ঢাকা ০২:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
চুয়াডাঙ্গার আলো

ফিরে দেখা : সময়ের অনুভবে হামিদুল হক মুন্সী 

  • বাংলাবাঁক
  • আপডেট : ০৮:২১:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অগাস্ট ২০২৪
  • 220


হুমায়ুন কবীর 



মনোরম প্রচ্ছদের একটি বই — “সময়ের অনুভবে হামিদুল হক মুন্সী।” যাকে নিয়ে লেখা এই বই সেই মুন্সী স্যার সেদিন বইটি আমার হাতে  ধরিয়ে দিলেন। বললেন, এটার  রিভিউ  লিখে দিও। ব্যস্ততা ছিল, সপ্তাহ খানেক  বাসায় পড়ে ছিল বইটা —একেবারেই পাতা উল্টানো হয়নি। সহসা ফোন পেলাম : হুমায়ুন, রিভিউটা  কতদূর?
: না,মানে, আমি এই শুরু করবো.. আর কি।
: হ্যাঁ, শুরু করো।
: জ্বি, দেখি এই আজই..
: ওকে। আর শোন, শুরু করলেই, দ্যাখবা শেষ করতে পেরেছো।
“শুরু করলেই শেষ করতে পারবা” —- কথাটা  মনে ধরলো,মনে হলো প্রাজ্ঞজনের বাণী চিরন্তনী।
কী আর করা! পড়ে  লিখলাম :
“কিছুক্ষণ বাদে বিচারকত্রয় তাঁদের নম্বর যোগ করে রায় দিলেন—-প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন হামিদুল হক মুন্সী। ” প্রতিযোগিতার বিষয় : কালো নিয়ে কম্পিটিশন। ১৯৮৫ সালে  সাহিত্য পরিষদের এই বিচিত্র কম্পিটিশনে যিনি প্রথম হয়েছিলেন তাকে নিয়ে ২০২১ – এ একটা প্রবন্ধ লেখা হলো —” হামিদুল হক মুন্সী : আমাদের কালো মানিক।” প্রবন্ধটি লিখেছেন  চুয়াডাঙ্গা পৌর কলেজ ও  চুয়াডাঙ্গা হোমিওপ্যাথি কলেজের মাননীয়  অধ্যক্ষ মো: শাজাহান আলী বিশ্বাস। প্রবন্ধে  তিনি লিখেছেন, হামিদুল হক মুন্সী চুয়াডাঙ্গা  সাহিত্য পরিষদ, চুয়াডাঙ্গা  প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে থেকে অনেক অবদান রেখেছেন। ইতোমধ্যে তার লেখা অনেকগুলো বই বাজারে এসেছে। এর মধ্যে গবেষণাধর্মী ইতিহাস গ্রন্থও রয়েছে। তিনি চুয়াডাঙ্গার কালো মানিক (Black Diamond) বলে খ্যাত। মানুষটি দেখতে যেন আফ্রিকার উগান্ডার ইদি আমিন।  হ্যাঁ, কালো  হলেও  তাঁর মনটি অতি সাদা।”

ইদি আমিন হামবড়া স্বভাবের মানুষ ছিলেন। শেষতক  দেশ ত্যাগ করেছিলেন। আমাদের কালো মানিক অবশ্য  তা না। এই মাটি, এই মানুষের মাঝেই তাঁর যাপিত জীবন। মালেকা হক মাখন , সাবেক বিভাগীয় প্রধান (বাংলা)  চুয়াডাঙ্গা পৌর কলেজ, একজন স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জয়িতা তাঁর সহধর্মিণী।  এই সংকলনে তাঁর লেখা –“-চুয়াডাঙ্গা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন ও হামিদুল হক মুন্সী “শীর্ষক নিবন্ধে দেখতে পাই : কলম সৈনিক হিসেবে পদকপ্রাপ্ত লেখক হামিদুল হক মুন্সী একজন আলোর পথের যাত্রী।  আলোকিত মানুষ হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্ত মানুষটি সাদা মনের মানুষ হিসেবে সমাদৃত থাকুক,কামনা এটাই।

সময়ের অনুভবে : হামিদুল হক মুন্সী ” গ্রন্থটি আসলে হামিদুল হক মুন্সীর “কালো মানিক “হয়ে ওঠার গল্প।  তবে সত্য এই যে, এ ধরণের সংকলন সাধারণত মৃত্যুর পর স্মারক গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হতে দেখি। সম্ভবত অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সী জীবদ্দশায় তাকে নিয়ে মূল্যায়নটা  দেখে যেতে চেয়েছেন। তা ইচ্ছেটা  মন্দ না– অন্যের চোখে ফিরে দেখাটা বরং ভালো। মুন্সী স্যারের   বর্ণাঢ্য জীবনের সাথে যুক্ত আত্মীয়, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী অনেকেই লেখা দিয়েছেন। মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দে  অস্তিত্ব লাভ করেছে সময়ের অনুভবে : হামিদুল হক মুন্সী গ্রন্থটি। নানাজন , নানান দিক থেকে হামিদুল হক মুন্সীকে ছুঁতে চেষ্টা করেছেন; কিন্তু পুরোটা  পেরেছে কই? না পারুক, ছুঁতে না পারার ব্যর্থতা দীর্ঘ  উচ্চতার প্রমাণ। নজির আহমেদ (অবসর প্রাপ্ত ব্যাংকার বর্তমান সাধারণ সম্পাদক, চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ) যথার্থই বলেছেন, “বিচিত্র কর্মময় জীবনের বাঁকে বাঁকে জনাব হামিদুল হক মুন্সী অর্জন করেছেন অসংখ্য মূল্যবান পদক, পুরস্কার ও সম্মাননা। হয়েছেন শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষা সংগঠক।”
তবু্ও কথা থেকে যায়, তিনি একজন কবি,শতাধিক লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক। ভুলে গেলে চলবে না, তিনি’ বয়সী রোদের বিউগল’, ‘মাধবী,শুধু তোমাকেই’, ‘অবরুদ্ধ নগরে আছি’ প্রভৃতি অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ  সৃজন করেছেন। এই সংকলনে  তাঁর  কবিতার  বই—‘মাধবী,শুধু তোমাকেই’ শিরোনামে একটা লেখা পেলাম। ফজলুল রহমান খানের এই  লেখাটিকে কাব্য-সমালোচনা বলা চলে না—এইসব ভেবে মনে হলো সবদিকে আলো পড়েনি, কিছু অন্ধকার রয়ে গেছে।

