ঢাকা ০২:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শফিকুল ইসলাম

গ্রামবাংলার লোকভাষ্যকার

  • বাংলাবাঁক
  • আপডেট : ১০:২৩:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৪
  • 184


হুমায়ুন কবীর



‘আমার ছেলেবেলা’ নামটা শুনে ছেলে বেলার দিন-তারিখে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার সাদামাটা গল্পকাহিনি মনে হতে পারে। কিন্তু বইটা পড়তে শুরু করলে এ ধারণা পাল্টে যায়। পর্বে পর্বে, পাতায় পাতায় দেখা মেলে গ্রামীণ জনপদের অনন্য বিচিত্র বৈভবের। দক্ষ এক ডুবুরির মতো তিনি তুলে এনেছেন গ্রাম্যজীবনের অতল থেকে হারানো মণি-মানিক্য। ভৈরব পাড়ের মায়াবীস্নিগ্ধ এক গ্রাম নিশ্চিন্তপুরে লেখকের জন্ম, বেড়ে ওঠা। গাঁয়ের প্রতিটি সোনালি দিন, স্বপ্নময় রাত তাকে মুগ্ধ করেছে। মাঠ-ঘাট-প্রান্তর দূরন্ত দামাল ছেলের মতো চষে বেড়িয়েছেন তিনি। মাটি-মানুষের কাছে থেকে যা দেখেছেন, শুনেছেন, বুঝেছেন তা অনবদ্য গ্রামীণ জনপদের আঞ্চলিক ভাষায় বর্ণনা করেছেন।

তিরিশ পর্বে বিভক্ত স্বকালে ঘটে যাওয়া আনন্দ-বেদনার এক অসাধারণ আলেখ্য এই বই। আজ থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের গ্রামের ছবি; যথার্থ অর্থে সেই সময়ের প্রকৃত পাঠ দেখতে পাই তার ছেলেবেলায়। সময় গড়িয়ে গেছে, প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগে গ্রাম গেছে পাল্টে, গ্রামীণ সংস্কৃতিও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। একটা কথা বলা হয়ে থাকে সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে ভাষা হারিয়ে যায়। কৃষিভিত্তিক সমাজে একটা সময় ব্যবহৃত হতো দীর্ঘদিনের প্রচলিত কৃষি উপকরণ লাঙল-জোয়াল, বিদে-ফলা। কৃষি-প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে; এখন পূর্বের শব্দগুলো হারাতে বসেছে। গ্রামীণ খেলা( ছিকে, গাদি, পলাপলি, কিতকিত্, হাডুডু ইত্যাদি খেলাগুলো হারিয়ে গেছে; সেই সাথে হারিয়ে গেছে প্রচলিত শব্দগুলো। এই হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি বয়স্কদের কাছে মায়াময় স্মৃতি, নবপ্রজন্মদের কাছে অপরিচিত। কিন্তু ঐতিহ্য বিমুখ জাতি আত্মপরিচয়হীন। ভাষাভিত্তিক, নৃতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক পরিচিতি ভুলে গেলে চলবে কেন? সেখানে যে আমাদের শিকড়! শিকড়ের সন্ধান করা নবপ্রজন্মের কর্তব্য। সেই আত্মপরিচয়ের পথটা দেখিয়েছেন লেখক তার ছেলেবেলার বর্ণনায়। এখানেই লেখক হিসেবে তার অনন্যতা, তার অসাধারণ কৃতিত্ব।
