ঢাকা ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
কবিতার নিবিড়পাঠ

হাশিম কিয়ামের ‘মহানরক’ : তিস্তার পাড়ে ফসলের মধুর আদর নেই

  • বাংলাবাঁক
  • আপডেট : ০৯:৩৩:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ অক্টোবর ২০২৪
  • 261


আবু আফজাল সালেহ



কবি হাশিম কিয়াম। বর্তমানের আলোচিত কবিদের একজন। তাঁর ”মহানরক” কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে বেহুলা বাংলা থেকে, ডিসেম্বর ২০২০ সালে। ২০ টি কবিতা নিয়ে এ কাব্যগ্রন্থ। এ বইতে দুটি দীর্ঘ কবিতা আছে। ‘আমি একদিন সত্যিকারের আমি হবো’ এবং ‘মহানরক’। ‘মহানরক’ কবিতাটি অতিদীর্ঘই বলা যায়। ৩০০ পঙক্তির কবিতা। আমার আলোচনার বিষয় এ কবিতার মানস, চিত্রকল্প, অলংকার প্রভৃতি নিয়ে।

আলোচিত ‘মহানরক’ কবিতায় কাক, হুক্কাহুয়া নেতিবাচক হিসাবে প্রতীকী হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। ‘শকুনের নখ’, নেকড়ে ভয়ঙ্কর ও হিংস্রতার প্রতীক। বর্তমান সমাজের সুবিধাভোগী, চাটুকর ও নেতবাচক শ্রেণির আচরণ ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এগুলো পাঠকের কাছে কবির ইপ্সিত বক্তব্য পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। সমাজের অন্ধকার ও খারাপ দিকগুলো উঠে এসেছে।  শুরুই হয়েছে পারস্পারিক অবিশ্বাস, অপ্রাপ্তি ও হতাশা নিয়েই—

‘ভরাবসন্তে না আছে কোথাও ফুলের সুবাস

না শোনা যায় কোকিলের মধুর কলরব

না ভোমরের মনভোলানো গুঞ্জন—সবখানে যতোসব

অচেনা—আজব—খুনরেজ কীটের আনাগোনা

পচা লাশের গন্ধভরা দক্ষিণের দমকা হাওয়া

বইছে বিরামহীন; কাকেরা কুঞ্জবনে কুহু কুহু করছে গান; শিয়ালের

হুক্কাহুয়া হাঁক

নেকড়ের ভয়াল গর্জনে মিশে গেছে—কানের পর্দাফাটানো

বীভৎস নিনাদে সাঙ্গ হয়ে যায় ঘুম ঘুম খেলা…’

[পঙক্তি নম্বর ১ থেকে ১০]

মানস ও বিষয়ের রূপান্তর শক্তি চমৎকার,অর্থবহ এবং সার্থক। সমাজের চিত্র যেমন আছে, তেমনই আছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের জানালা। যে জানালা দিয়ে ঢুকে যাওয়া যাবে জ্ঞ্যান ও আলোর গভীরে। সমাজের নানা অসঙ্গতিও উঠে এসেছে–কখনো শ্লেষ,  কখনো ব্যাঙ্গাত্মক। বিভিন্ন বিভাজন নীতির প্রয়োগ ও বাস্তবতা উঠে এসেছে এ কবিতায়। স্বার্থের দ্বন্দ্ব/সংঘাত নীতি প্রচলিত।

‘জননীর বিশাল শরীরের একদল সুচতুর ভিনদেশি
নির্দয়ভাবে মানচিত্র এঁকে গেছে
ঘরের মাঝে দেয়াল–হেঁশেলের মাঝে
পাঁচিল; শকুনের নখের মতো গোঁয়ারের পেন্সিলের
স্বেচ্ছাচারী আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত কোটি কোটি হৃদয়ের
আকাশফাটা আর্তনাদ এখনো কানে বাজে
দ্বিখণ্ডিত ভাষা কাটা কবুতরের মতো
ছটফট করছে’ [পঙক্তি ৮৩–৯০]