মনে হলো বেলা শেষ হয়নি, শেষ হয়েছে খেলা। হামিদুল হক মুন্সীর কালো মানিক হয়ে ওঠাকে শীর্ষ বিন্দু ধরে বিশিষ্ট লেখকেরা  যেন  উপসংহার টেনে বসলেন! তিঁনি এখনো দিব্যি বেঁচে, সুস্থ না হলেও মোটামুটি সচল। প্রাজ্ঞজনে  বলে, ওস্তাদের মার শেষ  রাতে। এই যে রবীন্দ্রনাথ শেষ জীবনে ছবি এঁকে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিলেন। শুধু কি তাই?  মৃত্যু শয্যায় মুখে মুখে রচিলেন—“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি, বিচিত্র ছলনাজালে, হে ছলনাময়ী। “একজন সৃষ্টিশীল মানুষ  কখন যে কী দেখিয়ে দেয়, কে জানে? হয়তো হামিদুল হক মুন্সীর মাষ্টার পিচটা এখনো লেখাই হয়নি। অথচ লিখিয়েরা  তাঁকে নিয়ে যেন একটা  কনক্লুজন টেনে দিলেন ! এটাও  সংকলিত  লেখাগুলোর একটা  সীমাবদ্ধতা বলেই মনে হচ্ছে।

বইটি পড়তে পড়তে শেষে এসে একটা ধাক্কা খেলাম। আরে!  লেখকবৃন্দ যে সবাই হামিদুল হক মুন্সীর প্রিয়জন; কেউ শত্রু না। নিজেকে নিয়ে নিজে বলতে গেলে যেমন নৈর্ব্যক্তিক হওয়া যায় না। প্রিয়জনও সামনাসামনি অপ্রিয় সত্য বলে না, লুকিয়ে রাখে।  অথচ ভালো মন্দ মিলায়ে যে বিচার সেই বিচারই যথার্থ বিচার। নৈর্ব্যক্তিক না হতে পারলে কি বিচারের লাইন ঠিক থাকে, বলুন তো?
 মুঠো ফোনে  ০১৭১২০১০৯৪৫ — এ দিলাম কল ।
ওপার থেকে : হ্যালো, হুমায়ুন। বলো…
: জি, বলছিলাম যে, আপনার বুঝি কোন শত্রু নেই!
: কেন? কেন?
:না,মানে.. বলছিলাম যে,লেখাগুলো কি আপনি এডিট করেছিলেন?
: নাহ্!  বিন্দুমাত্র এডিট করি  নাই। যে, যেমনটি লিখেছে, তেমনই মুদ্রিত হয়েছে। তোমার লেখাটাও কোন এডিট করবো না,প্রেসে ইমেইল করে দিব।

তিনি  কবি, সংবেদনশীল মানুষ, বলা যায়, প্রাজ্ঞজন। এ বিষয়ে কথা কন্টিনিউ করাটা  শোভন মনে করিনি। ফোন রেখে আবার চোখ রাখলাম গ্রন্থে। বিষ্ময়ের সাথে দেখলাম, লেখকের প্রতি ভক্তির আতিশয্য বাদ দিলেও  অনিবার্য  থেকে যায়–একজন কবি,একজন লেখক, একজন সংগঠক, একজন  প্রতিষ্ঠান প্রধান, সর্বোপরি একজন মানুষ হামিদুল হক মুন্সী। অজান্তেই উচ্চারণ করলাম, এতগুলো গুণের যে মানুষটি  তাঁর ত্রুটি  তো উপেক্ষার যোগ্য, তাই না?

“Do so good that no one can ignore you”—এই  প্রাজ্ঞ উক্তি মনে পড়তেই লজ্জাবতী লতাগুল্মের মতো নুইয়ে গেলাম। অধ্যক্ষ শাজাহান আলী বিশ্বাসের কথা মনে হলো, হামিদুল হক মুন্সী কালো বটে, কিন্তু মনটা বড় সাদা। আমি তাঁকে দূর থেকে দেখেছি বেশি, কাছ থেকে দেখেছি কম। আমার দেখা বিস্তৃত না,সীমানা প্রাচীরে আবদ্ধ। আমি তাঁকে নিয়ে এই সংকলনটা পড়ে  সাদা মনটা খুঁজে ফিরছি। বিভিন্নজন  বিভিন্ন মাত্রা থেকে তাঁকে দেখেছেন। তাদের লেখায়  মুন্সী স্যারের  বিপুল কর্মময় জীবনের  পরিচয় পাচ্ছি। জানতে পারছি, চুয়াডাঙ্গার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রথম তিনিই রচনা করেছেন। তাঁকে আবিস্কার করছি একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে। ২৭২-পৃষ্ঠার এই বইয়ে পাতায় পাতায় তাঁর  দেখা পাচ্ছি। আস্তে আস্তে   খসে পড়ছে তাঁকে নিয়ে  আমার অস্পষ্টতার পর্দা।