লেখকের বিষয় নির্বাচন এবং আটপৌরে গদ্যরীতি পাঠককে বিমুগ্ধ করে। প্রথম পর্বে লেখক লিখেছেন, ‘সন্ধ্যা হলে হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসতাম। খেজুর পাতার শীতল পাটির মাঝখানে হারিকেন রেখে চারপাশে স্লেট পেন্সিল বই খাতা কলম নিয়ে পড়তাম পরিবারের পাঁচ/ছয় ভাই। আমাদের কোনো গৃহশিক্ষক ছিল না। মাঝেমধ্যে আব্বা পড়াতেন। তিনি বলতেন, ‘লেখাপড়া হলো ব্যক্তিগত উদ্যোগ যার ওপর কারো প্রভাব খাটে না। পাশাপাশি আব্বা ধর্মীয় ও নৈতিক জ্ঞান দিতেন।’
তার এই বর্ণনায় একটা সময়-চিত্র আর পারিবারিক শিক্ষার পরিচয় মেলে। স্লেট-পেন্সিল, খেজুর পাতার শীতল পাটিতে বসে হারিকেনের আলোয় গৃহপাঠ চলছে। মাঝেমধ্যে বাবার কড়া নজরদারি, হিতোপদেশ( এমনটি আর চোখে পড়ে না। চাঁদনী রাতে উঠোনে পাটি পেতে গল্পের আসর, দাদীর মুখে রাক্ষস-খোক্কস, ভূত-প্রেত, জলকুমারী আর চাঁদের বুড়ির গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ার দিনগুলো নিজস্ব গদ্য স্টাইলে তুলে ধরেছেন লেখক। জীবনানন্দের এক কবিতায় পড়েছি (
‘চারদিকে বাঙালির ভিড়
বহুদিন কীর্তন ভাসান গান রূপকথা যাত্রা পাঁচালীর
চরম নিবিড় ছন্দে আজো শ্রাবণের জীবন গোঙায়,
আমারে দিয়েছে তৃপ্তি।’
শহিদুল ইসলামকে তৃপ্তি দিয়েছে এই জীবনের স্রোত।
কাব্যে জীবনানন্দ দাশ বাঙলার ঐতিহ্য, যাপিত জীবন তুলে ধরেছেন। ঠিক একই কাজ করেছেন মাটির কাছাকাছি থাকা শক্তিমান লেখক শফিকুল ইসলাম। তিনি অতীতের স্মৃতি ( বায়স্কোপ, গরু দিয়ে হাল চাষ, ঢেঁকি দিয়ে ধান ভানা, গরুর ঘানিতে সরিষার তেল ভাঙানো এরকম আরও বিলুপ্ত প্রায় গ্রামীণ জীবনের অনুসঙ্গ অতি যত্নে জীবন্ত করে হাজির করেছেন, ছেলেবেলার স্মৃতি রোমন্থনে।
কালের আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস-সংস্কার-কুসংস্কার তাকে নাড়া দিয়েছে। লেখক সরল বাক্যবিন্যাসে আর ভাবাবেগ প্রকাশের অনুপম ভঙ্গিতে অন্তরের সমস্ত মাধুরি মিশিয়ে সেই সব কথকতা লিখেছেন তার হিরন্ময় ছেলেবেলার গল্পে। তার লেখায় অজপাড়াগাঁয়ের মানুষ, মানুষের জীবনের গল্প উঠে এসেছে দারুণ বাস্তবতায় এবং সাথে সাথে তা পাঠকনন্দিত হয়েছে ফেসবুক এবং মুদ্রিত উভয় মাধ্যমে।
লোকসাহিত্যকে বলা হয় লোকমনের ফসল। লোকমনের কথাগুলো যে সবসময় সুশৃঙ্খল বিন্যাসে প্রকাশ পায় তা কিন্তু না, অমার্জিত কথনও উচ্চারিত হতে দেখা যায়। যেমনটি লেখক বলেছেন পর্ব-৩ এ মৌচাক ভাঙার মন্ত্রে ( ‘আদা মাচি পাদা মাচি / ক্ষুদে মদুর চাক,/ আমি আইচি মদু ভাঙতি / চুপ করে থাক।’
‘আমার ছেলেবেলা’য় আদ্যোপান্ত লোকমনের মুখের ভাষাকে অপরিবর্তিত রেখেছেন লেখক। তার লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি( ‘আমি চেয়ার বেয়ে উঠে চুপিচুপি দই খেয়ে গ্লাসে পানি ঢেলে দিতাম; দই খেতে গিয়ে এই অবস্থা দেখে দাদা লাঠি উঁচিয়ে দাদিকে বলতো, কিরাম দই বসাও হে, দৈনিক পানি কেটে যায়; দাদি তখন দৌঁড়ে সরে গিয়ে দাদাকে বলতো, বুড়ো মিনসে ম’লো না।’ এই সরস বর্ণনায় কী মুগ্ধ না হয়ে পারা যায়?
