ঢাকা ০৫:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
চুয়াডাঙ্গার গর্ব, বেড়ে ওঠার গল্প

আহাদ আলী মোল্লার পায়রাগুলো

  • বাংলাবাঁক
  • আপডেট : ০৯:০৭:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৪
  • 282


হুমায়ুন কবীর



গ্রামের সুভাসিত নাম কৃষ্ণপুর। সবাই বলে কেষ্টপুর।গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মাথাভাঙা নদী। এই নদীতে এক দূরন্ত শৈশবকাটে আহাদ আলী মোল্লার। নদীর দু’ধারে কাশবন, বাঁশঝাড়।  গাছের  ডালে ডালে  পাখি গান করে। মাথার উপর  ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা উড়ে যায়— কী যে সুন্দর লাগে! আহাদ আলীর মন আটকে যায় রঙ বেরঙের পায়রার ঝাঁকে। তার প্রিয় মানুষ বঙ্গবন্ধু।  শুনেছেন, বঙ্গবন্ধুর অনেক প্রিয় ছিল  এই পায়রা। বঙ্গবন্ধু পায়রা পুষতেন। তার ইচ্ছে তিনিও পায়রা পুষবে্ন। মায়ের কাছে  বলেন, মা, আমি পায়রা কিনবো,টাকা দাও। ছোট চাচা শের আলী মোল্লাকে বলেন, চাচা,আমাকে পায়রার ঘর বানিয়ে দাও। যেই কথা সেই কাজ—চাচা দোকান থেকে একটা পরিত্যক্ত কার্টুন কিনে আনলেন। বাড়ির বাঁশ- কাঠ দিয়ে  খুব যত্ন করে বানিয়ে দিলেন চার খোপের একটা পায়রা ঘর। আটচালা  খেড়ো ঘরের কোল-ঘেসে পায়রার ঘরটা বাঁশের মাচায় বসানো হলো।
কৃষ্ণপুর থেকে আট কিলোমিটার দূরে হাজরা হাটি গ্রাম। অই গ্রামে আহাদের মামা বাড়ি। মামাবাড়ির পাশে এক ভদ্রলোকের অনেক পায়রা। শোনা গেল, তিনি পায়রা বিক্রি করেন– জোড়া পাঁচ টাকা। একদিন সকালে আহাদ মোল্লা সেই পায়রাওয়ালার বাড়ি হাজির। ঘরের চালে অনেক পায়রা। বাক-বাকুম, বাক-বাকুম করে ডাকছে, চাল থেকে উড়ে গাছের ডালে বসছে। একটু পরে পাখা মেলে উড়ে যাচ্ছে শূণ্যে—-কী দারুণ!  আহাদের চোখে-মুখে আনন্দের আভা। তিনি ধীর পদে এগিয়ে গেল পায়রাওয়ালার কাছে। পকেট থেকে মায়ের দেয়া পাঁচ টাকা বের করে বললো, আমি একজোড়া পায়রা কিনবো।
ভদ্রলোক দুটি হাত মেলে ধরলেন আর মুখে কী যেন বললেন। অমনি পায়রার ঝাঁক ছুটে এল। তার হাতে- ঘাড়ে- মাথায়  বসলো । কী দারুণ শিকারী, কী দারুণ ভক্ত!  আহাদ মনে মনে বললেন, আমিও এভাবে পায়রাগুলোকে ভক্ত বানাবো। একরাশ মুগ্ধতা আর  পায়রা জোড়া নিয়ে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে আহাদ।
