আবু আফজাল সালেহ
‘কৃষ্ণচূড়ার সাথে রঙ্গন অশোকে, বুলাল রঙের মোহন তুলিকা লো’ অথবা ‘হলুদ গাঁদার ফুল রাঙা পলাশ ফুল,/ এনে দে এনে দে নইলে বাঁধবো না বাঁধবো না চুল / কিনে দে হাট থেকে, এনে দে মাঠ থেকে/ বাবলা ফুল আমের মুকুল।’ ফুল সাজিয়ে কী সুন্দর গান! কাজী নজরুল ইসলামের এরকম অসংখ্য গানে নাম জানা বা না-জানা ফুল-ফলে বা প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান নিয়ে গান রচিত করেছেন। আজ আলোচনা করব নজরুলের গানে বিভিন্ন ফুলের প্রসঙ্গ নিয়ে।
‘হল মাদার আশোক ঘাল
রঙন তো নাজেহাল
লালে লাল ডালে ডাল
পলাশ শিমুল’–অশোক-শিমুল ফুল নিয়ে কী সুন্দর চিত্র, কী সুন্দর চিত্রায়ণ, কী সুন্দর দৃশ্যকল্প! নজরুলের গানে ফুলের প্রসঙ্গ বেশি এসেছে। নজরুল গানে বলেছেন: ‘বুলবুলি নীরব নার্গিস-বনে/ঝরা বন–গোলাপের বিলাপ শোনে…’। নজরুলের ‘নার্গিস’ ফুলের গান এ ফুলকে বিখ্যাত করেছে বাঙালির। ‘নার্গিস’ কখনো প্রিয়তমা, কখনো ফুল হিসেবে এসেছে নজরুলের গানে। মোঘলদের হাত-ধরে আসা নার্গিস পৃথিবীজুড়ে ‘নার্সিসাস’ নামেই বেশি পরিচিত। নজরুল সংগীতে যে সব ফুলের নাম ব্যবহার করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফুল; বনদেবী, গিরিমল্লিকা, দোলনচাঁপা, শিউলি ফুল, সজনে ফুল, পদ্ম ফুল, গোলাপ ফুল, মালতী, সন্ধ্যামালতী, সন্ধ্যামণি, কদম ফুল, পিয়াল ফুল, টগর ফুল, হাসনাহেনা ফুল, জুঁই ফুল, চাঁপা ফুল, বেলি, মল্লিকা—আরও কত ফুলের নাম বা বর্ণনা পাওয়া কাজী নজরুল ইসলামের গানে। তাঁর গানে নানাভাবে নানান ফুলের প্রসঙ্গ এসেছে–কখনও উপমায়, কখনও সরাসরি। বিভিন্ন ফুলের নাম এসেছে এমন কিছু নজরুলের গান থেখে খণ্ডাংশ করে উপস্থাপন করলাম :
(১) ‘বাবলা ফুলের নাকছাবি তার
গায়ে শাড়ি নীল অপরাজিতার’
(২) ‘কে দিল খোঁপাতে ধুতুরা ফুল লো।
খোঁপা খুলে কেশ হ’ল বাউল লো।‘
(৩) ‘সে কাঁদান শুনি হের নামিল নভে বাদল,
এলো পাতার বাতায়নে যুঁই চামেলি কামিনি।’
(৪) রাগ প্রধান একটি গান–
‘আজকে দোলের হিন্দোলায়
আয়রে তোরা কে দিবি দোল
ডাক দিয়ে যায় দ্বারে ঐ
হেনার কুঁড়ি আমের বোল’
(৫) নিচে উল্লিখিত নজরুলের একটি জনপ্রিয় গানের অংশবিশেষ। এই গানটিতে মোট এগারোটি ফুলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বৈচিত্র্যময় বিন্যাস স্রোতাকে আকৃষ্ট করে।
‘কে নিবি ফুল, কে নিবি ফুল,
টগর যুঁথী বেলা মালতী চাঁপা গোলাপ বকুল,
নার্গিস ইরানী গুল
…এ ফুল ঝামেলা, চামেলী পারুল’
(৬) আর একটি জনপ্রিয় গানের কথা উল্লেখ না-করলেই নয়। যেখানে আমাদের আশেপাশের তেরোটি ফুলের প্রসঙ্গ এসেছে।
‘বেল ফুল এনে দাও চাইনা বকুল।
চাইনা হেনা আনো আমের মুকুল /
গোলাপ রঙ গরবী, এনে দাও করবী,
চাইতে যুঁথি আনো টগর কি ভুল /
কি হবে কেয়া দেয়া নেই গগনে
আনো সন্ধ্যা–মালতী গোধূলি লগনে /
গিরি মল্লিকা কই? চামেলী পেয়েছ সই?