একথা সত্য যে, লেখকের সৃষ্টিতে পারিপার্শ্বিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ছাপ পড়ে। শফিকুল ইসলাম এর ব্যতিক্রম না, তবে মনোযোগী পাঠক লক্ষ করবেন, তিনি তার সাহিত্য প্রতিভায় তাকে একটা নিজস্ব রঙের ছোঁয়া লাগাতে পেরেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছিলেন ( ‘নৌকা সব দেশেই নৌকা, রথ সব দেশেই রথ, কিন্তু বর্মা দেশের নৌকা, বাংলাদেশের নৌকা, মিশর দেশের নৌকা, গ্রীস দেশের নৌকা সবার ভিন্ন ভিন্ন গঠন প্রণালী রয়েছে।’
হ্যাঁ, লেখক শফিকুল ইসলাম গ্রামীণ জনপদের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে ব্যর্থ হন নাই। প্রখ্যাত লেখক হাবিবি জহির যথার্থই মন্তব্য করেছেন, ‘আমার ছেলেবেলা’য় আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে। গবেষণাধর্মী গ্রন্থটি কালের স্বাক্ষর হিসেবে সবার সংগ্রহ করা উচিত।’
প্রবাদ বাক্যে মানুষের অভিজ্ঞতার প্রকাশ উঠে আসতে দেখি। লেখক প্রায় প্রতিটি পর্বে প্রাসঙ্গিক বর্ণনায় এনেছেন প্রবাদ বাক্য। প্রবাদে বিরহিত মনের ছায়া পড়েছে তার লেখায় এভাবে (
‘সই লো সই / মনের কথা কই / সই গিয়েছে শ্বশুর বাড়ি / ক্যামনে একা রই।’
কখনো উঠে এসেছে উপদেশের বাণী, প্রবাদ, যেমন (
‘আপন চেয়ে পর ভালো / পরের চেয়ে জঙ্গল ভালো।’
অথবা,
‘নেপলি পুছলি ঘর / কামালি জুমালি বর।’
এই অসাধারণ বাণীগুলোতে গ্রামীণ জীবনের অভিজ্ঞতা, সহজিয়া মানস দর্শন বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।
বইটি পাঠে বয়স্ক পাঠক ও লেখকের মাঝে নিবিড় যোগাযোগ অনায়াসে সম্ভব হবে বলে মনে করি। পাঠক নিজের অজান্তেই এতে খুঁজে পাবে নিজেরই বালকবেলা। লেখক যখন বলে, ‘টিফিন পিরিয়ডে স্কুল মাঠে একটা বৃত্তাকার দাগ টেনে ছুঁ খেলা খেলতাম। তার ভেতর থেকে একে একে একদমে ছুঁ গেয়ে আবার সেই গোলঘরে ফিরে আসতে হতো।’
এ বর্ণনার সাথে বয়স্কদের শৈশব-কৈশোর মিলে যায়। এ যেন তার আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ, নিজেকেই আবিস্কার নতুন করে। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সাঁকো নির্মাণ, অস্তিত্বের সূত্রসন্ধান ( এখানেই বইটি অনন্য। একটা সুমধুর বর্ণনা তুলে ধরবার লোভ সামলাতে পারছি না। ‘চৈত্র মাসে ভৈরব নদীর তীরে মেলা বসতো। সকাল সকাল শাখা-সিঁদুর, চুড়িমালা, রসগোল্লা-জিলাপি, মেটেহাঁড়ি কোলা বেচাকেনার ধূম পড়ে যেত।… মেলায় গিয়ে প্রথমেই রসগোল্লা আর জিলাপি পেট ভরে খেয়ে নিতাম। তারপর অনেক ঘুরেফিরে পছন্দ করে লালপাথর নীলপাথরের আঙটি কিনতাম, দাদীর জন্যে নিতাম তামার আঙটি। আটআনা পয়সা দিয়ে টিকিট কিনে বায়স্কোপ দেখতাম।’ এমনই সরস বর্ণনায় পাঠক ফিরে যায় তার সোনালি অতীতে।