পায়রা পোষার শখ পূরণ হতে চলেছে তার। বাড়িতে এনে পায়রা দুটোর পাখা সুতো দিয়ে বেঁধে রাখলেন। সপ্তাহ খানেক পরে সুতো খুলে দিলেন। ওরা খোপওয়ালা ঘরের চারপাশে উড়ে উড়ে বসছে। বাক-বাকুম রবে মুখর করে তুলছে বাড়ি।  আহাদের চোখে-মুখে যুগপৎ আনন্দ আর শঙ্কা। শঙ্কা এই  জন্য যে, কখন যদি উড়ে যায়! আহাদের ভয় সত্যি হলো, পায়রা উড়াল দিল; মূহুর্তে চলে গেল চোখের আড়ালে।
আহাদ ভাবলেন, ফিরে আসবে। সে বাড়ি- মাঠ – নদীতট ঘুরে ঘুরে আসে, কোথাও দেখা মেলে না— ফিরেও আসে না।
আহাদের চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু জল। খাওয়া – দাওয়া ভুলে ঘরের এককোনায় বসে আছে সে । মা বললেন, যে বাড়ি থেকে এনেছিলি, সেই বাড়ি যা—সেখানে যেতে পারে। আট কিলোমিটার দূরের পথ। এতপথ কীভাবে যাবে, আহাদের বিশ্বাস হতে চায় না ; মা বললেন, তুই যা,দেখবি ওখানেই আছে। বিশ্বাস – আর অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে দুলতে আহাদ অবশেষে পৌঁছালো হাজরা হাটি গ্রামের সেই বাড়ি। হ্যাঁ, মায়ের কথায়  সত্যি—-পায়রা হাজির ওদের পূর্বের প্রভুর বাড়ি। সম্পর্ক মিলিয়ে দেখতে গেলে ভদ্রলোক আহাদের মামা। মামা বললেন, ভাগ্নে সাত দিন না, পনের বিশ দিন পাখা বেঁধে রাখবা।
এবার পায়রা পোষ মেনে গেল, উড়ে দূরে যায়, আবার ফিরে আসে। আহাদের মনে ভয় কেটে গেল।  পায়রাগুলো খুব  প্রিয় আহাদের। সে যত্ন করে, ওদের সাথে বলে— বাক-বাকুম… কুম। মাস দুই পরে ওরা বাসা বানাতে শুরু করলো,ডিম পাড়লো।কালে বাচ্চাও হলো। মাঠ থেকে শর্ষে – দানা এনে মা- পায়রা বাচ্চাকে খাওয়ায়। এইসব দেখতে বড্ড ভালোলাগে।আহাদের জীবনে এমন  আনন্দ  আগে আসেনি।দিন যায়, মাস যায় — এখন অনেক পায়রা আহাদের। তিনি ডাকলে পায়রাগুলো আসে ওর কাছে, হাতের তালু মেলে ধরলে বসে তালুতে—- আহাদের আনন্দ আর ধরে না।
গ্রামের মাঠ ক্ষেত- খন্দে ভরা। পায়রা ঝাঁক ধরে যায়, পেট ভরে খেয়ে ফিরে আসে। বাড়িতে তেমন একটা খাদ্য- খাবার দিতে হয় না। বন্ধুরা কেউ কেউ শখ করে, তারাও আহাদের মতো পায়রা পুষবে। পাশের গ্রাম থেকে কেউ কেউ পায়রা কিনতে আসে। আহাদের একটা মায়া জন্মে গেছে  পায়রাগুলোর প্রতি। তিনি একজোড়া ধরে, হাতের মুঠোয় নিয়ে ভাবে নাহ্!  