ঢাকা ০৫:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবারের সাময়িকী কালের খেয়া, দৈনিক সমকাল থেকে

বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় প্রতীক

  • বাংলাবাঁক
  • আপডেট : ১২:২৫:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৪
  • 162



আবু আফজাল সালেহ



বোদলেয়ারের কাছে প্রকৃতি হচ্ছে প্রতীকের ভান্ডার। প্রতীক বিমূর্ত বোধকে ইন্দ্রিয়গত, হৃদয়গত করে তোলে। সব কবিই এ কথা স্বীকার করে কবিতা লিখেছেন। প্রতীকী শব্দ বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা পায়, এর দ্যোতনা-গুণ বৃদ্ধি পায়, এবং রহস্যের আবির্ভাব ঘটে। কবি বুদ্ধদেব বসুর (৩০ নভেম্বর ১৯০৮-১৮ মার্চ ১৯৭৪) ব্যবহার করা কতিপয় প্রতীক ও এর বহুবিধ অর্থ সন্ধানই এ লেখার মূল উপজীব্য।

বীজ, বিদ্যুৎ, চাঁদ, জোয়ার
বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় বীজ এসেছে বেশ কিছু কবিতায়– প্রতীকী অর্থে। তাঁর কবিতায় বীজ নানা ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ। মায়াবী টেবিল, বৃষ্টি, স্বর্গবীজ, আবার দেখা, শীতরাত্রির প্রার্থনা, কবি: তার ক্ষমতার প্রতি, নেশা, প্রভৃতি কবিতায় বীজ নানারকম ব্যবহার হয়েছে। সৃষ্টি সম্ভাবনা, অন্ধকারের গোপনে সৃষ্টি হয় অরণ্য, ফসলের মাঠ, আলোর বা আশাবাদের প্রতীক। আগুন, বিদ্যুৎ, চাঁদ, জ্যোৎস্না, পদ্ম, সাপ, অন্ধকার প্রভৃতি প্রতীক ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধি পেয়েছে। দ্রৌপদীর শাড়ির নাম-কবিতাও প্রতীকী উচ্চারণে সমৃদ্ধ।
১.
জ্বলছে নতুন চাঁদ, ঝিলমিল ক’রে ওঠে পাৎলা কাপড়,
হাওয়ায় হঠাৎ যায় স’রে
[মেয়েরা/কঙ্কাবতী]
২.
বুকের রেখায় চাঁদের কণা,
পূর্ণিমা-চাঁদ বুকের ’পরে।
[রূপরেখা]
৩.
চোখে তোমার হানা দেয় চাপা বিদ্যুৎ
[ভীরুতা/নতুন পাতা]
৪.
জ্বলবে আমার আগুন
তোমার জোয়ারে।
[একদিন: চিরদিন]
৫.
তারা!… তারা!…  স্বর্গবীজ! জ্যোতির জন্মের রতি!…
[স্বর্গবীজ/দ্রৌপদীর শাড়ি]

নিঃসঙ্গতার বোধ
তিরিশের কবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সমাজ-বিচ্ছিন্নতার মনোভঙ্গি। বুদ্ধদেব বসুর কবিতাতেও সঞ্চারিত হয়েছে এই বোধ।  আর তারপর আমাকে জন্তুর মতো খাঁচায় পুরল, কাঁচার মতো এই সংসারে (মরচে-পড়া পেরেকের গান), নিঃসঙ্গতা! জেনেছি তোমারই নাম শীত, গ্রীষ্ম, বসন্ত, বৎসর (ঋতুর উত্তরে), ভাঙল একে-একে, … রইলো হিম নিঃসঙ্গতা, আর অন্ধকার নিস্তাপ (শীতরাত্রির প্রার্থনা), বুদ্ধি কল্পনা বিস্ময় বাসনা … কিছু আমার নয়,/ আমি চির-বন্ধ্যা, চির-নিঃসঙ্গ (এভারেস্ট) ইত্যাদি চিত্রকল্প, ভাবনা, প্রকাশ নিঃসঙ্গের দাবিকে জোরালো করবে। কিছু কবিতাংশ তুলে ধরা যাক–
১.
বাইরে বরফের রাত্রি। ডাইনি-হাওয়ার কনকনে চাবুক
গালের মাংস ছিঁড়ে নেয়, চাঁদটাকে কাগজের মতো টুকরো করে
ছিটিয়ে দেয় কুয়াশার মধ্যে, উপড়ে আনে আকাশ, হিংসুক
হাতে ছড়িয়ে দেয় হিম, শাদা, নরম, নাচের মতো অক্ষরে,
পৃথিবীতে মৃত্যুর ছবি এঁকে যায়।
(শীতরাত্রির প্রার্থনা)
২.
পৃথিবীর জটিল জ্যামিতি
রেখা কোণ বাঁক বৃত্ত, চঞ্চল স্থাপত্যলীলা,
রঙের অসংখ্য সূক্ষ্ম শ্রুতি, নৃত্যশীল ছায়া, প্রতিচ্ছায়া
নিঃসঙ্গ, নির্ভেদ। নিসর্গ নিশ্চিহ্ন আজ,