পাঠকের হৃদয়ের ক্যানভাসে এই সোনালি অতীত কম্পন তুলবে, মনে হবে এ যেন তার হারানো হিয়ার এক নিকুঞ্জ। লৌকিক খেলাধুলার অনেক নাম ‘আমার ছেলেবেলা’ পাঠে জানতে পারি। গ্রামীণ চিত্তবিনোদনের এই বিচিত্র খেলাগুলো ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে অথবা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে খেলা সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক শব্দগুলো। শফিকুল ইসলামের ভাষায় : ‘কাঁচের গুলি খেলায় আমরা কিছু শব্দ বলতাম, যার গর্ভধারিণী কে তা আজও সনাক্ত করা যায়নি। যেমন( নট কিরিচ, নট নড়নচড়ন, চুনুক। খেলায় কেউ ফাঁকি দিলে তাকে কান্টি বলা হতো। ধানকাটা শেষে ফাঁকা মাঠে চলতো ডাংগুলি খেলা। এই খেলায় একটা আঞ্চলিক শব্দগুচ্ছ বলে গণনা হতো, তা এমন( হেড়ে ফেড়ে নেজ চোমর চার চোক এক দুই, চার চোক এক তিন। খেটে খেলা নামক এক লৌকিক খেলা ছিল যাতে নানারকম ছড়া গাইতে হতো, তন্মধ্যে অন্যতম( আকাটি বাকাটি ঝিঙের ঝোল, তামার আঙটি গুনে গুনে তোল। কিংবা আকাটি বাকাটি ঝিঙের ঝোল, বিএসসি ফেল করে হইছি পাগল।’
এইসব খেলাগুলোর আদি উৎস ও বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিতভাবে এক এক এলাকায় এক একভাবে খেলা হয় এমনই মনে করেন লেখক। মানবচিত্তে সেই আদিম কাল থেকে বাসা বেঁধেছে নানা ধরনের সংস্কার। বিচিত্র বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মজাদার সব ঘটনা নিয়ে এসেছেন লেখক। তার ভাষায় : ‘…. ভোররাতে বন্ধুরা দল বেঁধে পালি হাতে মাঠে যেতাম। ঘোর ঠেলে যাবার সময় আগে পরে যাওয়া নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রায়ই ঠেলাপাড়াপাড়ি হতো। ঠেলা পাড়াপাড়ি হতো এজন্য যে, আমাদের বিশ্বাস ছিল ( আগে গেলে বাঘে খায়, / পিছনে গেলে ভ‚তে খায়।’
‘আমার ছেলেবেলা’ কালের স্বাক্ষর, যাপিত জীবনের ইতিহাস। গ্রামীণ জনপদের নাড়ির স্পন্দন পেয়ে যাই তার লেখায়। অনেক লোকসংস্কার, লোকবিশ্বাস তুলে ধরেছেন লেখক, তা বিজ্ঞানসম্মত না হলেও মিশে আছে আমাদের জীবনের স্রোতে সেই অনাদিকাল থেকে।
অনেক গ্রামীণ ঐতিহ্য, হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি মলাটাবদ্ধ করেছেন তিনি। জানি, সংস্কৃতি হলো সভ্যতার সার নির্যাস। ভবিষ্যতে গ্রামীণ জনপদের সংস্কৃতি রচনায় শফিকুল ইসলামের ‘আমার ছেলেবেলা’ একটা আকরগ্রন্থ হয়ে থাকবে মনে করি।
দেশভাগের পূর্বে অবিভক্ত ভারতে নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত চুয়াডাঙ্গা-জীবননগর। জাতীয় জীবনের বিভিন্ন আন্দোলন যেমন( ফরায়েজি আন্দোলন, সিপাহী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ সবকিছুই এই জনপদের মানসপটে অঙ্কিত। এই অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির রূপকার রবীন্দ্রনাথ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সরলাদেবী চৌধুরানী প্রভৃতি বিখ্যাত সাহিত্যিকগণ। তাদেরই মানসপ্রসূত এই জনপদের লেখকেরা। শফিকুল ইসলামও এর ব্যতিক্রম না। তার লেখা ‘আমার ছেলেবেলা’ এই জনপদকে স্পর্শ করেছে। এ অঞ্চলের উৎসব-পার্বণ, বিচিত্র খেলা, আচার-সংস্কার-কুসংস্কার, সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধ, প্রাচীন ঐতিহ্য, পল্লির আনাচে-কানাচে ভষ্মাচ্ছাদিত মণিমুক্তা তুলে ধরেছেন লেখক। সেকারণে কালের স্বাক্ষর হিসেবে বইটির মূল্য অমূল্য বটে!