এ জোড়া তো দারুণ সুন্দর, এদের বেঁচবো না।ওদের ছেড়ে আরেক জোড়া ধরে। হাতের পাঁচ আঙুলের স্পর্শ করে,বৃত্তাকার মায়াবী চোখের দিকে তাকায় ; বলে নাহ্!  থাক পায়রা বেঁচবো না। আহাদ পায়রার লোমশ ডানা  ছুঁয়ে বলে, নাহ্, তোদের আমি ভালোবাসি। তোদের জন্য আমার খুব মায়া । সত্যি পায়রাগুলোকে সে খুব ভালোবাসে।ভালোবাসলে সুন্দর সুন্দর কথা মনে আসে। পড়ার টেবিলে বসে তিনি পায়রাগুলোর উদ্দেশ্যে  প্রেম পত্র লেখেন :
 প্রিয় পায়রাগুলো, তোমরা ভালো থেকো
সারাদিন আমার   বাড়ি মুখর করে রেখো
যেখানেই যাও তোমাদের ঠিকানায় ফিরো
আমার  প্রিয়  পায়রাগুলো ভালো থেকো। “
মানুষের জীবনে প্রেম আসে। আহাদের জীবনে প্রথম প্রেম  এসেছিল  পায়রা – প্রেম। আহাদ মাঝেমধ্যে পায়রাগুলো নিয়ে ছড়া লিখতেন, কবিতা লিখতেন। নিজের ছড়া নিজে পড়েই মুগ্ধ হতেন ; মনে মনে বল্তেন, “আমি তো বেশ ছড়া লিখতে পারি। আমি শহরে যাব, পত্রিকায় ছড়া লিখবো। “
এসএসসি পাশ করে সত্যি সে একদিন চলে এলেন শহরে। বাড়িতে ছোট ভাই আর মা পায়রাগুলো দেখভাল করে।মাসে এক-দুবার সে  গ্রামে যায়। পায়রাগুলো করুন চোখে তার দিকে চায়। পায়রাগুলো রেখে তার মন চায় না শহরে আসতে। তবু্ও তিনি ফিরে আসে ইট কাঠের শহরে।পায়রাগুলোর কথা মনে হলে তিনি ছড়া লেখেন, কবিতা লেখেন।পত্রিকা অফিসের লোকজনের কাছে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বিরহের কবিতা লেখেন :
পায়রাগুলো নেই  ধারে- কাছে
মনটা পড়ে আছে তাদের মাঝে।
কাল  বাদে পরশু  বাড়ি যাবো
আমি তাদের সাথে দিন কাটাবো।”
পরের দিন আহাদের কলেজ ছুটি। আহাদ শহরের দোকান থেকে রঙ কেনে— লাল- নীল- সবুজ রঙ। ভালোবেসে এক একটা পায়রার শরীরে তিনি একেক রকম রঙ মাখাবে— কত্ত সুন্দর লাগবে পায়রাগুলো।
বাড়ির সীমানায় এসে তিনি মাঠের দিকে তাকান,আকাশের দিকে তাকান —- মনে ভাবে তার পায়রাগুলোর দেখা মিলবে। আহাদ গ্রামের বাড়িতে গেলে তার কথার আওয়াজ পেয়েই পায়রাগুলো ঝুপঝাপ মাটিতে নেমে আসতো, বাক-বাকুম – কুম শব্দে স্বাগত জানাতো। আজ কোন শাড়া শব্দ নেই। পায়রাগুলোর কোন সর্বনাশ হলো কি! মায়ের বিষন্ন মুখ দেখে সে চিন্তিত হয়ে পড়ে।  আহাদ মাকে বলেন, কী হয়েছে মা,পায়রাগুলো কই?