দৃশ্যকাব্য, কাব্যসৌন্দর্য, অলংকার ইত্যাদির প্রয়োগে কবি মুনশিগিরি দেখাতে পেরেছেন বলে মনে করি। তাঁর অনেক চিত্রকল্প নতুন স্বরে নতুন আলোর দিশা পাওয়া যায়। ‘ফ্যাসিবাদের কালো থাবার ছবি’  অথবা ‘নীল চোখ দুটি অস্তগামী সূর্যের মতো লাল হয়ে গেছে নতুন এক চিন্তা-চেতনার দিকে ঠেলে দেয়। ‘কাটা কবুতরের মতো’, ‘গোরের মতন গোপন ঘরে’, ‘আর্টিমিসের তৃষ্ণার্ত পূজাবেদি—ভূমধ্যসাগরের সমস্ত জল—অর্গোসের নীলাম্বর…’, ‘মরীচিকার মতো ছলনা’, ইত্যাদি অলংকার কিংবা চিত্রকল্প পাঠককে মুগ্ধ করছে। কিছুটা নতুনত্বও আছে। বাস্তবের ঘুব কাছাকাছি পাঠককে নিয়ে যেতে কবির এসব চিত্রকল্প সার্থক ও উপযোগী হয়েছে বলে আমার মনে হয়। বত্রিশ নম্বর বাড়ি, ট্রয়গামী জাহাজ, অর্গোসের নীলাম্বর, মন্দাকিনীর নির্মল জল ইত্যাদি শব্দশ্রেণি ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা বলে। ইতিহাস, ভূগোল, মিথ কিংবা ঐতিহ্যের বহুল ব্যবহার কবিতায় লক্ষ করা যায়। ‘ডোবার পাড়ে জিউসের ওক বৃক্ষের মতো একটি বুড়ো গাছ’ ইত্যাদির মতো পঙক্তি কিংবা হেক্যুবার, বেনাবতী, টিরিউসেরা কিংবা ফিলোমিলারার মতো শব্দ (মিথ কিংবা ইতিহাস) কবিতাটিকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। মিথ কিংবা ইতিহাস-ঐতিহ্যে আলোকিত কিছু কবিতাংশ—

ক। ‘নরকনদীতে বেহুলা একাকী ভেলায় এখনো ভেসে বেড়ায়

অপয়া ভিটেয় এখনো জয়গুন লড়াই করে

এখনো বর্বর টিরিউসেরা নির্মম তাণ্ডব চালায়

এখনো ফিলোমিলারা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে’

[পঙক্তি নম্বর ২৮৬ থেকে ২৮৯]

(পরপর নাসিক্য উচ্চারণের অনুপ্রাস প্রচেষ্টা ভালো লেগেছে)

খ। ‘নির্দয় খুনখারাবি আর জঘন্য গণহত্যায়

রাঙা ঐ ফোরাতের মিষ্টি পানি—কুরুক্ষেত্রে প্রতিটি

ধূলিকণা—রুয়ান্ডা—জালিয়ানওয়ালাবাগ—আর্মেনিয়া—বসনিয়া…

আদি সোদরের রাঙা খুনে একেবারে রাঙা হয়ে গেছে আদি জননীর আদি

পৃথিবীর খাঁটি মাটি; এখনো ঝরে তাজা খুন পৃথিবীর আনাচে কানাচে

মহাকালের পলিমাটির ভাঁজে ভাঁজে নিষ্ঠুর নির্মমতায়

কাতরাতে কাতরাতে ঘুমিয়ে আছে গাদাগাদা কঙ্কাল হয়ে’

[পঙক্তি নম্বর ৪৬ থেকে ৫২]

গ। ‘চকচকে সব প্রাসাদ যেন বুনো শুয়োরের বাথান
প্রাচুর্যের অলস মগজে সৃষ্টি নয়–ধ্বংসের নেশা খেলা করে
সহসা দাঁতাল শুয়োরের দল লোকালয়ে নির্মমভাবে
তাণ্ডব চালায়; আবালবৃদ্ধবনিতা –কোটি কোটি
বসন্তসৈনিক অবিরাম ছুটছে দিগ্বিদিক–
ছুটছে যতোসব ছায়াখাকি–
কখনো বা রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে–কখনো বা
চামড়ার ঝলসানো চড়া দুপুরে–তপ্ত বালুসাগরে; মরুসাইমুম
চাবুকের মতো আঘাত করছে’
[পঙক্তি নম্বর ১৩৪ থেকে ১৪২]