গ্রন্থের নাম : আমার ছেলেবেলা (১ম খণ্ড)
লেখক : মোঃ শফিকুল ইসলাম
প্রকাশক : সন্ধান প্রকাশনী, ঢাকা -১১০০
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি-২০২২ বইমেলা
পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৬৪, মূল্য : ১৫০ টাকা
জনপ্রিয় পোস্ট

শফিকুল ইসলাম

গ্রামবাংলার লোকভাষ্যকার

আপডেট : ১০:২৩:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৪


হুমায়ুন কবীর



‘আমার ছেলেবেলা’ নামটা শুনে ছেলে বেলার দিন-তারিখে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার সাদামাটা গল্পকাহিনি মনে হতে পারে। কিন্তু বইটা পড়তে শুরু করলে এ ধারণা পাল্টে যায়। পর্বে পর্বে, পাতায় পাতায় দেখা মেলে গ্রামীণ জনপদের অনন্য বিচিত্র বৈভবের। দক্ষ এক ডুবুরির মতো তিনি তুলে এনেছেন গ্রাম্যজীবনের অতল থেকে হারানো মণি-মানিক্য। ভৈরব পাড়ের মায়াবীস্নিগ্ধ এক গ্রাম নিশ্চিন্তপুরে লেখকের জন্ম, বেড়ে ওঠা। গাঁয়ের প্রতিটি সোনালি দিন, স্বপ্নময় রাত তাকে মুগ্ধ করেছে। মাঠ-ঘাট-প্রান্তর দূরন্ত দামাল ছেলের মতো চষে বেড়িয়েছেন তিনি। মাটি-মানুষের কাছে থেকে যা দেখেছেন, শুনেছেন, বুঝেছেন তা অনবদ্য গ্রামীণ জনপদের আঞ্চলিক ভাষায় বর্ণনা করেছেন।

তিরিশ পর্বে বিভক্ত স্বকালে ঘটে যাওয়া আনন্দ-বেদনার এক অসাধারণ আলেখ্য এই বই। আজ থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের গ্রামের ছবি; যথার্থ অর্থে সেই সময়ের প্রকৃত পাঠ দেখতে পাই তার ছেলেবেলায়। সময় গড়িয়ে গেছে, প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগে গ্রাম গেছে পাল্টে, গ্রামীণ সংস্কৃতিও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। একটা কথা বলা হয়ে থাকে সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে ভাষা হারিয়ে যায়। কৃষিভিত্তিক সমাজে একটা সময় ব্যবহৃত হতো দীর্ঘদিনের প্রচলিত কৃষি উপকরণ লাঙল-জোয়াল, বিদে-ফলা। কৃষি-প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে; এখন পূর্বের শব্দগুলো হারাতে বসেছে। গ্রামীণ খেলা( ছিকে, গাদি, পলাপলি, কিতকিত্, হাডুডু ইত্যাদি খেলাগুলো হারিয়ে গেছে; সেই সাথে হারিয়ে গেছে প্রচলিত শব্দগুলো। এই হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি বয়স্কদের কাছে মায়াময় স্মৃতি, নবপ্রজন্মদের কাছে অপরিচিত। কিন্তু ঐতিহ্য বিমুখ জাতি আত্মপরিচয়হীন। ভাষাভিত্তিক, নৃতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক পরিচিতি ভুলে গেলে চলবে কেন? সেখানে যে আমাদের শিকড়! শিকড়ের সন্ধান করা নবপ্রজন্মের কর্তব্য। সেই আত্মপরিচয়ের পথটা দেখিয়েছেন লেখক তার ছেলেবেলার বর্ণনায়। এখানেই লেখক হিসেবে তার অনন্যতা, তার অসাধারণ কৃতিত্ব।