মায়ের চোখে জল। মা বাকরুদ্ধ।
পরের দিন পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হলো : ফসলে বিষ : শতাধিক পায়রার জীবন নাশ।
আহাদ আলী শোকে পাথর হয়ে যান। অনেক দিন তিনি শহরেই থাকে। বাক-বাকুম শব্দ শুনলে তিনি আনমনা হয়ে ওঠেন। আকাশে পতপত করে পায়রা উড়তে দেখে  তিনি রহের কবিতা লেখে। মনে মনে ভাবেন  সেই পায়রাগুলো  ছিলো তার নন্দিত ভালোবাসা। এই  ভালোবাসাই  তাকে টেনে এনেছে লেখালেখির জগতে। আজ তিনি কবি। এই নন্দিত ভালোবাসাই তাকে কবি করে তুলেছে।
লেখকঃ প্রাবন্ধিক, শিক্ষক
জনপ্রিয় পোস্ট

চুয়াডাঙ্গার গর্ব, বেড়ে ওঠার গল্প

আহাদ আলী মোল্লার পায়রাগুলো

আপডেট : ০৯:০৭:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৪


হুমায়ুন কবীর



গ্রামের সুভাসিত নাম কৃষ্ণপুর। সবাই বলে কেষ্টপুর।গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মাথাভাঙা নদী। এই নদীতে এক দূরন্ত শৈশবকাটে আহাদ আলী মোল্লার। নদীর দু’ধারে কাশবন, বাঁশঝাড়।  গাছের  ডালে ডালে  পাখি গান করে। মাথার উপর  ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা উড়ে যায়— কী যে সুন্দর লাগে! আহাদ আলীর মন আটকে যায় রঙ বেরঙের পায়রার ঝাঁকে। তার প্রিয় মানুষ বঙ্গবন্ধু।  শুনেছেন, বঙ্গবন্ধুর অনেক প্রিয় ছিল  এই পায়রা। বঙ্গবন্ধু পায়রা পুষতেন। তার ইচ্ছে তিনিও পায়রা পুষবে্ন। মায়ের কাছে  বলেন, মা, আমি পায়রা কিনবো,টাকা দাও। ছোট চাচা শের আলী মোল্লাকে বলেন, চাচা,আমাকে পায়রার ঘর বানিয়ে দাও। যেই কথা সেই কাজ—চাচা দোকান থেকে একটা পরিত্যক্ত কার্টুন কিনে আনলেন। বাড়ির বাঁশ- কাঠ দিয়ে  খুব যত্ন করে বানিয়ে দিলেন চার খোপের একটা পায়রা ঘর। আটচালা  খেড়ো ঘরের কোল-ঘেসে পায়রার ঘরটা বাঁশের মাচায় বসানো হলো।
কৃষ্ণপুর থেকে আট কিলোমিটার দূরে হাজরা হাটি গ্রাম। অই গ্রামে আহাদের মামা বাড়ি। মামাবাড়ির পাশে এক ভদ্রলোকের অনেক পায়রা। শোনা গেল, তিনি পায়রা বিক্রি করেন– জোড়া পাঁচ টাকা। একদিন সকালে আহাদ মোল্লা সেই পায়রাওয়ালার বাড়ি হাজির। ঘরের চালে অনেক পায়রা। বাক-বাকুম, বাক-বাকুম করে ডাকছে, চাল থেকে উড়ে গাছের ডালে বসছে। একটু পরে পাখা মেলে উড়ে যাচ্ছে শূণ্যে—-কী দারুণ!  আহাদের চোখে-মুখে আনন্দের আভা। তিনি ধীর পদে এগিয়ে গেল পায়রাওয়ালার কাছে। পকেট থেকে মায়ের দেয়া পাঁচ টাকা বের করে বললো, আমি একজোড়া পায়রা কিনবো।
ভদ্রলোক দুটি হাত মেলে ধরলেন আর মুখে কী যেন বললেন। অমনি পায়রার ঝাঁক ছুটে এল। তার হাতে- ঘাড়ে- মাথায়  বসলো । কী দারুণ শিকারী, কী দারুণ ভক্ত!  আহাদ মনে মনে বললেন, আমিও এভাবে পায়রাগুলোকে ভক্ত বানাবো। একরাশ মুগ্ধতা আর  পায়রা জোড়া নিয়ে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে আহাদ।