তাঁর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো: মাহতাব উদ্দিন। ভদ্রলোক প্রবীণ সাংবাদিক এবং খ্যাতিমান শিশু সংগঠক। এই  শিক্ষকের মন্তব্যে আপ্লূত হলাম। “আমার প্রিয় ছাত্র : হামিদুল হক মুন্সী ” শীর্ষক প্রবন্ধে  তিনি লিখেছেন “মেধাবী ছাত্র ছিল হামিদুল। ঐ বয়সেই তাঁর ব্যক্তিত্বের শিখা দেখা যেত। শিক্ষকদের সাথে ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলার সময় আমরা তার যোগ্যতার সাথে পরিচিত হই।” স্যারের মন্তব্য পাঠে মনে হলো, উঠন্ত মুলা পত্তনেই চেনা যায়।

কিছু লেখা পড়ে মনে হয়েছে, সৃষ্টিশীল মানুষদের ভেতর থেকে কে যেন ঠ্যালা দেয়—রবীন্দ্রনাথ একদা বলেছিলেন, কে যেন আমাকে দিয়ে লেখিয়ে নেয়। সমাজের   প্রতি, মানুষের প্রতি  লেখকদের  একটা দায়বদ্ধতা থাকে। হামিদুল হক মুন্সী  মনে মনে উপলব্ধি করেছিলেন  চুয়াডাঙ্গায় একটা সাহিত্য পরিষদ থাকা প্রয়োজন। চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সাবেক সভাপতি সরদার আলী হোসেন—“চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠায় হামিদুল হক মুন্সী” প্রবন্ধে  লিখছেন, “স্বাধীনতা পরবর্তী চুয়াডাঙ্গায় বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন ব্যানারে সাহিত্য সংগঠনগুলো  পরিচালিত হয়ে আসছিল। মাঝিবিহীন নৌকার মতো  চলছিল সাহিত্যচর্চা।  সাহিত্যচর্চাকে একই  প্লাটফর্মে নিয়ে আসার  চেষ্টাগুলো বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল। তখন সামনে  এসে হাল ধরেছে হামিদুল হক মুন্সী। চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জনাব শফিউদ্দীন ১৯৮৩ সালে “ঐতিহাসিক পটভূমিতে চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ” শিরোনামে একটা তথ্যবহুল  প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে লেখক উল্লেখ করেন :” গতিশীল চিন্তা ও অধ্যবসায় যেকোনো উদ্দ্যেশ্য বাস্তবায়নের মৌলিক শর্ত। সর্বজন-স্বীকৃত এ-তত্ত্বের যথার্থতা প্রমাণে তরুণ কবি হামিদুল হক মুন্সী পরবর্তীকালে ‘চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা ও তার স্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টির এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। “এজন্য তিনি  স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ইনশাআল্লাহ। চুয়াডাঙ্গার কৃতিসন্তান বহু গ্রন্থ রচয়িতা রাজিব আহমেদ হামিদুল হক মুন্সীকে দেখেছেন সময়ের আগে ছুটে চলা ক্ষণজন্মা পুরুষ হিসেবে। বলেছেন, হামিদুল হক মুন্সী সারাজীবন তাঁর বয়সের  আগেভাগে ছুটে চলা মানুষ। সাধারণত যে বয়সে মানুষ যে কাজ করে, সেই কাজগুলো স্বাভাবিক সময়ের আগেই করে দেখিয়েছেন তিনি।

আগেভাগে ছুটে চলা এই মানুষটি এখন ক্লান্ত—ঠিক বয়সের ভারে না, রোগের ভারে। ইচ্ছে ছিল, কলেজ-অধ্যক্ষ থেকে অবসরে এসে সাহিত্য চর্চায় মন দিবেন। কিন্তু শরীর সেই অনুমোদন দেয়নি। লেখালেখি করেন না বললেই চলে। কলেজবন্ধু গাজী আবুল কালাম আজাদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, লেখালেখিটা ধরে  রাখিনি, আবার ছেড়েও দিইনি। এ প্রসঙ্গে মো: আনছার আলী লিখেছেন, লেখালেখির জগতে এই অঞ্চলে তাঁর সুনাম আকাশচুম্বী। কাব্য করে তিনি লিখেছেন :
একাধারে কবি তিনি সাংবাদিকও বটে
তাঁর মতো গুণীজন নেই এ তল্লাটে।
প্রাবন্ধিক, গবেষক, দক্ষ সংগঠক
তাঁর লেখা পড়ে প্রীত হয় সব পাঠক।