নারী নিয়ে রাজনীতি চলছে অনন্তকাল থেকে। নারীকে অবহেলায় রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা  চলমান। নারীকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূলস্রোতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা খুবই কম। অনেক নারী নিজেও পরাধীনতার আড়ালেই থাকতে চান। সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র নারীকে অগ্রসর হতে দেয় খুব কম। নারী নিয়ে আফসোসের এ কথা বললেন কবি হাশিম কিয়াম—

‘সিসিফাস উঁকি মারে বড়ো বড়ো হাঁড়িঠাসা হেঁশেলে

গৃহিণী মাতাগণ এক রাজ্যের নিঃসঙ্গতা বুকে নিয়ে

সারাটা জীবন নিরর্থক ব্যাগার খাটে—

অচল বাবারা জলভরা চোখে প্রাণের খোকার জমিতে

অর্তহীন জন খাটে…’

[পঙক্তি নম্বর ২১৯ থেকে ২২৩]

হাশিম কিয়ামের আলোচিত এ-কবিতায় গতি লক্ষ করা যায়। যা ফিউচারিস্টের কিছু লক্ষণ। শ্লেষ ও আইরনির ভাষা আরোও জোরালো হলে ভালো হতো। কিছু কমন চিত্র ও চিত্রকল্প এসেছে। সেগুলো এড়িয়ে নতুনত্ব আনতে পারলে আরও ভালো হতো বলে আমার মনে হয়। ‘রক্তরাঙা মরুফুল বিচারের আর্জি জানায়/বিচারহীন দরবারে’, ‘হায়না কবলিত এ-জপদে প্রায়ামদের এ-আশা পূরণ হবে না’, ‘অর্থহীন—অবাস্তব—অভিশপ্ত—যতোসব জীবনযাপন’ ইত্যাদির মতো বাক্যাংশ বা শব্দশ্রেণি সমাজের কালো দিকগুলির অবস্থান জানিয়ে দেয়। কবি তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। আলোচিত কবিতা থেকে কয়েক পঙক্তির উদাহরণ হিসাবে তুলেই দিই—

১। ‘এখন মানুষ প্রতিনিয়ত রূপান্তরিত হয়

সাদা কঙ্কালে; এখনো মানুষ শিরদাঁড়ায় বুনো অস্ত্রের দগদগে

ক্ষত বয়ে বেড়ায়…’

[পঙক্তি নম্বর ৫৪ থেকে ৫৬]

২। ‘ত্রিপথগামী টলটলে যৌবনে দেবতারা সাঁতার কাটে—

ধর্ষিত যুবতির মতো এলোচুলে শুয়ে থাকা বোবা

তিস্তার পাড়ে ফসলের মধুর আদর নেই

ফুল নেই

ফল নেই

কলসি কাঁখে কিশোরীদের কলরব নেই

বৃষ্টিস্নাত মেঘলা বিকেলের মধুর ছোঁয়া নেই

সবুজ ঘাসের নাচন নেই’

[পঙক্তি নম্বর ১৯৫ থেকে ২০২]

গ। ‘নরম ইটের বালিশে বিনিদ্র রাত যাপন; ম্যাকবেথেরা রক্তমাখা

চাকু হাতেবিলাসবহুল ফ্ল্যাটে নাক ডেকে

ঘুম পাড়ে…’

সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে বুঝে নেওয়া গেল যে, ‘মহানরক’ সমাজনির্ভর কবিতা। পচে-যাওয়া কিংবা ক্ষয়ে যাওয়া মূল্যবোধ ইত্যাদির বিষয়গুলো তুলে ধরে সতর্ক করা হয়েছে। বিপন্ন সময়ের অন্ধকারের গলিগুলি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এ চেষ্টা সফলই বলা যেতে পারে। পাশাপাশি এ-কবিতায় নতুন ভোরের গল্প শোনা যায়। অবিশ্বাস থাকলেও কিছুতেই তো বিশ্বাস করতেই হয়। তাইতো কবিতাটির একেবারে শেষদিকে শোনালেন আশার বার্তা—

‘হয়তো

কুয়োর বদ্ধজলের কুনোব্যাঙের মতো বিশ্ববিবেক

নীলতিমি হয়ে মহাসাগরে অবাধে সাঁতার কাটবে

হয়তো

পুব আকাশে নতুন সকালে এক আকাশগঙ্গা রোদ

নিয়ে নতুন সূর্য উঠবে

ঘুচে যাবে অন্ধকার…’

[পঙক্তি নম্বর ২৯০ থেকে ২৯৬]