পায়রা পোষার শখ পূরণ হতে চলেছে তার। বাড়িতে এনে পায়রা দুটোর পাখা সুতো দিয়ে বেঁধে রাখলেন। সপ্তাহ খানেক পরে সুতো খুলে দিলেন। ওরা খোপওয়ালা ঘরের চারপাশে উড়ে উড়ে বসছে। বাক-বাকুম রবে মুখর করে তুলছে বাড়ি।  আহাদের চোখে-মুখে যুগপৎ আনন্দ আর শঙ্কা। শঙ্কা এই  জন্য যে, কখন যদি উড়ে যায়! আহাদের ভয় সত্যি হলো, পায়রা উড়াল দিল; মূহুর্তে চলে গেল চোখের আড়ালে।
আহাদ ভাবলেন, ফিরে আসবে। সে বাড়ি- মাঠ – নদীতট ঘুরে ঘুরে আসে, কোথাও দেখা মেলে না— ফিরেও আসে না।
আহাদের চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু জল। খাওয়া – দাওয়া ভুলে ঘরের এককোনায় বসে আছে সে । মা বললেন, যে বাড়ি থেকে এনেছিলি, সেই বাড়ি যা—সেখানে যেতে পারে। আট কিলোমিটার দূরের পথ। এতপথ কীভাবে যাবে, আহাদের বিশ্বাস হতে চায় না ; মা বললেন, তুই যা,দেখবি ওখানেই আছে। বিশ্বাস – আর অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে দুলতে আহাদ অবশেষে পৌঁছালো হাজরা হাটি গ্রামের সেই বাড়ি। হ্যাঁ, মায়ের কথায়  সত্যি—-পায়রা হাজির ওদের পূর্বের প্রভুর বাড়ি। সম্পর্ক মিলিয়ে দেখতে গেলে ভদ্রলোক আহাদের মামা। মামা বললেন, ভাগ্নে সাত দিন না, পনের বিশ দিন পাখা বেঁধে রাখবা।
এবার পায়রা পোষ মেনে গেল, উড়ে দূরে যায়, আবার ফিরে আসে। আহাদের মনে ভয় কেটে গেল।  পায়রাগুলো খুব  প্রিয় আহাদের। সে যত্ন করে, ওদের সাথে বলে— বাক-বাকুম… কুম। মাস দুই পরে ওরা বাসা বানাতে শুরু করলো,ডিম পাড়লো।কালে বাচ্চাও হলো। মাঠ থেকে শর্ষে – দানা এনে মা- পায়রা বাচ্চাকে খাওয়ায়। এইসব দেখতে বড্ড ভালোলাগে।আহাদের জীবনে এমন  আনন্দ  আগে আসেনি।দিন যায়, মাস যায় — এখন অনেক পায়রা আহাদের। তিনি ডাকলে পায়রাগুলো আসে ওর কাছে, হাতের তালু মেলে ধরলে বসে তালুতে—- আহাদের আনন্দ আর ধরে না।
গ্রামের মাঠ ক্ষেত- খন্দে ভরা। পায়রা ঝাঁক ধরে যায়, পেট ভরে খেয়ে ফিরে আসে। বাড়িতে তেমন একটা খাদ্য- খাবার দিতে হয় না। বন্ধুরা কেউ কেউ শখ করে, তারাও আহাদের মতো পায়রা পুষবে। পাশের গ্রাম থেকে কেউ কেউ পায়রা কিনতে আসে। আহাদের একটা মায়া জন্মে গেছে  পায়রাগুলোর প্রতি। তিনি একজোড়া ধরে, হাতের মুঠোয় নিয়ে ভাবে নাহ্!  এ জোড়া তো দারুণ সুন্দর, এদের বেঁচবো না।ওদের ছেড়ে আরেক জোড়া ধরে। হাতের পাঁচ আঙুলের স্পর্শ করে,বৃত্তাকার মায়াবী চোখের দিকে তাকায় ; বলে নাহ্!  থাক পায়রা বেঁচবো না। আহাদ পায়রার লোমশ ডানা  ছুঁয়ে বলে, নাহ্, তোদের আমি ভালোবাসি। তোদের জন্য আমার খুব মায়া । সত্যি পায়রাগুলোকে সে খুব ভালোবাসে।ভালোবাসলে সুন্দর সুন্দর কথা মনে আসে। পড়ার টেবিলে বসে তিনি পায়রাগুলোর উদ্দেশ্যে  প্রেম পত্র লেখেন :