চাঁপা এনে দাও, নয় বাধব না চুল’
(৭) ‘’বউ কথা কও, বউ কথা কও, কও কথা অভিমানীনি’’ গানে বিভিন্ন ফুলের নাম ব্যবহার করেছেন নজরুর গানটিতে। গ্রামের বউ বা নতুন বউ যেন ‘বউ-কথা পাখি’—কৃষ্ণচূড়ার আগুনে বসে গান গায়, বলে ‘‘বউ কথা কউ’’ :
‘আগুন রাঙা ফুলে ফাগুন লালে লাল,
কৃষ্ণ চূড়ার পাশে রঙন অশোক গালে গাল।‘
(৮) আর একটি ফুলময় গান :
‘চৈতালি–চাঁপা কয় মালতী শোন
শুনেছিস বুঝি মধুকর গুঞ্জন
তাই বুঝি এত মধু সুরভী উথলে মধু মালতী বনে’।
(৯) ‘নাই পারিলে নোটন খোঁপায় ঝুমকো জবার ফুল
এমনি এস লুটিয়ে পিঠে আকুল এলোচুল’।
(১০) ‘মহুয়া ফুলের মদির বাসে
…মাতাল পাপিয়া পিয়া পিয়া ডাকে
দোলন–চাঁপায় ঝুলন শাখে’।
(১১) নেবু ফুলকে দিয়ে একটি মিষ্টি গান—
‘পলাশ ফুলের মউ পিয়ে ঐ বউ কথা কও উঠল ডেকে,
শিষ দিয়ে যায় উদাস হাওয়া নেবু ফুলের আতর মেখে’।
‘কদমফুলের রত্নবাজু বকুল ফুলের চুড়ি/ হাতে শোভে কেয়ার কাঁকন কুন্দ বেলের চুড়ি’, ‘লাজুক মেয়ে পল্লীবধু জল নিতে যায় একলাটি/ করবী নেয় কবরীতে বেনীর শেষে দোপাটি’, ‘চম্পা পারুল যুঁথী টগর চামেলা/ আর সই সইতে নারি ফুল ঝামেলা’–দোপাটি, করবী নিয়ে গ্রামের বধুর কী অপরূপ চিত্রায়ণ! কিছু ফুল নিয়ে নজরুলের ভাবনা ছিল অনবদ্য। একটি গানে অপরিচিত এলাচী ফুলকে উপস্থাপন করেছেন—‘দূর দ্বীপ-বাসিনী, চিনি গো তোমারে চিনি, দারুচিনির দেশের তুমি বিদেশিনী/…তব কবরী মূলে, নব এলাচীর ফুল দুলে কুসুম বিলাসিনী’। রঙন ও অশোকের বর্ণাঢ্য রঙের কথা পাওয়া যাবে এমন দুটি গান :
(ক) ‘অশোক ফুটেছে যেন পুঞ্জে পুঞ্জে
রং পিয়াসী মন-ভ্রমর গুঞ্জে,
ঢালো আরো ঢালো রং প্রেম-যমুনাতে।’
(খ) কৃষ্ণচূড়ার সাথে রঙ্গন অশোকে
বুলাল রঙের মোহন তুলিকা লো..।
‘‘শাল-পিয়ালের বনে” গীতি নাট্যের গানে ঝিঙে ফুল নিয়ে বলেছেন: ‘হলুদ বরণ ঝিঙে ফুলের কাছে/ দেখনা কেমন দু’টি ফিঙে নাচে’। এছাড়া ‘অকারণ ভাষা তার ঝর ঝর ঝরে/মুহু মুহু কুহু কুহু পিয়া পিয়া স্বরে,/ পলাশ বকুলে অশোক শিমুলে’, ‘প্রিয় এমন রাত যেন যায় না বৃথাই/ পরি চাঁপা ফুলের শাড়ি খয়েরী টিপ’, ‘রেশমি চুড়ির তালে কৃষ্ণচূড়ার ডালে/ পিউ কাঁহা পিউ কাঁহা ডেকে ওঠে পাপিয়া (গৌড়সারং কাওয়ালি)’, ‘কদম তমাল তরু দোলে,/ নাচে ধেনু বেণুরবে ময়ূর-ময়ূরী সবে (কানাড়া মিশ্র কাহারবা)’ ইত্যাদি চরণে ফুলের বহুমাত্রিক ব্যবহার করেছেন। চিত্রকল্প বা চিত্রগুলোকে জীবন্ত করেছেন অপূর্ব কারিশমায়। তিনি ফুলকে উপস্থাপন করেছেন বহুমাত্রিকতায়। তিনি ফুলকে ভালোবেসেছেন গভীরভাবে; প্রত্যক্ষ করেছেন নিবিড়ভাবে। নজরুল তাঁর গানে তুলে এনেছেন আমাদের চারপাশের সমস্ত চেনা ফুল, যেসব ফুলের সঙ্গে আমাদের প্রায় প্রতিদিনই দেখা হয়। নজরুলে এ গানের অংশ দিয়েই শেষ করি ‘বনে মোর ফুটেছে হেনা চামেলি যুথী বেলি’।
বাংলাবাঁক 