লেখকের বিষয় নির্বাচন এবং আটপৌরে গদ্যরীতি পাঠককে বিমুগ্ধ করে। প্রথম পর্বে লেখক লিখেছেন, ‘সন্ধ্যা হলে হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসতাম। খেজুর পাতার শীতল পাটির মাঝখানে হারিকেন রেখে চারপাশে স্লেট পেন্সিল বই খাতা কলম নিয়ে পড়তাম পরিবারের পাঁচ/ছয় ভাই। আমাদের কোনো গৃহশিক্ষক ছিল না। মাঝেমধ্যে আব্বা পড়াতেন। তিনি বলতেন, ‘লেখাপড়া হলো ব্যক্তিগত উদ্যোগ যার ওপর কারো প্রভাব খাটে না। পাশাপাশি আব্বা ধর্মীয় ও নৈতিক জ্ঞান দিতেন।’
তার এই বর্ণনায় একটা সময়-চিত্র আর পারিবারিক শিক্ষার পরিচয় মেলে। স্লেট-পেন্সিল, খেজুর পাতার শীতল পাটিতে বসে হারিকেনের আলোয় গৃহপাঠ চলছে। মাঝেমধ্যে বাবার কড়া নজরদারি, হিতোপদেশ( এমনটি আর চোখে পড়ে না। চাঁদনী রাতে উঠোনে পাটি পেতে গল্পের আসর, দাদীর মুখে রাক্ষস-খোক্কস, ভূত-প্রেত, জলকুমারী আর চাঁদের বুড়ির গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ার দিনগুলো নিজস্ব গদ্য স্টাইলে তুলে ধরেছেন লেখক। জীবনানন্দের এক কবিতায় পড়েছি (
‘চারদিকে বাঙালির ভিড়
বহুদিন কীর্তন ভাসান গান রূপকথা যাত্রা পাঁচালীর
চরম নিবিড় ছন্দে আজো শ্রাবণের জীবন গোঙায়,
আমারে দিয়েছে তৃপ্তি।’
শহিদুল ইসলামকে তৃপ্তি দিয়েছে এই জীবনের স্রোত।
কাব্যে জীবনানন্দ দাশ বাঙলার ঐতিহ্য, যাপিত জীবন তুলে ধরেছেন। ঠিক একই কাজ করেছেন মাটির কাছাকাছি থাকা শক্তিমান লেখক শফিকুল ইসলাম। তিনি অতীতের স্মৃতি ( বায়স্কোপ, গরু দিয়ে হাল চাষ, ঢেঁকি দিয়ে ধান ভানা, গরুর ঘানিতে সরিষার তেল ভাঙানো এরকম আরও বিলুপ্ত প্রায় গ্রামীণ জীবনের অনুসঙ্গ অতি যত্নে জীবন্ত করে হাজির করেছেন, ছেলেবেলার স্মৃতি রোমন্থনে।
কালের আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস-সংস্কার-কুসংস্কার তাকে নাড়া দিয়েছে। লেখক সরল বাক্যবিন্যাসে আর ভাবাবেগ প্রকাশের অনুপম ভঙ্গিতে অন্তরের সমস্ত মাধুরি মিশিয়ে সেই সব কথকতা লিখেছেন তার হিরন্ময় ছেলেবেলার গল্পে। তার লেখায় অজপাড়াগাঁয়ের মানুষ, মানুষের জীবনের গল্প উঠে এসেছে দারুণ বাস্তবতায় এবং সাথে সাথে তা পাঠকনন্দিত হয়েছে ফেসবুক এবং মুদ্রিত উভয় মাধ্যমে।
লোকসাহিত্যকে বলা হয় লোকমনের ফসল। লোকমনের কথাগুলো যে সবসময় সুশৃঙ্খল বিন্যাসে প্রকাশ পায় তা কিন্তু না, অমার্জিত কথনও উচ্চারিত হতে দেখা যায়। যেমনটি লেখক বলেছেন পর্ব-৩ এ মৌচাক ভাঙার মন্ত্রে ( ‘আদা মাচি পাদা মাচি / ক্ষুদে মদুর চাক,/ আমি আইচি মদু ভাঙতি / চুপ করে থাক।’
‘আমার ছেলেবেলা’য় আদ্যোপান্ত লোকমনের মুখের ভাষাকে অপরিবর্তিত রেখেছেন লেখক। তার লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি( ‘আমি চেয়ার বেয়ে উঠে চুপিচুপি দই খেয়ে গ্লাসে পানি ঢেলে দিতাম; দই খেতে গিয়ে এই অবস্থা দেখে দাদা লাঠি উঁচিয়ে দাদিকে বলতো, কিরাম দই বসাও হে, দৈনিক পানি কেটে যায়; দাদি তখন দৌঁড়ে সরে গিয়ে দাদাকে বলতো, বুড়ো মিনসে ম’লো না।’ এই সরস বর্ণনায় কী মুগ্ধ না হয়ে পারা যায়?