 

জনপ্রিয় পোস্ট

কবিতার নিবিড়পাঠ

হাশিম কিয়ামের ‘মহানরক’ : তিস্তার পাড়ে ফসলের মধুর আদর নেই

আপডেট : ০৯:৩৩:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ অক্টোবর ২০২৪


আবু আফজাল সালেহ



কবি হাশিম কিয়াম। বর্তমানের আলোচিত কবিদের একজন। তাঁর ”মহানরক” কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে বেহুলা বাংলা থেকে, ডিসেম্বর ২০২০ সালে। ২০ টি কবিতা নিয়ে এ কাব্যগ্রন্থ। এ বইতে দুটি দীর্ঘ কবিতা আছে। ‘আমি একদিন সত্যিকারের আমি হবো’ এবং ‘মহানরক’। ‘মহানরক’ কবিতাটি অতিদীর্ঘই বলা যায়। ৩০০ পঙক্তির কবিতা। আমার আলোচনার বিষয় এ কবিতার মানস, চিত্রকল্প, অলংকার প্রভৃতি নিয়ে।

আলোচিত ‘মহানরক’ কবিতায় কাক, হুক্কাহুয়া নেতিবাচক হিসাবে প্রতীকী হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। ‘শকুনের নখ’, নেকড়ে ভয়ঙ্কর ও হিংস্রতার প্রতীক। বর্তমান সমাজের সুবিধাভোগী, চাটুকর ও নেতবাচক শ্রেণির আচরণ ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এগুলো পাঠকের কাছে কবির ইপ্সিত বক্তব্য পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। সমাজের অন্ধকার ও খারাপ দিকগুলো উঠে এসেছে।  শুরুই হয়েছে পারস্পারিক অবিশ্বাস, অপ্রাপ্তি ও হতাশা নিয়েই—

‘ভরাবসন্তে না আছে কোথাও ফুলের সুবাস

না শোনা যায় কোকিলের মধুর কলরব

না ভোমরের মনভোলানো গুঞ্জন—সবখানে যতোসব

অচেনা—আজব—খুনরেজ কীটের আনাগোনা

পচা লাশের গন্ধভরা দক্ষিণের দমকা হাওয়া

বইছে বিরামহীন; কাকেরা কুঞ্জবনে কুহু কুহু করছে গান; শিয়ালের

হুক্কাহুয়া হাঁক

নেকড়ের ভয়াল গর্জনে মিশে গেছে—কানের পর্দাফাটানো

বীভৎস নিনাদে সাঙ্গ হয়ে যায় ঘুম ঘুম খেলা…’

[পঙক্তি নম্বর ১ থেকে ১০]

মানস ও বিষয়ের রূপান্তর শক্তি চমৎকার,অর্থবহ এবং সার্থক। সমাজের চিত্র যেমন আছে, তেমনই আছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের জানালা। যে জানালা দিয়ে ঢুকে যাওয়া যাবে জ্ঞ্যান ও আলোর গভীরে। সমাজের নানা অসঙ্গতিও উঠে এসেছে–কখনো শ্লেষ,  কখনো ব্যাঙ্গাত্মক। বিভিন্ন বিভাজন নীতির প্রয়োগ ও বাস্তবতা উঠে এসেছে এ কবিতায়। স্বার্থের দ্বন্দ্ব/সংঘাত নীতি প্রচলিত।

‘জননীর বিশাল শরীরের একদল সুচতুর ভিনদেশি
নির্দয়ভাবে মানচিত্র এঁকে গেছে
ঘরের মাঝে দেয়াল–হেঁশেলের মাঝে
পাঁচিল; শকুনের নখের মতো গোঁয়ারের পেন্সিলের
স্বেচ্ছাচারী আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত কোটি কোটি হৃদয়ের
আকাশফাটা আর্তনাদ এখনো কানে বাজে
দ্বিখণ্ডিত ভাষা কাটা কবুতরের মতো
ছটফট করছে’ [পঙক্তি ৮৩–৯০]