বিচিত্রতা, এলো কাল রাহুরূপে
করাল বিশাল গ্রাসে
বিশ্বব্যাপী সমীকরণের
অবিচ্ছেদ ধূসরতা
(জলপাহাড়ে কুয়াশা/ দময়ন্তী)
৩.
আর পৃথিবী ঠুকরে খাচ্ছে আমার হৃৎপিণ্ড
(রুদ্রের আবির্ভাব)
৪.
ট্রাফিক, বিরাট, বিলোল, গর্জমান;
তীব্র চাকায় ফোটে হিংসুক ফেনা;
গরম গন্ধে নিশ্বাস ফ্যালে মুখে
অন্ধ দোতলা জন্তু।
(একটি অভিজ্ঞতা/ মরচে-পড়া পেরেকের গান)

বিচ্ছিন্নতা
বিচ্ছিন্নতা বোধে ভোগে কবি বুদ্ধদেব বসুর কাছে প্রকৃতিও যেন শূন্য-শূন্য লাগে, ধূসর লাগে বর্ণিলতাকেও। বিচ্ছিন্নতাবোধ ধেয়ে এলে সুন্দরী হেমন্তও যেন শূন্য তাঁর কাছে। কাছে টানে না। রুগ্‌ণ, পাণ্ডু, নিঃস্রোত, বিমর্ষ, শূন্য ইত্যাদি হেমন্তের প্রকৃতি। প্রতীকী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বললে অধিক সমীচীন বলে মনে করি। আসলে এগুলো বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে কবির মনে রূপান্তরিত হয়েছে শূন্যতাবোধ, অবহেলা, অসহায়ত্ব, ক্ষমতাহীন ইত্যাদি নেতিবাচক শব্দ। তাঁর কবিতার ভাষায় হেমন্তেও শূন্যতা, পাণ্ডু বলে মনে হয় …
ঘুমভরা, বিষণ্ণ নিশ্বাসে ভরা নীরক্ত কার্তিক।
নিশ্চল নিষ্প্রভ দিন, আকাশ পাণ্ডুর।
স্তম্ভিত নিঃস্রোত বেলা, পৃথিবীতে পীত পাণ্ডুরোগ।
…শহরে বিমর্ষ গোঙানি শুনি
কাক আর কুকুরের ডাক।
(কার্তিক/ দময়ন্তী)
প্রতিতুলনা, রূপক, প্রতীকী ইত্যাদির মাধ্যমে কবিতায় নান্দনিক সব চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন বুদ্ধদেব বসু। কখনও ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিমা অবলম্বন করেছেন। চিত্রকল্প নির্মাণে তিনি ইউরোপীয় শোণিত ঢুকিয়ে দিয়েছেন বাংলা কবিতার শরীরে। ফলে, তাঁর হাতে বাংলা কবিতা পৌঁছেছে নতুন এক মাত্রায়। নতুন স্বরে নির্মিত কাঠোমাতে শব্দ/ বাগশৈলী, ভাষা পাঠক-হৃদয়ে সহজেই স্থান করে নিয়েছে।

 

সৌজন্য: কালের খেয়া (শুক্রবারের সাহিত্য সাময়িকী), দৈনিক সমকাল।। ঢাকা, ০৮ ডিসেম্বর ২০২৩।।  