একথা সত্য যে, লেখকের সৃষ্টিতে পারিপার্শ্বিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ছাপ পড়ে। শফিকুল ইসলাম এর ব্যতিক্রম না, তবে মনোযোগী পাঠক লক্ষ করবেন, তিনি তার সাহিত্য প্রতিভায় তাকে একটা নিজস্ব রঙের ছোঁয়া লাগাতে পেরেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছিলেন ( ‘নৌকা সব দেশেই নৌকা, রথ সব দেশেই রথ, কিন্তু বর্মা দেশের নৌকা, বাংলাদেশের নৌকা, মিশর দেশের নৌকা, গ্রীস দেশের নৌকা সবার ভিন্ন ভিন্ন গঠন প্রণালী রয়েছে।’
হ্যাঁ, লেখক শফিকুল ইসলাম গ্রামীণ জনপদের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে ব্যর্থ হন নাই। প্রখ্যাত লেখক হাবিবি জহির যথার্থই মন্তব্য করেছেন, ‘আমার ছেলেবেলা’য় আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে। গবেষণাধর্মী গ্রন্থটি কালের স্বাক্ষর হিসেবে সবার সংগ্রহ করা উচিত।’
প্রবাদ বাক্যে মানুষের অভিজ্ঞতার প্রকাশ উঠে আসতে দেখি। লেখক প্রায় প্রতিটি পর্বে প্রাসঙ্গিক বর্ণনায় এনেছেন প্রবাদ বাক্য। প্রবাদে বিরহিত মনের ছায়া পড়েছে তার লেখায় এভাবে (
‘সই লো সই / মনের কথা কই / সই গিয়েছে শ্বশুর বাড়ি / ক্যামনে একা রই।’
কখনো উঠে এসেছে উপদেশের বাণী, প্রবাদ, যেমন (
‘আপন চেয়ে পর ভালো / পরের চেয়ে জঙ্গল ভালো।’
অথবা,
‘নেপলি পুছলি ঘর / কামালি জুমালি বর।’
এই অসাধারণ বাণীগুলোতে গ্রামীণ জীবনের অভিজ্ঞতা, সহজিয়া মানস দর্শন বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।
বইটি পাঠে বয়স্ক পাঠক ও লেখকের মাঝে নিবিড় যোগাযোগ অনায়াসে সম্ভব হবে বলে মনে করি। পাঠক নিজের অজান্তেই এতে খুঁজে পাবে নিজেরই বালকবেলা। লেখক যখন বলে, ‘টিফিন পিরিয়ডে স্কুল মাঠে একটা বৃত্তাকার দাগ টেনে ছুঁ খেলা খেলতাম। তার ভেতর থেকে একে একে একদমে ছুঁ গেয়ে আবার সেই গোলঘরে ফিরে আসতে হতো।’
এ বর্ণনার সাথে বয়স্কদের শৈশব-কৈশোর মিলে যায়। এ যেন তার আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ, নিজেকেই আবিস্কার নতুন করে। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সাঁকো নির্মাণ, অস্তিত্বের সূত্রসন্ধান ( এখানেই বইটি অনন্য। একটা সুমধুর বর্ণনা তুলে ধরবার লোভ সামলাতে পারছি না। ‘চৈত্র মাসে ভৈরব নদীর তীরে মেলা বসতো। সকাল সকাল শাখা-সিঁদুর, চুড়িমালা, রসগোল্লা-জিলাপি, মেটেহাঁড়ি কোলা বেচাকেনার ধূম পড়ে যেত।… মেলায় গিয়ে প্রথমেই রসগোল্লা আর জিলাপি পেট ভরে খেয়ে নিতাম। তারপর অনেক ঘুরেফিরে পছন্দ করে লালপাথর নীলপাথরের আঙটি কিনতাম, দাদীর জন্যে নিতাম তামার আঙটি। আটআনা পয়সা দিয়ে টিকিট কিনে বায়স্কোপ দেখতাম।’ এমনই সরস বর্ণনায় পাঠক ফিরে যায় তার সোনালি অতীতে।
পাঠকের হৃদয়ের ক্যানভাসে এই সোনালি অতীত কম্পন তুলবে, মনে হবে এ যেন তার হারানো হিয়ার এক নিকুঞ্জ। লৌকিক খেলাধুলার অনেক নাম ‘আমার ছেলেবেলা’ পাঠে জানতে পারি। গ্রামীণ চিত্তবিনোদনের এই বিচিত্র খেলাগুলো ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে অথবা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে খেলা সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক শব্দগুলো। শফিকুল