সাত-সাতটি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। যখন যে কলেজে থেকেছেন,আপন মেধা -শ্রমে গড়ে তুলেছেন সেই  প্রতিষ্ঠান। ভালোবাসায় অন্যকে মুগ্ধ করেছেন আর নিজেও সিক্ত হয়েছেন  ভালোবাসায়। তাঁর ছাত্রী, আব্দুল হাই ডিগ্রি কলেজ, নড়াইলের  ফারজানা ববি লিখছেন, “তিনি নড়াইলের মাটি, মানুষ, গাছপালা, নদনদীকে আপন করে নিতে পেরেছিলেন। এটিই স্যারের কৃতিত্ব,গর্ব এবং নিশ্চয় অহংকারও।” মুন্সী স্যারের ভাগ্নী ডা. তাসনিয়া তাছনিন তামান্নার লেখায় এক রাশভারি প্রিন্সিপাল হামিদুল হক মুন্সীকে আমরা দেখতে পাই। ছুটিতে মামা বাড়ি এলে রাশভারি মামার সামনে জড়সড় হয়ে থাকতেন তিনি।

সমগ্র লেখায় একটা বিষয় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে সেটা হচ্ছে মানুষের ভালোবাসা। “হামিদুল হক মুন্সী, যাঁকে ভালোবাসা যায়”—-কামাল মাহমুদের লেখাটা পড়ে আপ্লূত হলাম। কামাল মাহমুদ লিখেছেন, বিখ্যাত এক মনীষী বলেছেন, ‘পৃথীবিতে খুব কম মানুষ আছে যারা প্রেম দিতে জানে,আরও কম আছে যারা নিতে জানে’—স্যার দুটোই জানেন। সুজাতপুর ডিগ্রি  কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো: আতাউল্লাহ  তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আকাশের চাঁদ ‘ হিসেবেই হামিদুল হক মুন্সী আমাদের কলেজে আবির্ভূত হয়েছিলেন। লেখায় ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, সাদিয়া সিদ্দিকা জিতু, মো: মেহেদী হাসান হৃদয়, এম এ ওয়াদুদ, ফরিদা ইয়াছমিন, মো: আনোয়ার হোসেন, হেলেনা পারভীন প্রমুখ। তাঁকে নিয়ে অসাধারণ লিখেছেন, রফিকুর রশিদ,, সরদার আল আমিন, বনোয়ারী লাল বাগলা, চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু, ইদ্রিস মন্ডল, আহাদ আলী মোল্লা, পরেশ কান্তি সাহা এবং আরও অনেকে। ড. অখিল পোদ্দারের লেখা ‘সক্রেটিস এবং অদ্বিতীয় হামিদুল হক মুন্সী’ পড়ে  মুগ্ধ হলাম।

এ-গ্রন্থে সংকলিত লেখাগুলো ব্যক্তি এবং সংগঠক হামিদুল হক মুন্সীকে নিয়ে  লেখা। লেখকদের মূল্যায়নে তিনি সফল  প্রতিষ্ঠান প্রধান  এবং বড়  সংগঠক  এমনই মনে হয়েছে।  আমি মাঝে তাঁর কবিতার বই পড়ে  একটা নিবন্ধ লিখেছিলাম। একদিন বিকেলে  উনার বাসায় বসে নাস্তা খেতে খেতে বলে ফেললাম, আপনি কবিতায় টিকে থাকবেন বলে মনে হয় না। বললেন, আমিও মানি।দ্যাখো, হুমায়ুন, আমার বোধহয় বড় পরিচয় এই যে, আমি একজন  সংগঠক। আমি বললাম, দেখুন, ড. মুন্সি আবু সাঈফ স্যার একসময়ে সাহিত্য পরিষদের আলোচনায় আপনার মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গা বইয়ের বেশ তারিফ করলেন। বললেন, বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য রাখার সময় বইটা থেকে উদ্ধৃতি দিই। এই বইটার জন্য কি মানুষ আপনাকে মনে রাখবে না? দেখলাম, হামিদুল হক মুন্সীর চোখেমুখে তৃপ্তির আভা— মনে হলো এই তো সেই কালো মানিক যাকে বইয়ের পাতায়  খুঁজে ফিরছি।

কোন কোন লেখায় ব্যক্তি মানুষ হামিদুল হক মুন্সী উঠে এসেছে। লেখকদের জীবনে আদি, মধ্য, অন্ত পর্ব থাকে। জীবনের প্রথম পর্বে মুন্সী সাহেব একটা সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মানের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন।  উদ্দেশ্যমুখী সাহিত্য চর্চা করতেন। একদা অনেক রোমান্টিক পদাবলিও  লিখেছেন। পরে স্থানীয় ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্থানীয় সংগ্রাম- আন্দোলনের ইতিহাস  নিয়ে লিখেছেন। তাঁর এই বহুমাত্রিক প্রতিভার বৈচিত্র্যকে ধরতে চেষ্টা করেছেন সম্মানিত লেখকেরা। তাঁর  কাব্য -ভাবনা ছাড়া অন্য দিকগুলোর একটা  তথ্যনির্ভর, স্মৃতিনির্ভর মূল্যায়ন  স্থান পেয়েছে এই সংকলনে। “নানা হামিদুল হক মুন্সীর মালা” একসূত্রে গাঁথবার এই প্রচেষ্টাকে আমরা অভিনন্দন জানাই।

 


ফিরে দেখা :  সময়ের অনুভবে  হামিদুল হক মুন্সী
সম্পাদনা : মালেকা খান মাখন
প্রকাশক : গতিধারা, ৩৮ বাংলাবাজার, ঢাকা–১১০০
 পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৭২ মূল্য: ৫০০ টাকা

 

লেখক : হুমায়ুন কবীর, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক। থাকেন চুয়াডাঙ্গা। 
জনপ্রিয় পোস্ট