 প্রিয় পায়রাগুলো, তোমরা ভালো থেকো
সারাদিন আমার   বাড়ি মুখর করে রেখো
যেখানেই যাও তোমাদের ঠিকানায় ফিরো
আমার  প্রিয়  পায়রাগুলো ভালো থেকো। “
মানুষের জীবনে প্রেম আসে। আহাদের জীবনে প্রথম প্রেম  এসেছিল  পায়রা – প্রেম। আহাদ মাঝেমধ্যে পায়রাগুলো নিয়ে ছড়া লিখতেন, কবিতা লিখতেন। নিজের ছড়া নিজে পড়েই মুগ্ধ হতেন ; মনে মনে বল্তেন, “আমি তো বেশ ছড়া লিখতে পারি। আমি শহরে যাব, পত্রিকায় ছড়া লিখবো। “
এসএসসি পাশ করে সত্যি সে একদিন চলে এলেন শহরে। বাড়িতে ছোট ভাই আর মা পায়রাগুলো দেখভাল করে।মাসে এক-দুবার সে  গ্রামে যায়। পায়রাগুলো করুন চোখে তার দিকে চায়। পায়রাগুলো রেখে তার মন চায় না শহরে আসতে। তবু্ও তিনি ফিরে আসে ইট কাঠের শহরে।পায়রাগুলোর কথা মনে হলে তিনি ছড়া লেখেন, কবিতা লেখেন।পত্রিকা অফিসের লোকজনের কাছে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বিরহের কবিতা লেখেন :
পায়রাগুলো নেই  ধারে- কাছে
মনটা পড়ে আছে তাদের মাঝে।
কাল  বাদে পরশু  বাড়ি যাবো
আমি তাদের সাথে দিন কাটাবো।”
পরের দিন আহাদের কলেজ ছুটি। আহাদ শহরের দোকান থেকে রঙ কেনে— লাল- নীল- সবুজ রঙ। ভালোবেসে এক একটা পায়রার শরীরে তিনি একেক রকম রঙ মাখাবে— কত্ত সুন্দর লাগবে পায়রাগুলো।
বাড়ির সীমানায় এসে তিনি মাঠের দিকে তাকান,আকাশের দিকে তাকান —- মনে ভাবে তার পায়রাগুলোর দেখা মিলবে। আহাদ গ্রামের বাড়িতে গেলে তার কথার আওয়াজ পেয়েই পায়রাগুলো ঝুপঝাপ মাটিতে নেমে আসতো, বাক-বাকুম – কুম শব্দে স্বাগত জানাতো। আজ কোন শাড়া শব্দ নেই। পায়রাগুলোর কোন সর্বনাশ হলো কি! মায়ের বিষন্ন মুখ দেখে সে চিন্তিত হয়ে পড়ে।  আহাদ মাকে বলেন, কী হয়েছে মা,পায়রাগুলো কই?
মায়ের চোখে জল। মা বাকরুদ্ধ।
পরের দিন পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হলো : ফসলে বিষ : শতাধিক পায়রার জীবন নাশ।
আহাদ আলী শোকে পাথর হয়ে যান। অনেক দিন তিনি শহরেই থাকে। বাক-বাকুম শব্দ শুনলে তিনি আনমনা হয়ে ওঠেন। আকাশে পতপত করে পায়রা উড়তে দেখে  তিনি রহের কবিতা লেখে। মনে মনে ভাবেন  সেই পায়রাগুলো  ছিলো তার নন্দিত ভালোবাসা। এই  ভালোবাসাই  তাকে টেনে এনেছে লেখালেখির জগতে। আজ তিনি কবি। এই নন্দিত ভালোবাসাই তাকে কবি করে তুলেছে।
লেখকঃ প্রাবন্ধিক, শিক্ষক