দৃশ্যকাব্য, কাব্যসৌন্দর্য, অলংকার ইত্যাদির প্রয়োগে কবি মুনশিগিরি দেখাতে পেরেছেন বলে মনে করি। তাঁর অনেক চিত্রকল্প নতুন স্বরে নতুন আলোর দিশা পাওয়া যায়। ‘ফ্যাসিবাদের কালো থাবার ছবি’  অথবা ‘নীল চোখ দুটি অস্তগামী সূর্যের মতো লাল হয়ে গেছে নতুন এক চিন্তা-চেতনার দিকে ঠেলে দেয়। ‘কাটা কবুতরের মতো’, ‘গোরের মতন গোপন ঘরে’, ‘আর্টিমিসের তৃষ্ণার্ত পূজাবেদি—ভূমধ্যসাগরের সমস্ত জল—অর্গোসের নীলাম্বর…’, ‘মরীচিকার মতো ছলনা’, ইত্যাদি অলংকার কিংবা চিত্রকল্প পাঠককে মুগ্ধ করছে। কিছুটা নতুনত্বও আছে। বাস্তবের ঘুব কাছাকাছি পাঠককে নিয়ে যেতে কবির এসব চিত্রকল্প সার্থক ও উপযোগী হয়েছে বলে আমার মনে হয়। বত্রিশ নম্বর বাড়ি, ট্রয়গামী জাহাজ, অর্গোসের নীলাম্বর, মন্দাকিনীর নির্মল জল ইত্যাদি শব্দশ্রেণি ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা বলে। ইতিহাস, ভূগোল, মিথ কিংবা ঐতিহ্যের বহুল ব্যবহার কবিতায় লক্ষ করা যায়। ‘ডোবার পাড়ে জিউসের ওক বৃক্ষের মতো একটি বুড়ো গাছ’ ইত্যাদির মতো পঙক্তি কিংবা হেক্যুবার, বেনাবতী, টিরিউসেরা কিংবা ফিলোমিলারার মতো শব্দ (মিথ কিংবা ইতিহাস) কবিতাটিকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। মিথ কিংবা ইতিহাস-ঐতিহ্যে আলোকিত কিছু কবিতাংশ—

ক। ‘নরকনদীতে বেহুলা একাকী ভেলায় এখনো ভেসে বেড়ায়

অপয়া ভিটেয় এখনো জয়গুন লড়াই করে

এখনো বর্বর টিরিউসেরা নির্মম তাণ্ডব চালায়

এখনো ফিলোমিলারা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে’

[পঙক্তি নম্বর ২৮৬ থেকে ২৮৯]

(পরপর নাসিক্য উচ্চারণের অনুপ্রাস প্রচেষ্টা ভালো লেগেছে)

খ। ‘নির্দয় খুনখারাবি আর জঘন্য গণহত্যায়

রাঙা ঐ ফোরাতের মিষ্টি পানি—কুরুক্ষেত্রে প্রতিটি

ধূলিকণা—রুয়ান্ডা—জালিয়ানওয়ালাবাগ—আর্মেনিয়া—বসনিয়া…

আদি সোদরের রাঙা খুনে একেবারে রাঙা হয়ে গেছে আদি জননীর আদি

পৃথিবীর খাঁটি মাটি; এখনো ঝরে তাজা খুন পৃথিবীর আনাচে কানাচে

মহাকালের পলিমাটির ভাঁজে ভাঁজে নিষ্ঠুর নির্মমতায়

কাতরাতে কাতরাতে ঘুমিয়ে আছে গাদাগাদা কঙ্কাল হয়ে’

[পঙক্তি নম্বর ৪৬ থেকে ৫২]

গ। ‘চকচকে সব প্রাসাদ যেন বুনো শুয়োরের বাথান
প্রাচুর্যের অলস মগজে সৃষ্টি নয়–ধ্বংসের নেশা খেলা করে
সহসা দাঁতাল শুয়োরের দল লোকালয়ে নির্মমভাবে
তাণ্ডব চালায়; আবালবৃদ্ধবনিতা –কোটি কোটি
বসন্তসৈনিক অবিরাম ছুটছে দিগ্বিদিক–
ছুটছে যতোসব ছায়াখাকি–
কখনো বা রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে–কখনো বা
চামড়ার ঝলসানো চড়া দুপুরে–তপ্ত বালুসাগরে; মরুসাইমুম
চাবুকের মতো আঘাত করছে’
[পঙক্তি নম্বর ১৩৪ থেকে ১৪২]