চুয়াডাঙ্গার আলো

ফিরে দেখা : সময়ের অনুভবে হামিদুল হক মুন্সী 

আপডেট : ০৮:২১:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অগাস্ট ২০২৪


হুমায়ুন কবীর 



মনোরম প্রচ্ছদের একটি বই — “সময়ের অনুভবে হামিদুল হক মুন্সী।” যাকে নিয়ে লেখা এই বই সেই মুন্সী স্যার সেদিন বইটি আমার হাতে  ধরিয়ে দিলেন। বললেন, এটার  রিভিউ  লিখে দিও। ব্যস্ততা ছিল, সপ্তাহ খানেক  বাসায় পড়ে ছিল বইটা —একেবারেই পাতা উল্টানো হয়নি। সহসা ফোন পেলাম : হুমায়ুন, রিভিউটা  কতদূর?
: না,মানে, আমি এই শুরু করবো.. আর কি।
: হ্যাঁ, শুরু করো।
: জ্বি, দেখি এই আজই..
: ওকে। আর শোন, শুরু করলেই, দ্যাখবা শেষ করতে পেরেছো।
“শুরু করলেই শেষ করতে পারবা” —- কথাটা  মনে ধরলো,মনে হলো প্রাজ্ঞজনের বাণী চিরন্তনী।
কী আর করা! পড়ে  লিখলাম :
“কিছুক্ষণ বাদে বিচারকত্রয় তাঁদের নম্বর যোগ করে রায় দিলেন—-প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন হামিদুল হক মুন্সী। ” প্রতিযোগিতার বিষয় : কালো নিয়ে কম্পিটিশন। ১৯৮৫ সালে  সাহিত্য পরিষদের এই বিচিত্র কম্পিটিশনে যিনি প্রথম হয়েছিলেন তাকে নিয়ে ২০২১ – এ একটা প্রবন্ধ লেখা হলো —” হামিদুল হক মুন্সী : আমাদের কালো মানিক।” প্রবন্ধটি লিখেছেন  চুয়াডাঙ্গা পৌর কলেজ ও  চুয়াডাঙ্গা হোমিওপ্যাথি কলেজের মাননীয়  অধ্যক্ষ মো: শাজাহান আলী বিশ্বাস। প্রবন্ধে  তিনি লিখেছেন, হামিদুল হক মুন্সী চুয়াডাঙ্গা  সাহিত্য পরিষদ, চুয়াডাঙ্গা  প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে থেকে অনেক অবদান রেখেছেন। ইতোমধ্যে তার লেখা অনেকগুলো বই বাজারে এসেছে। এর মধ্যে গবেষণাধর্মী ইতিহাস গ্রন্থও রয়েছে। তিনি চুয়াডাঙ্গার কালো মানিক (Black Diamond) বলে খ্যাত। মানুষটি দেখতে যেন আফ্রিকার উগান্ডার ইদি আমিন।  হ্যাঁ, কালো  হলেও  তাঁর মনটি অতি সাদা।”

ইদি আমিন হামবড়া স্বভাবের মানুষ ছিলেন। শেষতক  দেশ ত্যাগ করেছিলেন। আমাদের কালো মানিক অবশ্য  তা না। এই মাটি, এই মানুষের মাঝেই তাঁর যাপিত জীবন। মালেকা হক মাখন , সাবেক বিভাগীয় প্রধান (বাংলা)  চুয়াডাঙ্গা পৌর কলেজ, একজন স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জয়িতা তাঁর সহধর্মিণী।  এই সংকলনে তাঁর লেখা –“-চুয়াডাঙ্গা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন ও হামিদুল হক মুন্সী “শীর্ষক নিবন্ধে দেখতে পাই : কলম সৈনিক হিসেবে পদকপ্রাপ্ত লেখক হামিদুল হক মুন্সী একজন আলোর পথের যাত্রী।  আলোকিত মানুষ হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্ত মানুষটি সাদা মনের মানুষ হিসেবে সমাদৃত থাকুক,কামনা এটাই।

সময়ের অনুভবে : হামিদুল হক মুন্সী ” গ্রন্থটি আসলে হামিদুল হক মুন্সীর “কালো মানিক “হয়ে ওঠার গল্প।  তবে সত্য এই যে, এ ধরণের সংকলন সাধারণত মৃত্যুর পর স্মারক গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হতে দেখি। সম্ভবত অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সী জীবদ্দশায় তাকে নিয়ে মূল্যায়নটা  দেখে যেতে চেয়েছেন। তা ইচ্ছেটা  মন্দ না– অন্যের চোখে ফিরে দেখাটা বরং ভালো। মুন্সী স্যারের   বর্ণাঢ্য জীবনের সাথে যুক্ত আত্মীয়, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী অনেকেই লেখা দিয়েছেন। মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দে  অস্তিত্ব লাভ করেছে সময়ের অনুভবে : হামিদুল হক মুন্সী গ্রন্থটি। নানাজন , নানান দিক থেকে হামিদুল হক মুন্সীকে ছুঁতে চেষ্টা করেছেন; কিন্তু পুরোটা  পেরেছে কই? না পারুক, ছুঁতে না পারার ব্যর্থতা দীর্ঘ  উচ্চতার প্রমাণ। নজির আহমেদ (অবসর প্রাপ্ত ব্যাংকার বর্তমান সাধারণ সম্পাদক, চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ) যথার্থই বলেছেন, “বিচিত্র কর্মময় জীবনের বাঁকে বাঁকে জনাব হামিদুল হক মুন্সী অর্জন করেছেন অসংখ্য মূল্যবান পদক, পুরস্কার ও সম্মাননা। হয়েছেন শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষা সংগঠক।”
তবু্ও কথা থেকে যায়, তিনি একজন কবি,শতাধিক লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক। ভুলে গেলে চলবে না, তিনি’ বয়সী রোদের বিউগল’, ‘মাধবী,শুধু তোমাকেই’, ‘অবরুদ্ধ নগরে আছি’ প্রভৃতি অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ  সৃজন করেছেন। এই সংকলনে  তাঁর  কবিতার  বই—‘মাধবী,শুধু তোমাকেই’ শিরোনামে একটা লেখা পেলাম। ফজলুল রহমান খানের এই  লেখাটিকে কাব্য-সমালোচনা বলা চলে না—এইসব ভেবে মনে হলো সবদিকে আলো পড়েনি, কিছু অন্ধকার রয়ে গেছে।

