হুমায়ুন কবীর
শিউলি বকুল ফুলের মালা
যত্ন করে গেঁথে,
পাঠশালাতে নিয়ে গেলে
উঠতো সবাই মেতে—- পঙক্তিটি পড়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। একে একে শান্তি ছায়া,সজনে ডাটা, কুমড়ো বড়ি, শীতের পিঠা ছড়াগুলো পড়ে ফেললাম। এই জনপদের আবহমান ছবি, যাপিত জীবনের চিত্র পেয়ে গেলাম একে একে। হ্যাঁ, এক অনবদ্য ছড়া গ্রন্থ — “দেশের ছড়া দশের ছড়া’র ” কথা বলছি। ছড়া বইটি লিখেছেন চুয়াডাঙ্গার এক বিশিষ্ট ছড়াকার মো. আনছার আলি।তিনি লিখে চলেছেন নিরলস। সহজ কথায় ছড়ার মধ্যে মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম তিনি। ইতোপূর্বে তার “সোনালী অতীত ” নামক একক কাব্য গ্রন্থ ও ” ইচ্ছের কাছাকাছি “, ”সপ্তর্ষি ” ও “লকডাউন” নামে তিনটি যৌথ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। “দেশের ছড়া দশের ছড়া” তার দ্বিতীয় একক কাব্যগ্রন্থ। এই ছড়া গ্রন্থটি পাঠককে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে দেশের আর দশের মুখোমুখি। সেই অর্থে “দেশের ছড়া দশের ছড়া” গ্রন্থটি এই জনপদের মানুষের আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। পেশা,প্রকৃতি, দেশ- দশ, অতীত – বর্তমান এক মলাটে ধরেছেন কবি ও ছড়াকার আনছার আলী। ছড়াগুলোতে সহজেই অন্তমিল ঘটাতে পেরেছেন তিনি। তাকে যতটা জানি ছান্দসিক লেখায় তার এক সহজাত ক্ষমতা আছে। তার পক্ষেই বলা সম্ভব :
ধন্য দেশের সজনে ডাটা
গ্রাম বাংলার গৌরব
দিকে দিকে যাক ছড়িয়ে
সজনে ডাটার সৌরভ।
অপূর্ব এক মুগ্ধতা পেয়ে বসে এমন চমৎকার শব্দবুননে আর ছন্দের খেলায়।
বাংলাদেশ এবং এর ছয় ঋতুর সৌন্দর্যে মুগ্ধ এই কবি লিখেছেন —“হেমন্ত “, ” শীতের পিঠা” , “কৃষকের বৈশাখ” শিরোনামে অসাধারণ সুখ পাঠ্য ছড়া।হেমন্ত ছড়ার শুরুটা করেছেন এভাবে :
শীতের পরশ মেখে গায়ে
হিমমাখানো হালকা বায়ে
নিঃশব্দ আলতো পায়ে
আবার এল হেমন্ত। অক্ষর বৃত্ত ছন্দের ব্যাকরণ কিছুটা বিঘ্নিত হলেও ছবিটা কিন্তু অনবদ্য এঁকেছেন কবি।
তার মননে ধরা পড়েছে এক অনবদ্য হৈমন্তিক রূপ :
শিশিরকণা সবুজ ঘাসে
ভোরের কাঁচা রোদ্রে হাসে
পাকা ধানের মধুর ঘ্রাণে
রূপ যেন তার অনন্ত।
মহান স্বাধীনতার কথা তুলে এনেছেন —-” বিজয় দেখেছি ” , সাতই মার্চের ভাষণ ” , জাতির পিতা আর অগ্নিঝরা মার্চ’ এর মতো সহজ কথনে প্রকাশিত ছড়াগুলোতে।এইসব ছান্দসিক কবিতাগুলোতে মাতৃভূমির স্বাধীনতার প্রতি এক মমতা প্রকাশ পেয়েছে।
যুদ্ধপরবর্তী করুন চিত্র দেখতে পাই— ” বিজয় দেখেছি “নামক অসাধারণ ছড়ায়।
ছড়ার দ্বিতীয় পঙক্তিতে।তিনি লিখেছেন
অনেকে এসেছে যুদ্ধ শেষে
মায়ের কোলে ফিরে।
অনেক মাকে খুঁজতে দেখেছি
ছেলেকে লাশের ভিড়ে।
ছড়া শিশুদের কাছে সমাদৃত বেশি। কিন্তু আনছার আলীর ছড়ার বিষয় – বৈচিত্র বয়স্ক পাঠকের মনকেও স্পর্শ করেছে বলে মনে করি।
“কার কত অবদান ” ছড়ায় দেখতে পাই —-
স্বাধীনতা তুমি এসেছো ঠিকই
খুশিতে গেয়েছি গান
তুমি কি জান তোমার জন্য
কার কত অবদান !
ধর্মীয় অনুভূতিতে সিক্ত বেশ ক’টি ছড়া- কবিতা স্থান পেয়েছে বইটিতে।”আমরা সেই নবীর উম্মত ” , “মহররমের শিক্ষা” , “এসে গেছে রমজান, আল্লাহর দান ” এমন কিছু ছড়ায় কবির ধর্মীয় আকিদা- বিশ্বাসের প্রকাশ দেখি। একটা উদ্ধৃতি এমনঃ
রমজান এলে ভাই
কী যে ভালো লাগে
মধুময় অনূভুতি
প্রাণে প্রাণে জাগে।
ছন্দে ছন্দে কথা বলতে বেশ পারঙ্গম কবি আনছার আলী। চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের নিয়মিত সম্মেলনে তার ছান্দসিক বয়ান শোনার সুযোগ – সৌভাগ্য দু’টোই হয়েছে। অনেক সময় মনে হয়েছে একটা স্বভাব কবিত্ব বাস করে তার হৃদয়কূঞ্জে।সহজ মনের এই মানুষটির মতোই সহজিয়া জীবনবোধের সহজসরল প্রকাশ দেখি তার লেখায়।ছড়াগুলোর পরতে পরতে পেয়ে যাই অন্তমিলের এক অসাধারণ অথচ সাধারণ উচ্চারণ।
বইটি পাঠে তার ছড়া পাঠকেরা খুঁজে পাবে নিজের আত্মপরিচয়।শিশুতোষ লেখার মধ্যে জনাব আনছার আলী নিয়ে এসেছেন গ্রাম,শহর, দেশ এবং দেশের ঐতিহ্য – কৃষ্টি।তার বাক্য গঠন, শব্দশৈলী, বিষয় নির্বাচন একজন শিশুর মনোজগৎকে স্পর্শ করবে বলে মনে করি। সংকলনের অধিকাংশ ছড়া একজন পাঠক হিসেবে আমার মন কেড়েছে ; আমার বিশ্বাস শিশু – কিশোর – বয়স্ক সবারই ভালো লাগবে।
পাঠকের অন্তরে ছড়িয়ে যাক তার অনন্য ছড়ার সৌরভ।পাঠক এসে দাঁড়াক দেশের এবং দশের সম্মুখে।

ছড়াগ্রন্থ : দেশের ছড়া দশের ছড়া
ছড়াকার : মো. আনছার আলী
প্রকাশক: মঈন মুরসালিন,প্রতিভা প্রকাশ।
প্রচ্ছদ : সঞ্জিব রায়
প্রকাশ কাল : ফেব্রুয়ারি-২০২২
মূল্য: ১৬০
পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৬৪
বাংলাবাঁক 
