ইসলামের ভাষায় : ‘কাঁচের গুলি খেলায় আমরা কিছু শব্দ বলতাম, যার গর্ভধারিণী কে তা আজও সনাক্ত করা যায়নি। যেমন( নট কিরিচ, নট নড়নচড়ন, চুনুক। খেলায় কেউ ফাঁকি দিলে তাকে কান্টি বলা হতো। ধানকাটা শেষে ফাঁকা মাঠে চলতো ডাংগুলি খেলা। এই খেলায় একটা আঞ্চলিক শব্দগুচ্ছ বলে গণনা হতো, তা এমন( হেড়ে ফেড়ে নেজ চোমর চার চোক এক দুই, চার চোক এক তিন। খেটে খেলা নামক এক লৌকিক খেলা ছিল যাতে নানারকম ছড়া গাইতে হতো, তন্মধ্যে অন্যতম( আকাটি বাকাটি ঝিঙের ঝোল, তামার আঙটি গুনে গুনে তোল। কিংবা আকাটি বাকাটি ঝিঙের ঝোল, বিএসসি ফেল করে হইছি পাগল।’
এইসব খেলাগুলোর আদি উৎস ও বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিতভাবে এক এক এলাকায় এক একভাবে খেলা হয় এমনই মনে করেন লেখক। মানবচিত্তে সেই আদিম কাল থেকে বাসা বেঁধেছে নানা ধরনের সংস্কার। বিচিত্র বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মজাদার সব ঘটনা নিয়ে এসেছেন লেখক। তার ভাষায় : ‘…. ভোররাতে বন্ধুরা দল বেঁধে পালি হাতে মাঠে যেতাম। ঘোর ঠেলে যাবার সময় আগে পরে যাওয়া নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রায়ই ঠেলাপাড়াপাড়ি হতো। ঠেলা পাড়াপাড়ি হতো এজন্য যে, আমাদের বিশ্বাস ছিল ( আগে গেলে বাঘে খায়, / পিছনে গেলে ভ‚তে খায়।’
‘আমার ছেলেবেলা’ কালের স্বাক্ষর, যাপিত জীবনের ইতিহাস। গ্রামীণ জনপদের নাড়ির স্পন্দন পেয়ে যাই তার লেখায়। অনেক লোকসংস্কার, লোকবিশ্বাস তুলে ধরেছেন লেখক, তা বিজ্ঞানসম্মত না হলেও মিশে আছে আমাদের জীবনের স্রোতে সেই অনাদিকাল থেকে।
অনেক গ্রামীণ ঐতিহ্য, হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি মলাটাবদ্ধ করেছেন তিনি। জানি, সংস্কৃতি হলো সভ্যতার সার নির্যাস। ভবিষ্যতে গ্রামীণ জনপদের সংস্কৃতি রচনায় শফিকুল ইসলামের ‘আমার ছেলেবেলা’ একটা আকরগ্রন্থ হয়ে থাকবে মনে করি।
দেশভাগের পূর্বে অবিভক্ত ভারতে নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত চুয়াডাঙ্গা-জীবননগর। জাতীয় জীবনের বিভিন্ন আন্দোলন যেমন( ফরায়েজি আন্দোলন, সিপাহী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ সবকিছুই এই জনপদের মানসপটে অঙ্কিত। এই অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির রূপকার রবীন্দ্রনাথ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সরলাদেবী চৌধুরানী প্রভৃতি বিখ্যাত সাহিত্যিকগণ। তাদেরই মানসপ্রসূত এই জনপদের লেখকেরা। শফিকুল ইসলামও এর ব্যতিক্রম না। তার লেখা ‘আমার ছেলেবেলা’ এই জনপদকে স্পর্শ করেছে। এ অঞ্চলের উৎসব-পার্বণ, বিচিত্র খেলা, আচার-সংস্কার-কুসংস্কার, সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধ, প্রাচীন ঐতিহ্য, পল্লির আনাচে-কানাচে ভষ্মাচ্ছাদিত মণিমুক্তা তুলে ধরেছেন লেখক। সেকারণে কালের স্বাক্ষর হিসেবে বইটির মূল্য অমূল্য বটে!

গ্রন্থের নাম : আমার ছেলেবেলা (১ম খণ্ড)
লেখক : মোঃ শফিকুল ইসলাম
প্রকাশক : সন্ধান প্রকাশনী, ঢাকা -১১০০
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি-২০২২ বইমেলা
পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৬৪, মূল্য : ১৫০ টাকা