মনে হলো বেলা শেষ হয়নি, শেষ হয়েছে খেলা। হামিদুল হক মুন্সীর কালো মানিক হয়ে ওঠাকে শীর্ষ বিন্দু ধরে বিশিষ্ট লেখকেরা  যেন  উপসংহার টেনে বসলেন! তিঁনি এখনো দিব্যি বেঁচে, সুস্থ না হলেও মোটামুটি সচল। প্রাজ্ঞজনে  বলে, ওস্তাদের মার শেষ  রাতে। এই যে রবীন্দ্রনাথ শেষ জীবনে ছবি এঁকে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিলেন। শুধু কি তাই?  মৃত্যু শয্যায় মুখে মুখে রচিলেন—“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি, বিচিত্র ছলনাজালে, হে ছলনাময়ী। “একজন সৃষ্টিশীল মানুষ  কখন যে কী দেখিয়ে দেয়, কে জানে? হয়তো হামিদুল হক মুন্সীর মাষ্টার পিচটা এখনো লেখাই হয়নি। অথচ লিখিয়েরা  তাঁকে নিয়ে যেন একটা  কনক্লুজন টেনে দিলেন ! এটাও  সংকলিত  লেখাগুলোর একটা  সীমাবদ্ধতা বলেই মনে হচ্ছে।

বইটি পড়তে পড়তে শেষে এসে একটা ধাক্কা খেলাম। আরে!  লেখকবৃন্দ যে সবাই হামিদুল হক মুন্সীর প্রিয়জন; কেউ শত্রু না। নিজেকে নিয়ে নিজে বলতে গেলে যেমন নৈর্ব্যক্তিক হওয়া যায় না। প্রিয়জনও সামনাসামনি অপ্রিয় সত্য বলে না, লুকিয়ে রাখে।  অথচ ভালো মন্দ মিলায়ে যে বিচার সেই বিচারই যথার্থ বিচার। নৈর্ব্যক্তিক না হতে পারলে কি বিচারের লাইন ঠিক থাকে, বলুন তো?
 মুঠো ফোনে  ০১৭১২০১০৯৪৫ — এ দিলাম কল ।
ওপার থেকে : হ্যালো, হুমায়ুন। বলো…
: জি, বলছিলাম যে, আপনার বুঝি কোন শত্রু নেই!
: কেন? কেন?
:না,মানে.. বলছিলাম যে,লেখাগুলো কি আপনি এডিট করেছিলেন?
: নাহ্!  বিন্দুমাত্র এডিট করি  নাই। যে, যেমনটি লিখেছে, তেমনই মুদ্রিত হয়েছে। তোমার লেখাটাও কোন এডিট করবো না,প্রেসে ইমেইল করে দিব।

তিনি  কবি, সংবেদনশীল মানুষ, বলা যায়, প্রাজ্ঞজন। এ বিষয়ে কথা কন্টিনিউ করাটা  শোভন মনে করিনি। ফোন রেখে আবার চোখ রাখলাম গ্রন্থে। বিষ্ময়ের সাথে দেখলাম, লেখকের প্রতি ভক্তির আতিশয্য বাদ দিলেও  অনিবার্য  থেকে যায়–একজন কবি,একজন লেখক, একজন সংগঠক, একজন  প্রতিষ্ঠান প্রধান, সর্বোপরি একজন মানুষ হামিদুল হক মুন্সী। অজান্তেই উচ্চারণ করলাম, এতগুলো গুণের যে মানুষটি  তাঁর ত্রুটি  তো উপেক্ষার যোগ্য, তাই না?

“Do so good that no one can ignore you”—এই  প্রাজ্ঞ উক্তি মনে পড়তেই লজ্জাবতী লতাগুল্মের মতো নুইয়ে গেলাম। অধ্যক্ষ শাজাহান আলী বিশ্বাসের কথা মনে হলো, হামিদুল হক মুন্সী কালো বটে, কিন্তু মনটা বড় সাদা। আমি তাঁকে দূর থেকে দেখেছি বেশি, কাছ থেকে দেখেছি কম। আমার দেখা বিস্তৃত না,সীমানা প্রাচীরে আবদ্ধ। আমি তাঁকে নিয়ে এই সংকলনটা পড়ে  সাদা মনটা খুঁজে ফিরছি। বিভিন্নজন  বিভিন্ন মাত্রা থেকে তাঁকে দেখেছেন। তাদের লেখায়  মুন্সী স্যারের  বিপুল কর্মময় জীবনের  পরিচয় পাচ্ছি। জানতে পারছি, চুয়াডাঙ্গার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রথম তিনিই রচনা করেছেন। তাঁকে আবিস্কার করছি একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে। ২৭২-পৃষ্ঠার এই বইয়ে পাতায় পাতায় তাঁর  দেখা পাচ্ছি। আস্তে আস্তে   খসে পড়ছে তাঁকে নিয়ে  আমার অস্পষ্টতার পর্দা।