নারী নিয়ে রাজনীতি চলছে অনন্তকাল থেকে। নারীকে অবহেলায় রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা  চলমান। নারীকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূলস্রোতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা খুবই কম। অনেক নারী নিজেও পরাধীনতার আড়ালেই থাকতে চান। সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র নারীকে অগ্রসর হতে দেয় খুব কম। নারী নিয়ে আফসোসের এ কথা বললেন কবি হাশিম কিয়াম—

‘সিসিফাস উঁকি মারে বড়ো বড়ো হাঁড়িঠাসা হেঁশেলে

গৃহিণী মাতাগণ এক রাজ্যের নিঃসঙ্গতা বুকে নিয়ে

সারাটা জীবন নিরর্থক ব্যাগার খাটে—

অচল বাবারা জলভরা চোখে প্রাণের খোকার জমিতে

অর্তহীন জন খাটে…’

[পঙক্তি নম্বর ২১৯ থেকে ২২৩]

হাশিম কিয়ামের আলোচিত এ-কবিতায় গতি লক্ষ করা যায়। যা ফিউচারিস্টের কিছু লক্ষণ। শ্লেষ ও আইরনির ভাষা আরোও জোরালো হলে ভালো হতো। কিছু কমন চিত্র ও চিত্রকল্প এসেছে। সেগুলো এড়িয়ে নতুনত্ব আনতে পারলে আরও ভালো হতো বলে আমার মনে হয়। ‘রক্তরাঙা মরুফুল বিচারের আর্জি জানায়/বিচারহীন দরবারে’, ‘হায়না কবলিত এ-জপদে প্রায়ামদের এ-আশা পূরণ হবে না’, ‘অর্থহীন—অবাস্তব—অভিশপ্ত—যতোসব জীবনযাপন’ ইত্যাদির মতো বাক্যাংশ বা শব্দশ্রেণি সমাজের কালো দিকগুলির অবস্থান জানিয়ে দেয়। কবি তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। আলোচিত কবিতা থেকে কয়েক পঙক্তির উদাহরণ হিসাবে তুলেই দিই—

১। ‘এখন মানুষ প্রতিনিয়ত রূপান্তরিত হয়

সাদা কঙ্কালে; এখনো মানুষ শিরদাঁড়ায় বুনো অস্ত্রের দগদগে

ক্ষত বয়ে বেড়ায়…’

[পঙক্তি নম্বর ৫৪ থেকে ৫৬]

২। ‘ত্রিপথগামী টলটলে যৌবনে দেবতারা সাঁতার কাটে—

ধর্ষিত যুবতির মতো এলোচুলে শুয়ে থাকা বোবা

তিস্তার পাড়ে ফসলের মধুর আদর নেই

ফুল নেই

ফল নেই

কলসি কাঁখে কিশোরীদের কলরব নেই

বৃষ্টিস্নাত মেঘলা বিকেলের মধুর ছোঁয়া নেই

সবুজ ঘাসের নাচন নেই’

[পঙক্তি নম্বর ১৯৫ থেকে ২০২]

গ। ‘নরম ইটের বালিশে বিনিদ্র রাত যাপন; ম্যাকবেথেরা রক্তমাখা

চাকু হাতেবিলাসবহুল ফ্ল্যাটে নাক ডেকে

ঘুম পাড়ে…’

সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে বুঝে নেওয়া গেল যে, ‘মহানরক’ সমাজনির্ভর কবিতা। পচে-যাওয়া কিংবা ক্ষয়ে যাওয়া মূল্যবোধ ইত্যাদির বিষয়গুলো তুলে ধরে সতর্ক করা হয়েছে। বিপন্ন সময়ের অন্ধকারের গলিগুলি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এ চেষ্টা সফলই বলা যেতে পারে। পাশাপাশি এ-কবিতায় নতুন ভোরের গল্প শোনা যায়। অবিশ্বাস থাকলেও কিছুতেই তো বিশ্বাস করতেই হয়। তাইতো কবিতাটির একেবারে শেষদিকে শোনালেন আশার বার্তা—

‘হয়তো

কুয়োর বদ্ধজলের কুনোব্যাঙের মতো বিশ্ববিবেক

নীলতিমি হয়ে মহাসাগরে অবাধে সাঁতার কাটবে

হয়তো

পুব আকাশে নতুন সকালে এক আকাশগঙ্গা রোদ

নিয়ে নতুন সূর্য উঠবে

ঘুচে যাবে অন্ধকার…’

[পঙক্তি নম্বর ২৯০ থেকে ২৯৬]