জনপ্রিয় পোস্ট

শুক্রবারের সাময়িকী কালের খেয়া, দৈনিক সমকাল থেকে

বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় প্রতীক

আপডেট : ১২:২৫:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৪



আবু আফজাল সালেহ



বোদলেয়ারের কাছে প্রকৃতি হচ্ছে প্রতীকের ভান্ডার। প্রতীক বিমূর্ত বোধকে ইন্দ্রিয়গত, হৃদয়গত করে তোলে। সব কবিই এ কথা স্বীকার করে কবিতা লিখেছেন। প্রতীকী শব্দ বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা পায়, এর দ্যোতনা-গুণ বৃদ্ধি পায়, এবং রহস্যের আবির্ভাব ঘটে। কবি বুদ্ধদেব বসুর (৩০ নভেম্বর ১৯০৮-১৮ মার্চ ১৯৭৪) ব্যবহার করা কতিপয় প্রতীক ও এর বহুবিধ অর্থ সন্ধানই এ লেখার মূল উপজীব্য।

বীজ, বিদ্যুৎ, চাঁদ, জোয়ার
বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় বীজ এসেছে বেশ কিছু কবিতায়– প্রতীকী অর্থে। তাঁর কবিতায় বীজ নানা ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ। মায়াবী টেবিল, বৃষ্টি, স্বর্গবীজ, আবার দেখা, শীতরাত্রির প্রার্থনা, কবি: তার ক্ষমতার প্রতি, নেশা, প্রভৃতি কবিতায় বীজ নানারকম ব্যবহার হয়েছে। সৃষ্টি সম্ভাবনা, অন্ধকারের গোপনে সৃষ্টি হয় অরণ্য, ফসলের মাঠ, আলোর বা আশাবাদের প্রতীক। আগুন, বিদ্যুৎ, চাঁদ, জ্যোৎস্না, পদ্ম, সাপ, অন্ধকার প্রভৃতি প্রতীক ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধি পেয়েছে। দ্রৌপদীর শাড়ির নাম-কবিতাও প্রতীকী উচ্চারণে সমৃদ্ধ।
১.
জ্বলছে নতুন চাঁদ, ঝিলমিল ক’রে ওঠে পাৎলা কাপড়,
হাওয়ায় হঠাৎ যায় স’রে
[মেয়েরা/কঙ্কাবতী]
২.
বুকের রেখায় চাঁদের কণা,
পূর্ণিমা-চাঁদ বুকের ’পরে।
[রূপরেখা]
৩.
চোখে তোমার হানা দেয় চাপা বিদ্যুৎ
[ভীরুতা/নতুন পাতা]
৪.
জ্বলবে আমার আগুন
তোমার জোয়ারে।
[একদিন: চিরদিন]
৫.
তারা!… তারা!…  স্বর্গবীজ! জ্যোতির জন্মের রতি!…
[স্বর্গবীজ/দ্রৌপদীর শাড়ি]

নিঃসঙ্গতার বোধ
তিরিশের কবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সমাজ-বিচ্ছিন্নতার মনোভঙ্গি। বুদ্ধদেব বসুর কবিতাতেও সঞ্চারিত হয়েছে এই বোধ।  আর তারপর আমাকে জন্তুর মতো খাঁচায় পুরল, কাঁচার মতো এই সংসারে (মরচে-পড়া পেরেকের গান), নিঃসঙ্গতা! জেনেছি তোমারই নাম শীত, গ্রীষ্ম, বসন্ত, বৎসর (ঋতুর উত্তরে), ভাঙল একে-একে, … রইলো হিম নিঃসঙ্গতা, আর অন্ধকার নিস্তাপ (শীতরাত্রির প্রার্থনা), বুদ্ধি কল্পনা বিস্ময় বাসনা … কিছু আমার নয়,/ আমি চির-বন্ধ্যা, চির-নিঃসঙ্গ (এভারেস্ট) ইত্যাদি চিত্রকল্প, ভাবনা, প্রকাশ নিঃসঙ্গের দাবিকে জোরালো করবে। কিছু কবিতাংশ তুলে ধরা যাক–
১.
বাইরে বরফের রাত্রি। ডাইনি-হাওয়ার কনকনে চাবুক
গালের মাংস ছিঁড়ে নেয়, চাঁদটাকে কাগজের মতো টুকরো করে
ছিটিয়ে দেয় কুয়াশার মধ্যে, উপড়ে আনে আকাশ, হিংসুক
হাতে ছড়িয়ে দেয় হিম, শাদা, নরম, নাচের মতো অক্ষরে,
পৃথিবীতে মৃত্যুর ছবি এঁকে যায়।
(শীতরাত্রির প্রার্থনা)
২.
পৃথিবীর জটিল জ্যামিতি
রেখা কোণ বাঁক বৃত্ত, চঞ্চল স্থাপত্যলীলা,
রঙের অসংখ্য সূক্ষ্ম শ্রুতি, নৃত্যশীল ছায়া, প্রতিচ্ছায়া
নিঃসঙ্গ, নির্ভেদ। নিসর্গ নিশ্চিহ্ন আজ,