তাঁর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো: মাহতাব উদ্দিন। ভদ্রলোক প্রবীণ সাংবাদিক এবং খ্যাতিমান শিশু সংগঠক। এই  শিক্ষকের মন্তব্যে আপ্লূত হলাম। “আমার প্রিয় ছাত্র : হামিদুল হক মুন্সী ” শীর্ষক প্রবন্ধে  তিনি লিখেছেন “মেধাবী ছাত্র ছিল হামিদুল। ঐ বয়সেই তাঁর ব্যক্তিত্বের শিখা দেখা যেত। শিক্ষকদের সাথে ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলার সময় আমরা তার যোগ্যতার সাথে পরিচিত হই।” স্যারের মন্তব্য পাঠে মনে হলো, উঠন্ত মুলা পত্তনেই চেনা যায়।

কিছু লেখা পড়ে মনে হয়েছে, সৃষ্টিশীল মানুষদের ভেতর থেকে কে যেন ঠ্যালা দেয়—রবীন্দ্রনাথ একদা বলেছিলেন, কে যেন আমাকে দিয়ে লেখিয়ে নেয়। সমাজের   প্রতি, মানুষের প্রতি  লেখকদের  একটা দায়বদ্ধতা থাকে। হামিদুল হক মুন্সী  মনে মনে উপলব্ধি করেছিলেন  চুয়াডাঙ্গায় একটা সাহিত্য পরিষদ থাকা প্রয়োজন। চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সাবেক সভাপতি সরদার আলী হোসেন—“চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠায় হামিদুল হক মুন্সী” প্রবন্ধে  লিখছেন, “স্বাধীনতা পরবর্তী চুয়াডাঙ্গায় বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন ব্যানারে সাহিত্য সংগঠনগুলো  পরিচালিত হয়ে আসছিল। মাঝিবিহীন নৌকার মতো  চলছিল সাহিত্যচর্চা।  সাহিত্যচর্চাকে একই  প্লাটফর্মে নিয়ে আসার  চেষ্টাগুলো বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল। তখন সামনে  এসে হাল ধরেছে হামিদুল হক মুন্সী। চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জনাব শফিউদ্দীন ১৯৮৩ সালে “ঐতিহাসিক পটভূমিতে চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ” শিরোনামে একটা তথ্যবহুল  প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে লেখক উল্লেখ করেন :” গতিশীল চিন্তা ও অধ্যবসায় যেকোনো উদ্দ্যেশ্য বাস্তবায়নের মৌলিক শর্ত। সর্বজন-স্বীকৃত এ-তত্ত্বের যথার্থতা প্রমাণে তরুণ কবি হামিদুল হক মুন্সী পরবর্তীকালে ‘চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা ও তার স্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টির এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। “এজন্য তিনি  স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ইনশাআল্লাহ। চুয়াডাঙ্গার কৃতিসন্তান বহু গ্রন্থ রচয়িতা রাজিব আহমেদ হামিদুল হক মুন্সীকে দেখেছেন সময়ের আগে ছুটে চলা ক্ষণজন্মা পুরুষ হিসেবে। বলেছেন, হামিদুল হক মুন্সী সারাজীবন তাঁর বয়সের  আগেভাগে ছুটে চলা মানুষ। সাধারণত যে বয়সে মানুষ যে কাজ করে, সেই কাজগুলো স্বাভাবিক সময়ের আগেই করে দেখিয়েছেন তিনি।

আগেভাগে ছুটে চলা এই মানুষটি এখন ক্লান্ত—ঠিক বয়সের ভারে না, রোগের ভারে। ইচ্ছে ছিল, কলেজ-অধ্যক্ষ থেকে অবসরে এসে সাহিত্য চর্চায় মন দিবেন। কিন্তু শরীর সেই অনুমোদন দেয়নি। লেখালেখি করেন না বললেই চলে। কলেজবন্ধু গাজী আবুল কালাম আজাদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, লেখালেখিটা ধরে  রাখিনি, আবার ছেড়েও দিইনি। এ প্রসঙ্গে মো: আনছার আলী লিখেছেন, লেখালেখির জগতে এই অঞ্চলে তাঁর সুনাম আকাশচুম্বী। কাব্য করে তিনি লিখেছেন :
একাধারে কবি তিনি সাংবাদিকও বটে
তাঁর মতো গুণীজন নেই এ তল্লাটে।
প্রাবন্ধিক, গবেষক, দক্ষ সংগঠক
তাঁর লেখা পড়ে প্রীত হয় সব পাঠক।

