তাকে ভাষার ফ্রেমে আটকিয়ে রেখে পরবর্তী প্রজম্মের সঙ্গে সাঁকো নির্মাণ করে দেওয়ায় প্রকৃত সাহিত্যিকের কাজ। এ-গুণ সাহিত্যিককে ভবিষ্যতে শক্তকরে বাঁচিয়ে রাখে। আল মাহমুদ এক্ষেত্রেও সফল।
কৃতজ্ঞতাঃ লেখাটি দৈনিক ‘যায় যায় দিন’ এ প্রকাশিত। কবির ছবি ডেইলি স্টার থেকে নেওয়া।
বাংলাবাঁক 