বিচিত্রতা, এলো কাল রাহুরূপে
করাল বিশাল গ্রাসে
বিশ্বব্যাপী সমীকরণের
অবিচ্ছেদ ধূসরতা
(জলপাহাড়ে কুয়াশা/ দময়ন্তী)
৩.
আর পৃথিবী ঠুকরে খাচ্ছে আমার হৃৎপিণ্ড
(রুদ্রের আবির্ভাব)
৪.
ট্রাফিক, বিরাট, বিলোল, গর্জমান;
তীব্র চাকায় ফোটে হিংসুক ফেনা;
গরম গন্ধে নিশ্বাস ফ্যালে মুখে
অন্ধ দোতলা জন্তু।
(একটি অভিজ্ঞতা/ মরচে-পড়া পেরেকের গান)

বিচ্ছিন্নতা
বিচ্ছিন্নতা বোধে ভোগে কবি বুদ্ধদেব বসুর কাছে প্রকৃতিও যেন শূন্য-শূন্য লাগে, ধূসর লাগে বর্ণিলতাকেও। বিচ্ছিন্নতাবোধ ধেয়ে এলে সুন্দরী হেমন্তও যেন শূন্য তাঁর কাছে। কাছে টানে না। রুগ্‌ণ, পাণ্ডু, নিঃস্রোত, বিমর্ষ, শূন্য ইত্যাদি হেমন্তের প্রকৃতি। প্রতীকী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বললে অধিক সমীচীন বলে মনে করি। আসলে এগুলো বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে কবির মনে রূপান্তরিত হয়েছে শূন্যতাবোধ, অবহেলা, অসহায়ত্ব, ক্ষমতাহীন ইত্যাদি নেতিবাচক শব্দ। তাঁর কবিতার ভাষায় হেমন্তেও শূন্যতা, পাণ্ডু বলে মনে হয় …
ঘুমভরা, বিষণ্ণ নিশ্বাসে ভরা নীরক্ত কার্তিক।
নিশ্চল নিষ্প্রভ দিন, আকাশ পাণ্ডুর।
স্তম্ভিত নিঃস্রোত বেলা, পৃথিবীতে পীত পাণ্ডুরোগ।
…শহরে বিমর্ষ গোঙানি শুনি
কাক আর কুকুরের ডাক।
(কার্তিক/ দময়ন্তী)
প্রতিতুলনা, রূপক, প্রতীকী ইত্যাদির মাধ্যমে কবিতায় নান্দনিক সব চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন বুদ্ধদেব বসু। কখনও ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিমা অবলম্বন করেছেন। চিত্রকল্প নির্মাণে তিনি ইউরোপীয় শোণিত ঢুকিয়ে দিয়েছেন বাংলা কবিতার শরীরে। ফলে, তাঁর হাতে বাংলা কবিতা পৌঁছেছে নতুন এক মাত্রায়। নতুন স্বরে নির্মিত কাঠোমাতে শব্দ/ বাগশৈলী, ভাষা পাঠক-হৃদয়ে সহজেই স্থান করে নিয়েছে।

 

সৌজন্য: কালের খেয়া (শুক্রবারের সাহিত্য সাময়িকী), দৈনিক সমকাল।। ঢাকা, ০৮ ডিসেম্বর ২০২৩।।