সাত-সাতটি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। যখন যে কলেজে থেকেছেন,আপন মেধা -শ্রমে গড়ে তুলেছেন সেই  প্রতিষ্ঠান। ভালোবাসায় অন্যকে মুগ্ধ করেছেন আর নিজেও সিক্ত হয়েছেন  ভালোবাসায়। তাঁর ছাত্রী, আব্দুল হাই ডিগ্রি কলেজ, নড়াইলের  ফারজানা ববি লিখছেন, “তিনি নড়াইলের মাটি, মানুষ, গাছপালা, নদনদীকে আপন করে নিতে পেরেছিলেন। এটিই স্যারের কৃতিত্ব,গর্ব এবং নিশ্চয় অহংকারও।” মুন্সী স্যারের ভাগ্নী ডা. তাসনিয়া তাছনিন তামান্নার লেখায় এক রাশভারি প্রিন্সিপাল হামিদুল হক মুন্সীকে আমরা দেখতে পাই। ছুটিতে মামা বাড়ি এলে রাশভারি মামার সামনে জড়সড় হয়ে থাকতেন তিনি।

সমগ্র লেখায় একটা বিষয় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে সেটা হচ্ছে মানুষের ভালোবাসা। “হামিদুল হক মুন্সী, যাঁকে ভালোবাসা যায়”—-কামাল মাহমুদের লেখাটা পড়ে আপ্লূত হলাম। কামাল মাহমুদ লিখেছেন, বিখ্যাত এক মনীষী বলেছেন, ‘পৃথীবিতে খুব কম মানুষ আছে যারা প্রেম দিতে জানে,আরও কম আছে যারা নিতে জানে’—স্যার দুটোই জানেন। সুজাতপুর ডিগ্রি  কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো: আতাউল্লাহ  তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আকাশের চাঁদ ‘ হিসেবেই হামিদুল হক মুন্সী আমাদের কলেজে আবির্ভূত হয়েছিলেন। লেখায় ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, সাদিয়া সিদ্দিকা জিতু, মো: মেহেদী হাসান হৃদয়, এম এ ওয়াদুদ, ফরিদা ইয়াছমিন, মো: আনোয়ার হোসেন, হেলেনা পারভীন প্রমুখ। তাঁকে নিয়ে অসাধারণ লিখেছেন, রফিকুর রশিদ,, সরদার আল আমিন, বনোয়ারী লাল বাগলা, চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু, ইদ্রিস মন্ডল, আহাদ আলী মোল্লা, পরেশ কান্তি সাহা এবং আরও অনেকে। ড. অখিল পোদ্দারের লেখা ‘সক্রেটিস এবং অদ্বিতীয় হামিদুল হক মুন্সী’ পড়ে  মুগ্ধ হলাম।

এ-গ্রন্থে সংকলিত লেখাগুলো ব্যক্তি এবং সংগঠক হামিদুল হক মুন্সীকে নিয়ে  লেখা। লেখকদের মূল্যায়নে তিনি সফল  প্রতিষ্ঠান প্রধান  এবং বড়  সংগঠক  এমনই মনে হয়েছে।  আমি মাঝে তাঁর কবিতার বই পড়ে  একটা নিবন্ধ লিখেছিলাম। একদিন বিকেলে  উনার বাসায় বসে নাস্তা খেতে খেতে বলে ফেললাম, আপনি কবিতায় টিকে থাকবেন বলে মনে হয় না। বললেন, আমিও মানি।দ্যাখো, হুমায়ুন, আমার বোধহয় বড় পরিচয় এই যে, আমি একজন  সংগঠক। আমি বললাম, দেখুন, ড. মুন্সি আবু সাঈফ স্যার একসময়ে সাহিত্য পরিষদের আলোচনায় আপনার মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গা বইয়ের বেশ তারিফ করলেন। বললেন, বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য রাখার সময় বইটা থেকে উদ্ধৃতি দিই। এই বইটার জন্য কি মানুষ আপনাকে মনে রাখবে না? দেখলাম, হামিদুল হক মুন্সীর চোখেমুখে তৃপ্তির আভা— মনে হলো এই তো সেই কালো মানিক যাকে বইয়ের পাতায়  খুঁজে ফিরছি।

কোন কোন লেখায় ব্যক্তি মানুষ হামিদুল হক মুন্সী উঠে এসেছে। লেখকদের জীবনে আদি, মধ্য, অন্ত পর্ব থাকে। জীবনের প্রথম পর্বে মুন্সী সাহেব একটা সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মানের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন।  উদ্দেশ্যমুখী সাহিত্য চর্চা করতেন। একদা অনেক রোমান্টিক পদাবলিও  লিখেছেন। পরে স্থানীয় ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্থানীয় সংগ্রাম- আন্দোলনের ইতিহাস  নিয়ে লিখেছেন। তাঁর এই বহুমাত্রিক প্রতিভার বৈচিত্র্যকে ধরতে চেষ্টা করেছেন সম্মানিত লেখকেরা। তাঁর  কাব্য -ভাবনা ছাড়া অন্য দিকগুলোর একটা  তথ্যনির্ভর, স্মৃতিনির্ভর মূল্যায়ন  স্থান পেয়েছে এই সংকলনে। “নানা হামিদুল হক মুন্সীর মালা” একসূত্রে গাঁথবার এই প্রচেষ্টাকে আমরা অভিনন্দন জানাই।

 


ফিরে দেখা :  সময়ের অনুভবে  হামিদুল হক মুন্সী
সম্পাদনা : মালেকা খান মাখন
প্রকাশক : গতিধারা, ৩৮ বাংলাবাজার, ঢাকা–১১০০
 পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৭২ মূল্য: ৫০০ টাকা

 

লেখক : হুমায়ুন কবীর, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক। থাকেন চুয়াডাঙ্গা।